এবার বর্ষার খুব একটা দাপট দেখা গেল না। যদিও শ্রাবণের শেষ দিকে কয়েক দিন টানা বৃষ্টি ঝরিয়ে বিদায়ের আশীষ বুলিয়ে গেছে। অথচ বর্ষার দাপটে এখানে জনজীবন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত। মানুষের মুখে শোনা যায় বর্ষার প্রতি ধিক্কার বাক্য- কুত্তা বাইষ্যা। মানে ইংরেজি প্রবাদ Cats and dogs এর আরেক আঞ্চলিক সংস্করণ। জানি না এই সুন্দর বর্ষার সঙ্গে ইংরেজ সাহেবরা কুকুর এবং বিড়ালের সম্পর্ক খুঁজে পেলেন কিভাবে। বর্ষা তো আসলেই সুন্দর। প্রকৃতির জীবনদায়ী হলো বর্ষা। বর্ষা আসে বলেই আমাদের গাছপালা সবুজ হয়। নদী, খাল বিল পানিতে ভরে ওঠে। আর পানিতে ভরে উঠলেই বাঙালির আদরের মাছ বংশ রক্ষা হয়। বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশী নানা ধরনের ছোট মাছের যে হিড়িক যা একেকটা স্বাদে অমৃত, তা ঐ বর্ষারই দান। তাই স্বল্প বর্ষা মোটেই আনন্দদায়ক নয়। বর্ষার এই কৃপণতা অন্তত মীর্জা সগীর পছন্দ করেনি। কারণ এতে তার ‘টি প্রোডাক্ট’ কমে যেতে পারে। চা উৎপাদন কমে গেলে তার ম্যানেজারগিরি প্রশ্নের মধ্যে পড়ে যাবে। তাছাড়া নতুন প্লান্টেশনের যে প্রজেক্ট চলছে তাও হবে ক্ষতিগ্রস্ত।
এসব কথা ভাবছিল মীর্জা সগীর। টি গার্ডেনের আলিশান বাংলোতে বসে একা। নূরপুর টি এস্টেটের ম্যানেজার সে। বেশ বড়সড় টি এস্টেট বলা যায়। তাই ম্যানেজারের বাংলোও বেশ বড়। মস্ত একটা টিলা জুড়ে। পুরো টিলার কোল ঘেষে এঁকে-বেঁকে উঠে গেছে কালো পিচঢালা রাস্তা। সগীরের ল্যান্ড রোভার গাড়িটা ঐ পথে প্রতিদিন ওঠানামা করে। একটা আভিজাত্য ঠিকরে পড়ে তখন। এই বনে এমন গাড়ি আর দ্বিতীয়টি নেই।
আকাশে বিকেলের যে স্বচ্ছতা থাকার কথা ছিল, তা নেই। মেঘের আনাগোনা। শরতের দুষ্টু মেঘ। একটা বর্ষণক্লান্ত আকাশও এমনটা হয়। মানে মেঘগুলো ছেঁড়া ছেঁড়া। যতোটুকু মেঘ আকাশে আছে, বৃষ্টির ধারা হয়ে নেমে আসার মতো নয়। তবে, এখানের আকাশের ওপর কোন বিশ্বাস নেই। কখোন কি মতিগতি হয় বোঝা মুস্কিল। ছোট বাচ্চাদের মতো। তবে বাতাসে বেশ জলীয় বাষ্প আছে। টের পাওয়া যাচ্ছে। বাতাস শীতল এবং ভারীও।
এমন সময় প্রায় প্রতিদিন বারান্দায় বসে সগীর চা পান করে। বাগানের টাটকা পাতা আর গোয়ালের গাভীর দোয়ানো খাঁটি দুধ দিয়ে মগ ভর্তি করে চা পান তার বনেদী স্বভাব। কোন দিন কোন জিনিস সাহেবকে পরিবেশন করতে হবে। আর এ ব্যাপারে তার সহকারী দু’জন। মহুয়া তো আছেই। মেয়েটা সগীরের কখন কি লাগে খুব বোঝে। ঠিক ঠিক সময় মতো তা হাজির করে থাকে। সগীর তাই মেয়েটিকে খুব পছন্দ করে। বুদ্ধিও রাখে মেয়েটি। সাহেবের মেজাজ বিগড়ালে কিসে তা ঠিক করা যায়, তা বিলক্ষণ জানে। মীর্জা সগীর তাই এখানে বেশ ভালই আছে।
ম্যানেজার বাবুদের টি গার্ডেনের মালিকরা কখনো ঠকান না। অন্তত আরাম-আয়েসের কোন কমতি করেন না। এর পেছনে একটা ঔপনিবেশিক ধারণাও কাজ করছে। পূর্বে যখন এদেশ ইংরেজ শাসনে ছিল। চা খাওয়া এবং চা-বাগান করা যাদের হাতে এদেশের মানুষ শিখেছে- তাদের লোকজন এই বিদেশ বিভূঁইয়ে পড়ে থাকবে কোন আকর্ষণে? মানে সে সময় টি গার্ডেনের মালিক ছিল সব ইংরেজ। এমনকি টিলাবাবু বা কেরানী পর্যন্ত ছিল হয় ইংরেজ না হলে হিন্দু। কুলি-কামিনরা ছিল এ দেশীয়। তাও এদের মধ্যে ছিল নানা জাতির। ভারতের বিভিন্ন দলিত সম্প্রদায়ের লোকদের এনে টি প্লান্টেশনের কাজ করানো হতো। কারণ স্বল্প মূল্যে এই দুর্গম ও কঠিন কাজটি করতে কেইবা রাজি হবে! ইংরেজরা ছিল শাসক সম্প্রদায়। তাই, কিভাবে কাকে কোন কাজে ব্যবহার করতে হবে তা তাদের ভালই জানা ছিল। সেই চিন্তার অংশ হিসেবেই টি গার্ডেনের ম্যানেজার বাবুর বাংলো নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই সুদৃশ্য আরামদায়ক বাংলোতে শরতের প্রারম্ভিক ক্ষণে মীর্জা সগীর বসে বিকেলের চায়ের অপেক্ষা করছিল। তার চা ট্রেতে করে এনে হাজির করবে এই বাগানের বেতনভুক্ত বাবুর্চি। মহুয়ার আদি বাড়ি শ্রীলংকার ত্রিংকোমালিতে। সে এবং তার বাবা রনেশ মালাহোত্রি তাই দাবি করে। তবে রনেশ এই বাগানের আদি কুলি। বর্তমানে তিনকুড়ি কুলির সর্দার। বিয়ে করেছে ভারতের উড়িষ্যার মেয়ে বনরূপীকে। তারই মেয়ে মহুয়া। বড় বাবুর সেবা-যতœ করে। কুলির খাতায় নাম আছে। সপ্তাহান্তে বেতন পায়। কাজ তার বাগানে নয়, বাবুর খাস বাংলোতে। বড় বাবুর কৃপায় তার নকরি।
মীর্জা সগীর গেল বছর ইংল্যান্ড ঘুরে এসেছে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির বাগান বলে কথা। ওরাই মীর্জা সগীরকে একটা সুযোগ করে দিলো ট্রেনিং করার। টি প্লান্টেশন এর ওপর। তার ভীষণ ইচ্ছে ছিল এমন একটা কোর্স করার। তিন মাসের এই কোর্স করতে পেরে মীর্জা সগীরের জ্ঞানের বহর অনেক বেড়েছে। অন্তত ‘টি প্লান্টেশন’ সম্পর্কে সে আর অজ্ঞ নয়। র্মীজা সগীর মনে করে আমাদের দেশ সঠিকভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে টি প্লান্টেশনে হাত দিলে চায়ের রপ্তানি বাজার দ্বিগুণ হতে পারে।
মীর্জা সগীরকে একটা জিনিস ভীষণভাবে ভাবায়, তা হলো, স্বাধীনতা পেয়েছি আমরা দু’বার কিন্তু এখনো নিজ ভূমির অধিকার পাইনি কেন। ১৯৪৭ এ একটা আজাদী পেলাম। আবার ১৯৭১ এ পেলাম আরেকটা স্বাধীনতা। দু’টি স্বাধীনতায় এ দেশের মানুষই দিয়েছে রক্ত। করেছে অনেক ত্যাগ। অথচ এই যে বাগানগুলো, এখনো বিদেশী মালিক। এ গুলোর উপার্জিত অর্থ চলে যাচ্ছে বিদেশীদের পকেটে। এখনো চলছে এখানে ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম শৃংখলা আইন। শত শত বছর আগে যেভাবে তারা চালাতো সেভাবেই চলছে।
মীর্জা সগীর এবার চায়ের ইতিহাসের কথা ভাবে। ভেবে হাসে। ইতিহাসটা তার আগে জানা ছিল না। এবার কোর্স করতে গিয়ে জানে। চায়ের জন্ম নাকি পাঁচ হাজার বছর আগে চীনে। একই সময়ে এই ভারতেও চায়ের গাছ ছিল বলে অনেকে দাবি করেন। তবে সে দাবি তেমন অকাট্য প্রমাণিত হয়নি। যা জানা যায় তা হলো ১৮৩৫ সালে ভারতের দার্জিলিং এ চা-গাছ লাগানো হয়। তাই ১৮৪১কে চায়ের জন্মবর্ষ বলা হয়। চা সম্পর্কে চীনে প্রচলিত এক রূপকথা আছে। মনে পড়ে গেল সেই গল্পটি সগীরের। শেন নামে এক রাজা ছিলেন। ২৭৩৭ খ্রিস্টপূর্বের কথা। দূরের এলাকা পরিদর্শনে বেরিয়েছিলেন শেন। সেটা ছিল গ্রীষ্মকাল। তখন দুপুর। বিশ্রামের সময়। খাওয়ার পানি ফোটানো হচ্ছিল। রাজা দেখলেন, বুনো ঝোপ থেকে কিছু শুকনো পাতা উড়ে এসে পড়ল ফুটন্ত পানিতে। বাদামি হয়ে গেল পানির রং। রাজা সেই পানি কিছুটা ঢেলে চেখে দেখলেন। মুহূর্তে ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। রাজা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অবশেষে রায় দিলেন শরীরকে চনমনে সতেজ করে তুলতে অতুলনীয় এই পাতা। সৃষ্টি হলো চা। প্রচলন ঘটলো চায়ের।
-নমস্কার বাবু! আপনার চা। একটা বেতের ট্রেতে সাজানো চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে হাজির মহুয়া। বিকেলের নাস্তা হিসেবে কিছু চিড়া ভাজাও সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় বিরুইন চালের এই চিড়ার স্বাদ অতুলনীয়। সগীর পছন্দ করে বলে বিকেলের চায়ে মাঝে মধ্যে পরিবেশন করে বাবুর্চি। সাইড টেবিলে ট্রেটা রেখে মহুয়া একটু সরে দাঁড়িয়ে থাকে। উদ্দেশ্য বড় বাবু যদি দুস্রা ফরমায়েস দেয় তার জন্য অপেক্ষা।
সগীর মহুয়ার দিকে তাকায়। কালো কুচকুচে গায়ের রঙ হলেও চেহারাটা মায়াবী। লাল ফিতা দিয়ে দুটো বেনী করেছে। পরনে ছাপা শাড়ি। লাল এবং সবুজের সমারোহ। একটা জংলী ভাব। মহুয়ার নাকটা কিন্তু ভারতীয় নয়। বেশ খাড়া। ভারতীয় এবং দ্বীপাঞ্চল শ্রীলংকার মিলিত রক্তের ধারায় গড়া মহুয়া। স্বাস্থ্য ভাল। গোলগাল মুখ। চোখ দু’টোই সুন্দর বেশি। মায়াবী। বয়স চৌদ্দ-পনের হবে। খাতায় লেখা আঠারো। তা না হলে কুলির বেতন সে পাবে না। মেয়েটি সাধারণত কুলিরা যেমন হয় তেমন নয়। একটা পরিচ্ছন্ন মেজাজ আছে চলাফেরায়, কথাবার্তায়। রয়েছে স্পষ্ট বনেদী ভাব। বিশেষ করে সগীরের প্রতি সে রাখে সদা সতর্ক দৃষ্টি। যখন যা লাগে এনে হাজির। অবশ্য আরেক বয়স্ক কুলিও আছেÑ পিয়ারী। সগীরের কাপড়-চোপড় ধোওয়াধোয়ি, ঘরদোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা থেকে মায় সবধরনের ভারী কাজ নীরবে সে করে যায়। মহুয়া ভারী কাজ করে না। সুর্মা বাবুর্চি আছে পাকানোর জন্য। সগীরের রান্না খুব সামান্যই। কিন্তু মাসের পনের দিনই আড্ডা বসে এই বাংলোতে। পার্শ্ববর্তী বাগানের ম্যানেজার এবং মালিক পক্ষের আসা-যাওয়া লেগেই থাকে। তাই বাবুর্চির ব্যস্ততাও কম না। বন মোরগের কালিয়া কিংবা খরগোশের রোস্ট পাকাতে হয় প্রায়ই।
-এই শোন্ তোর বাপুজীকে বলবি- তোর মাকে আর যেনো না মারে- তোর মা বনরূপীর তো কোন কসুর নেই- তবু খালি খালি মারে কেন্? এভাবে কেউ মানুষকে মারে? আরেকটু হলে তো কাল মারাই পড়তো! তখন?
-বড় বাবু, আমার বাপুজী বেশি নেশা করে। নেশা তারে খাইল। নেশা করলে আমার বাপুজী আর মানুষ থাকে না। পশু হইয়া যায়।
-এইভাবে নেশা করলে নকরি থাকবে না। তিন কুড়ি কুলির সর্দার হ্যাঁ- সহজ কথা নয়- নকরি গেলে খাবি কিভাবে?
-বড়বাবু! আমি বাপুজীকে বলবে- নক্রি আপনার হাতে দেখবেন বড় বাবু-
-নকরি তো আমি রাখতে পারবো না- যার নকরি তাকেই রাখতে হবে। এমনিতে সে কুলিদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এর-ওর কাছ থেকে ধার নেয়। ফেরৎ দেয় না। মারধর করে। এসব করলে নকরি থাকে?
মহুয়া আর কোন কথা বলে না। বড় বাবুর রহম দীল। যা দোষ, তার বাপুজীর। তারপরও নকরি আছে বড়বাবু রহম দীলের মানুষ বলে।
মহুয়া আর দাঁড়ায় না। ট্রে-টা নিয়ে ধীরে প্রস্থান করে।
চা খেতে খেতে সগীর ভাবে রেশমা আপুদের আসার দিন তো ঘনিয়ে এলো। সঙ্গে থাকবে জমিদার দুলাভাই আর দু’ভাগ্নে, বিলু-মিলু। এমনিতে এখানে কেউ আসতে চায় না। বোনদের, বন্ধু-বান্ধবদের বহুবার বলেছে আসতে। সবাই বলে- টি গার্ডেনে কোন লাইফ আছে? ওখানে কেউ যাবে কি জন্য? একমাত্র রেশমা আপু জানিয়েছে- এবারও বেড়াতে আসছে। সবাই মিলে। আগেরবার যেসব জায়গায় যাওয়া হয়নি। এবার সেসব জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছে। বিশেষ করে এতদঞ্চলের বিখ্যাত গঙ্গাছড়ার বন এবার দেখার প্রোগ্রাম রেখেছে সগীর। সত্যিই এক অপূর্ব ঘন বন। শ্রীমঙ্গল থেকে আট কিলোমিটার পূর্বে। আর তার বাগান এবং বাংলো থেকে চৌদ্দ কিলোমিটার পশ্চিমে। ভাগ্নেদের চিঠিতে জানিয়ে দিয়েছে বনের সংক্ষিপ্ত বিবরণী। বিলু-মিলুও অপেক্ষায় আছে বন দর্শনে। শুধু তো বন দর্শন নয়। বন মানুষ, বন মোরগ, বন হরিণ, চিতাবাঘ, ভাল্লুক আরো কতো কি! আর আছে কতো প্রজাতির পাখ-পাখালী!