কাজ শেষে গার্মেন্টস থেকে লাইন ধরে বের হতে বেশ সময় লাগে। বাইরে বেরিয়ে জিল্লু দেখল সূর্যের আলো নেই, বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করছে, রাস্তার দু’পাশে দাঁড়ানো বিশাল বিশাল বটবৃক্ষের মত বিল্ডিংগুলো। রাস্তায় কোন ফাঁকা জায়গা নেই, ভ্যভু-প্যাঁপু শব্দে চলছে গাড়ি আর গাড়ি। এর মধ্যে ঠেলে-ঠুলে, মাথাগুজে ও বাকা হয়ে মানুষগুলােও হাঁটছে। মানুষের হাটা দেখে জিল্লু বেশ ভয় পেয়েও যায়, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে এই, এই বুঝি গার উপর গাড়ি উঠে পড়ল, কিন্তু না; পু করে অন্য দিকে ঘুরে চলে গেল। জিল্লু যেন হাঁটতেই পারছে না। আসার সময় মুনিয়ার হাত ধরে আসলেও, ফিরে যাওয়ার সময় সে মুনিয়ার হাত ধরে হাঁটতে পারল না, সাবিনার বাম সাইডে কোল ঘেষে হাত ধরে হাঁটতে লাগল। যেই সোজাসুজি গাড়ি আসে সেই সাবিনার কোলের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলতে থাকে। সাবিনা খুব যত্ন করে ছেলেকে নিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। মুনিয়া আরাে জোরে হাঁটে না, সেও যেন জিল্লুকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, হাঁটছে সাবিনার পিছনে| পিছনে। মাঝে মাঝে খিল খিল করে হাসছে আর বলছে, কিল্লায় এত্যা ভয় লাহে?

সাবিনা শান্ত গলায় বলে, কদিন গেলেই আমার ছেলেও তোমার মতো একাই হাইটি যাবিনে।
মুনিয়াও সাবিনার কথায় সমর্থন করে, অয় পিসি, ঠিহই কোইলা, তহন পিছন ধরণ পারুম না।
বস্তি গলির মধ্যে প্রবেশ করে, জিল্লু বুঝতে পারল রাত হয়ে গেছে। সাবিনা হাতের ছােট হ্যান্ডব্যাগ থেকে চাবি বের করে তালাটা খুলল। তাড়াতাড়ি বােতল থেকে কুকারে কেরােসিন ঢেলে দিয়ে ম্যাচের কাটি জেলে শইলতে গুলো ধরিয়ে দেয়। এরপর ওড়নার আঁচলটা টেনে পিঠের উপর দিয়ে, ঘড়া থেকে সকালে রাখা পানি নিয়ে, হাড়ির ভিতর চাল দিয়ে ধুয়ে ফেলল এবং হাড়িটা চুলায় তুলে দিল । জিল্লু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মায়ের ব্যস্ততা দেখছে। এক চিলতে জায়গা ঘরের মধ্যে এই ঘরেই রান্না করতে, খেতে ও ঘুমাতে হয়। রান্নার ব্যস্ততার মধ্যেও সাবিনা বলল,আলু খাটে বােইসু। জিল্লু খাটে পা ঝুলিয়ে বসতে গিয়ে কাইত হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল, ক্লান্ত শরীর, সারাদিন গার্মেন্টসে থেকেই এমন আইলি গিছে। সাবিনা দ্রুত বটিতে তরকারী কুটতে লাগল। পুড়পুড় শব্দে ভাত ফুটছে আর ফ্যান উতলিয়ে উঠছে। জিল্লু হাতের উপর মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে মায়ের রান্না করা দেখছে আর ভাবছে, গ্রামে তাে দাদী আকাতে ভাত রান্দে, আকার মদ্যি খড়ি ঢুকিয়ে দি বইসি বইসি তরকারী কোটে আর মাঝে মাঝে খড়িডা আকার মদ্যি ঠেইলি দেয়। মা’র আকাডায় ভাল, একবার আকা জাললে আর খড়ি ঠেলতি হয় না । এবার জিল্লু উঠে বসতে বসতে বলল, মাগাে দাদীকে তুমার মত একটা আকা কিনে দিলি হয় না? দাদীর রানতি খুব কষ্ট হয়। সাবিনার বুকের ভিতর ধক করে ধাক্কা লাগে। একুন আমি তো পর হয়ি গিছি বাপ? -মনে মনে বলে।
ভাবে, পুরুষ মানুষ দুডো-তিনডি বিয়ে কোইরি নিজ বাড়িতেই থাকে; মেয়িরা একটা ভুল কোরলি শ্বশুর বাড়ি-বাপের বাড়ি দুডোই হারায়, মেয়েদের জীবন তো গাঙের পানির মত, এই আছি- এই নেই, স্রোতের মত। ঠিকানাহীন।

সাবিনা নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে বলে, কামাই কোইরি কিনি দিও, ভাল কোইরি কাজ শিকি নাও; মেলা টাকা বেতন পাবা। কথাগুলো বলে সাবিনা নিজের মধ্যে হারিয়ে যায়, আমার ছেলেডা তো আহাদ আলীর ছেলি-মােবামুন্সীর নাতিছেলি; আমার কুনু দাৰি নাই, আমি তো মেয়ে মানুষ। টুপাফ্যানা, গাঙের পানিতে ভাইসি যায়। সাবিনার চোখে পানি এসে যায়। জিল্লু কি এমন বলে ফেলল যে সাবিনা মনে মনে কষ্ট পেয়ে অতীত- ভবিষ্যৎ ভাবছে?

জিল্লু একটু সামনের দিকে ঝুকে গিয়ে বলে, মা ওরা আমাকে কত টাকা মাইনা দেবে?

সাবিনা শান্ত গলায় বলল, দেবে বাবা, আগে কাজ শেকো। আগ্রহ দেখিয়ে জিল্লু বলে, শিকিচ্ মা; দৌড়ে দৌড়ে টেবিলে কাপড় পাইড়ি দিলাম, কাপড় পাড়া হইয়ি গেলি, মোমিন স্যার মেশিন দিয়া ঘরঘরঘর করে কাপড়ের বিরাট পালাটা কাইটি ফেললো। সাবিনা বুঝলো, কার্টিং মাস্টার আব্দুল মােমিন জিল্লুকে দিয়ে কাপড় টেনে টেবিলে পেড়েছে। সাবিনা তরকারী চুলায় তুলে দিতে দিতে বলল, তুমরা কয়জনে টেনেছ?

-চারজনে মা, দৌড়ে লৌড়ে কান্দে কইরি কাপড় পাড়ার সময় আমার সাত কেউ পাইরলু না। সাবিনা ছেলের কথা শুনে মৃদু হেসে ফেলল, পাইরবি ক্যারাম কইরি? তুমি আমার ছেলে না?

এ গার্মেন্টসে কাজে লাগার পরপরই আব্দুল মোমিন গোয়ালে বাধা মো’ষের মত আড়চোখে সাবিনার দিকে তাকিয়ে থাকে, সাবিনা যেন মুমিনের চোখে শ্যামা ঘাস। তবুও ছেলেকে কাজে সুযােগ করে দেওয়াতে, মধ্য বয়সী কাটিং মাস্টারের প্রতি যেন এক ফোটা করুণা হয় সাবিনার বুকে। সব পুরুষের তাে একই রকম চোখ। রান্না করতে করতে ভাবে আর শরীরের গলার ঘাম মুছে ওড়নার আঁচল দিয়ে।
সাবিনা কড়াইতে তেল দিলে, চড়চড় করে শব্দ হতে থাকে, বাটি থেকে তপ্ত তেলে কুটা তরকারী ঢেলে দেয়, ছাৎ ছাৎ শব্দ হয়। সাবিনার বুকের ভিতর পুড়তে থাকে, একমাত্র অবলম্বন ছেলিডা, ওকি মার কষ্ট বুঝবে? আমার কাছে থাইকবি?

আবার ভাবে, ওর তো পরিচয় আছে, ভিটে আছে, মাটি আছে, বাপ-দাদা আছে; আর আমার দুকুলই হারিয়ি গিছ। চামচ দিয়ে কড়াই এর তরকারি নাড়ে এবং বাম হাত দিয়ে নিজের পরণের ওড়নার আঁচল তুলে চোখ মােছে। বাবা মহসীনের কথা মনে পড়ে যায়। স্কুলের স্যারদের হুকুম শােনে, স্যাররা খুব ভালবাসে। বাবার ভালবাসার কিছু অংশ স্যাররা সাবিনাকে দিত, স্কুলে পড়তে গেলে সাবিনা স্যারের সেই ভালবাসার বিষয়টি টের পেতো।
বিয়ের সময় বিএসসি স্যার প্রতিবাদ করছিল, এত সুন্দরী মেয়িডার বিয়ি দিবা মহসীন? পড়াও, অনেক বড় জাগায় বিয়ে হবে, ভাল জামাই পাবা। কিন্তু বিয়ের বিষয়ে সাবিনার আগ্রহটায় বেশি ছিল, নিজের ইচ্ছায় আহাদ আলীকে বিয়ে করেছিল। ভুলে ভুলে জীবনডায় গেল। বাবার করুণ মুখটা ভেসে ওঠে, কতদিন বাপ-মাকে দেখিনি? কষ্টে মনের ভিতরটা মুছড়ে ওঠে, কোন মুখ নিয়ে গ্রামে যাব? ননদের স্বামীকে ভাগিয়ে আনলাম, সে হারামীও বড় বেইমানী কোইরলু, চইলি গেল ওই কচি ছুড়িকে পাইয়ি, ওর সাতে; আমিই একুন পথহারা।
বাপ-মা, শ্বশুর- শ্বাশুড়ি ; গাঁয়ের মান সম্মান তো আমিই ডুবাইয়িছ্।
সব দোষ নিজের ঘাড়ে চেপে নিয়ে, নিজেকেই সাবিনা অভিশাপ দিতে থাকে মনে মনে। আব্বা ঘুমাইও না, এই ভাত বাইড়ি দিচ্ছি।-জিল্লুকে উদ্দেশ্য করে বলল।
জিল্লুকে পেয়ে সাবিনা যেন পায়ের নিচে মাটি পেয়েছে-ছেলিডা কাছে থাকলি , আমার আর কিছু লাগবি না, ওই আমার সব। ভাত বেড়ে ফ্যানটার সুইচ দিয়ে দেয়, তরকারীর কড়াইটা নামিয়ে বিছানার উপর গামছা পেড়ে তার উপর রেখে দেয়। দ্রুত ঠান্ডা করার জন্য বিছানার উপরই ভাত, তরি-তরকারী রাখল। জিল্লু একটু সরে খাবারগুলাে সামনে নিয়ে বসল। ঘরের কোণায় রাখা টিনের ঘড়া থেকে মগে পানি ঢেলে জিল্লু সামনে রাখে। জিল্লু খাবার জন্য প্রস্তুত হয়, সাবিনাও জিল্লুকে কোলের মধ্যে নিয়ে বসে, খাও বাপ।