গুমাই বিলের পাশেই এক ঘাস ফড়িং বাস করে।নিজের মতো করে ঘাস খড় দিয়ে তৈরি করা ঘরে মনের আনন্দে থাকে সে। বিলের পাশ দিয়ে ছোট্ট ইছামতি নদী বয়ে গেছে। প্রকৃতির নানাজাতের ফুল ফলের সমারোহ নদীর কূল। ঘাস ফড়িং প্রতিদিন নদীর তীরে ফুলের মুখে বসে আর মৌমাছির মধু আহরণ উপভোগ করে।
মধু যখন সব ফুলে থাকে না তখন কী কর মৌ মনি? ঘাস ফড়িং আদর করে রাণী মৌমাছিকে মৌ মনি ডাকে। মৌ মনি লজ্জায় ঘুরে ঘুরে ফুলে চলে যায়।ঘাস ফড়িং উড়ে মৌ মনির পেছন পেছন যায়।
না, ফুলের মধু সব সময় থাকে না ঘাসু। তুমি কি জানো না কখন ফুল ফুটে? ঘাসু ফুড়ুৎ করে উড়ে মৌ মনিকে তার পাখার বাহার মেলে ধরে।
জানি জানি, তবুও জিজ্ঞেস করছি। সারাবছর খাবার খুঁজে মরো। আমার মতো ধানক্ষেত, সবজি ক্ষেতে যেতে পারো না? আমি যেমন কুটুর কুটুর করে নতুন চারার ডগা খাই, তুমিও তেমনি খাবে। তখন তোমার ফুল ফোঁটার অপেক্ষা করতে হবে না।
মৌ মনি বড় করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আর বলে, যুগযুগ ধরে আমাদের মৌয়ালি করতে দেখা গেছে সবসময়। মধু আহরণ করে বাসায় জমানো। যেটুকু পারি সঞ্চয় করি। এর বাইরে কোন কাজ করলে আমাদের সমাজ থেকে বিতাড়িত করা হবে জানো ঘাসু।
আহারে! এ কেমন নিয়ম বলো। আমার তো মাথায় আসে না তোমার আজীবন কেন ফুলে ফুলে ঘুরবে। সেদিন দেখলাম একটি গোলাপ থেকে মধু খাচ্ছে এক ছোট্ট মৌ। গোলাপ তার মধু দিতেই চায় না। পরে সে কি তুমুল ঝগড়া। মৌ বসে আর গোলাপ গা ঝেড়ে ফেলে দেয়। তারপর আমি গিয়ে অনেক বুঝিয়ে গোলাপকে শান্ত করি। বেচারা মৌ মধু খেতে না পেয়ে উপোস করেছে। তার তোমরাও কী বলো তো? কত আর ফুলকে বিরক্ত করবে? তোমাদের উচিৎ এখন খাওয়া দাওয়ার রুচি পরিবর্তন করা।
কী যে বলো ঘাসু। আমরা মধু ছাড়া কিছুই মুখে দিতে পারি না। আবার আমাদের বংশবৃদ্ধিও মধুর সাথে জড়িয়ে আছে। সে তুমি বুঝবে না। মৌ মনি আহরিত মধু ছোট্ট ঘাসের শিশিতে নিয়ে উড়তে শুরু করলো। ঘাস ফড়িং সবসময় তাকে ঘাসের শিশি তৈরি করে দেয়। এমন গাঢ় মিতালী দুইজনের। অনেকেই ঈর্ষা করে।

ঘাস ফড়িং আজ দক্ষিণের গুমাইয়ে গেল। মৌ মনির অপেক্ষা শেষ হয় না। কখন তার ঘাসু বন্ধুটা আসবে কে জানে। মৌ মনি নিজ হাতে মধুর পায়েশ করে এনেছে। নদীর ধারে বসে দুইজনে বেশ মজা করে খাবে। মৌ মনি ধানের শীষে বসে। নতুন ডগার সুঘ্রাণ নেয়। মাঝে মাঝে দুলিয়ে দেয় গাছের আনাচকানাচে যেন পরাগায়ন হয়। কী বিচিত্র বাসনা নিয়ে বসে থাকে ধানি জমি।
মৌ মনি মধু পায়েশ ধানের শীষকে সাধে। খাবে কি একটু? দিই?
ধানের শীষ বলে, আরে না। তুমি আমাকে দুলিয়ে ছন্দে আমার বান্ধবীর সাথে মিলিয়ে দিয়েছো আর কী চাই বল। কাল দেখো আরো দুটো নতুন শীষ হবে। সেই মুহু মুহু গন্ধে পুরো গাঁয়ে খবর হয়ে যাবে।
হুম, তবে তোমাদের জন্য কষ্ট লাগে। এত কষ্ট করে তোমরা মানুষের আহার হও। অথচ তারা তোমাদের নষ্ট করে, পঁচিয়ে ফেলে দেয়। মৌ মনি টুক করে ধানের শীষকে ছু্ঁয়ে দেয় আর তাদের নরম ডগা দুলতেই থাকে।

ঠিক বলেছো, আমরা যাদের আহার, তারা আমাদের দেখায় কত বাহার! চিন্তা করো না একদিন আমরা বিলুপ্ত হয়ে যাবো আট মানুষ তখন হাহাকার করবে। ধানের শীষ আর মৌ মনির কথা শুনে দূর থেকে টিয়ে পাখি।
ধানের শীষ ভয়ে বলে উঠে, মৌ মনি টিয়েকে তাড়াও প্লীজ। সে আমি সদ্য গজা শীষ খেয়ে সাবাড় করবে।
মৌ মনি টিয়ের পায়ে দিল এক কামড়।যাও বলছি। একদম এদিকে যেন আর না দেখি। মৌ মনি টপাস টপাস দুটো কামড় দিয়ে চলল নদীর ধারে।
এই মৌ, তুমি শীষের বন্ধু সেজেছো কবে থেকে? কাল দলবেঁধে আসবো, দেখি কয়টাকে কামড়াতে পারো।
মৌ যেতে যেতে টিয়ের হুমকি বার্তা শুনে নিল। ঠিক আছে কালকের কথা কালকে দেখা যাবে। আমরাও দলবল কম নই জেনে রেখো।

এতক্ষণ কোথায় গিয়েছিলে ঘাসু? তোমার জন্য মধু পায়েশ এনেছি। কখন থেকে বসে আছি।
ঘাস ফড়িং মৌ মনিকে তার হালকা পাখা্য তুলে নিল। পাখা ঝাপটে একটি পাতার লকেট পড়ল।
আর সেটা মৌ মনির গলায় ঝুলে রইল।
কী এটা? কোথায় পেয়েছো? আমাকে জানালে পারতে।
একসাথে এতো প্রশ্ন করলে কোনটার উত্তর দেবো বল।
আজ আমার বন্ধু লাল ফড়িং বিয়ে করল বেশ ধুমধামে। আসার পথে কাটটুকরা আমাকে দেখে এটি উপহার দিল। ভালোই হলো, তোমাকে লকেটটা বেশ মানিয়েছে মৌ মনি।

পায়েস খাও। পরে দেখবো লকেট। অনেক কষ্ট করে বানালাম। খাও মন ভরে। মৌ মনি পাতার তালা বিছিয়ে ঘাসুকে পায়েস দিল। আর ঘাস ফড়িং বেশ মজা করে খেলো।
কত কষ্ট করে মধু জোগাড় করো তোমরা মৌ মনি। আর মানুষ তোমাদের সেই মধু, মৌচাক তোমাদের থেকে কেড়ে নিয়ে যায়। ওরা কি তোমাদের, আমাদের কষ্ট দুঃখ আর সংগ্রাম কেমন করতে হয় বুঝে বলো? মানুষ কি কখনোই
আমাদের ভালোবাসবে না? অকারণে আমাদের মেরে ফেলবে আর কতদিন? দেখলে না কয়েকদিন আগে এই ইছামতি নদীতে কত অতিথি পাখি আসতো। তাদের সাথে তুমি আমি সবাই খেলতাম। কতই না আনন্দ লাগতো। সেদিন জোয়ান দুই ছোকরা এসে তাদের বেশ কয়েকটি হত্যা করলো। কী যে কষ্ট লেগেছে আমাদের? দূর থেকে দেখেছি কেবল সামনে গিয়ে বাঁচাবার সুযোগ ছিল না।
ঠিক বলেছো। আমরা সৃষ্টি জগতের কত উপকার করে যাচ্ছি আর মানুষ আমাদের অনিষ্ট করে কেবল।
চিন্তা করো না এখন দেশের অনেক ভাল মানুষ আমাদের নিয়ে ভাবেন। কিভাবে তুমি, আমি বাঁচবো গভীর চিন্তা করছেন।
আমরা না থাকলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হবে আর তাতে মানুষই বেশি কষ্ট পাবে। মৌ মনি ঘাসুকে সাহস দেয়।
একসময় মৌ মনি আর ঘাসু দুই বন্ধুর মিতালী আকাশে নীল মেঘে গিয়ে পৌঁছে। আকাশ নীল রং তাদের উপহার দেয়। সাথে দেয় এক গুচ্ছ টুকরো পরশ মেঘ।ঘাস ফড়িং আর মৌ মনির মিতালি ইছামতি নদীর ধারে কাশবনে লুকোচুরি খেলে।