একটি অটো রিক্সা ডোমার কাঁচা বাজারে দাঁড়িয়ে আছে। আমি অনুমান করে উঠে বসলাম। ভাবলাম, এটি দেবিগঞ্জ যাবে। আমার দেখা দেখি একটি ছোট মেয়ে উঠে আমার পাশে বসল। মেয়েটি বড়ই মিষ্টি। বয়স পাঁচের কম না হলেও ছয়ের বেশি হবে না। গায়ে ইউনিফর্ম জরানো। স্কন্ধে স্কুলের ব্যাচ। সাথে একজন বরখা পরিহিত মহিলা। মহিলাকে চেনা যাচ্ছেনা। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে মাত্র। তিনি এক পলক আমার চোখে চোখ রেখে পাশাপাশি সিটে উঠে বসল।

শুরু হল যাত্রা। তাসের প্রতিকুলে অটো রিক্সা। আমরা থানা মোড় পেড়িয়ে সোজা দেবিগঞ্জ অভিমুখে। ভ্যাপসা গরম। শ্রান্ত দেহে চুমো খেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে দুষ্ট বাতাস। মূহুর্তে ছুটি পেল দেহ- মন -ক্লান্তি।

আমি প্রকৃতির পানে তাকালাম। সবুজ রঙের ষোড়ষি ধান খেতে বাতাস নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। দূর গগনে চিলের মত সাদা মেঘ রাশি ভেসে বেড়াচ্ছে । হঠাৎ আমার মন টা ধুষর হয়ে উঠল। পাশেই লাল সবুজের পাপড়িতে একটি ফুটন্ত গোলাপ। প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য ছেড়ে মুখ ফিরালাম সে দিকে। সে আমার পাশেই বসে আছে। তার কচি মুখ খানা যেন সদ্য বের হওয়া সবুজ তেল তেলে কলাপাতা। লোভ সামলাতে পারলাম না। মুখ খুললাম। আমি আলত কপোল ছুয়ে ছোট করে বললাম।
“তোর নাম টা কিরে?”

মেয়েটি আমার গলা জরিয়ে ধরে কানের কাছে বলল- “মায়িশা “
“মায়িশা । বড় মিষ্টি নাম তো। “
“ধ্যাৎ, মিষ্টি না ছাই। “
আমার একটা রড় নাম আছে। সেটি আরও মিষ্টি।
“তাই নাকি ? তাহলে ওটাও বলে দাও। “
“না। “
“কেন ?”
“আম্মু এত বড় নাম রেখেছে। তা আমার মনেই নেই ।”
“ও তাই বুঝি ।”

মেয়েটির কথায় মহিলাটি একগাল হাসল। ঠিক আমার চোখে চোখ রেখে। কিন্তু মেয়েটির নাম প্রকাশে তার কোন কৌতুহল চোখে পড়ল না।
এরি মধ্যে দু এক জন যাত্রি উঠে বসল । আবার কেউ নেমেও পড়ল।

আমরা দেবিগঞ্জের অভিমুখে যাচ্ছি। আমি অন্য মনস্কো হয়ে চুপ করে নিরবতার হাত ধরলাম । এরি মধ্যে মেয়েটি আমার গা এলিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি বিরক্ত মনে না করে একটু স্নেহের আদলে মাথায় বিনি কেটে দিলাম। যাতে ঘুমের প্রশান্তি ওর দেহ-মন কে ডুবে নেয়। বুঝলাম মেয়েটি বড়ই ক্লান্ত। বাতাস সহায়তা দিয়ে ওকে শীতল পাটি বিছিয়ে ঘুমের পালকি সাজিয়ে দিল। সে এখন ঘুমন্ত পরী বেশে অন্য দেশের যাত্রী।
মহিলাটির সে দিকে মোটেও লক্ষ্য নেই। তিনি অন্য জগতে ডুবে আছে। ভিতরে তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে তা বুঝতে পারছিনা। তবে কিছু একটা ভাবনায় মজে আছে তা আমার দৃষ্টিকে মোটেও এড়াতে পারল না।

আমি মায়িশা কে ঘুমানোর সুযোগ করে, চুপ চাপ বসে আছি। ভাবছি- মেডিকেলে যাচ্ছি। মেডিকেলের ভ্যাপসা গন্ধে আমার নাড়িভুড়ি বের হবে নাতো ? হলেই বা- কি? আমাকে তো যেতেই হবে। বড় আপু এ যাবত কয়েক বার ফোন দিয়েছে। না বলি কোন মুখে।

অটো রিক্সাটি চিলাই মোড়ে এসে দাঁ।ড়াল। ভদ্র মহিলা এরার নিজের খেয়ালে নেমে পড়ল। তারপর তার হাতের পারস থেকে টাকা বের করতে মনোনিবেশ করল। মায়িশা এখনও আমার গা এলিয়ে ঘুমাচ্ছে। আমি ডাকলাম-
“মায়িশা উঠো। “

এক ডাকে মায়িশার ঘুম ভাংল । সে তার মাকে নামতে দেখে ধরপর করে অটো হতে নেমে পড়ল। ইতিমধ্যে বিল পরিশোধ। আমি মায়িশা কে ফেলে চলে যাচ্ছি। মায়িশা রাস্তা পাড় হতে মায়ের হাত ধরল । অটো চলতে লাগল। মনটা মায়ার বাঁধনে একটু খচ খচ করে উঠল। আমি পিচনে মুখ ফিরে তাকালাম। সেকি মায়িশার মুখে রক্ত-

ভদ্র মহিলা তো হতাস, কিংকর্তব্যবিমুঢ়। আমি তড়াতাড়ি চালককে অটো থামাতে বলে টপকে নামলাম। দৌড়ে গিয়ে মায়িশা কে বুকে জড়ালাম।
“কি হল এর মধ্যে? “
কারও মুখে উত্তর নেই।

মায়িশা হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগল। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ওর মুখ। মায়িশাকে কোলে নিলাম। ও আমার কোলো উঠতে একটুও দ্বিধা করল না। পিতৃ স্নেহের কাছে সে অসহায়। আমি যেন তার কত চেনা জানা আপণ কেউ।

মহিলাটি কি করবে ভেবে কুলাতে পারছেনা। তার চেহারা হতে সমস্ত রক্ত সড়ে গেছে। ঠোঁঠ দুটো শুকে কাঠ। হতাসায় বিহ্বল। চোখের পাঁপড়ি জুড়ে ছল ছল জল। ভাষাহীন চাহনি নিয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে। ততখনে বেশ হৈ চৈ পড়ে লোক জন ছুটে আসতে লাগল।

আমি বললাম- ” উঠুন মায়িশাকে মেডিক্যালে নেয়া যাক। ওর বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। “
মহিলাটি ” না “বলল না।

হৈ হল্লা কে পিচনে ফেলে আমি মায়িশা কে এনে মেডিকেলে ভর্তি করললাম। জরুরী বিভাগের বেডে শুইয়ে দিয়ে ডাক্তার কে ডাকলাম।

ভদ্র মহিলা তার মেয়ের পাশে বসে ছটপট করছে। ডাক্তার এল মায়িশা কে ড্রেসিং করল। মায়িশার উপরের সারির দুটো দাঁত ভেঙ্গে গেছে। তা থেকে তাল তাল রক্ত ছুটে চলছে। ড্রেসিং এর পর রক্ত বন্ধ হল। মায়িশা আমাকে চেপে ধরে জোরে জোরে কাঁদছে। আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে কান্না থামানোর চেষ্টা করছি।

এরি মধ্যে বড় আপুর সাথে আমার দেখা। আপু তো থ হয়ে গেল। ও প্রায় অবাক লাগার মত চোখে ধাঁ ধাঁ খেল। বিস্ময় মাখা কন্ঠে বলে ফেলল- ও কে রে ?
আমি বললাম- “এই ভদ্র মহিলার মেয়ে। এ্যাকসিভেন্ট হয়েছে । “
আপু বলল- ” ওকে ডাক্তার দেখিয়েছিস। “
বললাম- হ্যাঁ
“তাহলে আপাতত আমার বেডে ওকে শুইয়ে দে। “

আমি তাই করলাম। আপু আমার পাশে বসল। ভদ্র মহিলা তখন পা চারি করছে। তাকে হতাশা চঞ্চলতা ও বিষন্নতায় গিলে খেয়েছে। হাব ভাবটা বেশ রুক্ষ দেখাচ্ছে। এক সময় মহিলাটি জানালার পাশে এসে একাকী দাঁড়াল। দৃষ্টিটা দুরে। বাইরের পরিবেশ টা পাখিদের কুজনে বেশ মুখরিত। একটা কাক বিদ্যুত থামে আটকা পড়ে মরে গেছে। তাকে নিয়ে অন্য পাখিদের হৈ চৈ। মহিলাটি তাই অপলক দৃষ্টিতে দেখছে। আপু উঠে বাইরে গেল। মায়িশা চুপচাপ শুয়ে আছে। মাঝে মধ্যে ওর একটু হেচকি মেরে কান্না আসছে । আমি মহিলাটিকে ডাকলাম।
বললাম- “বসুন না। “
মহিলা সংকোচহীন ভাবে আমার পাশে এসে বসল।
বললাম- “ভাইকে ফোন করেছেন ?”
বলল- “না “
বললাম- “ফোন করবেন না। “
বললেন- “ফোন করে কি হবে? সে তো আর আসতে পারবেনা। ও তো দেশের বাইরে থাকে।”

আমি চুপচাপ কান পেতে শুনছি। বলতে বলতে সে একটা দীর্ঘ শ্বাষ ফেলল। যেন তা হৃদয়ের পাজর ভেঙ্গে বেড়িয়ে এল। শ্বাষটি যে কত কষ্টের, আর্তনাদের মৌলিক প্রকাশ, চোখে না দেখলে আমি কখনো তার অসহায়ত্বকে বুঝতে পারতাম না । অনেকটা নিঃসঙ্গতার মূর্ত্য ছবি। পাহাড়ের মত ভারী । তার চোখের কোনে বিন্দু বিন্দু জল। পুরুষের অভাবে নারীরা যে কতটা অসহায়, অসম্পুর্ণ তাকে না দেখে সহজে কেউ বুঝতে পারবে না।
বললাম- ” কত দিন হল ওনার বিদেশে যাওয়ার।”
“বছর পাঁচ তো হবে। মায়িশা তখন ভ্রুন। “
“ময়িশার নাম টা কে রেখেছে?”
“ও নিজেই রেখেছে। “ফোনে জানিয়েছিল।
“ফোনে খোঁজ খবর তো রাখেন, তাহলে? “
“এখন একটু কমে গেছে । প্রায় ছ’ মাস ধরে কোন ফোন আসেনা। “
“আপনি যোগাযোগের চেষ্টা করেন নি ? “
“করেছি। শত শত বার চেষ্টা করেও নাম্বার টা বন্ধই পেয়েছি। “
“এ বিচ্ছেদের বাপারে আপনার কি কোন সন্দেহ হয় ? “

তিনি থেমে গেল। কোন উত্তর দিল না। এড়িয়ে যাওয়ার ছল করে অন্য প্রসঙ্গ ধরল।
বলল- ” আপনার তো পরিচয় পেলাম না? “
আমি বললাম- ” থাক না। এই যে পাশাপাশি বসে গল্প করছি। এর থেকে বড় পরিচয় আর কি হতে পারে ? “
“আপনি আমার জন্য যা করলেন। তাকি-“
আমি বললাম- “এটা মানবতা, সহমর্মিতা।
কারণ, মানুষ তো মানুষের জন্য। তাই না ?”
এরি মধ্যে আপু ফিরে এল। বলল —-” আসাদ তুই এখন যাবি ?”
বললাম- ” হ্যা আপু, অফিসে তাড়া আছে।

মহিলাটি আমার চোখে চোখ রাখল। হঠাৎ আমার মধ্যে কি যেন খুঁজে পেল। তার চোখের দৃষ্টিতে তা বলল।
“আপনি বুঝি চাকরি করেন। “
“ঐ আর কি?”
“এ দেশে অনেক সৌভাগ্যবান পুরুষ আছে। যারা স্ত্রী -সন্তানকে নিয়ে দেশের মাটিতে অর্থ উপার্জন করে বড়ই সুখে আছে। আপনি তাদের মধ্যে মনে হয় এক জন।”
“দোয়া করবেন।”
“অবশ্যই। “
“নিজেকে এতটা অসহায় অর্থহীন ভাবছেন কেন ?”
“যে জীবনের উপর নিত্য অনন্ত খড়রৌদ্র। প্রশান্তির স্বপ্ন ছায়া কি তার মানায়? “
“ধৈর্য্য ধরুন। ধৈর্য্যশীলদের সাথেই আল্লাহ রয়েছেন। “
“নিঃসঙ্গ, একাকীত্ব কি কখনো ধৈর্য্যের বাঁধ মানে।
“তাহলে আপনার জীবন ইমানহীন হবে ان الله مع الصابرين
কোরআনের এ নিদর্শনের সাথে সম্পর্কহীন হবে আপনার আত্না। “
“হয়তো আমার প্রতীতি তাই।”
বলতে বলতে সে বিবেকের পাল্লায় হালকা হয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করল।

আমি ঘন্টা দুই মায়িশার জন্য হাসপাতালে কাটালাম। সময়ের দাবীতে তাড়া বাড়ছে। আমাকে ফিরতে হবে। আপুর সাথে তেমন কথা বলার সুযোগ হল না। এরি মধ্যে ফিরতে হল।
মায়িশা আমার কোলে। গলা জরিয়ে ধরেছে। আমি ওকে নিয়ে আপুর কাছে বিদায় নিলাম।
বললাম- ” আপু, মায়িশাদের অটোতে তুলে দিয়ে আমি চলে যাচ্ছি।”
আপু বলল- ” যাঃ। বাসায় ফিরে ফোন করিস।”

আমি মায়িশা কে একটা অটোতে তুলে দিলাম। মায়িশা আমার হাত চেপে ধরল। আমাকে ছাড়তে ওর কষ্ট হচ্ছে। ভারি কষ্ট। মায়াবী সুরে বলল-
“আপনি আমার সাথে যাবেন না।”
বললাম- ” না, মা। আমি তোমাকে একদিন দেখতে আসব।”
“আসবে তো ।”
“নিশ্চয় আসব মা। “

মায়িশা কাঁদতে লাগল। কি ময়াবী কান্না! ওর কান্না আমার নরম মনটাকে জয় করে বসল। নিজেকে বড় অসহায় মনে হল। সত্যি, পৃথিবী টা কি এক মায়ার আঁচলে বাধা।
মহিলাটি উঠে মায়িশার পাশে বসল। ওকে জরিয়ে ধরে বলল-

“পৃথিবীতে অনেক সাদা মনের মানুষ আছে। তার মধ্যে আপনি বোধ হয় অন্যতম, নয় শ্রেষ্টতম। আপনার মত সহমর্মি মানুষ হয়ত আমার এ ক্ষুদ্র নারী জীবনে আর কাউকে খুজে পাব না। “
মায়িশা বলল- ” মা, ওনি আমার কি হবে ? “
“চাচ্চু “
“চাচ্চু তুমি আসবে তো?
“আসব মা “

অটো ধীরে ধীরে চলতে লাগল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। এক সময় মায়িশা চোখের আড়ালে হাড়িয়ে গেল। কিন্তু আমার হৃদয় থেকে হাড়াল না একটি মুখ আর একটি মায়াবী কন্ঠস্বর। মনের সাগরে সারাক্ষন ঢেউ তুলে নাচল।
“চাচ্চু তুমি আসবে তো? “