বাংলাদেশের আধুনিক কালের সাহিত্যের বয়স খুব বেশি নয়। একাত্তর থেকে হিশেব করলে প্রায় পঞ্চাশ বছর। সাতচল্লিশ থেকে ধরলে প্রায় সত্তর বছর। আর যদি সাতচল্লিশ-পূর্ব উপনিবেশ কালের বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যকেও ধরি তাহলে সর্বসাকুল্যে আরো ষাট/সত্তর বছর। অর্থাৎ উনিশ শতকের শেষার্ধ থেকে ধরলে এর ব্যাপ্তি হবে কমবেশি দেড়শো বছরের। মীর মশাররফ হোসেন থেকে আল মাহমুদ এবং হুমায়ূন আহমেদ পর্যন্ত। মাঝখানে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন এই সাহিত্য ধারার সবচাইতে শক্তিমান প্রতিনিধি।

এখন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যারা কেবল বাংলা ভাষাতেই লেখাপড়া করতে পারেন তাদের সাহিত্য ক্ষুধা মেটাবার জন্য রয়েছে এই সর্বসাকুল্যে দেড়শো বছরের সাহিত্য। আমি এই সাহিত্যকে খাটো করে দেখছি না। এদের মধ্যে রয়েছেন অনেক প্রতিভাবান লেখক যেমন মীর মশাররফ হোসেন, কায়কোবাদ, মোজাম্মেল হক, শেখ আবদুর রহীম, এয়াকুব আলী চৌধুরী, এস ওয়াজেদ আলী, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বেগম রোকেয়া, ইসমাইল হোসেন শিরাজী, সৈয়দ এমদাদ আলী, গোলাম মোস্তফা, আবুল মনসুর আহমদ, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, সৈয়দ মুজতবা আলী, ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, মুনীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, আহমদ ছফা, হুমায়ূন আহমেদ প্রমুখ।

এছাড়া মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে যেসব মুসলিম লেখক ছিলেন যেমন শাহ মুহম্মদ সগীর, সৈয়দ সুলতান কিংবা আলাওল- এদের রচনার ভাষা আধুনিক কালের সাধারণ বাঙালি মুসলমানের জন্য প্রায় অপ্রবেশ্য এবং কাজে কাজেই বিপুলভাবে অপঠিত। কেবল সাহিত্যের গবেষক ও সিরিয়াস পাঠকেরাই এগুলি পড়তে পারেন কিংবা পড়েন। বাকীরা এসবের নাম হয়তো শুনে থাকবেন, দুয়েকটা জনপ্রিয় উদ্ধৃতি হয়তো অন্য কারো লেখার ভেতরে কোথাও কোথাও পড়ে থাকতে পারেন। কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। সাধারণ বিপুল শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এসব সাহিত্য পড়ে না। কেবল দূর থেকে এসব লেখকদের মাহাত্ম্যকে একরকম অপরীক্ষিত শ্রদ্ধা করে বা সম্মান জানায়। নিয়মিত পড়ে এসবকে আত্মস্থ করে না বা অনুসরণও করে না।

তাহলে এই যে একভাষী একধরনের বাঙালি মুসলমান গড়ে উঠেছে আমাদের বাংলা ভাষা কেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে তাদের সাহিত্য ক্ষুধা বা তৃষ্ণা কি তারা শুধু এই দেড়শো বছরের আধুনিক মুসলিম বাংলা সাহিত্য দিয়ে মিটাতে পারে? পারে না। পারে না বলেই এই একভাষী বাঙালি মুসলিমেরা এক পর্যায়ে অগ্রসর প্রতিবেশী হিন্দু সম্প্রদায় রচিত আধুনিক বাংলা সাহিত্যের দিকে ধাবিত হয়। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, জীবনানন্দ দাশ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখদের রচিত সাহিত্য দিয়ে বাঙালি মুসলমান পাঠকেরা তাদের অতৃপ্ত সাহিত্য ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মেটাতে বাধ্য হয়। আর এই সাহিত্য পড়তে গিয়েই এই একভাষিক বাঙালি মুসলিমদের মন-মানসিকতার উপর এইসব লেখকদের এক বিরাট প্রভাব চেতন ও অবচেতনভাবে পড়ে যায়।

এর প্রতিকারে যা প্রয়োজন তা হল উপমহাদেশ ও মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য ভাষার সাহিত্য পাঠের যোগ্যতা গড়ে তোলা। বিশেষ করে উপমহাদেশ ও আরব-ইরানী-তুরানী সংস্কৃতি বলয়ের আরবি, উর্দু ও ফারসি ভাষায় রচিত সাহিত্যের পাঠ বাঙালি মুসলমানের সাহিত্য চাহিদা, ক্ষুধা ও তৃষ্ণা মেটাতে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। সাধারণ পাঠকেরা প্রথমত বাংলা বা ইংরেজী অনুবাদের মাধ্যমে এটা আদায় করার চেষ্টা করতে পারেন। আর যারা সিরিয়াস পাঠক এবং বিশেষ করে যারা নিজেরাই লেখালেখি করতে চান তাদের জন্য এই ভাষাগুলি শিখে নেয়া খুবই কার্যকর হবে। বাঙালি মুসলিম লেখকদের মধ্যে যারা বড় লেখক যেমন কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ মুজতবা আলী কিংবা ফররুখ আহমদ প্রমুখরা এসব ভাষা ভাল করে শিখে ঐসব ভাষার সাহিত্য মন দিয়ে রপ্ত করেছিলেন। আর সে কারণে তাদের সাহিত্য অনেক উঁচু মানে পৌঁছাতে পেরেছিল।
ঘরকুনো একভাষিক বাঙালি মুসলমানের যে প্রজন্ম ইদানীং গড়ে উঠেছে তাদের কাছ থেকে বড় কোন সাহিত্য কর্ম আশা করা বাতুলতা মাত্র।