সকালে ঘুম ভাঙল পাহাড়ি ময়নার শীষে। গতকাল দিনে আর কোথাও যাওয়া হয়নি বলে বিলু মিলু শেষ দিকে আরেকবার ঘুমিয়ে নেয়। ভ্রমণের ক্লান্তি ছিল না। রাত্রে মামার সঙ্গে জম্পেস আড্ডা বসেছিল। অবশ্য আম্মুর চোখ রাঙানিতে খুব রাত অবধি তা গড়াতে পারেনি।
বিলু-মিলু পাখিটাকে খুঁজছিল। পাখিটা বনের তা বোঝা যাচ্ছিল। তবে শীষ দেওয়া শব্দটা বেশ কানের কাছে এসে লাগে। কিন্তু কোথায় যে পাখিটা তা বুঝে উঠতে পারে না। পাহাড়ি ময়না এতে কোন সন্দেহ নেই। আওয়াজটা একটু কর্কশ।
এসব ব্যাপারে বিলুর আগ্রহ বেশি। পাখিদের নিয়েও সে মেতে থাকে। পাখি সম্পর্কিত বই তার প্রিয় পাঠ্য।
-মিলু, পাখিটা কোথায় রে?
-মনে হয় দূর বাগানে কোথাও।
-পাখিটা ডাকে কেন?
-পাখিরা ডাকে দু’টো কারণে। এক যখন পাখি সঙ্গীহীন হয়ে পড়ে তখন, সঙ্গী পেতে। আরেক কারণ হলো সিজন চেঞ্জের ফলে পাখিদের গলার স্বর বদলায়। যেমন বসন্তকালে কোকিল বেশ সুরেলা স্বরে ডাকে। এ ছাড়া ফটিকজল, বুলবুল, রামগাংরু, ফিঙে, হাঁড়িচাঁচা পাখিররাও সিজন চেঞ্জের সঙ্গে সঙ্গে গলার স্বর বদলায়।
-আচ্ছা, আমরা তো এখানে অনেক রকম পাখি দেখতে পাবো, তাই না?
-হ্যাঁ, মামা বলেছেন এখানে একটা হাওর আছে- হাইলা হাওর, সেখানে শীতে নানা জাতের পাখি দেখা যায়। এমনিতেও এই হাওর এবং গঙ্গাছড়ার বনে অনেক বিরল পাখির আনাগোনা দেখা যায়।
-তাহলে তো মামাকে বলতে হবে আমাদের হাইলা হাওরে নিয়ে যেতে।
-অবশ্যই, আর মামার শিকারীরা তো আছেই- পাখি শিকার করে আনবে নিশ্চয়ই-
-কিন্তু পাখি শিকার করা অন্যায়- পাখিরা পরিবেশের বন্ধু। পাখিরা আল্লাহর সৃষ্ট প্রকৃতির সুন্দর জীব। ওদের শিকার করলে আমার কষ্ট হয়। ভাল্লাগে না।
-কিন্তু পাখির গোস্ত খুব মজার, তাই না ভাইয়া?
-তা ঠিক।
-কি বিলু-মিলু ঘুম ভাঙল?
মামা কখন ওদের ঘরে ঢুকেছেন টেরই পায়নি। বিলু-মিলু এবার মামার দিকে তাকিয়ে হাসে। হাফ প্যান্ট পরা মাখায় হ্যাড হাতে স্টিক এক ভিন্নরূপ মামার।-কোথায় যাচ্ছ মামা সাহেবের বেশে? বিলু বলল।
-বাগানে। এটা আমার রুটিন ডিউটি- যাবি আমার সঙ্গে।
-থাক্ আজ নয়- তোমার সঙ্গে বের হতে দেরি হয়ে যাবে। মিলু জবাব দেয়।
-ঠিক আছে তোরা থাক্- আমি একটা রাউন্ড দিয়ে আসি। এসে এক সঙ্গে নাস্তা করব। ঠিক আছে? তবে এখন তোরা চা খেয়ে নে। একটু পরই দেবে- চলি- বা-ই-
মীর্জা সগীর বের হয়ে গেলো।
বাংলোর ওপর থেকে ঢালু পথে নামতে নামতে শুনতে পায় ময়নার সুমধুর ডাক। পাহাড়ি ময়না। নিশ্চয়ই কোথাও বাসা বেঁধেছে। শরৎ কালে এই ময়না বাসা বাঁধে। বিলু-মিলুর জন্য ময়না পাখি ধরতে পারলে ভাল হতো।

নাস্তার টেবিলে বসে মীর্জা সগীর বেড়ানোর প্রোগ্রামটা নিয়ে ভাবতে থাকে। ইতিমধ্যে সকল প্রস্তুতি সে শেষ করে এসেছে।
-সগীর, আমাদের কোন বনে যেনো নিয়ে যাবে, বলছ না তো কিছু? রেশমা বলল।
-বলব, এখনই বলব- নাস্তা খেতে খেতে পুরো প্রোগ্রাম জানতে পারবে আপু-
-মামা, এ দেখছি খোরগোশের রোস্ট! হুররে! বিলু চিৎকার করে ওঠে।
-শুধুই কি খোরগোশের রোস্ট, বন মোরগের ভূনা। চালের রুটি, বিরুইন চালের খিচুড়ি। মাশকলাইয়ের ডাল, তিতির পাখির ডিমের দোপেঁয়াজা, গুড়ের পায়েস, নারকেলের নাড়–, কুঁচো চিংড়ির খাট্টা- কত কি! রেশমা বলে।
-তোমরা এসেছো বলেইনা আমার এই আয়োজন সার্থক হলো- আমার এখানে কতো কি পাওয়া যায় অথচ নাজমা আপু, রেহানা আপু, লাবু ভাইয়া বলে কি না বনে মানুষ থাকে? সেখানে লাইফ আছে? তোমরা বল এখানে কি লাইফ নেই?
-লাইফ আছে- তবে ভায়া জাঙ্গল লাইফ, যাকে বলে ওয়াইল্ড লাইফ- হাঃ হাঃ হাঃ। সাখাওয়াত এতক্ষণ পর মুখ খুলল এবং যার প্রেক্ষিতে ঘটে গেল ‘সিভিল ওয়ার’ বিটুইন টু ব্রাদার। একজন অপর জনের সম্পর্ক- ব্রাদার ইন ল। বিলু-মিলু তা দেখে বেশ উপভোগ করে।
হাসতে থাকে বিলু মিলু। আব্বু ও মামা আপোষে ঝগড়া করে কিছুক্ষণ।
-রাখতো তোমাদের ফাজলামো! এখন বেড়ানোর প্রোগ্রামের কথা বলো। রেশমা বিরক্ত হয়ে ওঠে।
-বলছি আপু। দুপুরের খাবার আমরা খাবো ভাড়াউড়া লেকের পাশে ফিনলে কোম্পানির চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোতে। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু অনেক আগেই দাওয়াত দিয়ে রেখেছে। আমরা যদি এগারোটার মধ্যে রওনা দিতে পারি, তাহলে দুপুর একটার মধ্যে জাফরের বাংলোতে পৌঁছে যেতে পারবো। সেখানে স্রেফ দুপুরের খাবার ছাড়া অন্য কোন প্রোগ্রাম নেই। দুপুরে খেয়ে দেয়ে একটু রেস্ট করেই গঙ্গাছড়ার বনের উদ্দেশ্যে রওনা দেবো। আমার বাহিনী এর আগেই সেখানে পৌঁছে যাবে।
-কিন্তু আরেক জনের বাংলোতে খাওয়া কেন- বনেও হতে পারতো- সাখাওয়াত টেনে টেনে বলল।
-দুলাভাই, সেখানে গেলেই বুঝতে পারবেন- জাফর আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওর একটা বনেদী মেজাজ আছে। গেলেই টের পাবেন। আপনি তো জমিদার মানুষ, ভাল লাগবে। জাফর হয়তো আপনাদের জন্য হরিণের ব্যবস্থা করেছে।
-তাই নাকি মামা! বিলু মিলু সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে।