রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর হামলা হয়েছে। এতে যে কোনো নাগরিকই দুঃখিত ও মর্মাহতই হবেন। আমি ব্যতিক্রম নই। শুধু তা নয়, একইভাবে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত।
এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ অক্টোবর’১৩ রাতে ইটিভির ‘একুশের রাত’ অনুষ্ঠানে আমি গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নিজ দায়িত্বে কিছু কথা বলেছি। আর আমি দায়িত্ব নিয়েই কথা বলি। সাংবাদিক মনির হায়দার অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিলেন। এতে গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে আমার বিশ্লেষণ ও মন্তব্য নিয়ে তর্ক তৈরি হয়েছে। তার কিছু উত্তর আরেকটি দৈনিকে আমি দিয়েছি। এই তর্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভিন্ন কিছু প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করবো।
তর্কবিতর্ক গণতন্ত্রের মর্ম। কিন্তু সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতা ভঙ্গ করে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একাত্তর টেলিভিশন আমার বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক প্রচার শুরু করে। তারা তাদের নিজেদের একটি টকশো আয়োজন করে। ইটিভির টকশো থেকে বেছে বেছে খ-িত ও বিকৃতভাবে কিছু অংশ পরিবেশন করে। এমনভাবে তা হাজির করে যাতে ইটিভির টকশোতে আমার মূল বিশ্লেষণই হারিয়ে যায়। সর্বোপরি কেনো আমি সেদিন গণমাধ্যম সম্পর্কে এভাবে মন্তব্য করছি সেই গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকুই বাদ দেয়। উদ্দেশ্য সেদিন একাত্তরের টকশোতে যারা হাজির ছিলেন তাদের বিভ্রান্ত করা এবং আমার বক্তব্য সম্পর্কে ভুল ধারণা দেওয়া। বিচক্ষণ দুই একজন আলোচক সেই মুহূর্তে না বুঝলেও পরে ইটিভির টকশোর পুরোটা দেখার পর একাত্তর টিভির মিথ্যাচার থেকে মুক্ত হয়েছেন। এই প্রত্যাশা আমি করি।
যে মন্তব্য নিয়ে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আমার কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা চলেছে সেই মন্তব্য সম্পর্কে সেই একই দিনে একই রাতে একই অনুষ্ঠানে আমি এটাও বলেছি, ‘যে আমি স্বভাবতই কখনই চাইব না কেউ পটকা, নিন্দা বা ঢিলও যেনো গণমাধ্যমের ওপর ছুড়ুক। এটা কথার কথা ৎযবঃড়ৎরপ। আলোচনা করার জন্য, যাতে আমরা বুদ্ধিজীবীরা, গণমাধ্যমের কর্মীরা বুঝতে পারি যে এই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া একমাত্র দায়ী নয়। আমরা, আমাদের ভূমিকার কারণে আজকে এই পরিস্থিতি আমরা তৈরি করেছি’। একাত্তর টিভি সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক স্বার্থে আমার মন্তব্যের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়েছে।
এমনকি একুশে টিভিতে আমি রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ করেছি, সেটাও প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করছে। ডক্টর সলিমুল্লাহ খান এই কথাগুলো বলেছেন। টিভিতে তাঁর মুখভঙ্গীর মধ্যে আমাকে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক যন্ত্রের দ্বারা শাস্তি দেবার জিঘাংসা দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। তার চোখেমুখে যে হিংস্রতা ও প্রতিহিংসাপরায়ণতা ফুটে উঠেছে তাতে আমি অবাক না হয়ে পারিনি। যাক আমাদের দেশে এই ধরনের বুদ্ধিজীবীর জন্ম হয়েছে যারা প্রতিপক্ষকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে শাস্তি দিতে ইচ্ছুক। সত্যিই আমরা অনেকদূর অগ্রসর হয়েছি। ইতোমধ্যে আমার নামে থানায় দুটো জিডি হয়েছে। ডক্টর সলিমুল্লাহ খান অবশ্যই এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল।
যেখানে যুগে যুগে বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রের নিপীড়নের বিরুদ্ধে নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, মতভিন্নতা থাকলেও পরস্পরকে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করেছেন, সেখানে ডক্টর সলিমুল্লাহ খান আমাকে বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের হাতে নির্যাতনের জন্য তুলে দিতে চাইছেন। এই ধরনের মহৎ কাজ করেছেন বলে আমি তাকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারছি না। প্রকাশ্যে তিনি টেলিভিশন টকশোর বরাতে রাজসাক্ষী হয়েছেন। আমি তাঁর এই উন্নতিতে অভিভূত।
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান ও আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রদ্রোহিতার শাস্তি মৃত্যুদ-। ডক্টর খান আমাকে হত্যাই যদি করতে চান, করতেই পারেন। তবে যার বক্তব্য তিনি পছন্দ করেন না তার চিন্তার বিরুদ্ধে লড়ার কাজকে এতোকাল তিনি গালিগালাজ বলেই বুঝেছেন। এখন আমার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনে আমাকে হত্যা করে মনের ঝাল মিটিয়ে নিতে চান। এটাই তার বুদ্ধিজীবিতা। এটাই আমরা শেষমেষ জানলাম। তাঁকে যখন চিনতাম তখন তার মধ্যে এই ধরনের জিঘাংসা কাজ করে সেটা আমি কখনই বুঝতে পারিনি। নিজের এই অক্ষমতার জন্য নিজের আত্মসমালোচনা করা ছাড়া আমার এখন আর উপায় কী!
ডক্টর খানের রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আমার কিছুই বলার নাই। তিনি প্রায়ই আমাকে গালিগালাজ করেন। সেটা তাঁর রুচি। গালিগালাজের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক সুস্থ তর্কবিতর্কের কোনোই সম্পর্ক নাই, সে সম্পর্কে আমি কি বলব! পাল্টা গালি তো আর দিতে পারি না। তার গালিগালাজের কোনো উত্তর দেওয়া আমি তাই কখনই সমীচিন মনে করি না। ইতোমধ্যেই একুশে টিভির কল্যাণে ও তার মতো ব্যক্তিদের উস্কানির কারণে নানান স্তরের সন্ত্রাসীরা আমার ক্ষতি করবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, বিষয়টি থানা, পুলিশ, আইন ও রাষ্ট্রীয় পরিম-ল অবধি নিয়ে গিয়েছেন তারা। ওপরের কথাগুলোও বলতে চাই নি। না চাইলেও এখন থানাপুলিশের কারণে উপেক্ষাও করতে পারছি না।

গণমাধ্যমের সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহিতা?
ইটিভির টকশোতে গণমাধ্যম কেনো আক্রান্ত হচ্ছে সেই ফেনোমেনার ব্যাখ্যা করতে গিয়েছিলাম আমি। গণমাধ্যমের সমালোচনা করলে সেটা কিভাবে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হয় সেই পা-িত্য বোঝার ক্ষমতা আমার নাই; বিশেষত যদি সুস্পষ্টভাবে বলা হয়, হামলা তো দূরে থাকুক, কেউ ঢিল ছুড়ুক আমি সেটাও চাই না। যদি পরিষ্কার থাকে যে যিনি কথা বলছেন, তিনি গণমাধ্যমের বাইরের কেউ নন; আর, কথাগুলো বলা হচ্ছে গণমাধ্যমের আত্মসমালোচনা হিসাবে? বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য নিজেদের দায়ী করে? কথাগুলো বলা হয়েছে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে গণমাধ্যমের সম্পর্ক বিচার করে।
এই রাষ্ট্রব্যবস্থা আমাদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করেছে। খোদ রাষ্ট্রই ‘সন্ত্রাস’ করে। আমাদের কণ্ঠরোধ করে। পত্রিকা ও টেলিভিশন-স্টেশান বন্ধ করে দেয়। অতএব আমাদের প্রথম কাজ হচ্ছে গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় হামলা ও সন্ত্রাস বন্ধ করা। আমরা সে দায়িত্ব পালন করিনি। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর এই রাষ্ট্র আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। যেসব গণমাধ্যম ও ব্যক্তি রাষ্ট্রের এই সন্ত্রাসী ও সহিংস ভূমিকার দৃশ্যমান সহযোগী তাদের সমালোচনা করলে তাদের কাছেই সেটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হতে পারে। এছাড়া গণমাধ্যমের সমালোচনা করলে কিভাবে তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হয় সেটা বোঝার ক্ষমতা আসলেই আমার নাই। এতোটুকু বুঝতে পারি যারা আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলেছেন তারা গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন। তাদের জিঘাংসা দেখে মনে হয় ঢাকার পুলিশকমিশনারের চেয়েও তারা হয়তো আরো ভালো কাজ করতে পারবেন, নাগরিকদের ধরে নিয়ে টর্চারসেলে টর্চার করার কাজও আরও দক্ষভাবে করতে পারবেন। নাগরিকদের নির্যাতন, গুমখুন ও হত্যার দায়িত্ব তাদের ওপর দিতে তদের পক্ষের শক্তি তাদের সরকারের কাছে সুপারিশ করতে পারেন। কিন্তু আমরা, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সাধারণ নাগরিকরা কি তাদের সাংবাদিক, গণমাধ্যমের কর্মী কিংবা বুদ্ধিজীবী বলতে পারি কি?
এটা সত্য বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপান্তর ছাড়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব, সেটা আমি দীর্ঘদিন ধরেই বলছি। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কেউ নির্বাচিত হয়ে এলেও সেটা গণতন্ত্র নয়, বরং সেটা সাংবিধানিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করে। এই বক্তব্য আজ নয়, নব্বই দশক থেকেই আমি বলে আসছি। বাংলাদেশের সংবিধানের সমালোচনা যখন আমি শুরু করি, তখন কেউই এই গোড়ার গলদ নিয়ে কিছু বলেনি। বাহাত্তরের সংবিধান প্রায় সকলের কাছেই ছিলো পূতপবিত্র জিনিস। কিভাবে সংবিধান ধর্মগ্রন্থের স্তরে উন্নীত হয় সে এক আজব কাহিনী। নৃতত্ত্ববিদদের দারুণ খোরাক। কিভাবে জাতিবাদ ও সেকুলার ধর্মপ্রাণতা ফ্যসিবাদকে ভিত্তি দেয়, রাষ্ট্রের ফ্যাসিস্ট রূপান্তর ত্বরান্বিত করে… তথাকথিত নানান অধ্যাপকেরাও যার প্রবক্তা হয়ে ওঠে… তার নানান নজির আমরা বেয়াল্লিশ বছর ধরেই দেখছি। এই অবস্থায় রাষ্ট্রদ্রোহী হওয়ার অর্থ এই রাষ্ট্রেরই দ্রোহী হওয়া। আমি এই অভিযোগ আমার মাথার মুকুট হিসাবে গ্রহণ করি। আমি তো ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধেই লড়ছি। এমন একটি সত্যভাষণের জন্য ডক্টর খানকে ধন্যবাদ জানাবার ভাষা আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
দলবাজ ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও সন্ত্রাসীর সহযোগী গণমাধ্যমের সমালোচনা করেছি বলে আমি রাষ্ট্রদ্রোহী। কথাটা আরও খতিয়ে দেখা যাক। আমরা এখন পঞ্চদশ সংশোধনী সম্বলিত সংবিধানশরিফের কালপর্বে রয়েছি। মজা হচ্ছে এই সংবিধানের ভিত্তিতে যে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে, সেই রাষ্ট্রের আমি দ্রোহী নই। বরং গণমাধ্যমের সমালোচনার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহী। সত্যি চমৎকার। যে বিশেষ বিশেষ গণমাধ্যম রক্ষা করতে গিয়ে আমার বিরূদ্ধে অভিযোগ সেই সকল গণমাধ্যম আর ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র যে সমার্থক যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, থানাপুলিশ করছেন তারা তা খুব ভালোভাবেই অবহিত। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের কর্মী হিসাবে তারা তাদের ভূমিকাকেই স্বীকার করে নিচ্ছেন। একই সঙ্গে ইতোমধ্যে চিহ্নিত গণমাধ্যমগুলোর দায়। বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা রক্ষার জন্য তারা মরিয়া। তবে মনে হয় পঞ্চদশ সংশোধনীর পর তার যে দুর্দশা ঘটেছে সে কারণে রাষ্ট্রের এই মহৎ রূপান্তরের পক্ষে তারা প্রকাশ্যে সরাসরি দাঁড়াতে চাইছেন, আবার শরমও পাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন শক্তি ও ফ্যসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা উভয় রক্ষা এখন নীতিনৈতিকতার দিক থেকেও বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে চূড়ান্ত মিথ্যা হলেও তারা বলছে, আমি গণমাধ্যমে বোমা মারতে বলেছি, আমি রাষ্ট্রদ্রোহী। অথচ আমি পরিষ্কার করে কী বলেছি তা উপরে উদ্ধৃত করেছি। আমি কথার ছলে রেটরিক হিসাবে যা বলেছি তার ব্যাখ্যাও সুস্পষ্ট ভাবেই সেদিন ইটিভির টকশোতে দিয়েছি।

এখনকার রাজনীতি, এখনকার কর্তব্য
আমি দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি বাংলাদেশের জনগণকে অবশ্যই নতুনভাবে বাংলাদেশ ‘গঠন’ বা কন্সটিটিউট করতে হবে। বুদ্ধিবৃত্তিক বা রাষ্ট্রদর্শনের জায়গা থেকে বাংলাদেশের বাস্তবতা বিচার করে এ সিদ্ধান্তে আমি অনেক আগেই এসেছি। পঞ্চদশ সংশোধনীর পর রাষ্ট্রব্যবস্থার যে-ফ্যাসিস্ট রূপান্তর ঘটেছে তারপর এই কর্তব্য এখন সরাসরি ঘাড়ের উপর চেপে বসেছে। এ ছাড়া অন্য কোনো পথ নাই। অর্থাৎ আন্দোলন-সংগ্রাম যদি জয়ী হয় তাহলে একটি রাষ্ট্রগঠন সভার ঈড়হংঃরঃঁবহঃ অংংবসনষু প্রয়োজন অবশ্যই হবে। আমার রাজনৈতিক অবস্থান এবং রাজনীতিতে আমি আশু কি অর্জন করতে চাই তা সবসবময় পরিষ্কারভাবে হাজির করেছি। আমি কখনই লুকাইনি। এই রাজনৈতিক কর্তব্যের গোড়ার জায়গা বাদ দিয়ে যারা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করে তারা বাংলাদেশকে রাজনীতিশূন্য করতে চায়, সে কথাও আমার চেয়ে শক্তভাবে কেউ বলেছে বলে আমার জানা নাই। বিদ্যমান রাষ্ট্রকে বহাল রেখে বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনাকে রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেবার মামলা এটা নয়। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর একটি বৈপ্লবিক কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এটা কোনোভাবেই এক এগারোর অগণতান্ত্রিক ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার প্রয়োগ নয়।
এখনকার লড়াই হচ্ছে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক লড়াই। এ লড়াইয়ে মতাদর্শিক বিভাজনের ভেদরেখা হচ্ছে কারা বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে, আর কারা তার রূপান্তর কামনা করে। জনগণের মধ্যে নানান মতাদর্শিক বিভ্রান্তি, বিরোধ ও বিভাজন রয়েছে। এ ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নাই। তার সুরাহা করে নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠনের গণতান্ত্রিক কর্তব্য তাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া আমাদের এখনকার প্রধান কাজ। আমি বর্তমান বাস্তবতায় এই রাজনীতিকেই সঠিক মনে করি। যারা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা শুধু নয়, সেই রাষ্ট্রের ফাঁসির কাষ্ঠে প্রতিপক্ষকে, বিশেষত আমাকে ঝুলাতে মরিয়া হয়ে গিয়েছে, তাদের সঙ্গে এই রাজনীতির পার্থক্য দুস্তর। প্রতিপক্ষের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা আছে, তারা তা প্রয়োগ করছে এবং আমাকে গ্রেফতারের আগে ক্ষান্ত হবে কিনা জানি না। কিন্তু যে জনগণের জন্য আমি লড়ছি তারা যেনো আমার রাজনীতি বুঝতে ভুল না করেন সেটাই এখন একমাত্র কামনা।
এই নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট হলে নতুনভাবে রাষ্ট্র গঠন কেমন ও কিভাবে হবে তার কৌশল নিয়ে অবশ্যই তর্ক-বিতর্ক হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে কিভাবে ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণার ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়া যায় তা নিয়ে আমাদের নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে, নতুনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের জন্য লড়েছি, কোনো বিদেশী প্রভুর নির্দেশ বা কোনো একটি দলের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য নয়। যে কেউই ইচ্ছা করলে স্বাধীনতার ঘোষণা পড়ে দেখতে পারেন। এই তিন নীতির ভিত্তিতেই যে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে তা পরিষ্কারভাবে স্বাধীনতার ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা এই তিন নীতি কায়েমের জন্য অকাতরে শহিদ হয়েছেন। অথচ বেয়াল্লিশ বছর এদেশের জনগণকে একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে দেশের জনগণকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তির অধীনতা ও বশ্যতা স্বীকার করে নেবার রাজনীতির চর্চা হয়েছে। আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি, কারও পরাধীনতা মেনে নেবার জন্য নয়। বেয়াল্লিশ বছর ধরে এ দেশের জনগণের মনে যে তীব্র ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়ে রয়েছে যে কোনো মুহূর্তে তার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। আমাদের প্রাণপণ চেষ্টা করতে হবে গণশক্তির উন্মেষ যেনো তার লক্ষচ্যুত না হয়। সঠিকভাবে বিকশিত হয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপ নিতে পারে।
খেয়াল করতে হবে, সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং ইনসাফ একদিকে যেমন বাংলাদেশে আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার ভিত্তি, একই সঙ্গে ইসলামের নৈতিক ও দার্শনিক আদর্শের সঙ্গেও তা গভীরভাবে যুক্ত। এই তিন নীতির ভিত্তিতেই অন্তত নতুন রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক ভিত্তিমূলক বিষয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখা সম্ভব। মনে রাখা দরকার পাশ্চাত্য থেকে ধার করা প্রচলিত গণতন্ত্র বা তথাকথিত লিবারেলিজমের সঙ্গে ইসলামের বিরোধ আছে। আছে বলেই ইসলাম নিজের দার্শনিক অবস্থান থেকে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফকে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার যুগে নতুন তাৎপর্য দিতে সক্ষম। কিন্তু সেটা ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান থেকে বোঝা যাবে না। ইসলামের ইতিহাস ও দার্শনিক তাৎপর্য থেকে বুঝতে হবে। অর্থাৎ মজলুম জনগণের ধর্মীয় চেতনার মধ্যে জালিম বিশ্বব্যবস্থা উৎখাতের যে সর্বজনীন ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা ও সংকল্প কাজ করে এবং বাস্তবে যার অভিপ্রকাশ। আমরা এখন বিশ্বব্যাপী দেখছি তাকে ধরিয়ে দিতে হবে। আমাদের কাজ হবে জনগণকে বুঝিয়ে দেওয়া তার লড়াই-সংগ্রামের কোন দিকটি সর্বজনীন, আর কোথায় সংকীর্ণতা ও সাম্প্রদায়িকতার গহ্বরে পতিত হয়ে ইসলামের ক্ষতি সাধন করবার বিপদ নিহিত রয়েছে।
জনগণের ওপর আস্থা আমার রাজনৈতিক তৎপরতার ভিত্তি। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি সাধারণ মানুষ সাম্প্রদায়িকতা ও সর্বজনীনতার ভেদ বুঝতে সক্ষম। এই সক্ষমতা তাদের সহজ ও স্বাভাবিক ক্ষমতা, তার নিজস্ব বয়ান বা ডিস্কোর্স আমরা প্রায়ই আমাদের চারপাশে সাধারণ মানুষের আলাপ আলোচনায় দেখি। এ এক অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি যার উপর আমি মনেপ্রাণে নির্ভর করি। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফকে সর্বজনীন আদর্শ হিসাবে ইসলামের দিক থেকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে এমন এক রাষ্ট্র গড়বার স্বপ্ন তাদের মধ্যে সঞ্চারিত করা সম্ভব, যারা শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ধারণ করে না, একই সঙ্গে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে ধ্বংস ও বিলয়ের অভিমুখ নির্ণয় করতে সক্ষম। এটা ঠিক যে ঔপনিবেশিক শিক্ষা ও সাম্রাজ্যবাদীও মানসিকতায় গড়ে উঠে শহুরে শিক্ষিত শ্রেণির উপর নানা কারণে আমি আস্থা রাখি না, কিন্তু তাঁদের মধ্যেও নতুন তরুণদের দেখে উৎসাহিত হই যাঁরা শাপলা আর শাহবাগের ভেদরেখা মানেন না। এখনকার লড়াই সংগ্রামকে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র রূপান্তরের কর্তব্য থেকে বিচার করতে সক্ষম। তারা প্যান্ট-শার্ট পরে টুপি পরা পাঞ্জাবি পরা গরিব মাদরাসার ছেলেদের পাশে দাঁড়িয়ে জীবন দিতে কুন্ঠিত নন। এই ভেদরেখ যতো তাড়াতাড়ি আমরা বিলুপ্ত করতে পারবো ততো তাড়াতাড়ি আমরা বৈপ্লবিক মুহূর্তের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো।
বাংলাদেশের ইতিহাসের দিক থেকে গুরুতপূর্ণ দিক হোল এই তিন নীতির একই সঙ্গে ঐতিহাসিক ও আইনী ভিত্তি আছে। ঐতিহাসিক কারণ এই তিন নীতি কায়েমের জন্য আমরা লড়েছি। এর আইনী ভিত্তি আছে- কারণ স্বাধীনতার ঘোষণার দলিলেই তা ঘোষিত ও সন্নিবেশিত। ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের যে কৃত্রিম সংঘাত জিইয়ে রাখা হয়েছে, যার কারণে আমরা বিভক্ত ও জর্জরিত এবং এখন পরস্পরকে ধ্বংস করতে উদ্যত- তা রাজনৈতিকভাবে নিরসনের এটাই সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পথ। যেহেতু ঘোষিত এই তিন নীতি কায়েমের জন্যই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, অতএব এর ন্যায্যতা ইতিহাসে, দ্বিতীয়ত বাংলাদেশের প্রতিটি বড় কিংবা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার রাজনৈতিক আকাক্সক্ষায় এবং তৃতীয়ত, প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মানুষের রূহানি সত্তায়। এই তিনটি নীতি আমাদের সমাজের বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যকে একপাত্রে ধরে রাখতে সক্ষম। ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে নিজেদের পরিগঠিত করবার জন্য যা আমাদের দরকার।
যারা আমার লেখা পড়েন ও অনুপ্রাণিত হন তারা অনায়াসেই জানেন ও বোঝেন যে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসাবে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ রেখে সাম্রাজ্যবাদ ও আঞ্চলিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়াই আমার রাজনীতি। এই কারণেই আমি জনগণকে বিভক্ত করবার, বিভাজিত রাখবার যে কোনো মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করি। যারা অজ্ঞ, অসচেতন জনগণকে সজ্ঞানে-অজ্ঞানে বিভক্ত করা ও বিভক্ত রাখার রাজনীতি করেন তারা যে যার খুশি আমাকে নাস্তিক কমিউনিস্ট কিংবা ইসলামি মৌলবাদী বলে নিন্দা করে থাকেন। এতে কিছুই আসে যায় না। লড়াইটা আস্তিকের বিরুদ্ধে নাস্তিকের, শাপলা বনাম শাহবাগ, কিংবা ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্ম-নিরপেক্ষতার লড়াই নয়। সুনির্দিষ্টভাবে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীপুরুষ নির্বিশেষে সমাজের সকল স্তরে নিপীড়িত ও শোষিত জনগণ ও শ্রেণীর লড়াই। তাদের ঐক্যবদ্ধ করবার সঠিক মতাদর্শিক বয়ান হাজির করা আমাদের এখনকার কাজ। যাতে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপান্তর যারা চায় তাদের আমরা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি এবং জনগণের বিজয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিরে নতুন গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত ও সফল হয়।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের কাণ্ড
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ বর্তমান সরকার ও রাষ্ট্রের সমর্থক। তারা নিজেদের প্রতিনিধিত্ব করেন, গণতন্ত্রমনা সাংবাদিক মহলের নয়। আমার বিরুদ্ধে তাদের বক্তব্যো গণতন্ত্রমনা সাংবাদিক সমাজের বক্তব্য নয়। এটা পরিষ্কার। সরকারি বলেই তারা এতোই প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়েছেন যে সারাদেশের সাংবাদিকদের উপর হামলার জন্য আমাকে এককভাবে দায়ি করে আমাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্যাতনের জন্য উস্কানি ও হুমকি দিচ্ছেন। যেহেতু রাষ্ট্র ও সরকার তাদের, তারা সফল হতে পারেন। তবে এর মধ্য দিয়ে সাংবাদিকতার যে নজির তারা সৃষ্টি করেছেন ও করবেন তা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কলংকজনক, নিন্দনীয় ও প্রতিহিংসামূলক অধ্যায় হিসাবেই চিরকাল চিহ্নিত হয়ে থাকবে। গত দুদিন ধরে টেলিভিশন ও অন্যান্য গণমাধ্যমে এদেরই কেউ কেউ আমার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, মিথ্যাচার ও বিকৃত ব্যাখ্যা করে যাচ্ছে তাতে নাগরিক হিসাবে আমি উদ্বিগ্ন এবং আমার নিরাপত্তার জন্য হুমকি
মনে করি।
সাংবাদিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ টেলিভিশন টকশোতে আমি কী বলেছিলাম তা পর্যালোচনা না করে যে অসহনশীল বক্তব্য দিয়েছেন ও দিয়ে যাচ্ছেন তা নিন্দার ভাষা আমার নাই। একজন নাগরিকের শুধুমাত্র টেলিভিশনের একটি টকশোতে একটি বিশ্লেষণমূলক বক্তব্যকেই বাংলাদেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সকল হামলার কারণ বলে দায়ি করা সাংবাদিক নৈতিকতার মধ্যে পড়ে না। সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে সত্য উদ্ঘাটন করা, কিন্তু তারা নিজেরাই মিথ্যাচার করছেন।
গণমাধ্যম বা সংবাদপত্রে যারা কাজ করেন সাধারণত তাঁরা সংবাদ বা গণমাধ্যমকর্মী বলে পরিচিত। কিন্তু সাংবাদিকতা একটা পেশা। যেমন, ডাক্তারি, শিক্ষকতা, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি। প্রত্যেকটি পেশারই নিজস্ব কিছু বিধিবিধান আছে, কিছু পেশাগত নৈতিকতা বা মানদ- আছে, যাতে পেশার ভাবমূর্তি বা পেশাদারিত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়। সাংবাদিকদেরও আছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পেশাই তাদের পেশাদারিত্বের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখবার জন্য কিছু লিখিত বা অলিখিত মানদ- অনুসরণ করে। কেউ তা মানছেন কিনা তার দ্বারা তিনি সেই পেশার আদৌ অন্তর্ভুক্ত কিনা বোঝা যায়।
সরকারপন্থী সাংবাদিক ইউনিয়ন আমাকে গণমাধ্যমের শত্রু ঘোষণা করেছেন। মিথ্যাচার ও অন্যের বক্তব্যের বিকৃতি ঘটিয়ে যারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীন শক্তিকে সন্তুষ্ট করার জন্য সদাই তৎপর, নিজেদের তারা গণমাধ্যমের কর্মী দাবি করতে পারে না। এরা শুধু গণমাধ্যমের শত্রু নয়, জনগণের শত্রু। গণতন্ত্রের দুশমন। ফ্যাসিস্ট সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়ে উলঙ্গভাবে এরা বাক ও ব্যক্তিচিন্তার স্বাধীনতার বিরোধিতা করছে। ইতিহাস তার নিজের নিয়মেই এদের শায়েস্তা করবে।
১ নভেম্বর ২০১৩। ১৭ কার্তিক ১৪২০। আরশিনগর।

নানাস্তরের সন্ত্রাসীদের আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে

বেসরকারি টেলিভিশন একুশের রাত টকশোয় হাজির হয়ে সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে কথা বলেন ফরহাদ মজহার। সাংবাদিক মনির হায়দারের উপস্থাপনায় এই টকশোতে আরও অংশ নেন জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব। উক্ত অনুষ্ঠান প্রচারের সাথে সাথেই সারা দেশে ফরহাদ মজহারের বক্তব্য নিয়ে ব্যাপক আলেচনা-সমালোচনা শুরু হয়। বিভিন্ন মিডিয়ায় ফরহাদ মজহারের বক্তব্যকে মিডিয়া-বিরোধী এবং উস্কানির মূল বলে সংবাদ প্রচার করা হয়। এই প্রসঙ্গে ফরহাদ মজহার তার মতামত জানিয়েছেন। তিনি বলেন,
বন্ধুরা, আপনারা দেখছেন বাংলাদেশের একাত্তর টিভি অন্যায়ভাবে আমার বক্তব্য খণ্ডিত ও বিকৃতভাবে প্রচার করছে। উস্কানি দিয়ে নানান স্তরের সন্ত্রাসীদের আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিচ্ছে। এরা বাক ও ব্যক্তিমত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। এদের সন্ত্রাস আজ কোথায় ঠেকেছে তা আমার বিরুদ্ধে এবং ‘একুশের রাত’-এর বিরুদ্ধে জঘন্য মিথ্যা ও অপ-প্রচারের ধরন দেখেই আপনারা বুঝতে পারবেন। এরা এভাবেই মিথ্যা অপপ্রচার ও উস্কানি দিয়ে তাদের বিরোধী গণমাধ্যম ও ব্যক্তিদের দমন করে। এরাই মানবাধিকার সংস্থাগুলো যেনো ক্ষমতাসীনদের গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রচার করতে না পারে তার জন্য গ্রেফতার, নির্যাতন ও হয়রানি করে। এরা বিরোধীদলের কোনো কণ্ঠস্বর থাকুক তা চায় না। এখন আমার বিরুদ্ধে, একুশে টিভির বিরুদ্ধে, ‘একুশের রাত’-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে। আমি কি বলেছি তা আপনারা নিজেরা দয়া করে পুরোটা শুনুন, তারপর একাত্তরের মিথ্যাচার আপনাদের কাছে স্পষ্ট হবে। কিভাবে এরা খ-িত, মিথ্যা ও উস্কানিমূলক তথ্য প্রচার করে এবং সমাজে উস্কানি দিয়ে বিরোধী মতাবলম্বীদের দমন করে সেটা লক্ষ্য করুন।
আমি সেদিন পরিষ্কার বলেছি, ‘আমি একটা কথা বলতে চাই যেনো দর্শকরা আমাকে বোঝে। আমি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার পক্ষে। গণমাধ্যমের ওপর কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ কারও থাকা উচিত না, যিনি মত প্রকাশ করছেন, যার বিরুদ্ধে করছেন ওতে যেনো কারও অপমান বা অমর্যাদা না হয়। সেটা রসুল হতে পারেন কিংবা অন্য কেউ হতে পারেন। এটা ছাড়া যে কারুরই ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার আছে’।
‘আমি এর আগে যে বোমার কথা বলেছি, এই অর্থে কথাটা বলেছি যে আমি স্বভাবতই কখনই চাইব না কেউ পটকা, নিন্দা বা ঢিলও কোনো গণমাধ্যমের উপর ছুড়ুক। এটা কথার কথা, ৎযবঃড়ৎরপ। আলোচনা করার জন্য, যাতে আমরা বুদ্ধিজীবীরা গণমাধ্যমের কর্মীরা বুঝতে পারি যে, এই বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শেখ হাসিনা বা খালেদা জিয়া একমাত্র দায়ী নয়। আমরা, আমাদের ভূমিকার কারণেই আজকে এই পরিস্থিতি আমরা তৈরি করেছি।’
এই বক্তব্য বাদ দিয়ে কিভাবে একাত্তর টিভি আমার বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক অপপ্রচার চালাচ্ছে লক্ষ্য রাখুন।
ওই দিনের টকশোতে এই প্রসঙ্গের আলোচনা এখানে হুবহু তুলে ধরা হলো:
কাজী ফিরোজ রশীদ: এই যে টেলিভিশন চ্যানেলের উপর যে উপর্যুপরি হামলা হচ্ছে, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। কিন্তু তার সাথে আমরা বলতে চাই যে, আপনারা যারা সংবাদকর্মী, আপনাদের কাছ থেকে জনগণ কিন্তু নিরপেক্ষতা আশা করে। আমি যখন দেখবো…
মনির হায়দার: আমরা কি পক্ষপাতিত্ব করছি বা নিরপেক্ষতা হারিয়েছি? মানে আমরা গণমাধ্যম কি নিরপেক্ষ নই?
কাজী ফিরোজ রশীদ: অবশ্যই… আর না হলে কেনো এই হামলা হবে? আমি এইটা বলতে চাই যে, আমি যখন দেখবো, আমি রাজনীতি করি, আমার প্রতিপক্ষ সংবাদপত্র, সংবাদকর্মী বা চ্যানেল দাঁড়িয়ে গেছে তখন ওইখানে প্রতিঘাত করার সমস্ত অধিকার কিন্তু ঐ যাদের বিরুদ্ধে তারা দাঁড়ায়, তাদের থাকে প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এরাতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নামছে। একসময় বিটিভিকে বলা হতো সাহেব-বিবি-গোলামের বাক্সো। তিনি লিখছেন, এই ফরহাদ মাজহার সাহেব আছেন, সাহেব-বিবি-গোলামের বাক্সো। এখনতো খালি গোলামের বাক্সো হয়ে গেছে! কি দুর্ভাগ্য!! সাহেবও নাই বিবিও নাই শুধু গোলাম, হায় হায়রে বিটিভি!! কি দৈন্যদশা!!
এই যে সোনালি ব্যাংক কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত এসমস্ত বড় বড় চোরদের দেখি ওখানে বসে কথা বলে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত… তারা ওখানে বসে কথা বলে। কোথায় দেশের অবস্থা আজকে? তারপর অন্য চ্যানেলের কথা আমি বলবো না, কিন্তু আমি সবাইকে বলতে চাই, যে দেখেন আপনাদের… দেশের প্রতি যেমন সবার একটি ভালোবাসা আছে, দায়িত্ববোধ আছে, আপনারা যার যার দায়িত্ব পালন করবেন। দায়িত্বের বাইরে গেলে কিন্তু এই ধরনের ঘটনা আরো ঘটবে।
মনির হায়দার: জি… জনাব ফরহাদ মজহার…
ফরহাদ মজহার: জি আমি আপনাকে… একটা হচ্ছে প্রথমত, সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে এইটা একটা সত্য কথা যে, বাংলাদেশে এখনকার যে গণমাধ্যমগুলো তারা নিরপেক্ষতো নয়-ই, একই সঙ্গে তারা গণবিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী এবং বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য যদি কাউকে দায়ী করতে হয়, মানে আমি আপনাদের থেকে ভিন্নরকম বলবো… আমি তাদেরকেই দায়ী করি। আপনি আজকে এই যে বিরোধী মতকে আপনি দমন করছেন এবং ক্রমাগত আপনি গণমাধ্যমের মধ্য দিয়ে কোনো বিরোধী চিন্তাকে আপনি হাজির করতে দিচ্ছেন না। আপনি অল্প কিছু ব্যক্তিকে, যেমন টকশোতে ধরুন, অল্প কিছু ব্যক্তিকে যে ক্রমাগত পুতুলের মতো তাদেরকে আপনি দেখাচ্ছেন সারা দেশের জনগণের কাছে, সমাজে যে আরো বহু শ্রেণী এবং শক্তি আছে, এখানে যে বিরোধী দল বলে একটা আছে, তাদের যে পক্ষে কথা বলার, তাদের বক্তব্য হাজির করার আপনি কোন পরিস্থিতি রাখছেন না… তো এটাতো স্বভাবতই এটা শেষ হবে বোমাবাজিতে। কারণ আপনি যখন কাউকে কথা বলতে বন্ধ করে দেবেন, স্বভাবতই এটা শেষ হবে সন্ত্রাসে। কারণ আপনি তো আমার কথা বলতে… আপনিতো সন্ত্রাস গড়ে তুলেছেন। তাহলে বাংলাদেশে সন্ত্রাস শুরু করেছে গণমাধ্যম। এটা পরিষ্কার বুঝতে হবে আমাদেরকে। ফিরোজ ভাইয়ের কথা থেকে ধরে নিয়ে আমি বলবো এটা আমাদের প্রত্যেককে উপলব্ধি করতে হবে। আশা করি গণমাধ্যমের লোকও শুনছে। আমি বাংলাদেশের অনেকগুলো গণমাধ্যমকে পরিষ্কার টেলিফোনে বলেছি, আপনারা সন্ত্রাসী, আপনারা এ দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। আপনাদের টেলিভিশনে আমি যাবো না। অনেকগুলো গণমাধ্যমতো দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিবাজদের গণমাধ্যম।
কাজী ফিরোজ রশীদ: উৎসাহ দিচ্ছে…
ফরহাদ মজহার: আমি মনে করি এটা বুঝতে হবে আমাদেরকে। আমিতো মনে করি এই পটকা ফোটানোটা খুব কমই হয়েছে। মূলতো আরো বেশি হওয়া উচিত ছিলো। কারণ যেকোনো দেশে এরকম পরিস্থিতিতে অনেক বেশি রেসিসটেন্স জনগণের কাছ থেকে ঘটে। এটার পক্ষে আপনি দেখবেন যে জনগণ…
মনির হায়দার: তাহলে আমরা কি এদেশে থাকবো না ? এটা যদি আরো ক্রমবর্ধমান হারে বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে?
ফরহাদ মজহার: খুবই ভালো প্রশ্ন করেছেন। আমরা বলতে আপনি কাকে বোঝাচ্ছেন
মনির হায়দার: নাগরিক …
ফরহাদ মজহার: না আপনি নাগরিক নন। কারণ আপনি নাগরিক হলে প্রথম আপনার উচিত ছিল দাবি করা, গণমাধ্যমে আমাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়া। আজকে আমরা কথা বলছি। আজকে বাংলাদেশের একজন সংবাদপত্রের সম্পাদক জেলে। আমি যখন কথা বলছি, তখন দিগন্ত টেলিভিশন বলে একটা টেলিভিশন যেটা বিরোধী দলের কথা বলতো, সেটা বন্ধ- অন্যায়ভাবে। আমি যখন কথা বলছি, আমার দেশের প্রেসকে আপনি বন্ধ করেছেন অন্যায়ভাবে। আমি যখন কথা বলছি ইসলামিক টিভি বন্ধ, আমি যখন কথা বলছি চ্যানেল ওয়ান বন্ধ। তো আপনি এটার কি ব্যাখ্যা করবেন? আপনারা কারা গণমাধ্যমের লোক?
মনির হায়দার: আপনাদের এই চ্যানেলগুলোতো প্রচলিত সরকারের বিরোধিতা করতো বেশি বেশি।
ফরহাদ মজহার: যাই করুকনা কেনো। আজকে যদি সরকারের পক্ষে নয় আমি বিরোধিতা করবো। তাদের কথা বলার অধিকার আছে। যেই কণ্ঠস্বরগুলো অন্যদেরকে রিপ্রেজেন্ট করে, অন্যদের কথা বলে। সে যেই দলেরই হোক না কেনো। আপনিতো তারই গণতান্ত্রিক অধিকার মানছেন না! আপনারা গণমাধ্যমই মানেন না। অন্যদের কথা বাদ দেন। আপনার গণমাধ্যমের কর্মীরা, আপনারা কখনো আজকে মাহমুদুর রহমানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন কি? দাঁড়ান নাই। আপনারা কি আজ দিগন্ত টিভির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন? দাঁড়ান নাই। আপনার কি ইসলামিক টিভির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন? দাঁড়ান নাই। আপনারা চ্যানেল ওয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন? দাঁড়ান নাই।

তাহলে আপনাদেরতো বোমা মারাই উচিত।