অনেকক্ষণ বসতে বসতে কোমর লেগে আসে সাখাওয়াতের। তাই একটু উঠে গাড়ির পেসেজে হাঁটাহাঁটি করতে থাকে। সেই বুড়োর পাশ দিয়ে যাবার সময় চোখ মেলে তাকায় সাখাওয়াতের দিকে। চোখাচোখি হয়। ভেবেছিল ঐ চোখাচোখি পর্যন্তই। হেঁটে চলে যাবে। কিন্তু বুড়ো বেশ আয়োজন করে সোজা হয়ে বসে।
-স্যার আপনাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে!
দাঁড়িয়ে যায়। এমনিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার হওয়ায় রাস্তাঘাটে স্যার ডাক শুনতে অভ্যস্ত। আবার কেউ কেউ ছাত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ভক্তি শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে পড়ে। কেউবা আবার ছাত্রছাত্রীর অভিভাবক হিসেবেও পরিচয় দিয়ে থামিয়ে দেয় চলার গতি। বাড়তি ঝামেলা। কিন্তু এখন যে উটকো ঝামেলায় পড়া গেল তা বোঝা যাচ্ছে। সাখাওয়াত না চেনার ভান করে সংক্ষিপ্ত পরিচয় পর্ব শেষ করে নিষ্ক্রান্ত হবে ভাবে।
-স্যার, আপনি আমার একদিন বেশ উপকার করছিলেন-
-মনে পড়েছে বই মেলায়-
-আমি বেশ বেকায়দায় পড়ছিলাম- আমার ভবিষ্যৎবানী সমৃদ্ধ বইগুলো কেউ বিশ্বাস করতে চায় না- কিছু বখাটে ছেলে আমার বুক স্টল তুলে দেবার জন্য হট্টগোল করে- আপনি স্যার সেদিন আমার স্টলটারে রক্ষা করছিলেন- বসুন স্যার, একটু কথা বলি। ভদ্রলোক উঠে বেশ খানিকটা জায়গা ছেড়ে বসার জন্য অনুরোধ করে। অগত্যা সাখাওয়াত তার পাশে বসতে বাধ্য হল।
-ফ্যামিলি নিয়ে যাচ্ছেন কোথাও স্যার?
এমন বুরবকী প্রশ্নে সাখাওয়াতের মেজাজ বিগড়ে যায়। পাছে ভদ্রলোক কিছু মনে করেন মনের ভাব চেপে স্বাভাবিক এবং যথাসম্ভব শান্তভাব রেখে বলল- এই শ্রীমঙ্গল- আত্মীয়ের বাড়ি।
-বেশ ভাল বেশ ভাল- শ্রীমঙ্গল শহরেই নাকি- অন্য কোন
-শহরে না- নূরপুর টি এস্টেটে- আমার ব্রাদার ইন ল ঐ এস্টেটের ম্যানেজার বাবু।
-খুব ভাল- খুব ভাল- নূরপুর টি এস্টেট তো বিশাল- ঘুরে ফিরে দেখবেন নিশ্চয়ই ঐ দিকে যাচ্ছেন যখন নির্ম্মাই শিব বাড়িটা দেখে আসতে পারেন। খুব পুরনো। প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর আগে ১৪৫৪ খ্রিস্টাব্দে শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা পরগনার শংকর সেনা গ্রামে নির্ম্মাই শিব বাড়ি বানায়। বালিশিরা অঞ্চলের ত্রিপুরার মহারাজা রাজত্ব করতেন। প্রবল শক্তিশালী এই রাজার বিরুদ্ধে ‘কুকি’ সামন্তরাজা প্রায়ই বিদ্রোহ ঘোষণা করত। এ রকম কুকি রাজার বিদ্রোহের খবর পাইয়া মহারাজা একদল সৈন্য পাঠান। তুমুল যুদ্ধে কুকিরা পরাজিত হয়। কিন্তু যুদ্ধে মহারাজার প্রধান সেনাপতি মারা যান। সেনাপতি ছিলেন সদ্য বিবাহিত। মহারাজার কন্যা হন স্বামীহারা। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী সহমরণে রাজী হলেন না রাজ কন্যা। স্বামী নিহতের স্থানে তিনি শিবের আরাধনা শুরু করলেন। তার নামেই নির্মিত তৈরি নির্ম্মাই শিব বাড়ি। দেখবেন বেশ সুন্দর।
-জ্বী দেখব, আপনার দেখছি ইতিহাস জ্ঞান ভাল।
-জ্বী, শুধু গ্রহ নক্ষত্র নিয়েই থাকি না আমি- ইতিহাসের দিকেও আমার একটু ঝোঁক আছে হা: হা: হা:..
-তাই তো দেখছি। আপনি বেশ গুণী লোক-
-স্যার, কি যে বলেন, গুনী তো আপনারা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরফেসর, আমরা পথের লোক- পথেই একদিন হারাই যামু-
-তাহলে উঠি এখন- সাখাওয়াত উঠতে যায়।
-একটু বসুন স্যার, আমার একটা বই, মাত্র সেদিন বের হইছে- বইটা আপনারে দিতে পেরে কি যে ভাল লাগছে- ভদ্রলোক তার জার্নি ব্যাগের চেইন খুলে ভেতর থেকে লাল ও কালোতে মিশ্রিত একটা বই বের করল। প্রচ্ছদে দু’টো রক্তাক্ত চোখ- বইয়ের নাম- স্বপ্ন কেন দেখেন।
-স্যার, এটা আমার বিশ বছরের গবেষণার থিসিস- আমি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এবং ধর্মীয় বিধানের মাধ্যমে প্রমাণ করছি স্বপ্ন শুধুই স্বপ্ন নয়- স্বপ্ন থেকে আমরা অতীত এবং ভবিষ্যতের অনেক কিছু জানতে পারি-
ভদ্রলোক বুক পকেট থেকে একটা ইকনো বল পয়েন্ট বের করে বইয়ের ইনার পাতায় লিখতে শুরু করল ‘পরম শ্রদ্ধেয়-’ এরপর সাখাওয়াতের মুখের দিকে স্মিত হেসে নামটা স্যার কাইণ্ডলি-
-সাখাওয়াত উল্লাহ চৌধুরী।
-খুব ভাল নাম, খুব শরীফ নাম- বলতে বলতে খস খস করে লিখে ফেলল নামটি। নিচে নিজের নাম রাবীন্দ্রিক হরফে লিখল মহাজ্ঞানী রাইচরন ভৃত্য নটবর জ্যোতিষী আচার্য্য।
-সাখাওয়াত নামটি পড়ে না হেসে পারল না। বুঝতে বাকি থাকল না ভদ্রলোক কেন নির্ম্মাই শিব বাড়ি দেখতে এতো উৎসাহী করল।
-বইটি হাতে নিয়ে সাখাওয়াত উঠে পড়ল। দু’হাত দিয়ে সাখাওয়াতের একখানি হাত স্পর্শ করে পরম ভক্তিতে একটা চুম্বনের ভঙ্গি করল রাইচরণ জ্যোতিষী। এসব খুব অপচ্ছন্দ করে সে। অতিরিক্ত তার কাছে মোটেই পছন্দনীয় নয়। কারণ এরা সাধারণত: খুব ধূর্ত টাইপের লোক হয়। দুনিয়ার অধিকাংশ বদ লোকেরা এসব স্বভাবের হয়। সাখাওয়তের তাই ধারণা।
নিজের সীটে ফিরে আসার পর বিলু হাত থেকে ছোঁ মেরে বইটি নেয়। দেখল বইটিতে নাম লেখা মহাজ্ঞানী নটবর জ্যোতিষী। কিন্তু বইয়ের ভেতরে নিজের পরিচিতি তুলে ধরতে বিশাল এক নাম ব্যবহার করেছে। তার মানে সে যে একজন বিশাল জ্যোতিষী তা বোঝাতে এই প্রয়াস। ডাক্তারদের নামের শেষে ইংরেজি বর্ণমালা যতো বেশি বসানো যায় তার প্রয়াস যেভাবে লক্ষণীয়, তেমনি এসব জ্যোতিষী নিজেকে জাহির করার জন্য উদ্ভট সব পদবী ব্যবহার করে থাকে। এই ব্যাটাও তাই করেছে।
-আব্বু, তুমি এতক্ষণ ঐ পাগল লোকের সঙ্গে কি কথা বললে? বিলু প্রশ্ন করে।
-কী আর করব, ব্যাটা মোটেই ছাড়তে চায় না। এটা সেটা প্রশ্ন করে। সে যে অনেক কিছু জানে তা বোঝাতে চায়- তবে পড়াশোনা কিছুটা করেছে তা ঠিক- তবে মতলববাজ-
-ঠিক বলেছো আব্বু, মতলববাজ- সুবিধের লোক নয় গিরিংগী টাইপের।
-তাতে আমাদের কি? মিলু বলল।
-আমাদের কি মানে! আমার মনে হচ্ছে একটা বড় ধরনের ঘুঘু-
-থাক্ ওঁকে নিয়ে চর্চা করে কাজ নেই। আমরা প্রায় এসে গেছি। সামনের স্টেশনের পরই শ্রীমঙ্গল।