একটি শব্দের বানান নিয়ে দ্বিধা সংশয়ে পড়েছি। শব্দটি হলো ‘ভেঙে / ভেঙ্গে’। কখন ভেঙে হবে আর কখন ভেঙ্গে হবে-এ প্রসঙ্গে যথাযথ নির্দেশনা খুঁজে বের করতে চেষ্টা করেছি। অধীত জ্ঞানের ভাণ্ডার অবমুক্ত করে এবং শব্দপ্রয়োগের ধরন দেখে যে ধারণাটি হয়েছে তা বেশ মজারই বটে। যে জিনিসটি ভেঙ্গে টুকরো করা যায় তার বানান হবে ভেঙ্গে-মানে উঁঅ-র পরে ‘গ’যুক্ত হবে। যেমন ইট ভেঙ্গে টুকরো করা। আর যে জিনিসটি ভাঙলেও টুকরো হয় না সেটির বানান হবে ভেঙে-মানে উঁঅ-র পরে ‘গ’যুক্ত না করে। যেমন মন ভাঙা। নির্দেশনাটি চমৎকার লাগলেও সূত্রটি কিন্তু হুট করে বলা সহজ নয়। তবে একেবারে যে শেকড়হীন তাও নয়।

বাংলা একাডেমি’র প্রমিত বাংলা বানানের নিয়মের মধ্যে এই সূত্রটি আমি পাই নি কোথাও। বানান অভিধানের ‘ঙ’ অধ্যায়ে একটি বর্ণনা রয়েছে শুধু। তাও অনুস্বার আর ঙ এর ব্যবহার নিয়ে। যেহেতু ঙ দিয়ে বাংলায় কোনো শব্দের সূচনা হয় না সেহেতু তার অবস্থান শব্দের মাঝে অথবা শেষে। এ কারণে অভিধানের ঙ অধ্যায়ে কোনো শব্দ না থাকাটাই স্বাভাবিক। যদিও সুকুমার রায় তাঁর একটি ছড়ায় লিখেছেন:

‘ব্যাঙ খায় ফরাসিরা খেতে নয় মন্দ / বার্মার ঙাপ্পিতে বাপরে কি গন্ধ’। এই ‘ঙাপ্পি’ই বাংলা ভাষায় ঙ দিয়ে সূচিত একমাত্র শব্দ। ঙাপ্পি হলো চিংড়ি মাছ দিয়ে তৈরি এক ধরনের চাটনি। এর গন্ধ তো ছড়ার পংক্তিতেই স্পষ্ট। বানানের নিয়মের ঙ অধ্যায়ের বর্ণনায় রয়েছে: ঙ বাংলা বর্ণমালার পঞ্চম ব্যঞ্জনবর্ণ এবং ক-বর্গের নাসিক্য ধ্বনির দ্যোতক। ঙ এবং ং ধ্বনি অভিন্ন। স্বতন্ত্র বর্ণরূপে ঙ-র পরিবর্তে ং লেখা বিধেয়, কিন্তু স্বরাশ্রিত হলে ঙ লেখা বিধেয়। সন্ধিতে ক খ গ ঘ-র পরে পদের অন্তস্থিত ম্ -স্থানে ং লেখা অথবা বিকল্পে ঙ লেখা বিধেয়। উঁঅ বলেছি বটে। সবাই এই নামেই চেনে বা জানে বলে। আসলে বর্ণটির নাম হওয়া উচিত অঙ্। ব্যাঙ-এর উচ্চারণে আমরা তারই প্রমাণ দিচ্ছি। ব্যাঙ-কে কেউ কি ব্যাঁও বলে? মনে হয় না। সুতরাং উচ্চারণ করি অঙ্ অথচ নাম রেখেছি উঁঅ-বিষয়টা যৌক্তিক মনে করি না। এই বর্ণনায় আমাদের সমস্যার সমাধান কতোটা হলো-ভেবে দেখার বিষয়।

বাংলা বানান অভিধানেরই পরিশিষ্টের ১.০৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: ক খ গ ঘ পরে থাকলে পদের অন্তস্থিত ম্ স্থানে অনুস্বার (ং) লেখা যাবে। যেমন: অহংকার, ভয়ংকর, সংগীত, শুভংকর, হৃদয়ংগম, সংঘটন। বিকল্পে ঙ লেখা যাবে। ক্ষ-এর পূর্বে ঙ্ হবে। যেমন: আকাঙ্ক্ষা। এই নিয়মের মধ্যে প্রচণ্ডরকমের দুর্বলতার বিষয়টি একেবারেই অস্পষ্ট নয়। তাহলে সমাধান কী? পরিশিষ্টের ২.১০ অনুচ্ছেদের শরণাপন্ন হলাম। ং,ঙ অধ্যায়ে লেখা হয়েছে: তৎসম শব্দে ং ঙ যেখানে যেমন ব্যবহার্য ও ব্যাকরণসম্মত সেইভাবে ব্যবহার করতে হবে। … তদ্ভব, দেশী, বিদেশী, মিশ্র শব্দের বানানের ক্ষেত্রে ওই নিয়মের বাধ্যবাধকতা নেই। তবে এই ক্ষেত্রে প্রত্যয় ও বিভক্তিহীন শব্দের শেষে সাধারণভাবে অনুস্বার ব্যবহৃত হবে। যেমন রং, সং, পালং, ঢং, রাং,গাং। তবে শব্দে অব্যয় বা বিভক্তিযুক্ত হলে কিংবা পদের মধ্যে বা শেষে স্বরচিহ্ন থাকলে ঙ হবে। আরেকটু সহজ করে বলা যায় যে অনুস্বারের সঙ্গে স্বর যুক্ত হলে ঙ হবে। যেমন: বাঙালি, ভাঙা, রঙিন, রঙের ইত্যাদি। তবে অভিধানে দেখেছি ঢঙি এবং ঢঙ্গি–দুটোই আছে। অর্থগত বৈচিত্র রয়েছে কিনা; বিদগ্ধজনের মননে টোকা দেওয়ার বিষয়।

এবার আমরা একটু কাছাকাছি এসেছি বলে মনে হয়। কিন্তু উদাহরণে উদ্ধৃত ‘ভাঙা’ কি বাঁধ ভাঙা নাকি মন ভাঙা-বোঝা মুশকিল। দুই ভাঙা যদি অভিন্ন রকমের হতো তাহলে তো ল্যাঠা চুকে যেত। কিন্তু বাঁধ ভাঙলে তো আমরা দেখি এবং তা মেরামতের কাজে যে যার মতো লেগে পড়ি। মন ভাঙলে কি দেখা যায়? যায় না। তাহলে একটু পার্থক্য বোধ হয় অনুমান করা যায়। সেটা হলো একটি ভাঙা ক্রিয়ার পর্যায়ে পড়ে আরেক ভাঙা অনুভবের পর্যায়ে পড়ে। সুতরাং যে ভাঙন দৃষ্টিগ্রাহ্য সেই ভাঙনকে অনভূতিগ্রাহ্য ভাঙন থেকে আলাদা করা যেতেই পারে। এরকম চিন্তা থেকে আমরা যদি ঘুম ভাঙা, মন ভাঙা, আকাশ ভাঙা ইত্যাদিকে শুধুই উঁঅ/অঙ্ (ঙ) দিয়ে লেখি তাহলে ভুল হয় না। আর কাঁচ ভাঙ্গা, প্লেট ভাঙ্গা, আর পাড় ভাঙ্গাকে একটু কষ্ট করে ঙ-এর সঙ্গে গ যুক্ত করে লিখলে মনে হয় ভাঙ্গনটা বুকে ধুক করে লেগে যায়। কিন্তু তাতেও সমাধান হয়ে যায় নাকি! কেননা স্বয়ং বাংলা একাডেমির বানান অভিধানে লেখা হয়েছে ভাঙচুর, ভাঙন, ভাঙাগড়া, ভাঙাচোরা ইত্যাদি। এই বানানগুলোর ভাঙনকে যদি দৃষ্টি-অগ্রাহ্য করা যেত তাহলে সমাধান হয়ে যেত। কেননা এরপরই ‘ভাঙ্গি’ শব্দটি উঁঅ-র সঙ্গে গ যোগে লেখা হয়েছে। অভিধানে ভাঙা/ভাঙ্গা, ভাঙানি/ভাঙ্গানি এরকম আরও অনেক শব্দ অভিন্ন অর্থে দু’রকমেই লেখা হয়েছে।

উঁঅ/অঙ্-টা আসলে ঝামেলার। এ কারণে বেশ কয়েকবার বাংলা বর্ণমালা থেকে এই আপদটাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার চেষ্টা চালানো হয়েছিল। ১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা একাডেমির বানান সংস্কার কমিটি উঁঅ/অঙ্-সহ আরও কয়েকটি বর্ণ ও কারচিহ্ন বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। ১৯৬৭-তেও বাংলা বানান সংস্কার ও সরলায়ন কমিটি বর্ণ ও কার চিহ্ন বাদ দেওয়ার তালিকাটিকে আরেকটু দীর্ঘ করেছিল। এরপর ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বাংলা বানানের নিয়ম সমিতি’ও এই বর্ণটিকে বাংলা বর্ণমালা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছে।

ও যাবে না। জ্বালিয়েই যাবে আমাদের। বাংলা একাডেমির বর্তমান বানান অভিধানে যে রীতি অনুসৃত হয়েছে তাতেও ক খ গ ঘ এবং ক্ষ-র পূর্বে নাসিক্যবর্ণ যুক্তকরণের জন্য সর্বত্র ঙ লেখা হয়েছে। এই নিয়ম পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্বভারতীর নিয়মের সঙ্গে অভিন্ন। যতই অভিন্ন হোক না কেন আমার হাত থেকে কফির মগটা পড়ে ভেঙ্গে গেলে আমার মনটাও তো ভেঙে যাবে। এই দুই ভাঙনে উঁঅ/অঙ্ কখন নি:সঙ্গ থাকবে আর কখন গ-য়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে থাকবে-সে সমস্যার সমাধান হলো কই।

আরেকটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করাটা অত্যুক্তি হবে না বলে মনে করছি। সেটা হলো বাংলায় ক চ ট ত প এই পাঁচটি বর্গের শেষে পাঁচটি নাসিক্য ব্যঞ্জনবর্ণ রয়েছে। সহজ নিয়ম হলো যে বর্গের শেষে যে নাসিক্য ব্যঞ্জন রয়েছে সেই বর্গের যে-কোনো বর্ণের শেষে ওই নাসিক্য ব্যঞ্জনবর্ণটিই যুক্ত হবে। এখানে আমি প্রসঙ্গ এবং ব্যঞ্জন শব্দ দুটি প্রয়োগ করেছি। ‘প্রসঙ্গ’-এ গ যুক্ত হয়েছে নাসিক্য ব্যঞ্জনের সঙ্গে। গ যেহেতু ক বর্গীয় বর্ণ সেহেতু এর সঙ্গে ঙ যুক্ত হয়েছে। আবার ‘ব্যঞ্জন’-এ জ-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইঁয় (্ঞ)। কারণ জ হলো চ-বর্গীয় বর্ণ।আর চ-বর্গের শেষের নাসিক্য বর্ণ হলো ইঁয়। তাই ইঁয় যুক্ত হয়েছে। অন্যান্য বর্গের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।

আসলে অভিধানে নজর রাখলে শব্দের বানানের রং ও রূপ আমাদের ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয় নি:সঙ্গ ঙ এবং গ-যুক্ত ঙ দুটো বানানই শুদ্ধ। সেক্ষেত্রে আমরা প্রস্তাব করবো যেসব শব্দ দুইরকম বানানে অভিন্ন অর্থ বহন করে সেসব বানানের জটিলতা দূর করার স্বার্থে একটিকে নির্ধারণ করে দেওয়া হোক।বানানকে সহজ করে তোলার স্বার্থে যুক্তবর্ণসহ ফলা-গুলো (ব-ফলা, ম-ফলা, য-ফলা ইত্যাদি) বাদ দেওয়া যায় কিনা;ভেবে দেখা হোক।একই শব্দের হ্রস্ব ও দীর্ঘ বানানের জটিলতা দূর করে সহজ করা হোক। যেমনটি তৎসম শব্দে হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বরচিহ্নের হ্রস্বটিকেই বিধেয় করা হয়েছে। বাংলা বানানের জটিলতা দূর করতে বিশেষজ্ঞ মহল বিষয়টি নিয়ে ভাববেন এ প্রত্যাশা করছি।

[বি.দ্র: অনুস্বার এবং ইঁয় বর্ণ দুটি আলাদা লিখতে গেলে তার আগে ডটের একটি বৃত্ত এসে যায়। ওই বৃত্তটিকে বাদ দিয়ে পড়লেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।]