সে অনেক দিন আগের কথা।
এক দেশে বাস করত এক মা। তার ছিল এক তরুণ ছেলে। তারা ছিল ভীষণ গরিব। সামান্য কিছু জমি ছাড়া তাদের আর কোনো ধন-সম্পদ ছিল না। মা-ছেলে মিলে তারা সারা বছর চাষ করত সেই জমিতে। কিন্তু ফসল যা ফলত, তাতে তাদের পুরো বছর চলত না। পরার জামা কাপড়ও তারা ঠিক মতো পেত না।
ছেলেটি কেবল ভাবত-‘এত খাটা-খাটুনি করি, তবু কেন আমাদের অভাব ঘোচে না? আমরা এত গরিব কেন?’
কিন্তু কারো কাছে এর কোনো উত্তর পেত না সে।
ভেবে ভেবেই কেটে যাচ্ছিল তার দিন। হঠাৎ একদিন সে গ্রামের বয়স্ক লোকদের কাছে জানতে পার-পশ্চিমে এক দেবতা আছেন, যিনি সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানেন।
ছেলেটি ঠিক করল পশ্চিমের সেই দেবতার কাছে যাবে। তাঁর কাছে জানতে চাইবে-‘আমরা গরিব কেন?’
কিন্তু কত দূরে থাকেন সেই পশ্চিমের দেবতা? আর কত দিনই বা লাগবে সেখানে যেতে আসতে-কিছুই জানে না সে। এদিকে মাকে একা রেখে যাওয়াও এক চিন্তা। মা এখন বুড়ো হয়েছে। আগের মতো আর তেমন খাটতে পারে না। একা রেখে গেলে তার দিন চলবে কী করে?
ছেলেটি ধীরে ধীরে ঘরে কিছু চাল, ডাল, তেল, নুন, জ্বালানি জমা করল, যাতে সে ক’দিন না থাকলেও মায়ের কষ্ট না হয়। তারপর মাকে সব বলে একদিন সে যাত্রা করল পশ্চিম দিকে।
ছেলেটি পশ্চিমদিক বরাবর হাঁটতে লাগল একটানা।
একদিন, দু’দিন, এক সপ্তাহ, এক মাস হাঁটছে তো কেবল হাঁটছেই। রোদ মানে না, বৃষ্টি মানে না, সে কেবল হেঁটেই চলল। এভাবে কেটে গেল ঊনপঞ্চাশ দিন। তারপর একদিন দুপুর বেলা। দেখে কি, তেষ্টায় তার বুক শুকিয়ে কাঠ। পা চলে না আর। ইতিউতি খুঁজে কড়া নাড়াল এক কুটিরে। বলল, ‘একটু পানি দেবে গো?’
এক বয়স্ক মহিলা কুটিরের ভেতরে ডেকে বসাল তাকে। জলপান করতে দিয়ে বলল, ‘তুমি এমন জোয়ান তরুণ বাছা, এত হাঁপিয়ে উঠেছ কেন? ভর দুপুরে এমন দিশেহারা হয়ে চলেছই বা কোথায়?’
ছেলেটি বলল, ‘আমি পশ্চিমের দেবতার কাছে যাচ্ছি। শুনেছি, এই দেবতা সব প্রশ্নের উত্তর জানেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি-সারা বছর কঠোর পরিশ্্রম করি, তবু কেন আমার অভাব ঘোচে না, আমি গরিব কেন?’
ছেলেটির কথা শুনে মহিলা হঠাৎ কেমন খুশি খুশি¬ হয়ে উঠল। আবেগ জড়ানো গলায় বলল, ‘তাই নাকি বাছা, পশ্চিমের দেবতার কথা আমিও শুনেছি। তা তুমি যখন তাঁর কাছেই যাচ্ছ, আমার একটি প্রশ্ন কি কষ্ট করে নিয়ে যাবে বাবা?’
‘কেন নেব না, বলো বলো, তোমার প্রশ্ন কী, বলো।’ জানার জন্য ছেলেটি অধীর হয়ে উঠল।
আমার আঠারো বছরের এক মেয়ে আছে, সে যেমন সুন্দরী, তেমনি বুদ্ধিমতী। কিন্তু জীবনে সে একটি কথাও বলেনি। সে কেন কথা বলতে পারে না? তা কি তুমি পশ্চিমের দেবতার কাছে জিজ্ঞেস করবে?
ছেলেটি জিজ্ঞেস করবে বলে কথা দিল।
মহিলার কুটিরে এক রাত কাটিয়ে পরদিন আবার পশ্চিমের পথে পা বাড়াল সে। হাঁটতে হাঁটতে ঠিক ঊনপঞ্চাশ দিন পর ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ল সে। খানিক জিরিয়ে নেয়ার জন্য সে কড়া নাড়াল এক কুটিরে।
কুটিরের দরজা খুলে দিল এক বুড়ো। ভেতরে ডেকে বসাল তাকে। তারপর কিছু জলখাবার দিয়ে বলল, ‘এমন হন্যে হয়ে কোথায় ছুটেছ গো তুমি? সারা শরীর যে তোমার ঘেমে নেয়ে একাকার!’
ছেলেটি যখন বলল সে পশ্চিমের দেবতার কাছে প্রশ্নের উত্তর জানতে যাচ্ছে, তখন হাসি ফুটল বুড়ো মুখে। বলল, ‘আমারও একটি প্রশ্ন আছে বাছা, তুমি যদি সে প্রশ্নটাও দেবতার কাছে নিয়ে যেতে!’
‘বেশ তো, পশ্চিমের দেবতার কাছে কী জেনে আসতে হবে শুনি।’ আগ্রহ নিয়ে বলল ছেলেটি।
‘আমার ফলের বাগানে সতেজ সবুজ একটি কমলা গাছ আছে। কিন্তু ওতে কোনো ফল ধরে না। তোমাকে জেনে আসতে হবে কেন ফল ধরে না?’
ছেলেটি জেনে আসবে বলে কথা দিল।
বুড়োর কুটিরে এক রাত কাটিয়ে সে যাত্রা শুরু করল আবার। যেতে…যেতে…যেতে…সে পৌঁছুল এক বড় নদীর তীরে। নদীতে কানায় কানায় জল, খরস্রোত। কিন্তু পারাপারের কোনো উপায় দেখতে পেল না কোথাও। হতাশায় কুঁকড়ে গিয়ে নদীর পাড়ে একটি পাথরের ওপর বসে পড়ল সে। এদিক ওদিক তাকাতে লাগল আনমনা।
হঠাৎ দমকা বাতাসে গর্জে উঠল নদী। দেখতে দেখতে আকাশ ছেয়ে গেল কালো মেঘে। সেই সঙ্গে বইতে শুরু করল ঝড়। শুরু হতে না হতে থেমেও গেল আবার। অমনি ছেলেটি দেখে, তার মাথার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক বিচিত্র রঙের মেঘ। চোখের পলকে সেই মেঘ আবার হয়ে গেল ড্রাগন। ভয়ানক তার চেহারা, যেন গনগনে আগুনমাখা তার পাখা।
আচমকা ভয়ে পেয়ে কেঁপে উঠল ছেলেটি। তাকে সহজ করার জন্য ড্রাগন বলল, ‘এই যে সুবোধ ছেলে, এমন হন্তদন্ত হয়ে কোথায় চলেছ তুমি?’
ছেলেটির সেই এক কথা। পশ্চিমের দেবতার কাছে প্রশ্নের উত্তর জানতে যাচ্ছে। এ কথা শুনে ড্রাগন নরম গলায় বলল, ‘তা হলে আমার একটি প্রশ্নের উত্তরও তুমি জেনে আসবে কি? মানুষ বা জীবজন্তু কারোরই কোনো ক্ষতি করিনি আমি, তবু এক হাজার বছর ধরে আমি শাস্তি পাচ্ছি। আমি কেন স্বর্গে যেতে পারি না?’
ছেলেটি বলল, ‘তুমি ভেবো না, পশ্চিমের দেবতার কাছ থেকে এ-প্রশ্নর উত্তর আমি নিয়ে আসব।’
ড্রাগন সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটিকে পিঠে তুলে নিয়ে নদী পার করে দিল।
তারপর পশ্চিমদিকে আরো কয়েকদিন চলার পর ছেলেটি গিয়ে পৌঁছুল এক পুরানো শহরে। শহরে ছিল এক রাজপ্রাসাদ। সেই রাজপ্রাসাদেই থাকেন পশ্চিমের দেবতা।
ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে ছেলেটি গিয়ে হাজির হল সেই রাজপ্রাসাদে। প্রাসাদের দ্বাররক্ষীকে পশ্চিমের দেবতার কথা বলতেই সে তাকে নিয়ে গেল ভেতরে। অনেকগুলো ছোট ছোট কক্ষ পেরিয়ে তারা ঢুকল এক বিশাল কক্ষে, অদ্ভুত সব আসবাব, জিনিসপত্র ও কারুকাজে কক্ষটি সাজানো। সেই কক্ষে মাঝখানে বসেছিলেন সৌম্যমূর্তি এক বৃদ্ধ, ধবধবে সাদা তার চুল-দাড়ি, পরনে তাঁর শ্বেত-শুভ্র বাস। তাঁকে দেখিয়ে দ্বাররক্ষী বলল, ‘ইনিই পশ্চিমের দেবতা।’
ছেলেটি সম্মান জানিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াতেই পশ্চিমের দেবতা হাসিমুখে বললেন, ‘কী হে তরুণ, আমার কাছে কী চাই তোমার?’
‘আমি আপনার অনেক নাম শুনেছি, আজ চারটি প্রশ্ন নিয়ে আপনার কাছে এসেছি, আশা করি আপনি আমায় ফিরিয়ে দেবেন না।’ ছেলেটি বিনয়ের সঙ্গে বলল।
পশ্চিমের দেবতা বললেন, ‘না, হে না, তোমায় বিমুখ করব না, প্রশ্নের উত্তর দেব। তবে এখানে আমাদের নিয়ম হল বিজোড় সংখ্যায় প্রশ্ন করা, জোড় সংখ্যায় নয়। অর্থাৎ একটি, তিনটি, পাঁচটি প্রশ্ন আমাকে জিজ্ঞেস করা যাবে। এখন তোমার চারটি প্রশ্ন থেকে তুমি যে কোনো তিনটি প্রশ্ন আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারো।’
ছেলেটি পড়ল মুশকিলে। চারটির মধ্যে তিনটিই অন্যদের প্রশ্ন। উত্তরের আশায় তারা পথ চেয়ে বসে থাকবে। উত্তর না নিয়ে গেলে কি বলবে? আর কার প্রশ্নই বা বাদ দেবে? ভেবে কোনো কূল-কিনারা পেল না সে, শেষে নিজের প্রশ্নটিই বাদ দিল। পশ্চিমের দেবতার কাছে জিজ্ঞেস করল অন্যদের প্রশ্ন তিনটি। আর প্রশ্নগুলোর উত্তরও পেল সঙ্গে সঙ্গে। উত্তর পেয়ে খুশিতে ভরে উঠল তার মন। হোক এসব অন্যদের প্রশ্নের উত্তর, তাদের তো উপকার হবে! নিজের প্রশ্নটি বাদ দিতে হয়েছে বলে তার এতটুকু আপসোস হল না। আনন্দে প্রায় নাচতে নাচতে বাড়ির পথ ধরল সে।
নদীর তীরে আসতেই দেখে-ড্রাগন দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাগনকে সে বলল, ‘পশ্চিমের দেবতা বলেছেন, স্বর্গে যাওয়ার জন্য তোমার দুটো ভালো কাজ করতে হবে।’
ড্রাগন ব্যস্ত হয়ে জানতে চাইল, ‘কী কী কাজ? জলদি বলো।’
‘প্রথম কাজ হলÑআমাকে নদীর ওপারে বয়ে নিয়ে যাওয়া, আর দ্বিতীয় কাজ হল, রাতে যে মুক্তাটি তোমার মাথা থেকে আলো ছড়ায়, ওটাকে ঝেড়ে ফেলে দেওয়া।’
ড্রাগন আর কোনো কথা না বলে ছেলেটিকে পিঠে তুলে নিয়ে গেল নদীর ওপারে। পিঠ থেকে তাকে নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘ভাই মুক্তাটি ঝেড়ে ফেলার জন্য আমি তোমার সাহায্য চাই। আমার মাথা থেকে যখন দুটো শিং বেরিয়ে আসবে, তখন তুমি ভয় না পেয়ে শিং দুটো জোরে চেপে ধরবে, কেমন?’
কথা শেষ হতে না হতেই ড্রাগনের মাথা থেকে বেরিয়ে এল দুটো শিং। ছেলেটি একটু থতমত খেয়ে সামলে নিল নিজেকে। তারপর আস্তে আস্তে শিং দুটোর ওপর হাত রেখে চেপে ধরল জোরে। সঙ্গে সঙ্গে ড্রাগনটি উঠে গেল উপর দিকে। মেঘ ফুঁড়ে স্বর্গলোকে চলে যেতে যেতে ছেলেটিকে ডেকে বলল, ‘আমার উপহার হিসেবে মুক্তাটি তুমি নিয়ে যাও।’
ছেলেটি অবাক হয়ে দেখল, দু’হাতে সে ধরে আছে ড্রাগনের মুক্তা, শিং নয়।
ড্রাগনের চকচকে মুক্তাটি নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হল ছেলেটি। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় বুড়োর কুটিরের কাছে এসে পৌঁছুল সে। বুড়ো তাকে দেখেই দূর থেকে বলল, ‘তুমি কি তোমার কথা রেখেছ?’
‘অবশ্যই। পশ্চিমের দেবতা বলেছেন-তোমার ফল বাগানের মাটির নিচে নয় কলস সোনা আর নয় কলস রূপা পোঁতা আছে। তুমি যদি মাটি খুঁড়ে সেগুলো বের করে নাও সেখানে একটি জলাশয়ের সৃষ্টি হবে। তারপর তোমার কমলার গাছে যদি সেই জলাশয়ের জল সেঁচ দাও, তবে ওটাতে ফল ধরবে।’
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে মাটি খোঁড়ার কাজে লেগে গেল বুড়ো। ছেলেটিও সাহায্য করতে লাগল বুড়োকে। দু’জন মিলে কিছুক্ষণ খোঁড়ার পর জলাশয়ের জল পেয়ে গেল তারা। কিন্তু সোনার কলস ও রূপার কলস আর পায় না। তবু হতাশ না হয়ে মাটি খুঁড়ে চলল তারা। অনেকক্ষণ পর মাটির অনেক গভীরে অবশেষে মিলল সোনা-রূপার কলসের দেখা। একটি একটি করে আঠারোটি কলস তোলা শেষ হতেই জলাশয়ের তলা থেকে ফুঁড়ে উঠল স্ফটিকের মতো পরিষ্কার জল। দেখতে দেখতে কানায় কানায় ভরে গেল জলাশয়টি।
জলাশয়ের এই স্ফটিক জল কমলা গাছটির গোড়ায় সেঁচে দিতে আর দেরি করল না বুড়ো। জলের ছোঁয়া পাওয়া মাত্র গাছটির শাখায় শাখায় ফুটে উঠল অসংখ্য ফুল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সোনালি কমলার ভারে নুয়ে পড়ল গাছটি।
বুড়ো তো আনন্দে আপনহারা। ছেলেটিকে কী বলবে সহসা ভেবে পেল না। জোর করে তাকে ধরে রেখে দিল দু’দিন। ইচ্ছেমতো আদর আপ্যায়ন করল। তারপর অর্ধেক সোনা আর রূপা তাকে উপহার দিয়ে বিদায় জানাল।
ড্রাগনের আলো ছড়ানো মুক্তা ও বুড়োর দেয়া সোনা-রূপা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এবার মহিলার কুটিরে এসে হাজির হল ছেলেটি। মহিলা তাকে দেখে বলল, ‘আমার প্রশ্নের উত্তর এনেছ তো?’
ছেলেটি বলল, ‘হ্যাঁ, পশ্চিমের দেবতা বলেছেন তোমার মেয়ে কথা বলতে পারবে। যেদিন তার পছন্দের পাত্রের দেখা পাবে, সেদিনই তার মুখে কথা ফুটবে।’
মহিলা যখন ছেলেটির সঙ্গে কথা বলছিল তখন মেয়েটি কাছে পিঠে ছিল না। কিছুক্ষণ পর সে ঘরে ঢুকল। ছেলেটিকে দেখামাত্র গোলাপ ফুলের মতো রক্তিম হয়ে উঠল তার মুখম-ল। লজ্জিত ভঙ্গিতে হেসে মৃদুস্বরে সে মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ইনি কে, মা?’
হঠাৎ অদ্ভুত এক উত্তেজনা ও খুশির আবেগে কেঁপে উঠল মহিলা। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে সে কেঁদে ফেলল আনন্দে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘আজকের দিনটা বড় শুভ মা, এই ছেলেটিকে দেখে আজই তুমি প্রথম কথা বলেছ, তাই আমি চাই এর সঙ্গে আজই তোমার বিয়ে হোক।’
ছেলেটি আর কী বলবে। সে দেখল এখানে কোনো আপত্তি চলে না। সুতরাং তখনি মেয়েটির সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে গেল। এক রাত সেখানে কাটিয়ে পরদিন আবার বাড়ির পথে পা বাড়াল ছেলেটি। এবার সে সঙ্গে নিয়ে চলল ড্রাগনের আলো ছড়ানো মুক্তা, বুড়োর দেওয়া সোনা-রূপা এবং সুন্দরী স্ত্রী।
ঊনপঞ্চাশ দিন একটানা চলার পর বাড়ি পৌঁছুল ছেলেটি। বাড়ি ফিরে দেখে মা তার কিছুই দেখতে পায় না। মা অন্ধ হয়ে গেছে। তার জন্য কেঁদে কেঁদে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছে মা।
বিষাদে ভরে গেল তার মন। অথচ সে চেয়েছিল মাকে নিয়ে একটি সুখের স্বর্গ গড়ে তুলবে, ভেবেছিল-মায়ের দু’চোখের তারায় খুশির আলো ঝিলিক দেবে, ভেবেছিল- মা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখবে-তার ছেলের বৌ কেমন সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী আর কত সোনা-রূপা ও কেমন আলো ছড়ানো মুক্তা সে নিয়ে এসেছে।
কিন্তু মায়ের এমনই পোড়া কপাল-বৌয়ের মসৃণ মুখম-ল ছুঁয়ে অনুভব করা ছাড়া এবং সোনা-রূপার রিনঝিন শব্দ শোনা ছাড়া আর কিছুই করতে পারল না। মায়ের এই অসহায় অবস্থা দেখে ছেলে কেবল মাথা কুটতে থাকে-‘কেন এমন হল, কেন?’
মুক্তাটি বের করে সে বারবার মায়ের চোখের সামনে নাড়ায়, কিন্তু যত আলোই মুক্তাটি ছড়াক না কেন, মা আঁধার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। তবু ছেলে আবার মুক্তাটি নাড়ায়। মায়ের অন্ধত্ব কিছুতেই মানতে পারে না সে। মুক্তাটি নাড়িয়ে নাড়িয়ে ব্যথা ভরা মনে সে বলে, ‘মা, তোমার সুখের জন্য আমি তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম, এই সুখের মুহূর্তে তুমি যদি শুধু দেখতে পেতে মা, আমি সবচেয়ে সুখী হতাম।’
ছেলের এই করুণ বিলাপ শেষ হতে না হতে মা হঠাৎ বলে উঠল, ‘বাছা, আমি দেখতে পাচ্ছি, সব দেখতে পাচ্ছি, তোর বৌ, সোনা-রূপা-মুক্তা সব আমি দেখতে পাচ্ছি।
ছেলেটি আনন্দে হতবাক। তার ইচ্ছেয় মা দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছে। কিন্তু এই ইচ্ছে কেমন করে পূরণ হল? মুক্তার গুণে? ভাবতে ভাবতে সে মুক্তাটি নাড়িয়ে নাড়িয়ে আবার মনে মনে বলল, ‘গ্রামে যদি একজন লোকও গরিব না থাকত, তবে ধনী লোকদের দাপট কমত।’
যেই না বলা, অমনি চারদিক থেকে ভেসে আসল দারুণ হই চই আর উল্লাসধ্বনি।
ছেলেটি বাড়ি থেকে বেরিয়ে দেখল, গ্রামে যেসব জবুথবু কুঁড়েঘর ছিল, সেগুলো সব দালান-কোঠা হয়ে গেছে। এমনকি তার নিজের ঘরটাও বাদ যায় নি। যারা দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পেত না, তারা সবাই আয়েশ করে কোর্মা পোলাও খাচ্ছে। যাদের গায়ে কোনো ভালো জামা কাপড় ছিল না, তারা সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এসব দেখে খুশিতে ছেলেটির বুক ভরে গেল। সে বুঝল- ড্রাগনের মুক্তাটি কোনো সাধারণ মুক্তা নয়, এটি কেবল আলোই ছড়ায় না, মানুষের ইচ্ছেও পূরণ করে, এটি ইচ্ছে পূরণ মুক্তা।
বাড়িতে ফিরে মুক্তাটি যত্ন করে রেখে দিল সে।
সেদিন থেকে সেই দেশে আর ধনী-গরিবের ভেদ রইল না। সবার জীবনই অপার সুখে-শান্তিতে মধুর হয়ে উঠল।