দোল খেতে খেতে গার্ডেনের ভেতর দিয়ে, কখনো দু’পাহাড়ের মাঝ দিয়ে, এঁকে বেঁকে চলে যাওয়া পথে, ল্যান্ড রোভারটি শরতের ঠাণ্ডা বাতাস খেয়ে খেয়ে ছুটে চলল। একটু দুলুনি লাগলেও ঠাণ্ডা বাতাস সুন্দর প্রকৃতি, পাখির ডাক শুনতে মন্দ লাগছিল না।
সবাই চুপ ছিল। শুধু মামার গাড়িতে বাজছিল ইংরেজি গান- লাইফ ইজ নাথিং বাট রোলিং স্টোন..
-সগীর, গানটা বেশ অনেক দিনের- তোমার কালেকশনে এখনো আছে?
-বিখ্যাত কান্ট্রি সিংগার জন লেননের তাই না?
-জ্বী, দুলাভাই।
-সাখাওয়াত আর কথা বাড়ায় না। বোঝা গেল মন দিয়ে শুনছে গান। সত্যিই অপূর্ব সুর আর কথা গানটির। এক সময় আমেরিকানদের স্বপ্নের পুরুষ ছিল এই জন লেনন। আজকের কোন শিল্পী এমন গগনস্পর্শী লোকপ্রিয়তা পায়নি। সাখাওয়াত ভাবে। গানের শেষ কথা ‘হার্ট ইজ ব্রেকিং বাট নো মোর…’ বাজার সাথে সাথে একটা স্রোতস্বি ঝর্ণার কাছে এসে ল্যান্ড রোভারটি ‘ক্যাচ’ শব্দ করে থেমে গেল।
-এখানেই আমাদের তাঁবু- এখন থেকে পায়ে হেঁটে যেতে হবে বনের ভেতর। যতোদূর যাওয়া যাবে দেখা যাবে নানা জাতের পশু-পাখি। বন মোরগ, খরগোশ, বানর, হনুমান, হরিণ, ভাল্লুক, ভাগ্য ভাল থাকলে চিতাবাঘের সঙ্গেও মোলাকাত হতে পারে।
-মামা চিতা বাঘ! বিলু মিলুর মিলিত কণ্ঠের উচ্চারণ।
-গতবার তো সাক্ষাৎ মেলেনি- এবার যদি –
-কী বলছ মামা! চিতা বাঘের সাক্ষাৎ!
-সগীর ল্যান্ড রোভার থেকে নামে। হাতে বাইনাকুলার। সগীরের সঙ্গে সঙ্গে বিলু মিলু নামে। পরে সাখাওয়াত এবং রেশমা নামে। সবাই হাত পা ছুঁড়ে একটু আড়ামোড়া ভাঙে। ঘণ্টা দেড়েক ছিল ওরা গাড়িতে। কিন্তু উঁচু-নিচু পথের ঝাঁকুনী ওদের শরীরকে নিস্তেজ করে দিয়েছে।
-ওই যে আমাদের তাঁবু। ওখানে গিয়ে চা খাবে সবাই চল- সগীর ঝর্ণার পাশে একটা গোলাকার জলপাই রঙের টাঙ্গানো তাঁবু দেখিয়ে বলল। বেশ উঁচু করে টাঙ্গানো। তাঁবুর বাইরে দু’টো চেয়ার একটা টেবিল দেখা যাচ্ছিল। সগীর হাঁটা শুরু করল। সগীর হাঁটতে থাকায় বিলু-মিলুও। রেশমা-সাখাওয়াত আর দাঁড়িয়ে না থেকে অনুসরণ করতে থাকে। কিছুটা হাঁটার পর দু’জন লোক লম্বা সালাম দিয়ে সগীরের সামনে এসে দাঁড়ায়।
-কি গঙ্গারাম- শঙ্কর সবকিছু ঠিক হ্যায়?
-জ্বে, হুজুর- সব কুছ ঠিক হ্যায়।
মাথায় পাগড়ীর মতো ঝুটি বাঁধা গঙ্গারাম- শঙ্করের। খাকি রংয়ের সার্ট এবং ধূতি পরা দু’জনের। এরা বাগানের লোক। পাকা শিকারী। পাহারাদার। সগীরের নির্দেশে এই ট্যুরিস্ট দলকে সঙ্গ দেবে। তাছাড়া হরিণ পাখি শিকার করে আনারও নির্দেশ আছে এদের। সগীর, বিলু-মিলু সাখাওয়াত রেশমা তাঁবুতে ঢুকে।
তাঁবুর ভেতর আরো দু’জনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল।
সগীর তাদের নাম ধরে ডাকে- ধোনদিবা- অরবিন্দ সবকিছু ঠিক হ্যায়?
-বিলকুল ঠিক হুজুর। এদের হাতে দু’টো বন্দুক এরা তাঁবু পাহারা দেবে। টুটু বোরের দোনলা বন্দুক। এরা আসলে ম্যানেজারের বডিগার্ড।
তাঁবুর ভেতর একটা রাউন্ড টেবিল- প্লাস্টিকের। চেয়ার খান আষ্টেক। ও গুলোও প্লাস্টিকের। টেবিলের ওপর সাদা কাপড় চড়ানো। একটা ট্রেতে একটা পানির জাগ ও ছখান কাঁচের গ্লাস। এছাড়া একটা টাইগার ফ্লাস্কও আছে পাশে।
-মামা পানি খাবো- বিলু বলল।
-বলতেই গার্ড একজন এগিয়ে আসছিল জাগ থেকে পানি ঢেলে দিতে। সগীর হাতের ইশারায় মানা করল। মুচকি হেসে আর এগোল না।
-পানি ঢেলে খাও- আমরা এখন বনে। বাসায় না। কষ্টকর জীবনের অভ্যাস করো। নিজে ঢেলে খাও এবং অন্যকে দাও। জলদ গম্ভীর স্বর মামার। যেনো কর্নেল সগীর।
বিলু উঠে গিয়ে জাগ থেকে পানি ঢালে। দু’টো গ্লাসে। এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেয় মিলুর দিকে।
-আমাকেও দিয়ো- সাখাওয়াত বলল।
-আমাকেও- রেশমা।
-দিচ্ছি- সবাইকে। পরপর আরো দু’টো গ্লাসে পানি ঢালল বিলু।
-মিলু পানির গ্লাস মুখে নিয়ে চিৎকার করে উঠল- ওমা! এযে ডাবের পানি!
-হ্যাঁ, ডাবের পানি- এখানে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া মুস্কিল- তাই ডাবের পানিই রাখতে বলেছি।
-তাহলে আমাদের ডাবের পানি খেয়ে খেয়ে চলতে হবে? রেশমা টেনে টেনে নাকি সুরে পেতনীর মত করে বলল।
-জ্বী আপু। ডাবের পানি হচ্ছে একশ ভাগ খাঁটি, যার ভেতর আছে মিনারেল ছাড়াও ভিটামিন। তাই, এটাকে অবজ্ঞা করার কিছুই নেই। সগীর আগের মতো কমাণ্ডিং ভয়েসে বলল।
-তাহলে আমরা বাসা থেকে পানি নিয়ে আসলাম না কেন! সাখাওয়াত বলল।
-এ জন্য দুলাভাই, বনের পরিবেশের সঙ্গে একাগ্র হতে। তবে, আপনাদের জন্য চায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে- এটা আমার বাগানের চা নয়- ফিনলে কোম্পানির বাগানের- যে বন্ধুর বাসায় দুপুরে খেলেন ওদের। বিলু মামা ফ্লাস্ক থেকে চা ঢালো তো।
-কিসে ঢালব মামা?
-ঐ গ্লাসেই- চা-কাপ এখানে পাবো কোথায়।
বিলু হাসে। মিলুও।
রেশমা উঠে গিয়ে ফ্লাস্কের মুখ খোলে। ফ্লাস্ক ভরা চা। গ্লাসে গ্লাসে চা ঢেলে দেয় রেশমা। এমন সময় একজন গার্ড তাঁবুর কোনায় রাখা ছিল একটা বিস্কুটের টিন এনে টেবিলে রাখে।
-এটা কি?
-বিস্কুট হুজুর- ছোট বাবু দিলে-
যাক্ বিস্কিটের ব্যবস্থা হয়ে গেল! আমি ভেবেছিলাম শুধু চা দিয়ে সারবো- হা: হা: হা: … সগীর হাসতে থাকে। হাসির মধ্যে একটা নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পায়।
-দুলাভাই, জাঙ্গল লাইফ উপভোগ করতে হলে এতো আরাম খুঁজলে চলবে কেন? হা: হা: হা : …

চা পানের পর সগীর তার দলবল নিয়ে বের হয়ে গেল। বলে গেল পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসবে। তাঁবুতে থাকল বিলু-মিলুরা। রেশমা সাখাওয়াত হাতে একটা তাল পাখা দিয়ে বাতাস খাচ্ছিল। তাঁবুর ভেতরে একটু গরম লাগছিল। বিলু-মিলু বের হয়ে আসে তাঁবুর বাইরে। বাতাসের জন্য। ঝর্ণার পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকে দু’জন। পাহাড়ি ঝর্ণা কল কল শব্দে বয়ে চলেছে। পাথরের নুড়িগুলো পারছে না ঝর্ণার চলার পথে বাধা হতে।
শ্ ..শ.. শ…। বিলু মুখে আঙ্গুল চেপে দৃষ্টি আকর্ষণ করে মিলুকে। মিলু একটু ঘাড় ঘুরিয়ে বিলুর নির্দেশ মোতাবেক তাকায়। দেখতে পেলো সেই বুড়ো জ্যোতিষী। ঝর্ণার ওপারে দাঁড়িয়ে। এদিক ওদিক পিটিস পিটিস তাকিয়ে কি যেনো খুঁজছে।
বুড়োটা এখানে কেন? বিলু ভাবতে থাকে। ব্যাটা তাদের ফলো করছে না তো। সঙ্গে ঐ ঝোলা আছে। ড্রেস যথা পূর্বং। একটা মাফলার গলায় অতিরিক্ত। নীল রঙের ছাপা মাফলার। সিল্কের।
-জ্যোতিষী বুড়ো এখানে কেন? মিলু প্রশ্ন করে।
-আমিও তো ভাবছি। ব্যাটাকে আমার সন্দেহ হয়। কোন বড় ধরনের চক্রের সঙ্গে ওর সম্বন্ধ থাকতে পারে।
-কিন্তু, ওকে আমাদের চ্যালেঞ্জ করা উচিত। এখানে কি চায়, কি জন্য এসেছে।
-না, সেটা করা উচিত হবে না। একটা না একটা ফাঁক ফোকর দিয়ে বের হয়ে যাবে। আমাদের নজরে রাখতে হবে। তাছাড়া মামাকে বললে বাগানের গার্ডদের দিয়ে ছাতু বানাতে কতক্ষণ?
-ছাতু বানালেই হবে না- যদি দেখা যায় ব্যাটার বড় কোন দলের লোক, তাহলে গোটা দলকে ধরিয়ে দিতে হবে।
-অতো সোজা নয় মিলু, এসব লোক পাকা ঝানু। এদের পাতা থাকে ফাঁদ- সাবধানে পা না বাড়ালে নির্ঘাৎ বিপদ হুঁ-
-চল, আমরা ট্যান্টে ফিরে যাই।
-চল, এতক্ষণে আম্মু-আব্বু আমাদের খুঁজতে লেগে যাবার কথা।
-বিলু-মিলু হাঁটতে থাকে ট্যান্টের উদ্দেশ্যে। কিছুটা হাঁটার পর ঝরনার পাশে বনের ভেতর হতে আসা আড়াআড়ি পথে হঠাৎ দু’জন লোক ওদের সামনে এসে দাঁড়ায়।
-কোথায় যাবে খোকারা?
-আপনারা কে- চিনি না তো! বিলু বলল।
-আমাদের চেনার কথা নয়- আমরা বাগানরক্ষী- বড় বাবু পাঠিয়েছেন- নিয়ে যেতে সঙ্গে চল-
-আমরা আপনাদের চিনি না। তাই যাবো না- আমরা ট্যান্টে যাবো- পথ ছেড়ে দাঁড়ান! বিলু বুকে সাহস নিয়ে জোরে বলল।
-এমন সময় একজন কালো জড়–লওয়ালা লোক পকেট হতে একটা গোলাপী রুমাল বের করল। একটা মিষ্টি ঘ্রাণ এসে ধাক্কা খেল নাকে বিলু-মিলুর। চোখের সামনে জ্বলে উঠল তারাবাতি। এরপর সব অন্ধকার। ঘন অন্ধকার।