আহসান হাবীব (জন্ম: ২ জানুয়ারি ১৯১৭; মৃত্যু: ১০ জুলাই ১৯৮৫) কবি এবং সাহিত্য-সম্পাদক হিসেবে বিশেষভাবে খ্যাত। তবে তিনি উপন্যাস, গল্প, শিশুতোষ রচনা, অনুবাদ, নিবন্ধ, নাটক এবং স্মৃতিকথাও লিখেছেন। কবিখ্যাতির বাইরে তাঁর ‘আরণ্য নীলমা’ (উপন্যাস, ১৯৬২), খসড়া (কাব্যানুবাদ, ১৯৮৫), ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ (ছড়া, ১৯৭৭) পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করতে পেরেছে। আর তাঁর ‘গল্পকার’ পরিচয়টি এখনো প্রায় অনুদঘাটিত ও অনালোচিতই থেকে গেছে। এমনটি ঘটেছে হয়তো হাবীবের কবিখ্যাতির প্রভাব-বলয়ের প্রভাবে।
আহসান হাবীব সাতটি গল্প লিখেছেন। তাঁর গল্পের প্রখর-চেতন সমাজলগ্নতা ও শৈল্পিক অনুভূতির অভিব্যক্তি সচেতন পাঠকের চিন্তা-প্রবণতাকে আন্দোলিত করে। মধ্যবিত্ত-মানস, দাম্পত্য, সমাজপরিবেশ, কিশোর-স্বভাব, মূল্যবোদের অবক্ষয় প্রভৃতি তার গল্পভুবনের উপাদান। অর্থনৈতিক টানাপড়েনও অনায়াসে এসেছে ত৭ার গল্পের অনুষঙ্গ হিশেবে। ‘বোবা জোয়ার’ গল্পটি আবু মিঞার মনের চাপা-পড়া প্রতিবাদ আর আবেগের প্রাবল্যে নির্মিত। দারিদ্র্যক্লিষ্ট আবু কলকাতায় মামা খাঁ বাহাদুরের বাড়িতে, এক অর্থে চাকর হিশেবেই, বসবাস করে। যদিও পড়াশোনার জন্যেই শহরে পদার্পণ তার। মামা-মামীর কী এক অশুভ-অজানা চক্রান্তে আবুর জীবনের গতি স্থবির হয়ে পড়ে। কালের পরিক্রমায় সে আজ ক্লান্ত-জীবানুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে তার। গল্পকারের ভাষায় :
আবু এখন যা পায় তাহাতেই খুশি থাকে, না পেলেও নাখোশ হওয়ার কারণ দেখে না। পৃথিবীতে কিছু আছে বলেই তার মনে হয় না। মনটাকে একা ভোঁতা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে তার বয়সটা কেবল বেড়ে চলেছে।
অবশ্য তার মনে রোমান্টিকতার একটু হাওয়া লাগে। মামার একমাত্র মেয়ে সুন্দরী তরুণী হাসিনার দিকে চোখ পড়ে আবুর-অনবধানতায়। খাঁ বাহাদুরের দহলিজে বৈকালিক আড্ডায় হাসিনার ফয়-ফরমাস শুনতে হয় আবুকে। এক কথায় আবু ছাড়া হাসিনার নৈমিত্তিক কাজকর্ম অচল। কোনো এক ঘুম-না আসা রাতে হাসিনার ঘরে ডাক পড়ে আবুর। চা তৈরি, পাশাপাশি বসে চা পান, হাসিনার পড়ে যাওয়া বালিশ তুলে দেওয়া-প্রভৃতি দায়িত্ব সারে আবু মন্ত্রমুগ্ধের মতো। কী এক দুর্বোধ্য শিহরণ হৃৎপিণ্ডে স্পন্দন তোলে তার। কিন্তু সে সুখদোলা অবোধ্যই থেকে যায়। হয়তো হাসিনার ফুফাতো ভাই-এর চেয়ে নিজের চাকর-পরিচয়টিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে আবুর কাছে।
আবুর- আবুদের প্রাণের এ অবদমিত আকাক্সক্ষা আর গুমড়ে কাঁদা সত্তা আহসান হাবীব আবিষ্কার করেছেন বিশে-ষকের দৃষ্টিতে। প্রাসঙ্গিকতায় ‘বোবা জোয়ার’ গল্পে রূপায়িত হয়েছে সমকালীন সমাজ-সংস্কৃতির ছিটেফোঁটা আলোকচ্ছটা।
দাম্পত্য-জীবনের ক্রমক্লান্তিজাত অবসন্নতা চিত্রিত হয়েছে ‘দক্ষিণের জানালা’ (মাহে-নও, জানুয়ারি ১৯৬১) গল্পে। ‘সংসারে রোদের আলো কমে আসে, মেঘেদের ছায়া নামে।’-এ গল্পের চাবি-বাক্য। নারী-পুরুসের নির্ভরশীল জীবন সমান গতিতে চলতে পারে না-চলে না। সময়ের প্রবাহে দাম্পত্যের চাকায় জমতে থাকে জড়তা। জীবনের পারিপার্শ্ব গার্হস্থ্য-পরিস্থিতিকে আলোড়িত-বিপর্যস্ত করে নানানভাবে। নির্ভরশীলতার ‘অক্ষমতা’ তাই অবশ্যম্ভাবী অবিনাশী ধ্বংস¯তূপে নিপতিত হয়। আহসান হাবীব দেখেছেন-‘পরিবেশের মালিন্য সম্পর্কের ওপর আক্রমণ চালায়। হাসি নেই সংসারে, এলোমোলো অকারণ গল্পগুজব বন্ধ; কথা যখন ওঠে কিছু, মারমুখো তার রূপ।’
এ গুল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মুশতাক। পাঁচ সন্তানের জনক মুশতাক স্ত্রী-সন্তানের অভিযোগ-প্রতিবাদে নুয়ে-পড়া বটবৃক্ষ। দারিদ্র্য আর অসহায়তা তাকে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করে। কিন্তু সংসার-স্ত্রী-সন্তানদের মুখ অনাগত সময়-পরিসর তার আত্মহত্যার নিশ্চিত যাত্রায় ব্যাঘাত ঘটায়। শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করা হয়ে ওঠে না মুশতাকের। তখন দক্ষিনের জানালা খুলে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেবার প্রত্যয়ে বুক বাঁধে সে। এ গল্পে যাবতীয় প্রতিকূলতার বিপক্ষে আশাবাদ ও সংসারলগ্নতার জয় সূচিত হয়েছে। মুশতাকের চারিত্র্যে পাঠক যেন খুঁজে পান নিরীহ নির্বিবাদী সংসারী আহসান হাবীববেই।
সাংসারিক বিচিত্র ছোটখাটো বিষয় ও বস্তুতে কেউ কেউ খুঁজে পায় নির্মল আনন্দের উপাদান। আর এ আনন্দ অনুভূতিকে ব্যক্তি বিশেষে শেয়ার করার প্রবণতাও বিরল নয়। মধ্যবিত্তমানস অতি অনায়াসে ঘড়ির নতুন ব্যান্ড, নতুন কমদামি কাপড়, খেলনা কিংবা উলের মধ্যে আনন্দের আলোকাভাস দেখতে পায়। হয়তো প্রতিবেশ সব সময় অনুকূল থাকে না-কারও কারও এ আনন্দের সঙ্গদাতা থাকে না কখনো কখনো। তখন সে ব্যক্তি হয়ে পড়ে নিঃসঙ্গ, অসহায়। এমনই এক মনস্তাত্ত্বিক সংকট আর বাঙালি-চারিত্র্যের নিপুণ বাষ্য হাবীবের ‘খুশি’ গল্পটি। এ গল্পে কোনো এক মধ্যবিত্ত পরিবারের কর্তা অফিস থেকে ফেরার সময় যেসব সাংসারিক খুঁটিনাটি জিনিসপত্র কিনে আনেন, তাতে লেপ্টে থাকে তার বিস্তর উৎসাহ। কিন্তু অধিকাংশ সময়েই তার স্ত্রী-সন্তানরা থাকে নির্বাক শ্রোতার ভূমিকায়। কখনো কখনো তাদের চেহারায় বিরক্তিও প্রকাশ পায়। বর্ণিত পরিবারের সদস্যদের খুশি না হবার এ প্রবণতাকে গল্পকার মধ্যবিত্ত বাঙালি-স্বভাবের সাথে মিলিয়ে দেখতে চেয়েছেন এভাবে-‘কোনো কিছু্েতই যেন খুশি হতে চায় না এরা। খুশি না হওয়ার একরকম বিলাসে মগ্ন থাকতে ভালোবাসে।’
‘খুশি’ গল্পে বাঙালির অখুশি-আসক্তিকে গাল্পিক এক ধরনের ‘নিরাসক্তি’ বলে ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পেয়েছেন। হাবীব মনে করেন মধ্যবিত্তসুলভ সংকোচ আর ভাড়ামি মোচনের সূত্রমুখ হচ্ছে-ক্লান্তিমোচনের একাগ্র সাধনা, অনাগত উজ্জ্বল কোনো মুহূর্তের জন্যে অবিরাম অপেক্ষা আর খুব সামান্যে খুশি হওয়ার ক্ষমতা। কেননা, ‘জীবনকে ঐশ্বর্যময় করে তোলে এই ক্ষমতা। আর সবচেয়ে বড় কথা কনা কণা করে আহরিত খুশির সেই অফুরান ঐশ্বর্য জীবনে যৌবনের দীপ্তিকে রাখে অহবান।’ আহসান হাবীব এ গল্পে কষ্টক্লিষ্টতার জঠরে অনন্য শুভবোধের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের নিত্য ঝলকানি অবলোকন করেছেন শৈল্পিক দৃষ্টিতে।
ব্যক্তিত্বের উদ্ভোধন আর অসহায়ত্ব মোচনের গল্প ‘ছাই থেকে’ (মাহেনও, অগ্রাহায়ণ, ১৩৬৭)। আহসান হাবীব পারিবারিক কাঠামোয় ব্যক্তি মানুষের উত্থান-পতনের বাস্তবতা এবং মানবিক মূল্যবোধের স্বরূপ এঁকেছেন এখানে। ধলা মেয়া ক্ষয়িষ্ণু জোতদারের প্রতিভূ-ধারকর্জের ভারে আর দুর্বলতার দায়ে সে এখন ছেলের কাছেই সর্বদা নিজেকে অপরাধী মানে। সংসার জীবনের ব্যয়বহুলতার ক্রমগতি ধলাকে বিপর্যস্ত করেছে। সংসার-যন্ত্র চালাবার শক্তি জোগাতে তাকে এখন শহুরে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। ছেলে মাহফুজ অবশ্য পিতার এহেন আত্মসমর্পণকে মেনে নিতে পারে না। ছেলেকে শিক্ষিত করার প্রত্যয়ে জমি-জিরেত বন্ধক-দেয়া পঙ্গু-প্রায় ধলা এগারো বছর পর পুরনো প্রসঙ্গের উন্মাদনায় নিজের সত্তাকে প্রকাশ করে। তার হারিয়ে যাওয়া সেই তেজ-দাপট-হুংকার মাহফুজকে উৎফুল¬ করে তোলে। মাহফুজ ফিরে পায় পিতার প্রকৃত চারিত্র্য। ঘটনা-বিন্যাসে পিতা-পুত্রের নাম-অভিমান-পর্ব এবং তার অবসানকে চিত্রিত করতে গিয়ে গল্পকার মধ্যবিত্তজচীবনের সংকটকেই স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আহসান হাবীবের স্বকীযতাও এ-অন্বৈষণ প্রচেষ্ঠায় অনুসন্ধেয়। ‘ছাই থেকে’ গল্পের শেষ কটি বাক্য যেন হাবীবের এ অন্বেষণ প্রবণতাকেই স্পষ্ট করে তোলে-‘কাটের ওপর পা মেলে দিয়ে বসে আছে মাহফুজ। সামনে দেওয়ালের দিকে দৃষ্টি-মুখটা প্রশস্ত, উজ্জ্বল। কিন্তু চোখ দুটোতে চকচক করছে ফোঁটা পানি।’-এ চিত্রভাসে মধ্যবিত্তের আনন্দ-অীভব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে অনন্যতায়। শেকলবন্দি মধ্যবিত্ত বাঙালি যেন অশ্র“ ছাড়া প্রফুল¬তাকে স্বাগত জানাতে পারে না।
অস্তিত্বের দ্বন্দ্ব আর স্বার্থসিদ্ধির সরল যোগফল হাবীবের ‘কে কাঁদে’ (মাহে-নও, আষাড়, ১৩৬৫) গল্প। চাকরিপ্রার্থী শিক্ষিক যুবকের অসহায়ত্ব, প্রেমিকাকে হাতিয়ার হিশেবে ব্যবহার-প্রবণতা, চাকরিদাতার অসততা ও আত্ম-উদ্বোধন এবং নারীর অবদমিত সত্তার উদভাসন এ গল্পের প্রতিভাস। কর্ম-সংস্থানের সংকটকে সামনে রেখে গল্পকার সাজিয়েছেন তাঁর কাক্সিক্ষত কথামালা। চাকরির বাজার সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য-‘এদেশে পাঁচ বছর, দশ বছর, এমন কি সারা জীবনও মানুষ চাকরির চেষ্টা করে।’ শরুতে চাকরি-সংকটকে এ গল্পের মূল বিষয়বস্তু মনে হলেও গল্প-পাঠ শেষ হলে এ ধারণা পাল্টে যায়। প্রকৃতপক্ষে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-ব্যবস্থায নারীর অবস্থান নারীর অবস্থান ও মর্যাদা যে কতোটা বিপর্যস্ত তারই চিত্ররূপ বর্তমান গল্পটি।
শিক্ষিত বেকার শহীদ তার প্রণয়িনী রিজিয়া ওরফে রিজুকে চাকরির তদবিরের জন্য পাঠায় লম্পট হিশেবে খ্যাত বারী চৌধুরীর কাছে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার সংগ্রহ করে রিজু। কিন্তু সংগ্রহের পথটি সন্দেহমুক্ত মনে হয়নি শহীদের। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গল্পকার শহীদ ছরিত্রে প্রতিবাদ-প্রবণতা যোগ করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তা আপন অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারেনি। সত্য-উদ্ঘাটনের পর শহীদ আত্মগ্লানির বহরে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। অন্যদিকে রিজুর প্রত্যাখান তাকে বিমূঢ় করে তোলে। শহীদের অসহায়ত্বকে আহসান হাবীব চিত্রিত করেছেন তার-ই (শহীদ) উপলব্ধিতে-‘কাঁদবো? কিন্তু কান্না তো বারণ। যে কাঁদে, ওরা বলে, সে উইক সেন্টিমেন্টাল, মরবিড!’ এ গল্পের একটি আদর্শকে রূপ দিতে গিয়ে সামাজিকের এক বিশেষ চারিত্র্যকে ধামাচাপা দিয়েছেন গল্পকার। বারী চরিত্রে আদর্শের এমন প্রলেপ না বুলালেও চলতো। ‘বারীদের’ বিপরীতেও মানুষ আছে-একথা আমরা জানি। কিন্তু‘বারীদের’ স্বরূপ প্রকাশ পাওয়া দরকার-মানবতার কল্যাণের জন্যে, শিল্পের সৌকর্যের তাগিদে। হাবীব হয়তো অনবধানতায়, ব্যক্তি-আদর্শের প্রভাবে ‘সো কল্ড আভিজাত্যের’ মূল্যহীনতার পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে ‘মেকি আভিজাত্যের’ জয়বার্তা ঘোষণা করেছেন। কিশোরসুলভ সংকোচ-দ্বিধা, শিহরণ আহসান হাবীব চেতনায় লালন করেছেন। তাঁর রচনায় মেলে শিশু-কিশোর বয়সের মানসিক দোলাচলতা ও অসম্ভব সব চাঞ্চল্যের উপস্থিতি। ভাবনা-প্রকাশে ভয়, প্রেম-প্রকাশে জড়তা আর জাগতিক সব কিচুকে সুন্দর দেখা ও বাবা কিশোর মনের অনন্য বৈশিষ্ট্য। কিশোর সুলভতার অপূর্ব শৈল্পিক রূপায়ণ আহসান হাবীবের ‘অপরাহ্নে’ (ডিটেকটিব, ১৯৬৩) গল্প। এ গল্পে এক কিশোরের প্রেম-শিহরণকে, কোনো কিশোরীকে ভালোলাগার অনুভূতিকে লেখক বর্ণনা করেছেন এভাবে-‘কচি বুকের মধ্যে টিপ্টিপ্ আওয়াজ হতো। তারপর দৌড়ে বাড়ির দক্ষিণ দিকের বাগানে একটা নারকেল গাছের গোড়ায় বসে বসে নামটা উচ্চারণ করতো কচিমুখে স্পষ্ট গলায় : যুবায়দা, যুবায়দা!’
ভালোলাগার প্রকাশ-জড়তা কিশোরি মনের নিত্যসঙ্গী। এ গল্পের ক্যানভাসে গাল্পিক দেখিয়েছেন দুই কিশোরী ভালোলাগা এক কিশোরকে বকুল ফুলের মালা উপহার দিতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে কতোটা লজ্জিত-সংকুচিত হয়ে পড়ে। মামাতো-ফুফাতো বোন যুবায়দা ও নূরজাহান ভালোলাগার দায়ভার একে অন্যের ওপর চাপাতে চেষ্টা করে-‘দু’জনের কেমন ধ্বস্তাধ্বস্তি শুরু হলো,…এ ও ঠেলে দিতে চাইছে সামনের দিকে।’
স্মৃতিলগ্নতা মানব জীবনের অন্বিষ্ট। কী এক অজানা শক্তি নিয়ে স্মৃতি গড়াতে থাকে জীবনের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। এ যেন স্বপ্নের ভেতর উদ্ভাসিত কোনো বাস্তবতা। স্মৃতির ফোয়ারা থেকে, প্রকৃত পক্ষে, রেহাই পাবার কোনো উপায় নেই মানুষের। ‘অপরাহ্নে’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র জীবনের শেষবেলায় এসে অনুভব করেন স্মৃতিবহনের দারুণ ক্লান্তি-‘এই প্রৌঢ় বয়সে, সারাদিনের কাজের শেষে ক্লান্ত শরীরে বিকেলের বারান্দায় বসে যখন দেখি, রোদ ঝিমিয়ে এসেছে, তখন অনেক পেছনের সেই কুয়াশা-ঢাকা একটি সকালকে যে মনে করতে পারি অনায়াসে-বা মনে করতে না চাইলেও যে মনে পড়ে যায়, এমন আশ্চর্য আর নেই কিচু পৃথিবীতে। কিন্তু তাও বুঝি আছে। আগুনের ভাটার মতো উজ্জ্বল একটি ছোট্টমুখ-চঞ্চল তার দু’টি চোখ-আর একটি মুখ স্থির, শান্ত আর ক্লান্ত কোমলতায় অপূর্ব; এই যে দু’টি চোখ-আর একটি মুখ স্তির, শান্ত আর ক্লান্ত কোমলতায় অপূর্ব; এই যে দু’টি মুখ না পারলাম কোনো দিন আমার বিকেলের ভাবনায় এক করে দেখতে, না পারলাম আলাদা করে চিনতে, এই-ই বুঝি সবচাইতে আশ্চর্য।’ স্মৃতিকাতরতা আহসান হাবীবের কবিতায়ও উজ্জ্বল আভা ছড়িয়ে আছে। বর্তমান গল্পটির স্মৃতিনিমগ্নতা মনে করিয়ে দেয় তাঁর ‘খুজে তারে মতো মিছে’, ‘আমার যাওয়া হয় না’, ‘ডিসেম্বর-১৯৭৭’ প্রভৃতি কবিতার ক্যানভাস।
‘চেহারা’ (মেঘনা, ১৯৫৭) গল্পে দুটি অধ্যায়ে-‘নায়ক’, ‘খরচপত্র’-মানুষের স্বরূপ উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছেন গল্পকার আহসান হাবীব। শিক্ষা আর ভদ্রতার মোড়কে তথাকথিত সভ্যমানুষ সত্যিই সত্য ও সুন্দরের পূজারি কি-না তাতে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। মানুষের ভাবনা-প্রত্যাশা প্রাপ্তি-অভিযোগে যে বিরোধ, তাতে মানবস্বরূপ চিহ্নিতকরণও অসাধ্য বটে। হাবীব ‘নায়ক’ গল্প-পর্বে নারীমুক্তি, প্রগতিশীলতা এবং আধুনিক মনন সমর্থনের অন্তরালে পুরুষের প্রকৃত অভিব্যক্তি এঁকেছেন। ইঙ্গিত আছে নারীমনের দুরতিক্রম্য রহস্যময়তার প্রতিও। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা রক্ষায় ‘নারীবাদী’ পুরুষের ভাবনাবলয় গল্পকার কথাবদ্ধ করেছেন এভাবে-‘মেয়েরা যত লেখাপড়াই জানুক পরিবেশ তারা নিজেরা গড়ে নিতে পারে না। পরিবেশ দিতে হয়। তেমন পরিবেশ গড়ে দিতে পারলে…।’ আলোচ্য গল্প-পর্বে নারীর তথাকথিত অসহায়তা আর পুরুষের পশ্চাৎপদমানসিকতা প্রকাশ করতে চেয়েছেন গল্পকার। এ গল্পের বিষয় হলো-পুরুষ সাধারণ নারীর যে আবেগ-উচ্ছলতাকে প্রশ্রয় দেয়, তা নিজ স্ত্রীর মধ্যে দেখতে অভ্যস্ত নয়; স্বামীকে অভিযোগ-আপত্তিতে জর্জরিত রাখলেও বন্ধু-পুরুষের প্রশস্তি গাইতে নারীর প্রাণবস্ততা।
অফিসের ‘লালফিতার দৌরাত্ম্য আর কর্মকর্তা-কর্মচারীর একাংশের মানসিকতার প্রতিফলন ‘খরচপত্র’ গল্প-পর্ব। তদবির-সেলামি ছাড়া কোনো কর্ম-উদ্ধার এখন রীতিমতো অসাধ্য-প্রায়। আজ অনেকের কাছেই উ॥কোচ বা ঘুষ এক ধরনের ‘অধিকার’। ঘুষ-প্রত্যাশিীদের ঐক্য এবং হীনতার অহংবোধও এখন আর অপ্রকাশ নয়। এ গল্প-পর্বে বর্ণিত কজন সহকর্মীর আলাপে এ প্রবণতার পরিছয় মেলে :
‘সবচাইতে কমবয়সী আলম মিয়া বললেন, অথচ এরাই দেশের শিক্ষিত জন বলে দাবি করে। বৃদ্ধ মনির সাহেব বললেন, হ্যাঁ দেখতে শিক্ষিত বলেই মনে হয়, অথচ সাধারণ ভদ্রতাবোধটুকু নেই।…কথাটা প্রায় লুফে নিয়ে আহমদ মিয়া বললেন, একটা কাজে এলে কিছু খরচপত্র যে করতে হয়, এই জ্ঞানটুকুও এদের নেই।’
সমাজসত্যের চিত্রভাস এ গল্প। সততা ও আদর্শের পথ তেকে যে মানুষ ক্রমাগত দূরে সরে পড়ছে তারই সফল রূপায়ণ ‘চেহারা’ গল্প। মানুষের স্পরূপ ও ‘প্রকৃত চেহারা’ অন্বেষণে গল্পকারের বিশেষ অভিনিবেশ পাঠকের হৃদয় কাড়ে অনায়াসে। আর এক্ষেত্রে তাঁর বিষয় ও অনুষঙ্গ নির্বাচন সময়োপযোগী, কাহিনীবিন্যাস সহজবোধ্য। মূল্যবোধের অবক্ষয় চিত্রণে এক্ষেত্রে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি চমৎকার।
আহসান হাবীবের গল্পের কেন্দ্রবিন্দু হলো মধ্যবিত্ত মানস। তাঁর গল্পের উপাদান চারপাশের পরিচিত সমাজবলয়। বিষয় ও ভাষা সমকালনি এবং সহজপাঠ্য। তিনি জানতেন-সমাজ ও সমকাললগ্নতা শিল্পীর অনন্য বৈশিষ্ট্য। সমকারীন প্রবণতাকে বাদ দিয়ে শুধু কল্পনা বিলাসে শিল্পের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা অসম্ভব-প্রায়-এ উপলব্ধি তিনি চেতনায় লালন করতেন। হাবীবের গল্পের তাই অতি পরিচিত মানুষ, তার প্রবণতা, মূল্যবোধের বিপর্যয় এবং তা থেকে উত্তরণের প্রত্যয় কঠিন-বাস্তবতায় উপনীত হয়েছে কাব্যিক গীতলতার ভেতর দিয়ে।