শুনেছি, তাঁর নামটা রেখেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। নবনীতা- এ নামকরণের পেছনেও ছোট্ট একটা গল্প আছে। নবনীতার মা রাধারাণী দেবী আর বাবা নরেন্দ্র দেব দুজনেই তখন বাংলা সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। রাধারাণী ছিলেন বালবিধবা। রবীন্দ্রনাথের ঘটকালিতে নরেন্দ্র দেবের সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে হয়। স্বভাবতই যখন এই রবিস্নেহধন্য দম্পতির প্রথম সন্তানের জন্ম হয়, তাঁরা গুরুদেবকে তার নাম রাখার আবেদন জানান। কবিগুরু নবজাতিকার নাম রাখেন– নবনীতা।

এ নামকরণের পেছনে দুটো কারণ ছিলো। প্রথমত, মেয়েটা হয়েছিলো ফর্সা, গোলগাল নবনী বা মাখনের দলার মতো। দ্বিতীয়ত, তাঁর মা নতুন করে পরিণীতা হওয়ার মাধ্যমে এই পুত্রীটিকে তাঁর কোলে এনেছিলেন। তাই এ মেয়ের নাম হলো নবনীতা।

কাহিনিটা কোথায় শুনেছিলাম বা পড়েছিলাম মনে নেই, কিন্তু ওটা মনে গেঁথে আছে। অনেক আড্ডায়, আসরে আমি গল্পটা বলেছি। কারণ দেশ বা অমৃতে বা কৃত্তিবাসে বা অন্য কোনো কাগজে নবনীতা দেব সেনের নতুন লেখা (প্রধানত রম্যস্বাদের রচনা, মধুর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মিশেলে), কিংবা তাঁর জীবনে নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বিয়ে আর বিচ্ছেদের ট্র্যাজেডি প্রভৃতি নানা উপলক্ষে এই সুখ্যাত লেখিকা প্রায়ই আমাদের সাহিত্য আড্ডা-আসরে আলোচনার উপজীব্য হয়ে থাকতেন।

জন্মসূত্রে ছিলেন নবনীতা দেব, অমর্ত্য সেনের সঙ্গে বিয়ের পর হলেন নবনীতা দেব সেন। তবে নোবেল জিতে অমর্ত্যবাবু তো লাইমলাইটে এলেন সেদিন! আমরা আকৈশোর যাঁকে চিনি, যাঁর সাহিত্যসুধা পান করে আসছি, যিনি সবসময়েই আমাদের একান্ত প্রিয়জন, কাছের মানুষ, আত্মার আত্মীয় বলে আমরা অনেক দূর থেকেও মনে করি, তিনি নবনীতা দেব সেন।

এরকম একজন মহিলার সঙ্গে কেন সংসার করতে পারলেন না অমর্ত্যবাবু, সেটা ছিলো আমাদের কাছে গভীর বিস্ময়ের বিষয়। দুটো কন্যাসহ তাঁকে একলা ফেলে ক্যারিয়ারের পেছনে অমর্ত্য সেনের চলে যাওয়াটা আমরা– নবনীতার ভক্ত-অনুরাগীরা– কখনোই ক্ষমা করতে পারি নি।

ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও যে মধুর হতে পারে, সেটা আমরা নবনীতা দেব সেনের লেখায় পেয়েছি। এতে যাকে ব্যঙ্গ করা হলো তাঁর শিক্ষা হবে বটে, কিন্তু তিনি ক্রুদ্ধ হবেন না। মানুষকে না রাগিয়ে ঠাট্টাচ্ছলে শিক্ষা দেয়ার কৌশল আমরা নবনীতা দেব সেনের কাছেই শিখেছি।

আজীবন ভুগেছেন ক্রনিক হাঁপানিতে। তার মধ্যেই অধ্যাপনা, গবেষণা, সাহিত্যসেবা, দুই মেয়েকে মানুষ করার সব হ্যাপা নিজেই সামলেছেন। সাহিত্যকর্মের জন্যে পদ্মশ্রী, সাহিত্য আকাদেমিসহ পুরস্কার, সম্মান, স্বীকৃতিও পেয়েছেন ঢের। এখন গানের পালা শেষ করে দিয়ে চলে গেলেন অনেক দূরে। পরিণত বয়সেই গেলেন। এটাকে অকালমৃত্যু বলবো না, তবে বড় অপ্রত্যাশিত, আকস্মিক মৃত্যু।

নবোদিত সূর্যের মতো বিরাট অরুণরাঙা টিপ পরা সদাহাস্যমুখটি চিরদিন জেগে থাকবে আমাদের মনের আকাশে। আমাদের শেষ প্রণাম গ্রহণ করুন, নবনীতা দেব সেন– প্রিয় কথাশিল্পী, প্রিয়তর মানুষ।