বরিশালের বানারীপাড়া জম্বেদ্বীপ গ্রাম চিরে ভিতরের দিকে আলতা হয়ে কাঁচাবালিয়া ও আটঘর কুড়িয়ানার দিকে চলে গিয়েছে সৌরভ নদী। নদীর দুই পাড়ে রয়েছে লতা-পাতা-ঝোপঝাড়। ঝির গাছ, অশ্বত্থ- শুপারী গাছে নদীর দুই তীর অন্ধকার থাকে সর্বদা। নদীর পানিতে খলাল চিংড়ী, শোল, কৈ, মাগুর, টেংরা, শিলন, পুঁটি, পাবদা, মৃগেল, রয়না, টাকি, ডগরী, বাইম, শরপুটি, রূপচাদা, তেলাপিয়া, বোয়াল, পাঙ্গাশ, চেলা, ডেলা, ফলি, খলসে, পাবদা, রুই ও কাতলার ঝাঁক। বিশেষ করে আলতা গ্রামের গোপের মোড়ে এ মাছ ধরতে সব সময় কেউ-না কেউ থাকেই। ঝাঁকি জাল, বাধা জাল, গড়া, চরগড়া, মৈয়াজাল, কৈজাল, ছাদিজাল কারেন্ট জাল, নৌকাজাল, চাই, ওচা, খলনী, দুচনী, জাউ, বড়শী- এসব দিয়ে প্রতিদিন কয়েকশত লোক কয়েক হাজার কেজি মাছ মারে।
রোস্তম আলী মোল্লা ও তার দশ বছরের নাদুশ-নুদুশ ছেলে সাদেক আলী মোল্লা নিত্যদিনের মতোই সেদিন ঝাঁকি জাল নিয়ে মাছ মারতে মারতে বাস্তকাঠির দিকে যায়। বাস্তকাঠির সমীরন চেয়ারম্যান বাড়ির একটু আগে ছোট একটি থৈলা গাছের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় পেছনে থাকা সাদেক আলী দেখতে পায় গাছে একটি ফেচুয়া পাখি লেজ নাড়ছে আর বলছে ‘আজ তোরা মাছ ধরতে কেনো নামলি। আজ তোদের শ্রম খালে যাবে’। কিশোর সাদেক আলী একটু ভয় পেলেও সাহস হারায়নি দৌঁড়ে গিয়ে সামনের বাবাকে বললে বাবা ফিরে এসে দেখে কিছুই নাই। বাবা ওকে শান্তনা দিয়ে আবার সামনের দিকে আগায়।
জালে একেকটি খেও দিচ্ছে মাছ পাচ্ছে খুশিতে হাতে থাকা সিলভারের জগে ভরছে সাদেক। এভাবে খুশিতে সাদেক আলীর মন ধরে না। চেয়ারম্যান বাড়ির দরজা পেরিয়ে আরেকটু দক্ষিণে ছোট একটি নালার মুখে কতোগুলো হোগলপাতা ও এউলার ঝোঁপে রুস্তম আলী মোল্লা একটি খেও দিলে অনেক মাছ পায়। সাদেক আলী ঘাস-পাতা-কাদা-পেরী-শামুক-লেরী এসব ছাফ করে করে একটি একটি মাছ জগে ভরে। একদম শেষে একটি ছোট পোটকা মাছ দেখে ও অযথাই ভয়ে কুঁকড়ে যায়। পোটকা মাছটি আর দশটি পোটকার মতো নয়। কেমন যেনো ডোরা ডোরা মুখটি হা করা। চোখ বড় বড়। ও বাবাকে ডাকে-
: আব্বা! আব্বা!
: কী অইছে, চেচাও ক্যা!
: দেখো, এই পোটকাডা যেনো কেমন, কেমন…
: কেমন কেমন মানে! মাছতো মাছই!
: না আব্বা এইডা দেইক্কা মোর ডর করে। হালাইয়া দি?
: না না। হালানোর দরকার নাই। লইয়া ল।
ও এতো ছোট একটি পোটকা মাছের প্রতি বাবার লোভ দেখে মনে মনে বাবাকে বকলেও মাছটি জগে রেখে দেয়।
বাপ-ছেলে আরও সামনের দিকে আগায়। আজকে বুঝি ওদের মাছের নেশায় পেয়ে বসেছে। সকাল গড়িয়ে সূর্য কখন ঠিক মাথার উপরে ওরা টেরই পায়নি। মাঝে সাদেক আলী একবার বাবাকে বলেছিলো আব্বা, আইজ অনেক মা অইছে লও বাড়ি ফিররা যাই। রুস্তম আলী ছেলের কথায় কান দেয়নি। হাঁটছেতো হাঁটছেই। হঠাৎ সাদেক আলী খেয়াল করল ওর জগটি যেনো ক্রমে ক্রমে ভারী হচ্ছে। ভারী জিনিস হাতে নিয়ে হাটলে এমান্বয়ে ওজন বাড়তে থাকে- ও এটি জানতো। তাই প্রথমে অতোটা গায়ে মাখেনি। কিন্তু এক পর্যায়ে এসে দেখে জগটি অত্যধিক ভারী হয়ে উঠেছে। ও তাকিয়ে দেখে জগের সেই পোটকা মাছটি ছাড়া আর কোনো মাছ নেই। পোটকা মাছটি বিশাল আকৃতি ধারণ করে পুরো জগের জায়গা দখল করে নিয়েছে। ও জোরে একটি চিৎকার দিয়ে বাবাকে ডাকলো। রুস্তম আলী এসে দেখে এ অবস্থা। রুস্তম আলী এসে ছেলেকে শান্তনা দিয়ে বলে ও তার মানে এই মাছটা সবগুলো খাইয়া প্যাটটা ফুলাইয়া হালাইছে। চল, বাড়ি চল- ভয়ের কিছু নাই।
সাদেক আলী মাছটি ফেলে দিতে চাইলেও রুস্তম আলী না না করে বাড়ি দিকে পথ ধরে। আসার পথে সাদেক আলী সেই গাছের ফেচুয়া পাখিটিকে আবার দেখতে পায়- ওদের দেখেই বলে উঠল ‘এক জনের খাবার আরেকজনে খেতে নাই’। আবার উধাও পাখিটি।
লোভী রুস্তম ছেলের বারণ না শুনে ওটিকে বাড়িতে নিয়ে আসে। সাদেকের মাতো দেখে খুশিতে বাগ বাগ, কত্তবড় পোটকা মাছ। আজ মজা করে খাওয়া যাবে। সে দাও, বটি, হাড়ি-পাতিল, মশলা-তেল, ছাই-লবণ সব কিছু প্রস্তুত করে মাছ কাটতে বসে পরে। তার আনন্দের সীমা নেই। কী তেলতেলে মাছরে বাবা! এতো ভালো মাছতো জীবনেও দেহি নায়। কিন্তু একি! মাছ যতই কাটার চেষ্টা করে মাছ কিছুতেই কাটা যায় না। ছাই দিয়ে ভালোমতো করে ধরেও কোনো লাভ হয়নি। এমনকি আকশি দিয়ে ধরে অনেক চেষ্টা করেও মাছ কাটতে না পেরেও তারা ক্ষান্ত হলো না। মাছ খাবেই খাবে। কিন্তু সাদেক বার বার নিষেধ করে।
সাদেক : আমার মনে হয় মাছডা খাওয়া ঠিক অইবে না।
রুস্তমের স্ত্রী : তুই এতো চিকপাক করছো ক্যান? থাম। নাইলে পিডাইয়া মাইরা হালামু।
রুস্তম : থামতো বাপ তুই এতো ছোড মানু তোর এতো মাতা ব্যাতা ক্যা ।
রুস্তমের স্ত্রী : তুই এহোন থাম।
সাদেক চুপ করে বসে থাকে পাশে।
রুস্তমের স্ত্রী এবার অন্য বুদ্ধি আঁটে। সে বড় পাতিলে লবণ, তেল, পেয়াজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ, সবকিছু মিলিয়ে পানি গরম করে। পানি ফুটলে তাতে বড় পোটকা মাছটি জ্যন্ত ছেড়ে দেয়- এইবার কই যাবা। রুস্তম তার স্ত্রীর বুদ্ধি দেখে কী যে খুশি। কিন্তু বিধিবাম। এবার হলো উল্টো ঘটনা। মাছটিতো মরলোইনা বরং আরো বড় হয়ে হয়ে পুরো পাতিল ভরে গেলো। সমস্ত মসলা খেয়ে ফেললে এবারতো সকলেই অস্থির। ভয়ে কাচুমাচু হয়ে গেলো। সাদেকের মা তো বেহুশ হয়ে গেলো। রুস্তম জোরে জোরে চিৎকার করছিলো। সকলে শুনে ছুটে এলো তাদের বাড়িতে। সকলে আশ্চার্যান্বিত হলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলো।
তাদের একটু দূরেই হাজ্বি সাহেবের বাড়ি। হাজ্বি সাহেবের নাম ছিলো সারা এলাকায় বুজর্গ হিসেবে। একজনের পরামর্শে হাজ্বি সাহেবকে ডেকে আনা হলো। তিনি এসে পানিপড়া দিয়ে সাদেকের মাকে সুস্থ্য করলেন এবং সবকিছু শুনে দেখে বললেন, এটি তোমাদের লোভের ফসল। মাছটি যেখানে পেয়েছ, সেখানেই ফেলে এসো। সাথে জগ এবং পাতিলটি ও ফেলে দিয়ে আসো। নইলে কিন্তু ক্ষতি হয়ে যাবে।
হাজ্বি সাহেবের কথামতো রুস্তম তার ছেলে মাছটি ফেলে দিতে চলে যায়। পথিমধ্যে সেই গাছটিতে এবারও পাখিটি দেখতে পায়। পাখিটি এবার বলে- এঁই বাঁর ঠিঁক কাঁজ কঁরেঁেছা । যাঁও যাঁও। তারা উভয়েই এবার পাখির কথাটিকে শুনতে পায়। তবে বেশী সময় ক্ষেপণ করে না। পাছে আবার কোনো ক্ষতির সম্মূখীন হয়।
ধীরে ধীরে বাপ-ব্যাটা নির্দিষ্ট স্থানে পাতিলসহ মাছটি ফেলে দিলো। জগটিও ফেলে দিলো। এতো পরিশ্রমের, এতো সখের মাছ খেতে না পেরে সাথে এতো দামী জগ ও পাতিল ফেলে দিয়ে দুঃখে রুস্তম দুই ফোঁটা চোখের পানিও ফেলে দিলো নদীতে। মাছসহ পাতিল ও জগ ধীরে ধীরে পানির মধ্যে ডুবছে, এমন সময় ঘটলো অকল্পনীয় ঘটনা। রুস্তম ও সাদেক আলী এগুলো ডোবার দৃশ্য দেখছিলো, হঠাৎ দেখে, সেই পাখিটি অতিদ্রুত পানির মধ্যে ডুব দিযে নিচে চলে যাচ্ছে। ওরা পাখিটির উঠার অপেক্ষায় অনেকক্ষণ থেকেও পাখিটিকে উঠতে না দেখে ফিরো আসলো বাড়ির দিকে। পথে আসার সেই গাছের পাখিটিকে দেখলো। পাখিটি ওদের দেখেই ছড়া কাটলো-
মাঁছ খাঁও মাঁছ খাঁও
ভূঁতেরঁিট ক্যাঁন,
এঁইবাঁর বাঁড়ি গিঁয়ে
খাঁও পঁচাঁ ফ্যাঁন।
ভূঁত ভাঁলো ভূঁত খাঁরাপ
ভূঁত ভঁয়ঙ্কর;
লোঁভ যঁদি নাঁ কঁরো ভাঁই
নাঁই ভঁয়-ডঁর।।
এরপরেও সাদেক অনেকদিন ঐ গাছের তলা দিয়ে আসছে, গিয়েছে কিন্তু আর কোনদিন সে পাখিটির দেখা পায়নি।