বাংলা সংগীতের একটি অমূল্য সম্পদ কবি গোলাম মোহাম্মদ -এর গীতিসমগ্র। গ্রন্থটি তরুণ বয়সে সিদ্ধহস্তে সম্পাদনা করেছেন শিল্পী তাওহীদুল ইসলাম। শ্রম, মেধা আর আন্তরিকতা দিয়ে সম্পাদনার ক্ষেত্রে সম্পাদক গ্রন্থটিতে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। আমার বিশ্বাস, এই তরুণ বয়সে সম্পাদকের জন্য এটি একটি পরম সৌভাগ্য ও সূক্ষ্ম অভিজ্ঞতার হাতেখড়ি। যেখানে গোলাম মোহাম্মদের রচনাসমগ্র (১ম খ-) সম্পাদনা করেছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ, সেখানে তাওহীদুল ইসলাম গীতিসমগ্র সম্পাদনায় দুঃসাহস দেখিয়েছেন। গ্রন্থটি সম্পাদনা সম্পর্কে প্রাজ্ঞ গীতিকার-সুরকার-শিল্পী তাফাজ্জল হোসাইন খান যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন তা প্রণীধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, “গোলাম মোহাম্মদ গীতিসমগ্র সম্পাদনার দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল আমাদের আমরা তা ব্যর্থ হয়েছি, তাওহীদুল ইসলাম সেটি সম্পাদনা করে আমাদেরকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন”। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে : আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবদুল মান্নান তালিব, মতিউর রহমান মল্লিক, সাইফুল্লাহ মানছুর ও মশিউর রহমানকে।
গীতিসমগ্রে ৫১৬ পৃষ্ঠা জুড়ে গোলাম মোহাম্মদের ৬৪৫টি গান স্থান পেয়েছে। গান সংগ্রহের বিষয়ে সম্পাদকের প্রসঙ্গ-কথা থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে বাংলা সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত গোলাম মোহাম্মদ রচনাসমগ্র (১ম খ-) থেকে ২৭০টি গান পাওয়া যায়। বাংলা সাহিত্য পরিষদের প্রকাশক তৌহিদুর রহমানের কাছ থেকে পুরাতন ১৪টি ডায়রী উদ্ধার করা হয়, যা ২০০৪ সাল থেকে বস্তাবন্দী ছিলো, যেখান থেকে অপ্রকাশিত ১৩৫টি গান সংগ্রহ করা হয়। কবির সহধর্মিনী শাহীন আক্তার মধু ও কবিপুত্র সুহাইমের সহযোগিতায় তাদের বাসা থেকে সংগ্রহ করা হয় ২২৫টি গান এবং বিভিন্ন অ্যালবামের অডিও রেকর্ড থেকে আরো ১১০টি গান সংগ্রহ করা হয়। গ্রন্থের মোট গানগুলোকে ১৫টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন- হামদ, নাতে রাসূল (স.), মোনাজাত, দেশের গান, প্রকৃতি, ছড়াগান, মানবতা, আহবান, জাগরণ, সংগ্রাম, প্রেরণা, রমজান, ঈদ, মরমী ও বিবিধ ইত্যাদি।
গ্রন্থের শুরুতে লিপিবদ্ধ হয়েছে উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ মুস্তাফা জামান আব্বাসী’র লিখিত ভূমিকা। ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, “তার লেখা গান, ছড়া, কবিতা ও গদ্য রচনা পাঠ করার সৌভাগ্য যার হয়েছে, তিনি জানতে পারবেন আশি দশকের ‘জাতশিল্পী’ এই লেখকের জীবন ঘনিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে।” তিনি আরো উল্লেখ করেছেন, “প্রতিটি গানেই আনে মোহাচ্ছন্ন পরিবেশ। আল্লাহ্কে উদ্দেশ্য করে তার গানগুলো নজরুলেরই প্রতিধ্বনি। নাত পর্যায়ের গানগুলো সুর দিয়ে গাইলে এবং রেকর্ড ও রেডিওর মাধ্যমে প্রচারিত হলে নজরুলের গানের মতোই দেশকে মাতিয়ে তুলত। দেশমাতৃকা ও প্রকৃতির গানগুলো তার কবিত্বের স্ফুরণ। এত সুন্দর কল্পনার বিস্তার মনে করিয়ে দেয়, আবু হেনা মোস্তফা কমালকে। এই বইটি আমাদের গানের ভুবনকে সমৃদ্ধ করবে, এ বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।”
গ্রন্থের শুরুতে কবি ও শিশুসাহিত্যিক ওমর বিশ্বাস, গোলাম মোহাম্মদের একটি সংক্ষিপ্ত জীবনপ্রণালী তুলে ধরেছেন। যা একনজরে সহজ ও সাবলীলভাবে কবিকে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রসঙ্গ-কথায় সম্পাদক তাওহীদুল ইসলাম লিখেছেন, “কবি গোলাম মোহাম্মদের গান মানেই কাব্যিক, উপমার চমৎকার ব্যবহার, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, আধ্যাত্মিকতা এবং প্রকৃতির সজীবতায় পরিপূর্ণ। তাঁর গানে এক ধরণের সম্মোহনী শক্তি রয়েছে, যা শ্রোতাকে মুগ্ধ, পুলকিত ও আনন্দরসে আপ্লুত করে।” তিনি আরো লিখেছেন, “গোলাম মোহাম্মদ সাধারণত ¯্রষ্টার মাহাত্ম্য-একাত্ববাদ, রাসূলের প্রশংসা, প্রকৃতির সৌন্দর্য, দেশপ্রেম ও মানবতা প্রেমের চিরন্তন ভাব ও বিষয় নিয়ে গান রচনা করেছেন। তাই তাঁর গান যেমন সার্বজনীন তেমনি তা চিরন্তন।”
গ্রন্থে লিপিবদ্ধ গানগুলোতে মনোনিবেশ করলে বা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কবি গোলাম মোহাম্মদের গানে রয়েছে ব্যাপক বৈচিত্র্যময়তা। তাঁর গানে আধ্যাত্মিকতার ও রোমান্টিকতার আবরণে অত্যন্ত শৈল্পিক ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপিত। তাঁর গানে যেমন বিশ্বসী চেতনার পরিস্ফুটন ঘটেছে, তেমনি মানুষের হৃদয়বৃত্তি এবং প্রকৃতির নিপূণ সৌন্দর্যকেও ধারণ করেছেন। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, আমাদের ঐতিহ্যিক শব্দাবলীর ব্যবহার ছাড়াও দৈনিন্দিক ব্যবহৃত শব্দগুলোর মাধ্যমে কবি চমৎকারভাবে ইসলামি ভাবধারায় প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
স্বাতন্ত্র্য উপমা-রূপক-উৎপেক্ষা-অনুপ্রাস, মৌলিক শব্দ প্রয়োগ এবং নিখুঁত ছন্দের গাঁথুনী গোলাম মোহাম্মদ গানকে করে তোলেন ঝরণাধারার মতো শীতল ও গীতল। সত্যের পথে অবিচল থাকা, ন্যায়-নীতির পথে জীবনকে পরিচালনা করাই ছিল তাঁর মূল ব্রত। কোন অহমিকা তাঁকে ঘ্রাস করতে পারেনি। তিনি ছিলেন অলিফের মতো সোজা। যাপিত জীবনে মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথে আহবান জানিয়েছেন, যার প্রতিফলন ঘটেছে গীতিসমগ্রের গানের প্রতিটি পরতে পরতে।
গীতিসমগ্রের শেষে পাঠকদের সুবিধার্থে অক্ষরভিক্তিক ক্রমবিন্যাস দেয়া হয়েছে। যে গানগুলো সুরারোপ হয়েছে সে গানগুলোর শেষে সুরকার ও প্রকাশিত অ্যালবামে নাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। যা একজন গায়ক ও পাঠককে সহজে অডিও গান খোঁজে নিতে বেগ পেতে হবে না। আরো আনন্দের বিষয় হলো, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সুবিধার্থে ১৫০টি জনপ্রিয় গানের একটি সমৃদ্ধ এমপিথ্রিও গ্রন্থের সাথে উপহার দেয়া হয়েছে। সম্পাদনার ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত বিষয়াবলী সম্পাদকের সৃজনশীল ও মননশীলতার বহিঃপ্রকাশ।
গ্রন্থটি জুলাই ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশ করেছেন ইল্লিন রেকর্ডস এর প্রকাশক মো: নূরুল ইসলাম। নান্দনিক প্রচ্ছদ করেছেন মোমিন উদ্দীন খালেদ। দাম ৬৫০ টাকা। গ্রন্থে কৃতজ্ঞতা স্বীকারে উল্লেখ করেছেন- শাহীন আক্তার মধু, তৌহিদুর রহমান, আদনান আব্দুল্লাহ সুহাইম ও আনিকা আনজুমী নামসমূহ।
গোলাম মোহাম্মদ গীতিসমগ্র অতিদ্রুত সর্বমহলের পাঠকদের কাছে পৌঁছে যাক এবং গ্রন্থের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি লাভ করুক। আমিন।