ঘোর তীব্র বিন্দুর মতো। ঘুরছে। ঘুরছে এলোমেলো। সরীসৃপের মতো। কোনও বিরাম নেই। অথচ সুস্থ-সুন্দর বিরাম আসুক। ওই বিরাম চিহ্নের ওপর উড়ে এসে বসুক, এক জোড়া শালিক পাখি। কিছু দুরন্ত চড়ুই। রাতের সেই লক্ষ্মীপেঁচা জোড়া। যে দুটো ডানার ওমে আগলে-আগলে রেখেছে এতদিন। রৌদ্র এইসব ঘন বিন্দুগুলির ওপর জগদ্দল পাথরের মতন-ই প্রোথিত হয়ে আছে।

ভাদ্রের প্যাচপেচে গরমের পর মেঘ উঠল আকাশে। মেঘগুলো দৌড়চ্ছে। যেন দল-দল লাগামহীন মোষ। কিছু মোষ শাবক। তোলপাড় করছে আকাশটি। রৌদ্রের মনে হল, এ-বছর উৎসবের আগে, শহর কলকাতা এবার উদাস ও নির্লিপ্ত। ও-বোতল থেকে ঢক ঢক করে কিছুটা জল খেয়ে লক্ষ করল, মুদিয়ালি মোড়ে পিএসসি অফিসের সামনে দীর্ঘ লাইন। একদল অল্প বয়সী ছেলে মেয়ে কল কল করছে। ওদের চোখেমুখে দুরন্ত দৃপ্তি। উছলে পড়ছে। এই এক সময় ছেলেরা মেয়েরা ফ্রী বার্ড। অনেক অনেক লাগামছাড়া, কিন্তু মনে মনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জীবন এখানে শীতের রোদের মতো মিষ্টি ও সাদা পৃষ্ঠার মতো সম্পূর্ণতই খোলা। এই পৃষ্ঠায় তুমি যা খুশি, যখন খুশি, যেমন ইচ্ছে লিখতে পারো। আঁকতে পারো। সাজিয়ে নিতে পারো নিজের মতো করে। অতঃপর, দেখবে গল্পের পরবর্তী অংশটি ইচ্ছে মতো-ই গড়িয়ে যাচ্ছে। হ্যাঁ, নিজস্ব সুরে এবং ছন্দে। মনে করো, তখনই গল্পটি সুন্দর একটি গল্প লিখবে, নিজের পরিধির ভেতর থেকে। তারপর গল্পগুলিকে ছড়িয়েও দেবে নিজস্ব পরিধির-ই ভেতর ও বাইরে। ভোরের রোদ্দুর মেখে কলকাতা জেগে উঠবে, গানের ভেতর থেকে গানান্তরে নেমে যাওয়ার জন্যে।

দুই.
আস্তে-আস্তে নিজেকে ভার শূন্য করছে রৌদ্র। একান্তে নিজের সঙ্গেও কত কথা থাকে। একসময় ভ্রমর বলত, দিনের যে-কোনও একটা সময় অন্তত নিজের সঙ্গে কথা বলা দরকার। নিজেকে ভাঙা দরকার। ভাঙতে-ভাঙতেই তো সত্যিকারের সুন্দরের কাছে পৌঁছতে হবে। এটি খুব সত্যি কথা। দেখবে, এভাবেই মনকে নিজের মুঠির মধ্যে নিয়ে নিয়েছ। সত্যি-সত্যিই সত্যিকারের সুন্দরের কাছে নিজেকে পৌঁছে দিতে পারছ। পৃথিবীতে খারাপ বলে কিছু নেই কিন্তু রৌদ্র। আমরা যেই মুহূর্তে সমস্ত কিছুকে সুন্দরভাবে দেখতে থাকব, ঠিক তখন আর আমাদের কাউকে প্রয়োজন হবে না। এমনকি ছুটতে হবে না, কোনও মাইণ্ড ট্রেনারের কাছে। মন করো, মার্বেল ফ্লোর। এইখানে এক বালতি জল ঢেলে দাও, গড়াতে-গড়াতে চলে যাবে, এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে। ঠিক আবার এই জল শুষে নেয়ার জন্যে ফ্লোরের উপর এক টুকরো স্পঞ্জ রেখে দাও। দেখবে, মুহূর্তে সব জল স্পঞ্জ শুষে নিয়েছে। দেখো, মনের অভ্যন্তরে যেমন তেলতেলে মেঝে দরকার, তেমন-ই দরকার একখণ্ড মোটা স্পঞ্জ। যাতে কোনও কিছু-ই মনে রেখাপাত না করতে পারে। এই মনই কিন্তু সমগ্র শরীরকে পরিচালন করছে। আর খুব মজার ব্যাপারটি হল, মন ছিল বলেই আজও আমাদের স্পর্শ, ক্রোধ ক্ষুধা… আছে। তাই আজও আমরা সাবলীল। নিজের কাছে অন্যের কাছেও। মনের ওপর অনেক জল পড়বে। হতে পারে ওই জল নর্দমার। আবার কখনও পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ। সেগুলি গ্রহণ বা বর্জন করা বা না করার শক্তি নিজেকেই ছিনিয়ে নিয়ে আসতে হবে। আমি বা আমরা একে অপরকে শুধু কিছু সাজেশন দিতে পারি। সেগুলি গ্রহণ বা বর্জন করা না করা আমাদের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু লড়ে যুদ্ধ জয় করে ফিরতে কিন্তু আমাদেরই হবে। জেতো। হাততালি দেওয়ার লোকের অভাব হবে না। তবে যুদ্ধ না করে হেরে যাওয়া একজন যোদ্ধার কাজ নয়।

রৌদ্র আকাশের দিকে তাকালো। কখন ওই দুরন্ত মেঘগুলো কেটে গেছে। এই তো ঝলমলে রোদ তেজস্ক্রিয়…

তিন.
কতদিন হয়ে গেল ভ্রমরের সঙ্গে দেখা হয় না। সেই ঘটনার পর আর মাত্র একবার মুখোমুখি হয়েছিল ও, ওই বছর মার্চ মাসের ২০ তারিখ। আর দেখা হয়নি। অথচ প্রতিটি মুহূর্ত ওঁর স্পর্শ আজও ভিজিয়ে রেখেছে রৌদ্রকে। কত বছর হল? অনেক? অনেক যুগ? নাকি যুগান্তর? এই গাছহীন জীবনে এক সুদূর নিবাসী গাছ-ই তো আজও রৌদ্রকে দূর থেকে ছায়া দিয়ে যাচ্ছে। শিকড়ে বাকড়ে আগলে আগলে রেখেছে। ও-বলত, দেখো আমাকে হারালে আর শত চেষ্টাতেও ছুঁতে পারবে না। হাজারো চেষ্টা করে আর পৌঁছতে পারবে না এ-মনের ভেতর। সুতরাং…। সেই রাত আজও মনে ঢেউ তোলে। ভাঙা কাঁচ জোড়া লাগালেও দাগ কিন্তু থেকে যাবে রৌদ্র। বিহ্বল রৌদ্র বলেছিল, থাকবে না। দেখো। আর একটিবার… প্লিজ…। নিষ্ঠুরের একগাল বিষাদ হাসি হেসে ও-বলল, না। একদম না। এখন আমি নিজেকে যে জায়গায় স্থাপন করেছি ; সেখান থেকে তোমার আমার ভেতর ব্যবধান অনেক। এইখান থেকে কেউ আমাকে নামাতে পারবে না। তুমিও চেষ্টা করো না। পারবে না। শুধু সময় নষ্ট হবে। লাভ হবে না। বরং আমাদের মধ্যে সজীব সৌন্দর্যগুলি বিপন্ন ও নির্লিপ্ত হয়ে যাবে। এই ঘটনার পর রাতের পর রাত হাউ হাউ করে কেঁদেছে রৌদ্র। আর বাইরে পড়ে থেকেছে রঙিন অ্যাপ্রোন। তুষের আগুনের মতো ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে। ভ্রমর আর কোনও যোগাযোগ রাখেনি। রৌদ্র গঙ্গোপাধ্যায় নামে একজন তরুণকে জীবন্ত মৃত বানিয়ে এই পৃথিবীর বুকে বেওয়ারিশ বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। তবু রৌদ্র নিজেকে প্রোথিত করে রেখেছে এই একটি বিন্দুতেই। ধ্যানে, অনুধ্যানে। যে-কোনও জটিল মুহূর্তে যে কোন-ও আনন্দ বাতায়নে চোখ দুটি বন্ধ করে রৌদ্র দুঃখ ও আনন্দ সংবাদটি প্রথমে একজনকেই দেয় আজও। দেখে উজ্জ্বল দৃপ্ত মুখখানি। দক্ষিণের জানালা দিয়ে মৃদু উন্মুক্ত বাতাস এসে ভ্রমরের মুখের ওপর আছড়ে পড়ে। তারপর পরম বিশ্বস্ত হাসিটি ফুটে ওঠে ঠোঁটের কোণে। ভরসার হাতটি রাখে কাঁধে। তারপর চোখে চোখ রেখে বলে, চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

চার.
রাত গভীর হল। ইদানীং ভালো ঘুম হয় না রৌদ্রর। কখনও সামান্য চোখের পাতা লেগে আসলে ছেঁড়া-ছেঁড়া স্বপ্নগুলো হিংস্র জন্তুর মতো তাড়া করে। কখনও প্রখর হয়ে ওঠে জন্তুগুলির আদল। ছাদে উঠে এল রৌদ্র। রাতের ছাদে অদ্ভুত রোমাঞ্চ থাকে। এই এক সময় নিজের কাছে নিজেকে অবলীলাক্রমে উন্মুক্ত করে দেয়া যায়। এখন অন্ধকার আর গাছপালাগুলো গাঢ় একটি চাদরের মতো মনে হচ্ছে। এই এক সময়, নিজেকে খোদাই করার। রৌদ্র জানে, যে-কোনওভাবে নিজেকে খোদাই করে পুনর্গঠন না করা পর্যন্ত তার বিরাম নেই। বিলাস নেই। কিছু নেই। আসলে একটি মানুষ ততক্ষণ পর্যন্তই সম্পূর্ণ নন কখনও-ই।

শিহরণ খেলে গেল সমস্ত শরীরে। মানুষের ভাবনার জগত কত বিস্তৃত। একজন মানুষ চাইলেই মুহূর্তে বিশ্ব ভ্রমণ করতে পারেন, রৌদ্র ভাবল। সকলে ঘুমিয়ে পড়লে ছাদের এইখানে এসে নিজেকে খুলে দেখার মধ্যে কি যে আনন্দ! কী যে উন্মাদনা! এই তো এক্ষুনি রাতজাগা পাখিগুলি ডেকে উঠল। কি অপূর্ব ধ্বনি। তরঙ্গ। সুগন্ধি। সুরের ওঠা-নামা। যেন কেউ বলতে চাইল, আমি জেগে আছি। এইবার গুহাটির মধ্যে নেমে পড়। তারপর ডানাগুলি পরে পৌঁছে যাও প্রিয় গন্তব্য অভিমুখে। অতঃপর পরম নিশ্চিন্তে ক্রমশ নিজেকে আলগা করতে থাকে রৌদ্র। বৈদ্যুতিক স্পর্শ পাওয়ার মতো ও-কাঁপতে থাকল। ওর সামনে খুলে গেল সিঁড়ির একেকটি মুখ। ও-দেখতে পাচ্ছে, দূরে অনেক দূরে একটি লাল রঙের বাড়িতে রাত বাতি জ্বলছে। সারা ঘরময় হলুদ রঙের আলো। চুম্বকের মতো আলোটি ওঁকে টানছে ক্রমশ-ই। তীব্র সেই স্পর্শ। এক অপূর্ণ শূন্য থেকে পূর্ণের মধ্যে রৌদ্রকে জড়িয়ে নিচ্ছে তীব্রভাবে। এক প্রাচীন দাগ অপার স্নিগ্ধতার মধ্যিখানে দ্রবীভূত হয়ে যাচ্ছে বিস্ময়হীনভাবে। আর সেই দ্রবণের ভেতর একজোড়া ছায়ামূর্তি নিজেদের বেঁধে-বেঁধে নিচ্ছে একে অপরের সঙ্গে। আদিম উল্লাস ও ব্যাকরণ ভাঙার দুরন্ত উন্মাদনা আজ ওদের গভীরভাবে পেয়ে বসেছে।