ডাক শুনে ফিরে তাকাল বাতাস। এ পথেই উড়ে যাচ্ছিল। এমনি করেই যায় রোজ। তবে আজকের যাওয়া আর অন্যদিনের যাওয়ার মধ্যে কিসের যেন গন্ধ পেল ওরা। তাই ডাকাডাকি। হাতে একেবারেই সময় কম, কি কথা, বলে ফেল ঝটপট, বাতাসের সাফ জবাব। নীলাপরী আর ধলাপরী চোখ দেখাদেখি করল। ওরা দুজন সই। এক সাথেই থাকে। ওড়াউড়ি জোড়া বেঁধেই করে। বাগান থেকে বাগানে যায় হাত ধরাধরি করে। দেশ থেকে দেশান্তরেও জোড়া বেঁধেই উড়াল দেয়। জায়গাটা বেশ সুনসান। নাম নাজানা দু’চারটা ফুলও ফোটে এদিক সেদিক। সময় পেলেই দুজন উড়ে এখানে বসে, ফুল ছিঁড়ে খোঁপায় গোঁজে, নাচেও মাঝে মধ্যে।
কি বলবে জলদি বলো কিছুটা উঁচুস্বরেই বাতাস কথাটা ছুঁড়ে মারল পরীদের দিকে। নীলা আর ধলা বুঝতে পারল না বাতাসের কী এমন তাড়া। অন্য সময় তো অচিন মুশিকের গল্প শোনায়। পাশে বসে, উম দেয়। মনটা তখন ফুরফুরে হয়ে যায়। বাতাসেরও এ কেমন ব্যবহার আজ। তাই দুই পরী একাসাথেই প্রশ্ন করে বসল, কিসের এত তাড়া তোমার? গল্প না শুনিয়েই চলে যাচ্ছ যে। বাতাস অবাক হয়ে জবাব দিলো, কেন? তোমরা কিছু শোননি?
না না। নীলা আর ধলা উত্তর দিয়েই বাতাসের চোখে চোখ ঘষলো। বাতাস একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল চাঁদকে পাওয়া যাচ্ছে না। বাতাসের চেহারায় তখন টুকটুক করে হেঁটে যাচ্ছে ক্লান্তির ছায়া।
এমন হতচ্ছড়া খবর শুনে নীলা আর ধলাতো হেসেই লাল। চাঁদকে পাওয়া যাচ্ছে না এ আবার কেমন বার্তা দিলে হে বাতাস। চাঁদ যাবে কোথায়। দেখগে তারাদের ঘরে জ্যাম্পেশ আড্ডা জমিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া চাঁদের ঐ বুড়ি আছে না সেতো আবার গপ্পে উস্তাদ। আর একটু ওপরে উঠো ঠিক ঠিক চাঁদের সন্ধান মিলে যাবে।
পরীদের বকবকানিতে বাতাস বিরক্ত হয়ে বললো তোমরা কি ভেবেছো এসব জায়গায় তালাশ বাদ রেখেছি? কোথাও নাই। চাঁদকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব পড়েছে আবার আমার উপর। কাল ঈদ। ওকে না পাওয়া গেলেতো সব খুশিই বরবাদ। বাতাসের কপালে চিন্তার রেখা। বিন্দু বিন্দু ঘামও বসে আছে সেখানটায়।
পরীরা বিচলিত হয়ে উঠলো। তাইতো, এত সময় ওদের মনেই ছিলো না ঈদের কথা। ঈদের চেহারা মনে আসতেই খুশি খুশি লাগছে ওদের। ডানাগুলো ঝাপটা দিলো বারকয়েক, আনন্দে। কিন্তু চাঁদ নিখোঁজ হলেতো মুশকিলের ব্যাপার। ঈদের কি হবে। ঈদের খবরতো ঐ চাঁদই নিয়ে আসে, একটা মুচকি হাসি ছড়িয়ে দিয়ে। আর সেই হাসি তখন ঠোঁট থেকে ঠোঁটে লাগতে থাকে।
নীলাপরী ধলাপরীকে জড়িয়ে ধরে একরকম নাচতেই শুরু করলো। দু’জনার পায়ের নূপুরে রিনিক ঝিনিক শব্দ। পরীদের স্বভাবটাই যেন কেমন। শুধু হাসে আর নাচে। এতো হাসি পছন্দ নয় বাতাসের। তাছাড়া এমন একটা দুঃসংবাদ শুনেও কেমন হাসছে ওরা। যতোসব। বাতাস বললো আমি যাচ্ছি তাহলে, তোমরা হাস-নাচ বলেই বইতে শুরু করলো। বাতাসের কথায় পরীরা রীতিমতো লজ্জা পেয়ে পাশাপাশি উড়তে লাগলো। ওদেরওতো একটা দায়-দায়িত্ব আছে। চাঁদ যদি নিখোঁজই থাকে তাহলে ঈদতো একেবারেই মাটি।
নীলা-ধলা-বাতাস উড়ছেতো উড়ছেই। আর ইতিউতি নজর ফেলছে চাঁদের খোঁজে। নাহ! কোথাও চাঁদের দেখা নাই। মেঘ উড়ে উড়ে যাচ্ছে। নীলাপরীর পাখায় দু’একবার ধাক্কা খেলো মেঘ। কাত হয়ে পড়তে পড়তে নিজকে সামলে নিলো নীলা। তারাদের চোখ ঘুমে ঢুলুঢুল। আবছা আঁধারে দেখাও যাচ্ছে না সব কিছু। কেবল ওদের তিনজনার চোখে ঘুম নাই। বাতাসের কপালে চিন্তার ভাঁজ। ঠোঁট কামড়াচ্ছে বারবার। পরীরাও বিচলিত। হাতে সময় নাই একদম। ফজর হয় হয়। ওরা চলার গতি বাড়িয়ে দিলো। পাখা দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলো একদঙ্গল মেঘ। এক্কেবারের শেষের মেঘটিকে নীলাপরী ডেকে বললো, ও ভাই মেঘ তোমরা কি আশেপাশে চাঁদকে দেখেছো? আমরা তাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান। বাতাস আর ধলাপরী নীলার কথায় সায় দিলো।
চাঁদকে দেখিনি তবে পথে শুনে এলাম তাকে নিয়ে আলাপ হচ্ছে। দু’একবার চাঁদের নামটা কানে এসেছিলো, বলেই মেঘ চলতে শুরু করলো। বাতাস নীলা আর ধলাতো নেচে উঠলো আনন্দে। মনের বাগিচায় খুশির প্রজাপতি। মেঘকে ঘিরে ধরলো এরা তিনজন। কি আর করা, দাঁড়াতেই হলো।
আর কি জানতে চাও চটজলদি বলে ফেলো দেখি। আমার আবার উত্তরে যেতে হচ্ছে। সেখানে বৃষ্টি ঢালতে হবে। ঐবেটা সূর্য নাকি রোদ ঢেলে ঢেলে জমিনগুলোকে যাচ্ছেতাই করে রেখেছে। পানি না খেলে ওসবে কোনো ফসলই ফলবে না, বলেই পরী আর বাতাসের চোখে চোখ দিলো মেঘ। বাতাস তখন আরো একটু কাছে ঘেঁষে জানতে চাইলো চাঁদের নামটা সে আকাশের কোন এলাকায় শুনে এসেছে। মেঘের আর ত্বর সইছিলো না। তাই সোজাসাপটা বলে দিলো, নাক বরাবর সাড়ে তের কিলো যাবে তারপর বাঁয়ে বাঁয়ে ঘুরে যাবে আরো পাঁচ কিলো, এরপর দেখবে একটা মস্ত সুড়ঙ্গ। সেই সুড়ঙ্গ পথের শেষ মাথায় বিশাল বাগান। শুধু ফুল আর ফুল। দক্ষিণের কোণাটায় দেখবে ইয়া বড় একটা চম্পাগাছ। তামাম ডালপালা ফুলে ফুলে ছাওয়া। পাতা আর দেখা যায় না। ফুলের পাপড়িরা সব ঢেকে বসে আছে। সে পথ দিয়ে উড়ে আসার সময় চাঁদের নামটা কানে এলো। তোমরা ওখানটায় গিয়ে খোঁজ করতে পারো। নীলা-ধলা আর বাতাস সময় নষ্ট না করে উড়াল দেয় মেঘের বলে দেয়া ঠিকানার দিকে। পরীদের পাখা থেকে পিছলে পিছলে পড়ে যাচ্ছে কুয়াশা। দৌড়ে যাচ্ছে আঁধারও পাশ দিয়ে। ডানে বাঁয়ে ঘুরে সুড়ঙ্গের মুখটায় পৌঁছে গেলো ওরা তিনজন মুহূর্তে। সারা সুড়ঙ্গ জুড়েই সুগন্ধি আর সুগন্ধি। সেই সুগন্ধি নাকেমুখে মাখতে মাখতে শেষমাথায় গিয়ে হাজির হলো। ইয়া চৌড়া সুড়ঙ্গ। তাই চলতে ফিরতে তেমন কোনো ঝামেলাই হয়নি ওদের। পথটি কিছুটা অন্ধকার অন্ধকার এই যা। কানের কাছ দিয়ে দু’চারটি বাদুড় গেলো। মাকড়সাও আছে কিনা কে জানে। ধলার আবার মাকড়সায় ভয় দারুণ। তাই বাতাস যাচ্ছে আগে আগে। মেঘ মিথ্যে বলেনি। ইয়া বড় বাগান, চোখের সীমানায় কেবল ফুল আর ফুল। কতো কিসিমের যে ফুল তা গুনে শেষ করা যাবে না। গোনাগুনির চিন্তা ওদের দেমাগেই আসেনি। এখন মাথায় শুধু চাঁদ। অন্য সময় হলে হয়তো এতো ফুলের সমাবেশ দেখে নাচই জুড়ে দিতো নীলা-ধলা। সময়টা এখন অন্যরকম। লোভটা সামলে নিলো ওরা দু’জনে। বেচারা বাতাসের মুখেও কথা ফুটতে চাইছে না। বেশুমার ফুল দেখে। কতো যে রঙ। এমন হলেও মুশকিল। তাই বাতাস মনটাকে বশে আনার জন্যে মাথাটাকে ডানে-বাঁয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে একটা বড় ফুলকে জিজ্ঞেস করলো- বোন ফুল, তুমি কি চাঁদের খবর জানো? এখানে নাকি কারা চাঁদকে নিয়ে আলাপ আলোচনা করেছে। আমরা চাঁদকে খুঁজে খুঁজে একেবারে জেরবার। জানালে খুবই উপকারে আসতো। বাতাসের শরীর থেকে হালকা হাওয়া বেরিয়ে পড়ছে বারবার। তাতে করে ফুলেরা দুলছে ডগাসমেত। সারা বাগানজুড়ে বয়ে যাচ্ছে ফুলের ঢেউ। লাল নীল হলুদ বেগুনি ঢেউয়ের মাতোয়ারা বাগান। ওরা তিনজন দাঁড়িয়ে আছে জবাবের অপেক্ষায়। বুকের ভিতর একটা নাম না জানা দাপাদাপি। এই যখন অবস্থা তখন ছোট্ট একটি বেগুনি ফুল ওদেরকে ডাকলো কাছে। ধলাপরী এগিয়ে গেলো, পিছনে এরা দু’জন। বেগুনি রঙের ছোট্ট ফুলটি বারকয়েক সাথীদের চোখে চোখ রাখলো। বড় একটি ঢোক গিলে বললো ঐ যে দূরে চম্পাগাছটি দেখছো ফুলে ফুলে আটকে আছে, এখানটায় ঘুমিয়ে আছে চাঁদ। ওতো মাঝে মধ্যেই ওখানে আসে। চম্পাদের সাথে আড্ডা জমায়। ঘুমায়। চম্পাফুলের রঙ চাঁদের মতো কিনা, তাই চাঁদের খুব ভাব ওদের সাথে। আর কিছু জানার অপেক্ষা না করে উড়াল দিলো বাতাস চম্পাগাছের দিকে। কি আর করা, নীলাপরী আর ধলাপরীও বাতাসকে অনুসরণ করলো। ওরা গিয়ে দেখে বাতাসের ঝাপটায় ফুলের মাখন রঙের পাপড়িগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। কোনোটি পাতায় কোনোটি ডালে আর অন্যগুলো নিচে, বাগানে।
এরিমধ্যে চাঁদের শরীর বেরিয়ে পড়েছে। পরীদের ফিসফাস আওয়াজ আর বাতাসের ঝাপটায় জেগে গেলো চাঁদ। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসলো। এদিকে বাতাসের আর ত্বর সইছে না। সময়ও দৌড়ে যাচ্ছে দ্রুত। সূর্য ঘরে ফিরে যাবার আগেই চাঁদকে নিয়ে পৌঁছতে হবে আকাশের পশ্চিম কোণায় ঐ শেষ মাথাটায়। সেখানকার লাল-সাদা বিছানায় বসিয়ে দিয়ে আসতে হবে। দুনিয়াজোড়া মানুষ অপেক্ষা করছে তার জন্য। কেউ ছাদে কেউ গাছতলায় কেউ আবার খোলা মাঠে। বাতাস পরীদের দিকে তাকিয়ে নিলো কয়েকবার তারপর চাঁদের চোখে চোখ রেখে বেশ রাগত স্বরেই বলে বসলো, তুমি কেমন বেয়াক্কেল হে চাঁদ, কাল ঈদ আর তুমি কিনা এখানে এসে দিব্বি ঘুমাচ্ছো। ফুলের সুবাস মাখছো শরীরে। আর আমরা খুঁজতে খুঁজতে সারা আকাশ চষে বেড়াচ্ছি। মেঘের সাথে দেখা না হলেতো মহাবিপদই ঘটে যেতো দেখছি। আর ঘুম নয়, জলদি মুখ হাত পরিষ্কার করে তৈরি হও। চম্পাফুলরা অপরাধীর মতো তাকিয়ে আছে। আর আড়চোখে দেখছে পরীদের ডানায় আটকে থাকা আলপনা। চাঁদ বলতে চাচ্ছিলো কিছু একটা, বাতাস সুযোগ না দিয়ে তৈরি হবার তাকিদ দিলো আবার।
আস্তে ধীরে তৈরি হচ্ছে চাঁদ। বাতাসের চোখে মহৎ গুণ। তাই বাতাস ধৈর্যের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থেকে তার সেই মহত্বের খবরটি চাঁদের সামনেও টাংগিয়ে দিলো। ধীরে সুস্থে সাফ-সুতর হয়ে চাঁদ চম্পাগাছের ডাল থেকে নামলো। বাতাসের উড়না ফরফর করে উড়ছে। তাহলে সে তার দায়িত্বে ঠিকঠাকভাবেই পালন করতে পেরেছে। দায়িত্বের মুখোমুখি হয়ে নীলাপরী আর ধলাপরীতো খুশিতে বাগবাগ। ঈদের খুশবু যেনো উড়ছে ওদের আশপাশে। পালকে লেগে থাকা শিশিরে কিছু কণা ঝেড়ে নিলো এ অবসরে। উড়তে উড়তে ধলার এক পায়ের নূপুরে বাঁধন কিছুটা খসে গিয়েছিলো, সেটি ঠিকঠাক করে কয়েকটি চম্পা ফুল তুলে খোঁপায় গাঁথলো। চম্পাবনে নীলাও দিশেহারা। চাঁদের শরীর থেকে তখন চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে চম্পার সুবাস। চাঁদ চলতে গিয়েও আবার ধপাস করে বসে পড়লো গাছতলায়। তার মাথা ঘুরছে, ঝাপসা হয়ে আসছে চোখযুগল। চোখের পাতাগুলোও কাঁপছে থিরথির। চাঁদের সামনে তখন সারা দুনিয়া, ছবির মতো, উত্তর থেকে দক্ষিণে দৌড়াচ্ছে। আবার দৌড়ে যাচ্ছে পশ্চিম থেকে পুবে। চাঁদ বুঝতে পারছে না এর কারণ। কেনো এমন হচ্ছে, গোলমালটা কোথায়। গত কয়দিন যাবত এই ঝিমধরা বেরামটা যেনো পেয়ে বসেছে চাঁদকে।
এদিকে চাঁদের বুড়ি হাঁকডাক শুরু করে দিয়েছে। তার আবার গরম একেবারেই অসহ্য। তাছাড়া গত কয়দিন যাবত ঘরে পান-সুপারির ভাণ্ড খালি। পানের বাটায় পান নাই, সুপারি নাই। কিছু জরদা তলানি হিসাবে পড়ে আছে। তাতে বুড়ির চান্দি গরম। মেঘ চাঁদের কানে কানে বললো, ভাইয়া, এবার চলো তোমার চরকা বুড়ি ক্ষেপেছে। চলতে চলতে আলাপ করা যাবে। ওরা দু’জন সামনের দিকে পা বাড়াল। একটি ধূমকেতু লেজ নাড়তে নাড়তে কোথায় যেনো যাচ্ছে। রাজারাজা ভাব নিয়ে চলছে ও। উপর থেকে তারাদের টুকটাক কথাবার্তাও কানে আসছে।
মেঘ আর চাঁদ চলছে গায়ে গায়ে। দু’জনই চুপচাপ। তবে চাঁদের চোখের জমিনে নানা প্রশ্নের দৌড়াদৌড়ি। উড়ে উড়ে যাচ্ছে দু’জন। মেঘ আড়চোখে বুড়ির অবস্থানটা একবার পরখ করে নিলো। নাহ, বুড়ি শুয়ে আছে চুপচাপ। এই সুযোগে চাঁদকে ইশারায় ডাকল মেঘ। চাঁদের মগজে তখন নানান তোলপাড়। শিশুদের কান্নাকাটি মানুষের আহাজারি, ঘরদোর ভেঙে পড়ার শব্দ। মেঘের ডাক শোনে। শরীরে একটা হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে মাথাটা বাড়িয়ে দিলো এর দিকে। মেঘ এমনিতেই কথা বেশি বলে, পাশ দিয়ে কথা বলা তার একটা স্বভাব। ওদের পাশ দিয়ে শাঁ শাঁ করে চলে গেলো পাথরের মতো কি যেনো একটা। নুড়ির মতো কয়েকটি টুকরো মেঘের গায়ে এসে ধাক্কা লাগলো। তাতে করে দুয়েক ফোঁটা বৃষ্টি ঝর ঝর করে নিচে পড়ে গেলো। ওপাশ দিয়ে আবার আগুনের একটা ফুলকি কোথায় যেনো চলে যাচ্ছে দ্রুত। ঘাড় কাত করে মেঘ দেখলো এদেরকে। তারপর চারদিকে একরকম ইশারায় বললো শোন চাঁদভাইয়া আমরা এখন যে অঞ্চলটির ওপর দিয়ে যাচ্ছি এটির নাম হলো ইরাক। প্রায় হাজার বছর আগে এই এলাকার কারবালায় মস্ত বড় একটা সমর হয়েছিলো। তখন রক্ত আর রক্ত। রক্তে পাশের ফুরাত নদী টইটম্বুর হয়ে উঠেছিলো। এদেশের মারামারি কাটাকাটি যেনো লেগেই থাকে, আর ঐ যে পিছনের পাহাড়ে আগুন জ্বলছে ওটির নাম হলো গিয়ে আফগানিস্তান। ওখানেতো মারামারি, খুনাখুনি বহুদিন থেকে। কান্নাকাটি শুনলে না? চাঁদ তখন চুপচাপ। তার চোখে পানি টলমল করছে। মেঘের কিন্তু সে দিকে খেয়াল নেই। সে বকবক করেই যাচ্ছে, কি যেনো নাম এলাকাটার। ও মনে পড়েছে ফিলিস্তিন। সেই দেশেতো এলাহি কাণ্ড। বেচারা আজরাঈল তার গায়ের ঘাম মুছারও সময় পাচ্ছে না। বোমার পর বোমা, গুলির পর গুলি, রকেটের টুকরাগুলি এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে কলিজা, মাথা। ফিলিস্তিনের ওপর দিয়ে উড়ে গেলে আমার মনে হবে ওটি মস্ত একটি কবরখানা।
চাঁদ এতসময় মেঘের জবাব শুনে যাচ্ছিলো। চাঁদ আনন্দের সংবাদ শুনতে চায়। শুনতে চায় খুশির কথা। মেঘ এসব কিসের খবর দিচ্ছে। চাঁদ মেঘকে ডেকে বললো এবার থামতো, সহ্য করতে কষ্ট হচ্ছে। মেঘ দেখলো সত্যিকার চাঁদের চোখ টলমল করছে। মেঘ চুপ মেরে গেলো। দু’জন পাশাপাশি উড়ছে। শব্দহীন।
সাঁই সাঁই করে দৌড়ে চলে গেলো। একটি লেজওয়ালা উলকা, মেঘের ডানপাশ দিয়ে। উলকার দৌড়ে যাবার শব্দে মেঘের ঝিমুনিটা ছুটে গেলো। আড়মোড়া ভেঙে ফের চাঁদকে ডাকলো মেঘ। কী ঘুমিয়ে পড়লে নাকি। নাহ শুনছি, বলেই চাঁদ মেঘের চোখে কথা আটকে দিলো। মেঘ বুঝলো এই সুযোগে কথা শুরু করা যায়। সেই কথামতো শুরুও করলো। চাঁদ বাধা দিতে গিয়েও চুপ থাকলো। আকাশের উত্তর কোণার বিশাল আমলকিগাছটিতো দেখছো কী বলো, মেঘের এমন প্রশ্নে চাঁদের মুখ থেকে একটা হুম শব্দ বেরিয়ে এলো। মেঘ তড় তড় করে বলতে থাকলো। সে দিন আমলকি গাছের মগডালটায় ঘুমানোর আয়োজন করছিলাম। এমন সময় দেখি কয়েকটি তারা মিলে ফিসফাস করছে। কান পাততেই শুনি ওরা বলাবলি করছে। দুনিয়ায় নাকি বুশ না ঠুশ নামের এক ডাকাত সরদার বাস করে। সে নাকি তার সাঙ্গ পাঙ্গ নিয়ে একেক সময় একেক জনপদে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সোনাদানা সম্পদ সব লুটপাট করে চম্পট দেয়। আর গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধায়। প্রতিবাদ করলে কচুকাটা করে। ওর হাত থেকে নাকি নারী শিশু বৃদ্ধ কারো নিস্তার নাই। শুকুনের মতো তার চাউনি, তার জিহ্বা আর সাপের জিহ্বার মাঝে নাকি কোনো তফাৎ নাই।
রাজাদের হাঁকডাকে তন্দ্রা ছুটে গেলো চাঁদের। চোখ খুলে দেখে সম্য দৃশ্য। বাতাস, নীলাপরী, ধলাপরী তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখছে তিন জোড়া চোখ। পরীদের ঠোঁটের হাসি চড়–ইপাখির মতো উড়ছে। মাথার কাছে চম্পাগাছ। কোথায় আমলকি কোথায় মেঘ, লড়াই, যুদ্ধ। চাঁদ বুঝতে পারলো সবই ছিলো স্বপ্ন। গত রাতের ঘুমটা ঠিক যুতসই হয়নি। এ দিকে বাতাসের আর অপেক্ষ্ াসহ্য হচ্ছে না। সূর্য ফিরে যাচ্ছে তার বাড়িতে। চাঁদকে সাথে করে সময় মতো পৌঁছতে না পারলে মহাকেলেংকারী ঘটে যাবে। হাতে সময় নেই বললেই চলে। বাতাস সুর নরম করলো, গরম বড় বালাই। চাঁদের মাথায় পিঠে আদর করে বললো চল ভাইয়া আর দেরি নয়। তোমার জন্য রাজ্যের মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আমার দেখা না পেলেতো আনন্দ থৈ থৈ করে নাচবে না। নূপুর বাজবে না। ঈদও হবে না কাল। শুনছি সারা দুনিয়া জুড়েই নাকি কান্না আর কান্না। শান্তির চেরাগ নাকি নিভে আর জ্বলে। এতো কান্নায় আর অশান্তিতে আনন্দের স্থান কোথায়। চাঁদের এমন হতাশমাখা কথায় বাতাস মুচকি হেসে জবাব দিলো। কান্নার আর এক পিঠেই তো আনন্দের ঘরবাড়ি। তাছাড়া কান্না না থাকলেতো আনন্দের মজাটাই কেরেসিন। তাই কান্নার পর হাসির দরকার। আর এই হাসিটা হলে গিয়ে তুমি। চাঁদের কপালে আস্তে একটা টোকা দিলো বাতাস। কি যেনো ভেবে খুব সাবধানে বাতাসের পিঠে এসে বসলো চাঁদ। বাতাস আর সময় নষ্ট না করে উড়াল দিলো। দুই পাশে উড়ছে নীলাপরী আর ধলাপরী। ওরা যাচ্ছে পশ্চিমে। বাতাসের ঝাপটায় পেছনে দুলছে ফুলবাগ চম্পাবন।