আমাদের দেশের অফিসে-আদালতে,সরকারি নথি-পত্রে,স্কুল-কলেজে,পত্র- পত্রিকায় যে ক‍্যালেন্ডার ব‍্যবহার করা হয় তা ইংরেজি ক‍্যালেন্ডার বা ইংরেজি বর্ষপঞ্জী।এই ইংরেজি বর্ষপঞ্জী বা ক‍্যালেন্ডার রোমাদের তৈরী।রোমানদের তৈরি ক‍্যালেন্ডরের আগেও ক‍্যালেন্ডার বা বর্ষপঞ্জী ছিল।প্রাচীন গ্ৰিকবাসীরা তিনশো চার দিনের একটি ক‍্যালেন্ডার বা বর্ষপঞ্জী ব‍্যবহার করত।সেটা ছিল দশ মাসের ক‍্যালেন্ডার।সেই ক‍্যালেন্ডারে জানুয়ারি ও ফ্রেব্রুয়ারি ছিল না।গ্ৰিকদের ক‍্যালেন্ডারের প্রথম মাস ছিল মার্চ এবং ডিসেম্বর মাস ছিল বছরের শেষ মাস।খ্রিস্টপূর্ব ৭১৩ সালে রোম সম্রাট ন‍্যুমা পম্পিলিয়াস গ্ৰিক ক‍্যালেন্ডারের সঙ্গে জানুয়ারি ও ফ্রেবরুয়ারি যোগ করে বারো মাসের একটি নতুন ক‍্যালেন্ডার চালু করেন।সেই ক‍্যালেন্ডারের দীর্ঘদিন প্রচলন ছিল।পরবর্তীকালে খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার জানুয়ারিকে বছরের প্রথম মাস ও ডিসেম্বরকে শেষ মাস হিসাবে সাজিয়ে নতুন ক‍্যালেন্ডার প্রচলন করেন।সেই ক‍্যালেন্ডার অনেক দেশে অনেক কাল ধরে চলে।এরপর ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে রোমান পোপ ত্রযোদশ গ্ৰোগোরি জুলিয়ান লক্ষ করেন সেই বর্ষপঞ্জীতে সৌরবর্ষ হিসাবে কিছু ত্রুটি আছে।জুলিয়াস বর্ষপঞ্জীর গণনা অনুসারে একটি মহাবিষুব থেকে আরেকটি মহাবিষুব পর্যন্ত সময়কাল ধরা হয়েছিল ৩৬৫.২৫ যা প্রকৃত সময়কাল থেকে ১১ সেকেন্ড কম।সেই ১১ সেকেন্ড পার্থকের ফলে প্রতি ৪০০ বছর অন্তর মূল ঋতু থেকে জুলিয়ান বর্ষপঞ্জীর প্রায় তিন দিনের ব‍্যবধান ঘটত।পোপ ত্রয়োদশ গ্ৰেগোরির সময় সেই পার্থক‍্য ধরেছিল মোট ১০ দিনের।এর ফলস্বরূপ মহাবিষুব ২১ মার্চের পরিবর্তে পড়েছিল ১১ মার্চে।যেহেতু খ্রিষ্টীয় উৎসব ইস্টারের দিন নির্ণেয়ের সাথে মহাবিষুব জড়িত সেহেতু মহাবিষুবের সাথে জুলিয়ান বর্ষপঞ্জীর এই ব‍্যবধান রোমান ক‍্যাথলিক গির্জার কাছে অনভিপ্রেত ছিল।সেকারণে গ্ৰেগোরি জুলিয়ান ক‍্যালেন্ডার পরিমার্জিত করে নিখুঁত নতুন ক‍্যালেন্ডার তৈরি করে ১ লা জানুয়ারি তারিখে নববর্ষ পালন করার নির্দেশ দেন।প্রথমে কিছু মুষ্টিমেয় ক‍্যাথলিক দেশ এই বর্ষপঞ্জী গ্ৰহণ করে‌।এরপর ১৭৫২ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন এই বর্ষপঞ্জী গ্ৰহণ করে।পরবর্তীকালে একে একে প্রায় সব দেশই গ্ৰেগোরিয় ক‍্যালেন্ডরের প্রচলন ঘটে।
পোপ গ্ৰেগোরির প্রচলিত এই ক‍্যালেন্ডার গ্ৰেগোরিয়ান ক‍্যালেন্ডার বা গ্ৰেগরিয় ক‍্যালেন্ডার বা ইংরেজি ক‍্যালেন্ডার নামে খ‍্যাত।এই ক‍্যালেন্ডার বা বর্ষপঞ্জী শুধু আমাদের দেশে নয় পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত বর্ষ পর্ষপুঞ্জী।ইংরেজি ক‍্যালেন্ডারের মাসগুলোর নামকরণ করা হয়েছে রোমানদের দেবদেবীর প্রতি সম্মান জানাতে ।এবার জেনে নেওয়া যাক গ্ৰেগোরীয় ক‍্যালেন্ডারের মাস গুলোর নামের তাৎপর্য।
জানুয়ারি : রোমান দেবতা ‘জানুস’-এর নামানুসারে বছরের প্রথম মাসের নাম জানুয়ারি রাখা হয়।রোমবাসীদের বিশ্বাস অনুযায়ী ‘জানুস’ হচ্ছেন সূচনার দেবী।কোন ভালো কাজ করার আগে রোমানরা এই দেবতার স্মরণ করতেন।তাই তারা বছরের প্রথম মাসের নাম জানুয়ারি রাখে।

ফেব্রুয়ারি : সেসময় পাশ্চাত‍্যে বসন্তকালে আত্মা ও মনের শুদ্ধিকরনের জন‍্য ‘ফেব্রুয়া’ উৎসব পালন করা হতো।সেই উৎসবের নাম থেকেই মাসেটির নাম ফেব্রুয়ারি রাখা হয়।

মার্চ : রোমদের যুদ্ধের দেবতা ‘মার্স’ – এর নামানুসারে তারা মার্চ মাসে নামকরণ করে।

এপ্রিল : ইতিহাসবিদদের মতে গ্ৰীকদের ভালোবাসার দেবী Aphrodite থেকে রোমানদের ‘এপ্রিলিস’ আর সেই ‘এপ্রিলিস’ থেকে ইংরেজিকরণে বছরে তৃতীয় মাসের নাম এপ্রিল রাখা হয়।

মে : মে মাসের নাম রাখা হয় রোমানদের ফসলের দেবী ‘মাইয়া’ -এর নামানুসারে।

জুন : রোমানদের বিয়ের দেবী ‘জোনা’ এর নামানুসারে বছরের ষষ্ট মাসের নাম রাখা হয় জুন।

জুলাই : খ্রিস্টপূর্ব ৪৫ সালে রোমান ‘সম্রাট জুলিয়াস’ যে ক‍্যালেন্ডার প্রচলন করেছিলেন তার নাম জুলিয়াস ক‍্যালেন্ডার।আর এই ক‍্যালেন্ডারের প্রবর্তক জুলিয়াস সিজারকে সম্মান জানাতে মাসের নাম জুলাই রাখা হয়।

অগাস্ট : ‘জুলিয়াস সিজার’ এর উত্তরাধিকারী ‘অগাস্টাস সিজার’ এর নামানুসারে অগাস্ট মাসের নামকরণ করা হয়।

সেপ্টেম্বর : দশ মাস বিশিষ্ট রোমানদের ক‍্যালেন্ডারে সেপ্টেম্বর ছিল সপ্তম মাস।ল‍্যাটিন ভাষায় ‘সেপ্টম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সপ্তম।তাই তারা সপ্তম মাসের নাম সেপ্টেম্বর রাখে।

অক্টোম্বর : ল‍্যাটিন ভাষায় ‘অক্টো’ মান আট আর রোমানদের দমসীয় ক‍্যালেন্ডার অষ্টম মাসের নাম অক্টোবর রাখা হয়।

নভেম্বর ও ডিসেম্বর : ঠিক একই ভাবে ল‍্যাটিন ভাষায় ‘নোভেম’ শব্দ থেকে নভেম্বর আর ‘ডিসেম’ শব্দ থেকে ডিসেম্বর নাম আসে।