আজ গল্পের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলো। নতুন বছরে সে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হবে । এখন শীতের ছুটি চলছে। গল্পের বাবা থাকে কথা দিয়েছেন শীতের ছুটিতে তাদের গ্রামের বাড়ি সোনাপুর নিয়ে যাবেন। গল্প তার বাবার কাছে সোনাপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মুছব্বিরের গল্প শুনেছিলো। আবদুল মুছব্বিরের যুদ্ধের গল্প এবং তার এখনকার কাজকর্মের সব কথা গল্প তার বাবার কাছে শুনেছে। সেই থেকে অধীর আগ্রহে বসে আছে ছুটি পেলেই সোনাপুর গ্রামে যাবে৷
গল্প তার বাবার কাছ থেকে আবদুল মুছব্বিরের যুদ্ধে যাওয়ার সে গল্প শুনেছিল। ১৯৭১ সালের কোনও এক রাতে কাউকে না জানিয়ে আবদুল মুছব্বির তার কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে ভারতে পাড়ি জমায়। সেখানে তারা মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেন। ট্রেনিং শেষে দেশে ফেরে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। পাক হানাদার বাহিনী যখন সোনাপুর গ্রামে আক্রমণ করে, তখন হানাদারদের মোকাবিলায় মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি নিজের নেতৃত্বে গেরিলা বাহিনী গঠন করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন আবদুল মুছব্বির।

একদিন পাক মিলিটারির সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ বাঁধে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলে। কয়েক ঘন্টার উত্তেজনাপূর্ণ যুদ্ধ শেষে পাক বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। মূলত আবদুল মুছব্বিরের দৃঢ়তা ও মনোবলের জোরে সেদিন মুক্তিবাহিনীর বিজয় ঘটে। মুখোমুখি যুদ্ধে দুপক্ষেরই বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। মুক্তিবাহিনীর তিনজন ঘটনাস্থলেই শহিদ হন। অল্পের জন্য বেঁচে যান আবদুল মুছব্বির। পাক মিলিটারির একটা বুলেট আবদুল মুছব্বিরের বা চোখের পাতা স্পর্শ করে চলে যায়। চোখের কিছু হয়নি ভেবে চোখের আর কোন যত্ন নেননি। কিন্তু সময় যত বাড়তে থাকে তিনি চোখে ঘোলা দেখতে শুরু করেন। এভাবে এ পর্যায়ে এসে বাম চোখের আলো পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন তিনি। আর কোনও প্রচেষ্টা চোখের আলো ফিরিয়ে দিতে পারে নি।

সেদিন আবদুল মুছব্বিরের নেতৃত্বে সোনাপুর গ্রাম স্বাধীন হয়। সোনাপুর গ্রামের বৃদ্ধ যুবক সবাই তাঁর বীরত্বের কথা জানেন। আবদুল মুছব্বির এখনও সোনাপুর গ্রামে বাস করেন। তাঁর একমাত্র ছেলে সাবিত শহরে সুনামধন্য একটি প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে চাকরি করে। চাকরির সুবাধে সে শহরেই বাস করে৷
গল্প আবদুল মুছব্বিরের গল্প যত শুনে ততই অবাক হয়। গল্পের বিস্ময় জাগলো আবদুল মুছব্বিরের এখনকার কাজকর্মের কথা জেনে৷ বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও অতি সাধারণ ও অনাড়ম্বর চলাফেরা তাঁর। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ভাঙ্গিয়ে অন্যদের মতো যত্রতত্র নিজেকে বেচে বেড়ান না কিংবা প্রভাব প্রতিপত্তি দেখিয়ে বেড়ান না। নামের পূর্বে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ব্যবহারেও ভীষণ অনিচ্ছা তাঁর। মুক্তিযোদ্ধার সরকারি ভাতা নেন না কোনও সংবর্ধনা বা সম্মাননাও কেউ দিতে চাইলে নেন না তিনি। কেবল একটি কাজই আনন্দের সঙ্গে করে থাকেন, আর তা হলো নতুন প্রজন্মের কাউকে পাশে পেলে পরম মমতায় ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থেলে রণাঙ্গনের গল্প শোনান। আবদুল মুছব্বির মনে করেন, নতুন প্রজন্ম যতবেশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানবে তারা ততবেশি সুনাগরিক ও দেশপ্রেমিক হয়ে গড়ে উঠবে। তারা মুক্তিযুদ্ধ দেখে নি, তাই তাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

বর্তমানে আবদুল মুছব্বির দুটি কাজ নিয়মিত করে থাকেন। তা হল, নিজের টাকায় গাছের চারা কিনে রাস্তার পাশে অথবা সরকারি খালি জায়গায় রোপণ করেন। আরেকটি হল, মাছের পোনা কিনে পুকুরে না ছেড়ে নদীতে ছাড়েন। তাঁর এমন কাজে গ্রামের মানুষ মুগ্ধ। এখন অনেকেই তাকে অনুকরণ করা শুরু করেছেন ৷
গল্পের অপেক্ষার প্রহর শেষ হতে চলল। সে বাবা-মায়ের সঙ্গে সোনাপুর যাচ্ছে। খুব সকালে যাত্রা শুরু করেছে তারা। গাড়ি চলছে তার মতো করেই। গল্পের তর সইছে না। বাবাকে বার বার জিজ্ঞেস করছে, আর কতদূর? প্রতিবারই বাবার এক উত্তর এই তো সামনেই, আর একটু বাবা। গল্প এতোদিন বাবার কাছে যে মানুষটির গল্প শুধু শুনেছে আজ তাকে নিজ চোখে দেখতে পাবে এই ভেবেই যেন সীমাহীন আনন্দ। দারুণ একটা ইচ্ছাপূরণ হতে যাচ্ছে তার।

গল্পদের গাড়ি গল্পের স্বপ্নের গ্রাম সোনাপুরে প্রবেশ করল। বাবা গল্পকে জানালার দিকে তাকাতে বললেন। গল্প বাহিরে তাকালো।কী সুন্দর গ্রাম। সারি সারি গাছ। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চিরচিরে আলো চলে মাটিতে পড়ছে। গাছের ছায়ায় মানুষজন বিশ্রাম নিচ্ছে। রিকশা চালক গাছের ছায়ার নিচে রিকশা রেখে ঘুমোচ্ছে। পথিকেরা গাছের ছায়া অনুসরণ করে হেঁটে যাচ্ছে। যাতে সূর্যের প্রখর রোদ গায়ে না পড়ে। এসব দৃশ্য দেখে গল্পের মনটা ভরে গেল। সোনাপুর গ্রামের সুন্দর প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।
আরেকটু সামনে যেতেই গল্পের বাবা চালকে গাড়ি থামাতে ইশারা করলেন৷ একে একে সবাই গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। হাতের ইশারা দেখিয়ে গল্পকে সামনে তাকাতে বললেন তার বাবা। গল্প সামনে তাকাল। গল্প দেখতে পেল, এক লোক গাছের চারা রোপণ করার জন্য গর্ত খুঁড়ছে। গল্পের বুঝতে বাকি রইল না তিনিই বাবার গল্পের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মুছব্বির।
বাবা গল্পের হাত ধরে সামনে এগোলেন। আবদুল মুছব্বিরের সামনে এসে, তাকে সালাম দিলেন৷ সালাম শুনে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন তিনি। সালামের উত্তর দিলেন। গল্পের বাবা জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছেন চাচা?
আবদুল মুছব্বির জবাব দিলেন, আল্লাহর রহমতে ভালো আছি বাবা। তবে জানি না, আর কতদিন ভালো থাকবো! এই বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। গল্পের বাবা বললেন, চাচা আপনার জন্য আমাদের দোয়া আছে। গল্পের হাত ধরে তাকে আবদুল মুছব্বির সাহেবের সামনে এনে বললেন, চাচা এ আমার ছেলে। আপনাকে দেখার জন্যই তার এবার গ্রামে আসা। আবদুল মুছব্বির গল্পকে নিজের পাশে টেনে নেন৷ গল্পকে জিজ্ঞেস করলেন, কী নাম তোমার দাদুভাই?
গল্প জবাব দিল, আমার নাম গল্প।
বাহ, কী সুন্দর আমার দাদুভাইয়ের নাম।
গল্প হাসল। আপনি কেমন আছেন?
আমি ভালো আছি দাদুভাই। অনেক খুশি হলাম, বুড়ো মানুষটাকে দেখতে এসেছো।
গল্প আবার মুচকি হাসলো। বলল, দাদুভাই আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারব?
গল্পের কথা শুনে তিনিও হাসতে হাসতে বললেন, দাদুভাই যত প্রশ্ন আছে মনে সব করতে পার।আমি সব প্রশ্নের জবাব দিব।
আবদুল মুছব্বিরের কাছ থেকে অভয় পেয়ে গল্প তার মনে জমে থাকা সব প্রশ্ন একসঙ্গে করে ফেলল। গল্প বলিল, দাদু আপনি মুক্তিযোদ্ধার কোনও সংবর্ধনা নেন না, ভাতা নেন না, রাস্তার পাশে বা সরকারি জমিতে গাছের চারা রোপণ করেন পুকুরে না ফেলে নদীতে মাছের পোনা ছাড়েন৷ এসব কেন করেন দাদু?

আবদুল মুছব্বির কিছু সময় নীরব থাকেন৷ গল্পের বাবার দিকে একবার তাকিয়ে তারপর গল্পের দিকে তাকালেন। এবার কথা বলতে শুরু করলেন। দাদুভাই, যুদ্ধ করেছিলাম দেশপ্রেমের তাগিদে। দেশমাতাকে পরশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য। অন্তরে দেশপ্রেম ছিল বলেই, নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পেরেছিলাম। এখনও যা কিছু করছি দেশপ্রেমের তাগিদেই করছি। দেশকে ভালোবাসি। তাই দেশের জন্য, দশের জন্য কাজ করে আনন্দ পাই৷
গাছ লাগানো পরিবেশ ভালো থাকবে। বৃষ্টি হবে বেশি, কৃষকের সুবিধা হবে। মানুষ ছায়া পাবে, ফল পাবে। কতই না আনন্দ! আমাদের পরিচয় আমরা বাঙালি। আর বাঙালি খাদ্যাভাসের পরিচয় মাছ আর ভাত। আমরা মাছে ভাতে বাঙালি। আর এখন আমরা বুঝে না বুঝে নদী খাল এসব ভরাট করে দিই, দখল করে বাড়ি বানাই, মার্কেট বানাই। নদীকে দূষিত করে। শত্রুতা করে অন্যের পুকুরে বিষ ঢেলে দিই। এতে করে মাছের ক্ষতি হয়। মাছের বৃদ্ধি ব্যাহাত হয়। এভাবে চলতে থাকলে মাছ দুষ্প্রাপ্য হয়ে যাবে। তখন আমরা মাছ পাব কীভাবে? কীভাবে আমিষের চাহিদা মিটাবো? পুকুর মানুষের ব্যক্তিগত। আর নদীর উপর সবার অধিকার থাকে। সবাই এখানে মাছ ধরতে পারে। আমি এজন্য নদীতে মাছের পোনা ছাড়ি৷ নদীতে মাছ বৃদ্ধি পেলে ধনী গরিব সবাই মাছ ধরে, কিনে খেতে পারবে। গরিব মানুষ ও গরিব জেলেরা লাভবান হবে।

এভাবে করে আমরা সবাই যদি দেশের জন্য ভাবি, দেশের জন্য কাজ করি তাহলে আমাদের সকল সমস্যা দূর হয়ে যাবে। দেশের জন্য কাজ করার যে তাগাদা অনুভব করি এটাই আমার দেশপ্রেম। এখন তুমি আমাকে বলো, তুমি চাইলেই কি এখন মুক্তিযোদ্ধা হতে পারবে? গল্প জবাব দিল, না দাদুভাই। আমি তো যুদ্ধ করিনি।

আবদুল মুছব্বির বললেন, তবে তুমি চাইলেই ঠিকই একজন দেশপ্রেমিক হতে পারবে। গল্প অবাক হয়ে বলল, তাই দাদুভাই? কীভাবে আমাকে বল।

আবদুল মুছব্বির বললেন, তুমি যখম কলা খাবে। কলার বাকল যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবে। চিপস খেলেও প্যাকেটটা একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবে৷ তোমার সামনে কেউ বিপদে পতিত হলে তোমার সাধ্য অনুযায়ী তাকে সহযোগী করবে। গাছ রোপণ করবে। পরিবেশ দূষণ রোধে সচেষ্ট থাকবে। দেশ ও দশের ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকবে। এসকল কাজ যদি করতে পারো, তাহলেই তুমি একজন দেশপ্রেমিক। দেশও তোমাকে ভালোবাসবে। সম্মান দিবে৷

এক নাগাড়ে কথাগুলো বলতে বলতে তিনি আবার কাজে মনোযোগী হলেন। বললেন, এখন বাসায় গিয়ে বিশ্রাম কর। অনেক দূর থেকে এসেছো। কাল আবার কথা হবে৷ গল্প বাবার হাত ধরে সামনে এগোতে শুরু করল। একটু সামনে এগিয়ে গল্প আবার পেছনে তাকাল। গল্প দেখল দাদুও তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন। চোখে চোখ পড়তেই দুজনেই মুচকি হাসল। গল্পের কাছে এ যেন শত স্বপ্ন ছুঁয়ে যাওয়া এক স্মৃতিমধুর হাসি। এ যেন এক চির অমলিন দৃষ্টি বিনিময়।