রাকিব হাসান এবার এমএ কমপ্লিট করে ঠিকাদারী ব্যবসায় ঢুকেছে। ২০২০ সালের ১০ জুলাইয়ের ঘটনা। হঠাৎ সেদিন রাকিবের মনে হলো ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টি হচ্ছে তাই গজনি পাহাড়ে গেলে আজ বৃষ্টি দেখা যাবে। দীর্ঘদিনের ইচ্ছেও ছিল তার গারো পাহাড়ের শাল-গজারি বাগানে বৃষ্টি দেখার। তাই মাসুদ তার ঘনিষ্ট বন্ধু জাহিদকে সাথে নিয়ে জুম্মা পড়ে দুপুরের খাবার খেয়েই বাইক নিয়ে ছুটে চললো গজনির উদ্দেশ্যে। সাথে ছিলো তার প্রিয় ডিএসএলআর ক্যামেরা।
কিন্তু পথের মধ্যে বৃষ্টির বাগড়ায় কালিবাড়ি ও তেঁতুলতলা বাজারে দু’দফা দাঁড়িয়ে আবারও রওনা হলো গজনির উদ্দেশ্যে। দু’দফা থামার কারণে এক ঘণ্টার পথ যেতে লাগলো দুই ঘন্টা। গজনির ‘অবকাশ’ কেন্দ্রে পৌঁছেই রাকিব পূর্ব দিকের আকাশে তাকিয়ে দেখলো ঘন মেঘে আকাশটা কালো হয়ে আসছে। এক্ষুনি বৃষ্টি শুরু হবে। তাই দেরি না করে ‘অবকাশ’ টাওয়ারের নিচে বাইকটা স্ট্যান্ড করে টাওয়ারে উঠতে লাগলো। এসময় টাওয়ারের সিঁড়ির কাছে সম্ভবত শেরপুরের বাইরে থেকে প্রাইভেট কার নিয়ে আগত দু’জন তরুণ-তরুণীকে দেখলো টাওয়ারে উঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সাথে তাদের মা-বাবা ছিল। এসময় তাদের বাবাকে বলতে শুনলাম, ‘বাদল-বৃষ্টি তোমরা টাওয়ারে উঠো আমরা উঠতে পারবো না নিচে বসলাম।’ এ কথা বলে ওই লোকটি ও তার স্ত্রী টাওয়ারের নিচের একটি দোকানে গিয়ে বসলো।
আমাদের পেছন পেছন তারা টাওয়ারের উপরে উঠছিলো। টাওয়ারে উঠার সাথে সাথেই ঝুম বৃষ্টি শুরু হলো। রাকিবের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন যেন পুরণ হলো। টাওয়ার থেকে দূরের আকাশ, পাহাড়, আর বন-বৃক্ষের উপর দাপিয়ে পড়া বৃষ্টির ছন্দে মোহিত হয়ে পড়লো রাকিব। মাঝে মাঝে বাতাসে বৃষ্টি ঝাপটা এসে তাদের গায়ে এসে পড়ছিল। এদিকে ওই তরুণ-তরুণী দু’জন তাদের পাশেই টাওয়ারের বেঞ্চে বসে বৃষ্টি দেখতে লাগলো। প্রকৃতির বৃষ্টি’র জলের ছটা এসে মানবী বৃষ্টির চুল আর ঠেঁটে এসে পড়ছিল কুয়াসার মতো। বৃষ্টির তান্ডব বাড়ার সাথে সাথে রাকিবের ডিএসএলআর এর ক্লিক শুরু হয়ে যায়। অদ্ভুদ কিছু দৃশ্য তার ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করলো।
ওই তরুণ-তরুণীরা পরষ্পর ভাইবোন। একে অপরকে বৃষ্টি ও বাদল বলে ডাকাডাকির কারণে রাকিবের বুঝতে কষ্ট হলো না তরুণীর নাম বৃষ্টি এবং তার ভাই বাদল। তারা তাদের মোবাইল ফোনে নানা ভঙ্গিতে ছবি তুলছিলো। মাঝে মাঝে দূরের পাহাড়ে বৃষ্টির দৃশ্যও তুলছিল তারা। এদিকে হঠাৎ করে বৃষ্টি নামের মেয়েটি রাকিবের কাছে এসে বললো, ‘ভাইয়া কিছু মনে করবেন না। ঢাকায় আমারও ডিএসএলআর ক্যামেরা আছে। কিন্তুু আমরা গতকাল জামালপুরে নানুর বাড়িতে বেড়াতে আসি। আজ হঠাৎ করে ঝিনাইগাতিতে আমার আম্মুর পুরোনো এক বান্ধবীর খোঁজ পেয়ে ঝিনাইগাতিতে আম্মুর সেই বান্ধবীর সাথে দেখা করে যাওয়ার সময় আব্বু বললো ঝিনাইগাতি যখন এসেছি গজনিতে একটু ঘুরে যাই। তাই হুট করে এখানে আসায় ক্যামেরাটি আনতে পারিনি। প্লিজ আমার কয়টি ছবি তুলে দিবেন ? আমার মেইল এড্রেস দিয়ে দিবো। আপনি যদি কষ্ট করে ছবি গুলো পাঠিয়ে দিতেন, তবে কিছু ছবি তুলবো।’
একথা শুনে রাকিব যেন আসমানের চাঁদ হাতে পেলো। তাই রাকিব কোন ভনিতা না করে বললো, ‘না না কোন সমস্যা নেই। আমি মূলত ব্যবসা করি কিন্তু ছাত্র জীবন থেকেই আমার ছবি তোলার শখ তাই ডিএসএলআর ছাড়া কোথাও যাই না। হ্যা রেডি হোন।’ একথা বলেই রাকিবের ডিএসএলআর এর ক্লিক শুরু হয়ে যায়। কিছু ছবি বৃষ্টির পছন্দমতো এবং কিছু ছবি বৃষ্টিকে না বলেই ক্লোজ সর্ট তুলে রাখলো। সে কথা বৃষ্টিকে জানালো না। এভাবে ক্যামেরার ক্লিক পড়তে পড়তে বৃষ্টির গতি কিছুটা কমে আসতে শুরু করলো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ঘণ্টাখানিক পার হয়ে গেছে বৃষ্টি ঝরা।
এদিকে টাওয়ারের নিচ থেকে বৃষ্টি-বাদলের বাবার হাক, ‘বৃষ্টি-বাদল নিচে নেমে আসো, সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে, ফিরতে হবে।’ মাসুদের মানের ভিতর কেমন জানি করে উঠলো। ইস্ বৃষ্টিটা যদি আরো ঘণ্টাখানিক থাকতো। একথা ভাবতেই বৃষ্টির ব্যাগ থেকে কলম বের করে একটি কাগজে তার মেইল নাম্বারটা দিয়ে একসাথে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল আর কথা হচ্ছিল। এসময় বৃষ্টি তার পরিচয় জানালো, সে ঢাকা ভিকারুন্নেছা কলেজে পড়ছে। বাসাও সেখানে। রাকিবকে বেইলি রোডে আম জুস খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে সিঁড়ির শেষ ধাপে নেমে ভুবন জয়ি হাসি দিয়ে বৃষ্টির প্রস্থান হলো। যাবার সময় শুধু বার বার বলছিলো, ‘মেইল গুলো কিন্তু অবশ্যই পাঠাবেন।’ রাকিব মনে মনে ভাবছিলো, তাড়াহুরার মধ্যে বৃষ্টির এফবি আইডি বা মোবাইল নাম্বারটাও নেয়া হলো না। আবার পরোক্ষণে মনে সান্তনা আনেন এই ভেবে যে, যাই হোক অন্তত মেইল নাম্বার তো আছে। এদিকে মানবী বৃষ্টির চলে যাওয়ায় রাকিবের মনে ভিতর প্রকৃতির বৃষ্টির দাগ কেটে রইলো…