যে এঁদো ডোবা অনেকটা মন খারাপ নিয়ে বেঁচে থাকার যাবতীয় আয়াজন করে- তার পাশ দিয়েই আমার যাতায়াত। এ নিয়ে আমার প্রাপ্তির শেষ নেই। সেখানে রাস্তা নিয়ে ঝগডাঝাটি; কে কার জায়গা দিয়ে হাঁটে। তারপর মাটি ধসে যাওয়ার ভয়ে শব্দহীন পা ফেলা, মাঝে মাঝে ব্যাঙের লাফে চমকে উঠি। ভাবি, এরাই আমার স্বজন, এদের সাথেই আমার আত্মীয়তা।

আমি পুকুরের পাড়ে বসে আছি। জলের উপরিতলে বিলি কাটছি ঝরা শিরীষ ফুলের মতো। মমতার হাতখানি যেমন ভরসা দেয় ফুসফুস চালু রাখার- তেমনি থিতিয়ে পড়া উদার বক্ষ ঝকঝক করে- সাঁতার কাটে- জলের স্তর ছাড়িয়ে বাতাসে- বাতাসের এলোমেলো খেয়ালে। তারপর বেড়ার ফাঁক দিয়ে সেই চোখ- সেই আমন্ত্রণ; বিমর্ষ বেদনার সুর।

প্রথম সারিতে ছিলাম না কখনও। কোন ঋতুকাল আমায় পথ বলে দেয় নি। ফলে মঞ্চের সামনের রঙিন আলোর রোশনাই’এর হাড় পাঁজর তেমন দেখতে পাইনি কোনো দিনও। কোনা বাধা ছিল না এই হুল্লোড় সময়, হাতাহাতি করে দখল নেওয়া যেত চাকু হাতে নিয়ে, কিংবা জোর করে চাপানো কথার ফুলঝুরি, কিন্তু ওই যে- পানকৌড়ির ভেজা ডানা কখনও সহ্য করেনি কোনা দামামা। শুনতেও চায়নি কোনা দিন। আমাদের ছিল পিপাসা জড়ানো মধ্যবর্তী সোহাগ। সে সকাল হলেই বেরিয়ে পড়ে মাঠে, চাষ জমির ভিতে কাটবে, আগাছা তুলতে তুলতে পান করবে ভাঁড়ের জল। মাটিতে শুইয়ে দেবে শরীর।

সেদিনের জন্য যতটুকু তরল হাসির ঘাম- ভুরু পল্লবের সরলরেখায় ভরিয়ে দেবে ক্লান্তির হরষ। সে সব নিয়ে ভাবনার অবকাশ দেয় নি এই অস্থির গুমোট। কোনো ধুপকাঠি ছিল না আমাদের। ছিল না বললে ভুল হবে, প্রত্যেকের তা নিজস্ব ধুপকাঠি থাকেই, তাকে জ্বালাবার মতো বেল ফুল ঝরে পড়া চাই। সেই বেল ফুলের পরিবর্তে পথে ছেঁড়া পালক, ভেসে আসে কোনো চেনা সুর; একতারা। ঋতুর কায়দায় কেবল পৃষ্ঠাময় দুঃখ ধারনের জ্বরা। মুহূর্তে জন্ম নেয়া পীড়ণ শুধু নিজেকে নয়- একটা রাষ্ট্রকেও ক্ষয় করে দিতে পারে। তবু বিলোপ নেই। মোহিনীরা অমৃতের কলস দেখিয়ে দেখিয়ে মিলিয়ে গেছে ক্ষমতা দখলের মোহে।

যেমন করে চাতালে পা রাখতে পারছে না কোন জল হাঁসের লিপ্তপদ, বয়ে বেড়াচ্ছে চোখের মধ্যে স্বপ্নদোষের অস্থিরতা। আগুন গা’য়ের পীড়িত ফনাগুলি শেওলা নিয়ে এক একটা অভ্যাসের কাছে উপড়ে ফেলে সম্পর্ক। অবশ্য কষ্ট তো আছেই। ডাবের জল, গন্ধরাজ লেবুর সর ভাসানো সরবত। এই টানটা এপাড়া ওপাড়া থেকে দক্ষিণ পাড়া পর্যন্ত শ্রমিক মৌমাছির সাথে উড়ে বেড়ায়। সেখানে পূর্বজন্মের ছাউনির নিচে সমুদ্র দেখা মানুষও জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যেতে যেতে রাখাল বন্ধুর গান করে। হয়তো ভয় জয় করা সহজ নয়, হয়তো কেনো- শীতকাল কিংবা গ্রীষ্মকাল তার সঙ্গে আমার কোনো যৌন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, সে জন্য আমি কিছুই নই- কেন, সেটাও সঠিক ভাবে বলতে পারি না । পারি না তা কোনো কিছু জয় করতে, তাই শেষের সারিতে বসে দেখতে থাকি। বুকে চকের গুঁড়ো মেখে ভুতরূপী মানুষের নন্দী ভৃঙ্গি নৃত্য, আর ভয়ে সেঁটিয়ে যাই।

বস্তুত: কিছু বলার থাকলে বলতে পারি, জল তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ , বাক্যগুলো শুনেই আশেপাশে দাঁড়ানো মানুষজন আমার দিকে বিষ্ময়ে তাকাবেই। আমাদের সময় তা সত্যি আর গভীর ঘুমে নেই কেউ, হতে পারে ঘুমপাড়ানো ঔষধ দিয়ে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে মাত্র, তবুও আমাদের নীল সবুজ ধূসর গঞ্জে নিতাই এর চা দোকান, তার পাশে আমাদের জীবদ্দশা, ধান চুরির পর বক্ষদেশের আঁচল আলগা করে পথের চোখগুলোকে ইঙ্গিত বিলিয়ে দেয়, চোখে চোখে জানতে চায় তার স্তন দুটো কত বড়, মসৃণ পাথরের কাছে উরু জয়লাভ করবে কিনা। সেই সব সরব ছায়ার কাছে উদ্দাম সমর্পণ আর আবেগের কদম তলায় ফের দোকান নিয়ে বসেছে সে, কিংবা কেবলমাত্র তৃষ্ণা নিবারণের জন্য স্বামীর অক্ষমতা থেকে পালায় অন্য কারও হাঙ্গামায়। দেদার মর্মকথা হারিয়ে নিভৃত কালবৈশাখীর জন্য বাস ধরে সেই বউটি। সবাই জানে সেকথা, বোঝেও- ভাইরাল হয়ে যাওয়া প্রবল সঙ্গমে কেঁপে ওঠে তিন মাথার মাড়ে। কদিন ভেবেছি একবার না হয় বলি,
‘সবই পরখ করে পিপার্সাত রেখা, অখ্যাত কোনো
নারীর মতো ফেরি হয় কৃষ্ণচুড়া ধারাপাত
স্তব্ধ গ্রামের পর কালেভদ্রে উৎসবের দিন
গুজবের উপচার ছড়িয়ে দেয়
নিজস্ব উঠোনে।’
মিশে যাচ্ছে সব- এই কোলাহলের মাঝে সব শব্দহীন। কারন সাইকেলের চেনটাতে তেল না দিয়ে পাল্টে দিতে থাকে চিত্তদার মেকানিক ছেলে।

এই সমস্তকেই জার্নি বলা যায়; সম্পর্কের সাথে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়তে থাকে রোমান্টিক দৃষ্টি, শৈশব যৌবন এমনকি অজানা মধ্যরাতও ছলাৎ করে ওঠে; কত দুর্ঘটনার মাঝে বটের ঝুরি এখনো হাওয়ায় দুলতে থাকে। সেক্ষেত্রে আমার মতো ভীতু- মুখ লুকানো একটা মানুষ সমস্ত মাস তিথির ক্যলেন্ডার নিয়ে অপচয় করে চলেছি বেদনা-ব্যথা-সময়-স্বাস্থ্য। আহম্মকের মতো উপেক্ষা করে চলেছি সদ্য পিচ রাস্তার ধারে গজিয়ে ওঠা ধাবা। কেবল, প্লাস্টিকের জারে ভরা নুন ঝাল রসুনের আচার। আকাশ আড়াল করা হোর্ডিঙের বড় বড় অক্ষর সাজানো সব ভালো ভালো কথা। জ্বলজ্বল করছে দুন্ধুভি। ঘোলাটে নীল চোখে তাকিয়ে থাকে যুগ্মতার অভিনয়। হাতছানি দিচ্ছে রাস্তায় সমান্তরাল দাগ কেটে এগিয়ে যাওয়া ইজ্জত রক্ষার চ্যাঁচানি। কত না সম্মুখ ভাগ নিয়ে উত্তর পাদের ভালো থাকার জীবন। আর সব কিছুর মাঝে শনশন গাছতলা।

আমরা কি এতই খারাপ ? কেন ভবিষ্যতের পূর্বেই একটা আস্ত চন্দ্রবিন্দু ঝুলিয়ে দেয় আমাদেরই আ-কার ই-কার উ-কার ভোটের কল। তবুও নিজস্ব ধংসের এই অসময়ের কাছে চিং হয়ে শুয়ে থাকার সুখটুকু অনুভব করি। আমার তো দেবার মতো কিছু নেই- শব্দহীন ব্লাকবোর্ড মুছতে মুছতে জানতে ইচ্ছে করে- আমি তো কবিতার মতো নই- একটা নির্ভেজাল ভিটে মাটি, তার চারদিকে চারটি নিমের গাছ, আর পেটে হলুদ লেজে হলুদ নিয়ে সুখ পাখিটি কখনও একা কখনও জোড় বেধে ঘুরে বেড়ায়। অন্তহীন পথচলা শুরু হয় আমাদের। প্রত্যেকটি স্বপ্নমুখী পথ কবিতার দিকে চলে যায়। নির্বিকার চোখ জেগে থাকে এটা দ্বীপের মাঝে। তারপর কত রকমের বৃক্ষ। আমি শুয়ে আছি আকাশের নীল বাহুতে, তার সাথেই আমার নির্জনতা বেশি। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর পেরিয়ে ভর সন্ধ্যায়ও আমার কোনো আক্ষেপ নেই। আরও অতল ডেকে নিচ্ছে আমাকে- আমার শরীরকে।

শেষ পর্যন্ত পা দুটোকে জলে ডুবিয়ে রাখি। এক প্রকার শীতল পরশ স্নায়ু বেয়ে উঠে যাচ্ছে হাঁটু কোমর বুক গলা এমনকি মাথার দিকে। প্রচণ্ড ভারী এই শরীর, তবুও বৃক্ষ নাড়াচাড়া করছে, তাদের নাম কেউ বনমালী কেউ যামিনী। আমার ঠাকুর্দা আমার ঠাকুমা। সমস্ত অতীত কথা বন্ধ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি আবারও আকাশ জড়িয়ে ধরতে চাই। ছায়া ঘেরা এই বিশ্বাসের কিনারায় এ আমার দখিনা বাতাস। কে আমি ? কয়েক গুচ্ছ দীর্ঘশ্বাস কাশফুলের মতো নড়তে থাকে বাতাসে। এভাবেই চলতে থাকে অভিষেক-অনাসক্তি-হতচেতনা। নক্ষরা দূর থেকে জেগে ওঠে আকাশের ভাঁজ থেকে নিজেকে সনাক্তকরা এই গুঁড়ো গুঁড়ো অন্ধকার থেকেই শুরু হয় অনন্তের পথচলা।