প্রাণপণ চেষ্টা আর ভাবনায় প্রতি রাতই কেটে যায় আশিকের ৷ কাগজ-কালি নষ্ট করছে অহরহ ৷ মোবাইলের নোটপেডে যা তা লিখে লিখে মোবাইলের চার্জ শেষ করে ফেলছে প্রতি দিন ৷ এদিকে ঘুম তাড়িয়ে নির্ঘুম থাকার কষ্ট-কসরতও কম করছে না আশিক ৷ তবুও একটা কবিতা বা গল্প লেখা হয়ে উঠে না তার ৷ আশিক কবি ও গল্পকার হতে চায় ৷ যেখানে তার সহপাঠী বন্ধুদের কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা ব্যারিস্টার হতে চায়, সেখানে আশিক নাকি রুটি-রুজিহীন কবি ও গল্পকার হবে ৷ এটাই তার সিদ্ধান্ত ৷ প্রথম যেই দিন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সে, সেই দিন থেকেই আশিক বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকদের বই সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করে দিয়েছে ৷ কবি ও গল্পকার হতে হলে যে প্রচুর পড়তে হয় এটা জানে আশিক ৷ মাঝে মধ্যে এবং ইদানিং প্রায় প্রতিদিনই কবিতা-গল্প লেখার জন্য চেষ্টাও করে যাচ্ছে সে ৷ কিন্তু এখনো সে লেখার মূল উপাদানগুলো ধরতে পারেনি ৷ থিমগুলো বোধহয় অগোছালো রয়ে গেছে ৷ তাই এখন নিজের ওপর খুব জিদ চেপে আছে ৷ যে কোনো মুহূর্তে কলম-কাগজ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কবি-গল্পকার হওয়ার শখ মাটি চাপা দিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকবে ভাবছে আশিক ৷ নিজের ওপর জিদ ক্রমশই বাড়ছে ৷ একটা বেখাপ্পা সময় যাচ্ছে আশিকের ৷ বন্ধুরা বলেছিলো প্রেম করতে ৷ প্রেম করলে নাকি মাথায় হরেক রকম কবিতা ও গল্পের আইডিয়া নাযিল হয় ৷ কিন্তু আশিকের মতো শান্ত-ভদ্র এবং নিতান্তই লাজুক ছেলে প্রেম-টেম করতে রাজি নয় ৷ প্রেমের কতো অফার সে পেয়েছে! কোনোটাতেই সে সায় দেয়নি ৷ কতো প্রেমনিবেদনপত্র তার বইয়ের পাতায় পাতায় লুকোনো পেয়েছে, সবই ছিঁড়েছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ময়লার ঝুঁড়িতে ৷ ও বরাবরই মেয়েদের সংস্রব থেকে দূরে থাকার ছেলে ৷ কোনো মেয়ের দিকে আঁড়চোখেও তাকায় না কখনো ৷ বড্ড লাজুক ও কোমল প্রকৃতির ছেলে আশিক ৷ তার লাজুকতা ও শরমিন্দা গুণের কারণে এলাকার কোনো অনুষ্ঠান, পিকনিক ও কলেজের শিক্ষাসফরেও যাওয়া হয় না তার ৷ আত্মীয়-স্বজনদের বিয়ের দাওয়াতেও তাকে নেয়া যায় না ৷ গতবার তার একমাত্র মামাতো বোন সাবিহার বিয়ের সময় আশিক কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না ৷ যাবে কি যাবে না ৷ এদিকে বাড়ির সবাই তৈরি হয়ে বসেছিলো বিয়েতে অংশ গ্রহণের জন্য ৷ আশিক তো মহাবিপাকে পড়ে গিয়েছিলো ৷ ছোট বোন আতিকা বার বার এসে তাগাদা দিচ্ছিলো তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিতে, তার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে ৷ আশিক ভাবছিলো এবার কি তাকে মামাতো বোনের বিয়েতে যেতেই হবে? সেই মামাতো বোন সাবিহা, যে তার জন্য উজোরপ্রাণ ছিলো ৷ যে তাকে নিয়ে ঘর-সংসার বাঁধবে স্বপ্ন দেখে আসছিলো ৷ কিন্তু অাশিকের পক্ষ থেকে কোনো সাড়ানাড়া ছিলো না ৷ কোনো কেয়ারই করতো না মামাতো বোন সাবিহাকে ৷ সে তার কাজে মগ্ন থাকতো ৷ শেষমেশ সাবিহার বিয়ে অন্যত্র হওয়ার আয়োজন চলতে লাগলো ৷ এখন সে বিয়েতে না গেলে সাবিহা ভাববে সেই কারণেই বোধহয় আশিক আসেনি ৷ আশিক তার কাছ থেকে অনেক জ্বালা সহ্য করেছে ৷ তাকে সে অনেক ভুগিয়েছে ৷ যা আশিকের মননবিরুদ্ধ ছিলো ৷ যদিও আশিকের না যাওয়ার কারণ হবে তার লাজুকতা, তার শরম শরম ভাব ৷ কিন্তু এটা কি সাবিহা বুঝবে? সে যাই হোক, আশিক যাবে না যাবেই না ৷ এখন এই না যাওয়ার জন্য তাকে উপস্থিত কোনো বুদ্ধির আশ্রয় নিতে হবে ৷ তবে সেটা ফলপ্রসূ হবে কি না— ভাবতে ভাবতেই তার মাও এসে ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছিলো ৷
‘আশিক আশিক’
এই আশিক, জলদি আয় বাবা!
সাবিহার বিয়েতে না গেলে যে সবাই তোকে খারাপ বলবে, তোকে এক রুখা, একঘেঁয়ে বলবে ৷ মনে না চাইলেও এবার আমাদের সাথে তোকে যেতে হবে ৷ সাবিহাদের বাড়িতে গিয়ে না হয় তুই এক রুমেই বসে থাকিস, সে ব্যবস্থা আমি করে দেবো ৷ আয় বাবা জলদি আয়, এক্ষুনি আয়!
আসছি মা! একটু অপেক্ষা করো তোমরা ৷
যতো তাড়াতাড়ি পারিস আয়, গাড়ি এসে গেছে সেই কখন ৷
‘ঠিকাছে মা তুমি যাও’
আশিকের মা চলে যাবার পর সে বাথরুমে ঢুকলো ৷ কী করবে সে ভেবে পাচ্ছিলো না ৷ যেতে হলে আর দেরি করা যাবে না ৷ এখন আর কেউ তার জন্য অপেক্ষা সইবে না ৷ আর না যেতে হলে কোনো উপায় অবশ্যই খুঁজতে হবে ৷ তৎক্ষণাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেলো ৷ যদিও এটা কাজে লাগালে বাড়ির সবারই বিয়েতে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে ৷ তারপরও তাকে এই ‘এহেন কর্ম সাধন’ করতে হবে যদি সে বিয়ে বাড়িতে যাওয়া থেকে বাঁচতে চায় ৷ আরেকবার কেউ এসে ডাকার আগেই তাকে কাজটা সেরে ফেলতে হবে ৷ যে ভাবা সে কাজ ৷ পায়ের গোড়ালি দিয়ে বাথরুমের ফ্লোরে দ্রিম করে একটা আওয়াজ করে আশিক চিৎপটাং হয়ে শুয়ে পড়ে আর মাজায় হাত রেখে বাড়িসুদ্ধ মাতিয়ে দিয়ে আহাজারি শুরু করে দেয় ৷
‘ ও আম্মা গো! আমি মরে গেছি গো, আমাকে ধরো, আহহহহ!
চিৎকার শুনে সবাই দৌড়ে এসে দেখে বাথরুমের দরজা লাগানো ৷ ভেতর থেকে আশিকের বুকফাঁটা চিৎকার আসছে ৷ আশিকের মা বাবা পেরেশান গলায় তাকে দরজা খুলতে বলছে ৷ ও তো ব্যথায় জর্জরিত সুরে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলছে, মা আমি উঠতে পারছি না, আমার কোমরে ভীষণ লেগেছে মা, ও মা আমি শরীর নাড়াতে পারছি না ৷ আশিকের মা বললো, একটু কষ্ট করে দেখো বাবা সিটকিনিটা খুলতে পারো কি না ৷
আশিক চিন্তা করলো এতো বেশি ব্যথা পেয়েছি বোঝানোর দরকার নেই, পরে যদি এক্স রে রিপোর্টে ভাঙা-ফাটা কিছু ধরা না পড়ে তাহলে হয়তো সবাই সন্দেহ করে বসতে পারে ৷ মাঝারি চোট পেয়েছি এটা বোঝানোই যথেষ্ট ৷ ডাক্তার হয়তো কিছুদিন বিশ্রাম নেয়ার কথা বলবে ৷ এতেই আমার বিয়েতে না যাওয়ার ডিসিশান আসবে ৷
সে আলতো করে দরজার সিটকিনিটা খুলে দিয়ে ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠার মতো করে ৷ আশিকের মা তো কেঁদেই ফেললো আর চিৎকার করে বলছে, কীভাবে পড়ে গেলে বাবা? কোথায় আঘাত লেগেছে তোমার? আশিক কোমর ও তার নিচের অংশ দেখিয়ে আবার আহহহ করে উঠলো ৷ তাকে সবাই ধরাধরি করে ওই গাড়িতে নিয়ে উঠালো যেটা তারা সাবিহার বিয়েতে যাওয়ার জন্য ভাড়া করেছিলো ৷ এখন তাদের গন্তব্য সদর হাসপাতাল ৷ হাসপাতালে পৌছে যথারীতি তাকে ডাক্তার দেখানো হলো ৷ ডাক্তার সাহেব আশিককে এক নজর দেখেই এক্স রে করিয়ে আনতে বললেন ৷ এক্স রে শেষে রিপোর্টে তার কোমর ফ্রেশ দেখাচ্ছিলো ৷ আঘাতের কোনো চিহ্ন নেই ৷ ডাক্তার সাহেব আশিকের মা বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘তার কোমরে গুরুতর কোনো আঘাত নেই ৷ হাড়ও ভাঙেনি ৷ আপনারা চিন্তা করবেন না ৷ ও কিছু দিন বিশ্রাম নিলে আর এই ওষুধ কটা খেলেই পুরোপুরি সেরে উঠবে ৷ আমি তাকে ব্যথানাশক মেডিসিন স্প্রে করে দিয়েছি ৷ এখন তাকে বাসায় নিয়ে যেতে পারেন’ ৷ তাই করা হলো ৷ আশিককে বাসায় নিয়ে আসা হলো ৷ আশিককে আর মামাতো বোন সাবিহার বিয়েতে যেতে কেউ পীড়াপীড়ি করেনি ৷ পরদিন আশিকের বাবা ও ছোট বোন আতিকা বিয়ে খেয়ে চলে এসেছিলো ৷ বাড়তি কোনো ফূর্তি-মৌজ করা হয়নি ৷ আশিকের এই অনাকাঙ্খিত ‘দূর্ঘটনা’র কথা শুনে অনেকেই মনের আনন্দ হারিয়েছে ৷ অনেকেই তাকে দেখতে এসেছে ৷ সান্ত্বনা দিয়েছে ৷ আশিক জানে এ ঘটনা নিছক তার বানানো ৷ শুধুমাত্র এক বিয়েতে অংশগ্রহনের লজ্জা থেকে বাঁচতে তাকে এটুকু সাজাতে হয়েছে ৷

সপ্তাহ দুয়েক পর আশিক বাইরে বের হলো ৷ যে কেউ তাকে দেখছিলো সে এখন কেমন বোধ করছে জানতে চায় ৷ আশিক জানিয়ে দেয় সে ভালো বোধ করছে ৷ তবে আশিক নিজেকে এখন অপরাধী ভাবছে ৷ অযথাই একটা মিথ্যা গল্প সাজিয়ে সবাইকে পেরেশান করে রেখেছিলো এদ্দিন ৷ এক রাতে ডায়েরিটা নিয়ে বসলো আশিক ৷ তত চিন্তা-ভাবনা না করে তার এই মাজা ভাঙার মিথ্যে গল্পটাই লিখবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ৷ তিন দিন মাথা খাটিয়ে পরিশ্রম করে গল্প লেখা শেষ করলো সে ৷ আগাগোড়া একটা রম্যগল্প দাঁড়িয়ে গেলো ৷ এখন আশিক হাসছে ৷ গল্পটার ওপর যথেষ্ট ঘষামাজা করে স্থানীয় একটি মাসিক পত্রিকার অফিস বরাবর পাঠিয়ে দিলো ৷ সামনেই পত্রিকাটির ঈদসংখ্যা প্রকাশ হবে ৷ তার গল্পটি যদি সুনির্বাচিত হয়, সম্পাদক সাহেব তা ছাপতেও পারেন ৷ অবশেষে তাই হলো ৷ পত্রিকার একেবারে শেষের দিকে রম্য বিভাগে আশিকের স্বকৃত রম্যগল্পটি ছাপা হয়েছে ৷ আশিক খুবই উচ্ছ্বসিত ৷ এই প্রথম গল্পের শেষে তার লেখক পরিচয় দেয়া হয়েছে ‘গল্পকার’ ৷