‘কতা কও না ক্যালা? খালি চ্যাগায় আচো, ঐ মিয়া নাম ভি কইবার পারো না?‘
হাফিজুদ্দি’র কাগুজে নাম হাফিজ উদ্দিন, না হাফিজুর- তার খেয়াল পড়ে না। পানরসরাঙ্গা দাঁত আর বিড়ির গন্ধ ও আঁচে পোড়া পীতরঙ্গা ঠোঁট দেখিয়ে, মিঠা করে হেসে, গুরু ভাইয়ের কাছে মিঠা করে অজ্ঞতা জানায়। গুরু ভাই দরদী আদমি আছে। রাগলেও তা সহজেই জলবৎ গড়িয়ে পড়ে। হাফিজুদ্দি’র বেকুবি দেখে ফ্যাঁচ করে হেসে পরমূহুর্তে তার পিলে চমকে অট্ট হাসে- লালাভেজা গোলাপ রঙ্গের আলজিভটা দেখা যায়- সাথে চর্বিত পানের ভগ্নাংশ সহযোগে পোকা খাওয়া দাঁতের ভাঙ্গন। হাফিজুদ্দি চেয়ে থাকে নিমেষ। তার জড়তা ভেঙ্গে আসে। তার ভয় করে- না জানি মশা-মাছি ঢোকে। খানিক বাদে মুখের ঝাপ দন্ধ হয়। গুরু ভাই কোমর সোজা আয়েশি বসে।
‘ ঘর বাড়ি আছে নি?‘
প্রশ্নের তালে গুরু ভাই লুঙ্গির তলায় হাত চুবিয়ে রাকঢাক করে গোপনাঙ্গে চুলকিয়ে গোপন পুলক পায়। পুলকের ঠ্যালায় তার ঠোঁট-মুখ হালকা মুদিত হয়ে বেঁকে আসে।
‘অংপুরোত ভাই, গঙ্গাচড়া।‘
‘কাগজ পরিচয় তো কিচু আনো নাইকা! তোমারে ক্যামনে রিসকা দেই, কও দেহি?‘ গুরু ভাইয়ের মুখে চিন্তা নামে। চোখে প্রশ্ন নাচে। নাচের উত্তরে বেকুব হাফিজুদ্দি’র আবার দাঁত কেলিয়ে আসে।

সেই থেকে হাফিজুদ্দি রিকসার প্যাডেল চাপে। টুং টুং ঘন্টি বাজায়। মোহাম্মাদপুর যায়- মতিঝিল যায়- শাহবাগের মোড়ে ঠ্যাঁঙের উপড় পা তুলে, পান বিড়ি খেয়ে, মুখ গহবর লাল করে তোলে আর সখিনার গান গায়। যদিও তার বউ হয় ময়না। তার জন্য ঘরে অন্য গান, গান না বলে ছন্দোবদ্ধ ছড়া বলা চলে-
হালুয়া দাদার গরু, নাদে সরু সরু,
ময়না মোর ময়না, মিচা কতা কয়না।
ময়নার তাতেই দিলখুশ। তার সংসার ঘরামীতে ও আল্লার অনুদানে ছোট্ট পুতুল ময়না আসে। টিনের ভাপের তলায়- বয়স্ক মাঝারি উচ্চতার টেবিল ফ্যানের ঘটঘট সুরে- ছেঁড়া লুঙ্গির ন্যাকড়ায় চিৎপাৎ হয়। সুখের লালিত্যে হাফিজুদ্দি-ময়না যুগল দোল খায়। বুকে পিঠে শিশু পুতুলের আদর মেখে দিন-রাত গুজার করে। দিনপঞ্জির পাতার দিন, মাস, বছর উল্টে এলে হাফিজুদ্দি’র চুল-দাঁড়ি পাঁক ধরে- দাঁত ক্ষয়ে গাল তুবড়ে আসে। বয়সের বলিরেখা তারুণ্যের খাতা থেকে নাম কেটে দেয়। ততোদিনে হাফিজুদ্দি’র প্যাডেল চাপা রিকসার পিঠে রাঙ্গা হয় পুতুল-ময়না পরিবহন, প্রোপ্রাইটর …।
গুরু ভাই আর হাফিজুদ্দি’র মধ্যে ব্যস্ততা ব্যবধান তুলে রাখে, আলগোছে, অজ্ঞাতে।

ছোট্ট পুতুল ময়না নড়বড়ে পায়ে দাপায়- যেন দৌড়াতে চায়। কোমল ডানার মতো নরোম হাত ঝাপটায়- যেন উড়তে চায়। সারাদিন কিচকিচ-কিচিরমিচির করে বাপ-মা ডাকে, আবার অদেখা দাদারে ডাকে। দাদীরেও ডাকে দেখি। আবার, ডাকতে ডাকতে হঠাৎ একদিন নিউমোনিয়ার ডানা গজিয়ে আল্লার কাছে উড়াল দেয়। ময়নারে বোবা ধরে থাকে। তার মুখে কথা ফোটে না।
দিনপঞ্জির পাতার মাস, বছর উল্টে, আরো উল্টে এলে হাফিজুদ্দি কোন এক ধুম বৃষ্টির হাঁটু পানির চোরা আবদ্ধতায়, নয় নম্বর- ছয় নম্বর বাসের চিপা আদরে পড়ে চ্যাগায় যায়। ফলাফলে, কার্যতঃ হাফিজুদ্দি অথবা হাফিজ উদ্দিন অথবা হাফিজুর অথর্ব গণনা হয়। সংসারে ভুত নাম- ভুতে কিলায়।

‘কও কি মিয়া, হেই লাইগা তোমার পাত্তা নাই! একটা খবর ভি দিবার পারতা!’
আধা বিকল হাফিজুদ্দি’র চোখে পিচুটির সাথে জল জমে ওঠে। গুরু ভাইয়ের ঘরের খাটের গোরায় পিঠ সোজা কাঠের চেয়ারে বসে শরীরে মৃদু মৃদু জ্বর কাঁপন তোলে। দরদী গুরু ভাই বৃদ্ধ বয়েসী বন্ধুসম হাফিজুদ্দি’র কষ্টে ভিজে আসে। গুরু ভাইয়েরও দিন পড়ে গেছে। জোয়ান বউ সব নিয়ে সটকে পরেছে পর পুরুষে। প্রথমা পড়ন্ত যৌবনা স্থূলদেহী বউয়ের আচঁলে আবার ভগ্ন দশার সংসার টুংটুং-ঝুনঝুন ম্লান বাজে। চকবাজারের এই গলিতে সবার দরদী নিঃসন্তান গুরু ভাই ব্যবসা গুটিয়ে পুতুলের মতো উড়াল দেবার ক্ষণ গোনে।
‘তয়, এহন কি করবার চাও? আর তো কোনকালে প্যাডেল মারতে পারবানা মনে কয়?’
মৃদু মৃদু জ্বর কাঁপন কান্নার রূপ ধরে পাল্টে যায় । বরাবরের বেকুব হাফিজুদ্দি অসহায় পুরুষ মানুষী কান্নায় হাউমাউ করে।

‘আও, তোমারে একখান বুদ্ধি দেই, একখান জিনিস দেখাই।’
বুদ্ধি পেয়ে, জিনিস দেখে, হাফিজুদ্দি’র ভাঙ্গা পায়ে জোর ফেরে। হাফিজুদ্দি’র মনে হয় গুরু ভাই- আসলেই গুরু ভাই। মনে হয় এই মানুষটা তার চেয়েও কষ্টে আছে। গুরু ভাই আসলে একটা ওঝা- সংসারে ভুত এবার নামবে …।

হাফিজুদ্দি দোমড়ানো রিকসার ভাঙ্গারি ধোলাইখালে দিয়ে ঘসঘসে পাঁচ হাজার দুইশ পায়। ত্যাল-নুন-ঔষধ ত্রয়ী আর ঝুপরীর ভাড়ায় দুই হাজার যায়। পাঁচ হাজার দুইশ থেকে দুই হাজার বাদ দিলে হাতে থাকে তিন হাজার দুই। সেই ফলাফল হাতে নিয়ে গুরু ভাইয়ের মুখে ধরে। গুরু ভাই চমকায়- বেকুবের বেকুবিতে বিরক্ত হয়।
‘ ট্যাকা দেও ক্যালা, মিয়া?’
‘থোন ক্যানে গুরু।’
‘তোমার কাচে রাইখ্যা দ্যাও, ওষুধ-পথ্যি করো। আজই পারলে কামে লাগো, কেউ য্যান টের না পায় তোমার না। কাম শ্যাষে আবার লইয়া আইবা। পরে ঠিকানা পাল্টাইলে লইয়া যাইয়ো। খাওয়াইয়ো, নিজে খাইয়ো, একশতে বিশ তার জন্য জমাইয়ো।’
‘তোমা যা কন, সেটাই করিম গুরু!’ কথার তলে তলে সরল লাভের নিয়মে একশতে বিশ, পাঁচশতে কত আর হাজারে কত সেটাই ভাবে হাফিজুদ্দি।

‘কিচু কইবার চাও?’ ঘাড় ঘুরিয়ে হাফিজুদ্দি’র উপর পূর্ণ দৃষ্টি ম্যালে গুরু।
‘গুরু বড়টা দ্যাও কেনে মোক?’ হাফিজুদ্দি’র চাহিদায় গুরু একটু বুঝি থমকায়। বেকুব হাফিজুদ্দি কিভাবে যেন গুরুর খোলা দিল পড়ে ফেলে। প্রশ্নের উত্তরে আরেকটা প্রশ্নের বেকুবীতে তাই ভ্যাবাচ্যাকা গোছের; আগের উত্তরের পিঠে আরেকটা সহজপ্রাপ্ত উত্তর দাঁড় করে।
‘তোমা পছন করি দ্যাও গুরু। তোমা ভাল বোঝেন।’ হাফিজুদ্দি’র চমকানোটা গুরু টের পায়, মাগার উপভোগ করে না।
‘ব্যাকাডারে লইয়া যাও। ইনকাম মন্দ হইবাও না কইতাছি। কাইল তোমার লাইগা একটা হুইল চেয়ার আনমুনে, মাগার ট্যাকা দেওন লাগবো। আইজ যেইডা আচে সেইডাই লইয়া যাও।’
‘আচ্চা, এলায় নেও ক্যা!’ বলে- খানিক বিবেচনা করে – খানিক থেমে বেকুব হাফিজুদ্দি টাকা গুরু ভাইয়ের পায়ের কাছে রাখে, অর্ঘ্য দেয়ার মতো। গুরু বেকুবের ভক্তিটা বোঝে, সাগ্রহে গায়ে মাখে। আবেগি হয়ে খানিকটা ভিজে ওঠে।

ধনুকের মতো ডান পা’টা বেঁকে ওঠানো, বামেরটা তার বিপরীত। হাত ও পিঠ এবং মুখের সর্বত্র একটা বক্রতার খেল জড়িয়ে আছে। মুখে লালা ঝড়িয়ে-পুতুল বয়েসী- হুইল চেয়ারে বসা বিকল মেয়েটি অবুঝ হাসে। হাফিজুদ্দি’র ভিতরে মোচরায়। ‘বাপো রে! কার মাইয়া ছওয়া গো। নুলা দেকি বাপ-মায়ের নাগাল পাইল না।’
‘বড় মাথা ওয়ালা হেরে দিলাম না। বেশিদিন বাঁচবো বইলা মনে হয়না। হেরে আমি পেয়ার করি পোলার লাহান। আহারে! কোন জারজে ডাসবিনে ফাইলা রাখচিলো।’ গুরুর গলাজুড়ে কেমন একটা কাঁপা-ফাঁপা-কাঠ শুকনো অনুভূতি আসন করে। স্মৃতির বিষাদ ট্রেনে উঠে গুরু ভাই কষ্টের ঝিকঝিক শোনে। বুক খালি করে দীর্ঘশ্বাস ছোটে। গুরু ভাই এক পাখা ভাঙ্গা পাখির ন্যায়, এক সন্তান হারা আহত বুক চাপড়ে বয়েসি গলা উম্মুক্ত করে কান্না করে- ‘আ হা হা…।’

হাফিজুদ্দি কোন ব্যাস্তবাগিশ ভীরের কেন্দ্রে আহত পায়ের অবশিষ্ট জোরে ভর করে, জংচটা হুইল চেয়ার ক্যাঁচক্যাঁচ ছন্দপতনে এগিয়ে যায়। তার লুলা পুতুল অসাড় অসহায়ত্বে শুয়ে- দুই বিপরীত ধনুক পায়ের ফাঁকে চিটচিটে প্লাস্টিক বাটি গুঁজে বুজে থাকে। অজস্র শব্দঘাতের মেট্রোশহরের জনাকীর্ণ রাস্তায় নতুন পেশায় নবীশ অসহায় হাফিজুদ্দি বহুল জনশ্রুত কিছু শব্দ অভিনয়ের সাথে তার মুখে রেওয়াজ করে নেয়, ‘দয়া করি সাহায্য করেন….।’