গান শেষ হয়ে এলেও পড়ে থাকে গানের মালা। গানের মালা শুকালে স্থান নেয় স্মৃতিতে। গত রাতে গান হয়েছিল অনেক রাত অবধি আমার বাসায়। সারেঙ্গির শেষ ছড়ের বেদনা ঘরের বাতাসে। ঠুমরি থেকে গজলের সুমধুর তানের রেশ শোনা যায়। ঝুলে আছে কয়েটি সাপাট, তান, আবেশ ও তাঁর মধুমিমা।

বন্ধুরা যাওয়ার আগে বললেন, বড় ভালো লাগল রে তুলু, অনেক দিন পরে তোর বাসায় গানের আসর, বিশেষ করে ফরিদা পারভীন, ফাতেমাতুজ্জোহরা, সুবীর নন্দী, পারভীন সুলতানাও আকবরের গান। অনুরোধে আমার দুই-একজন বন্ধুও গাইল: আসফ খান, ড. এনামুল হক। ওরা যার যার বাড়ি ফিরে গেছেন, কোন পার থেকে কোন পারে’ একতারা বাঁজিয়ে গান করেছে, তেমনি ছিল দোতরা বাঁজিয়ে গান গাওয়ার শিল্পী। স্বাক্ষী পড়ে আছে তবলা জোড়া, দু’টি তানপুরা, হারমোনিয়াম, স্টেজে কয়েকটি মালা। সব আছে, পালিয়ে গেছে গানের পাখিরা। কোনো দিন এমনিভাবে জমবে না আসরটি। সেই কান্নার কথকথা।

কত না আসরে গান গেয়েছি। আমার বাড়িতেই আসরের পর আসর, পাতলা থান লেন, পুরানাপল্টন, গুলশান। সব আসর গুটিয়ে ফেলেছি। ফিরে আসে জলসা থেকে জলসার আবহ তাড়িত স্মৃতির কোটরে। প্রথমেই মনে পড়বে যার কথা, সে আমার পুত্রসম। তাঁকে কাছে টেনে নিয়েছিলাম নিজ পুত্রের মতোই।

বাংলার ভাব গ্রাম ঘুরে তাঁর মতো প্রতিভাধর কণ্ঠশিল্পী আর খুঁজে পাইনি, যেমন ছিল তার কণ্ঠতেমনি তার উচ্চ স্তরের দোতরা বাজনা, সাথে নূপুরের তালে তার নৃত্য। বলছি আকবর আলী উদাসের কথা। কিছুদিন আগে কুষ্টিয়ার নিজ গ্রাম ভবানীপুরে আকবর চিরবিদায় নিয়েছে অল্প বয়সেই, যেমন গান গাইতে গাইতেই বিদায় নেয় আমাদের পল্লী দুলাল গীদালা। তাদের দেখার কেউ নেই, তাদের জন্যে কান্নার কেউ নেই, তাদের জন্যে ভালোবাসার কেউ নেই। দু’দিনের তরে কণ্ঠে ফেরে বসন্তের গান, তারপর চির বিদায়। ওর গল্প করেছি খানিকটা স্বল্প পরিসরে, ‘জীবন নদীর উজানে’ গ্রন্থে। সব কথা বলতে পারিনি এই জন্যে যে এত জনের সাথে আমার পরিচয় যে অল্প কথায় কারো কথাই তেমন করে বলা হয়নি। সময় আকবরকে ঘিরে স্মৃতি করে তুলেছে উতলা, আমি আজ পুত্র শোকে কাতর। ওর যেভাবেই বলতে চাই, চোখ ভিজে আসবে। যারা পড়বে তাদের কাছে মনে হবে এটি গল্প। এটি সত্যি নয়, আব্বাসী ভাই অনেক বানিয়ে কথা বলতে পারে, সে উপন্যাস লিখছে। আকবর আলী উদাস, ফেলু শেখ, চাঁদ মিয়া, কানাইলাল শীল, রঙ্গলাল দেব, সীমাহারার মতো অজ¯্র চরিত্র তার সামনে খেলা করছে। এদের যে কাউকে নিয়ে সে লিখতে পারবে একেকটি উপন্যাস। যার সাথে মিল থাকবে সেই সব চরিত্রের, যা লিখে অদ্বৈত মল্লবর্মণ, মানিক বন্দোপ্যাধ্যায়, শামসুদ্দিন আবুল কালাম, জসিম উদদীন। এই কারণে যে এই সব লোকজীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের সাথে ছিল আমার দিন-রাতের ওঠা-বসা। কোনো চরিত্র বানান নয়, যদি লিখতে পারি ওদের জীবনকথা তা হলে সবচেয়ে বেশি কাঁদব আমি। আর কেউ নয়।

আকবর প্রথম দিনে এসেই আমার মন জয় করেছিল। আমি বাইরে থেকে ফিরেছি। তখন রাত ৯ টা হবে। কয়েকজন ছেলে আমাকে গান শোনাবে। আমি বললাম, আজ হবে না, আরেক দিন এসো। ওরা এবার আমার স্ত্রীকে ধরল। তারই এ রকম গান তো আমরা আর শুনিনি। পরপর সাত আঁটি গান গাইল আকবর। আমার স্ত্রী নতুন করে ভাত মুরগি রান্না করল। আকবর প্রথম দিনই আমাকে ‘আব্বু’ সম্বোধন করেছিল। সেই দিন পর্যন্ত ওর এই ডাক আমাকে উন্মনা করে। টেলিভিশনের নানা অনুষ্ঠানে তাকে উপস্থাপনা করি। সবাই বলে একে কোথায় পেলেন? ওকি সত্যি আপনার ছেলে, না বানান?

ওকে বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনে কলকাতা পাঠাই। এক সন্ধ্যাতেই সবার মন অধিকার করে। এরপর কোচবিহার ও মুর্শিদাবাদ। সুখবিলাস বর্মা আমাকে বলেন যে ওর চেয়ে ভালো শিল্পী আর হয় না। এর পর পাঠালাম ইরানে সিরাজ ফেস্টিভালে। আমি না গিয়ে ওকে পাঠাই। তাতে আমার সম্মান আরো বেড়ে যায়। এরপর লন্ডনে বাংলাদেশ ফেস্টিভালে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলি, আমার যাওয়ার প্রয়োজন নেই, ও গেলেই হবে। জাপানে আমার দুই সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানে ওই ছিল শ্রেষ্ঠ শিল্পী। টেলিভিশনের লোক ওর কাছে জানতে চায় কার কাছে এত সুন্দর বিচ্ছেদি। শিখছে বাংলার প্রকৃতি থেকে জাপানে আমাদের অনুষ্ঠান বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি করে। দশজন শিল্পীর এই অনুষ্ঠান আজ পর্যন্ত জাপানের আঁটি শহরে আর এমন জমেছিল বলে শুনিনি। আকবরের পরেই লোকসঙ্গীতের গানগুলো গেয়ে অনুষ্ঠান মাত করেছিল ছোট মেয়ে শারমিনী, দিলরুবা খান, নাদিরা ও বান্নার গান ও গাজী আবদুল হাকিমের বাঁশি। ছবিগুলো জ্বল জ্বল করছে। সবই আছে, নেই শুধু আকবর। বছর দু’য়েক থেকে সে কঠিন রোগে আক্রান্ত। ব্যাঙ্গ্যোলোরে পাঠান হলো। সবাই সাহায্য করেছে, আমিও। ওকে আমি চাকরিও দিয়েছিলাম, যাতে গ্রামে থেকে সে লোকসঙ্গীতের সেবা করতে পারে। বেঁচে থাকতে ওর গ্রামে গিয়ে হাজির। ও বিশ্বাসই করতে পারেনি সেখানে যাবো। হাজার হাজার লোক দেখতে এসেছে। আকবর আর নেই। সে শুয়ে তাঁর স্ব-গ্রামের উত্তরের ঘরটিতে যেখানে বসে সে দোতরা বাজিয়ে গান গাইতো। আমার চোখে এখন আষাঢ়ের বন্যা। আকবর শেষের দিকে আধ্যাত্মিকতার স্পর্শ পেয়েছিল। সারা রাত জিকির করতো। ওর বাবা সেই সময়ের একজন নন্দিত আধ্যাত্মিক পুরুষ। তাকে বারণ করিনি, কারণ গান বাজনার শেষে এক দিন সেখানেই ফিরে যেতে হবে। ওর মৃত্যুতে আমার দুই মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে অস্থির, যেন আপন ভাইয়ের মৃত্যু হয়েছে।

সীমাহার কথা বলতে চোখে অশ্রু বাঁধ মানবে না। অসামান্য সুন্দরী, যে সামনে এসে বসেছিল মাত্র একটি প্রহর। তখন শিল্পকলা একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে। কেমন করে ঢুকল তাও বিস্ময়। হয়তো সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সামনে ধরা দিয়েছিল। গানের গলাটি সুন্দর, সিডি বেরোয়নি, টেলিভিশনে গায়নি। অল্প কথায় ধরতে পেরেছি, সে তার কূল হারিয়ে ফেলেছে এবং সর্বশেষে এসেছিল আশ্রয়ের জন্যে। নামটিও সে গোপন করেছে। নিজের নাম দিয়েছে সীমাহারা। গ্রাম-গ্রামান্তর থেকে প্রতিভাশীলরা যখন সুযোগ পায় না, তখন কিছু মানুষ তাদের অপব্যবহার করে বলে তোমাকে স্টার বানিয়ে দেবো। সীমাহার তার একটি ফটো অ্যালবাম তুলে ধরে, যাতে কোনো মফস্বল শহরের ফটোগ্রাফার বিভিন্ন পোজে তার ছবি তুলেছে। এগুলো দেখে সুচিত্রা সেনের কথা মনে হয়েছে বৈকি। বললাম, তুমি গান জানো?

অবাক করে দিয়ে বলল, নজরুলের গান জানি, কম করে হলেও একশ’টি।
বললাম, গাও।
[গান ধরল: ‘ওগো চিরজনমের সাথী’ সীমাহার কেমন করে জানল যে এই গানটি আমার প্রিয়র তালিকায়? যেভাবে গাইল তাতে মনে হলো, সামনে ভবিষ্যৎ-এর একজন ফিরোজা বসে আছেন। সুন্দর কণ্ঠ ও গাওয়ার ভঙ্গি। বললাম, তা হলে তোমার এ হাল কেন? এত বিপর্যস্ত হয়ে কেন এসে দাঁড়িয়েছো?
সীমাহারা উত্তর দেয়নি। শুধু কাঁদল। কান্নাই তার প্রশ্নের উত্তর। ও কোন দিন ফিরোজা বেগম হতে পারবে না, কোনো দিন আসবে না নজরুলের ব্যথাসিক্ত ক্রন্দন নিয়ে শ্রোতাদের দ্বারে, তার সুন্দর ছবি কেউ কোন দিন দেখবে না।
তা হলে সীমাহারার ক্ষেত্রে কী হয়েছিল? ভালো করে জানি না, কিন্তু ওর কথা আমার মাঝে মাঝেই মনে হয়। সঙ্গীতের রাজ্যে কত ঘটনাই ঘটে, কে তার খবর রাখে? তাকে সুযোগ দিতে পারতাম, টেনে তুলতে পারতাম পঙ্ক থেকে, সে সুযোগ ঘটেনি। কাঁদতে কাঁদতে সে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল। আর কোনদিন দেখা হয়নি ।

‘ভরা নদীর বুকে’-এর অনুষ্ঠান করতে গেছি কুষ্টিয়ায়। লালনের মেলায়। কত বছর আগে মনে নেই।সকাল থেকে চুল দাঁড়িওয়ালা তরুণ বৃদ্ধ বাউলদের পেছনে পেছনে শুটিং করতে করতে ক্লান্ত। একটি মেয়ে লালনের মেলার প্রান্তে গাইছে অপরূপ বিষাদের সুরে; ‘সবাই বলে পিরিত ভালো. আমার ভালো হলো কই। মেয়েটির বয়স ১৪-১৫ এর বেশি হবে না। যত গান শুনেছি এ যাবৎ এর চেয়ে সুন্দর গান আর শুনিনি।
প্রডিউসার মুসা আহমেদকে বললাম, তুমি শুনেছো? বলল, আব্বাসী ভাই, এই মেয়েটি একটি জিনিয়াস। বাংলাদেশ জুড়ে আছে প্রতি গ্রামে এ রকম জিনিয়াস। এদের জন্যে আমরা কিছুই করতে পারলাম না। সত্যিই তাই। কত সুন্দর সুন্দর ফুল যে ফুঁটে আছে বাংলার গ্রামে, তার খবর কে রাখে?

এত কম বয়সে কিসের দুঃখ তাকে স্পর্শ করেছে, তা জানার কৌতুহল আজো আছে। সেই তরুণী বাংলার কোন গৃহকোণে বাস করে, তা আমার জানতে আজো ইচ্ছে করে। সে কি এখনো গান গায়, যেমনটি সে দিন গেয়েছিল; ‘সবাই বলে পিরিত ভালো, আমার ভালো হলো কই’ তার জীবনে এ গানটি কি সত্যি হয়ে দেখা দিয়েছিল?
যে ফুলের সন্ধান পেয়েছিলাম, ওদেরকে তুলে এনে টেলিভিশনে দেখিয়েছি বছরের পর বছর, ওদের গান বাঁচাতে পারিনি। আসরবিহীন আসরের গল্প ‘জীবন নদীর উজানে’-তে । কে কার গল্প শুনবে? চল্লিশ বছর আগে জসীম উদদীন লিখেছিলেন জারিগানের গায়কদের জীবন নিয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘জারিগান’। এরপর মুর্শিদি গায়কদের নিয়ে লেখা: ‘মুর্শিদাগান’। একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, বই দু’টি পড়েছে? বললাম না। তার মৃত্যুর পর বই দু’টি সংগ্রহ করে পড়লাম ও অনেকক্ষণ কাঁদলাম। ওতে লেখা বাংলার অখ্যাত গীদালদের কথা। ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি’, দুই খ- ও ‘ভাটির দ্যাশের ভাটিয়ালি’-তে গীদালদের কথা বলেছি। কে পড়বে?

লেখক: সাহিত্যিক ও সংগীত ব্যক্তিত্ব