শত ব্যস্ততার মাঝেও নতুন বই পড়ার লোভ সামলাতে পারি না। একুশের বইমেলা শেষ হওয়ার পর তিনটা উপন্যাস শেষ করলাম। বই কিনে যদি না পড়ি তাহলে কিনে লাভ কি? নতুন বইগুলোর লেখা কেমন? কি নিয়ে লেখা এগুলো আকর্ষিত করে আমায়।
এবারের ধারাবাহিকতায় তিন নম্বর উপন্যাসটি ছিল কাওসার পারভীন এর “দ্বীপান্তরে”।
আপাকে বলেছিলাম বইটি অবশ্যই পড়ে জানাবো। আজ শুধু আপাকে নয়, সবাইকে জানানোর জন্য লিখতে বসে গেলাম। নিজের অনুভূতি, উপন্যাসের কিছু ঘটনার ছটা একটু গুছিয়ে প্রকাশ করার প্রয়াস। যদিও লেখক লিখেন নিজের ভাবনা থেকে। একেকজন পাঠক একেকভাবে গ্রহণ করে। উপন্যাসটি আমি কিভাবে গ্রহণ করলাম সেটি লিখি।

সুন্দর প্রচ্ছদ ও বাইন্ডিং এর একটি বই হাতে নিয়ে প্রথমে আমি যা করি তা হচ্ছে এর প্রকাশকাল, প্রকাশনীর নাম, উৎসর্গ, প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম ও কাগজ কেমন?
সুন্দর একটি বই “দ্বীপান্তরে”
প্রকাশকাল, একুশের গ্রন্থমেলা ২০২০
প্রকাশনীঃ উষার দুয়ার
প্রচ্ছদ শিল্পীঃ মাহামুদুল হাসান আসিফ
বইটির মূল্যঃ ২৮০
ভালো মানের কাগজে, উন্নত বাইন্ডিং এ প্রচ্ছদ শিল্পীর ভাবনার সাথে কাওসার পারভীনের ” দ্বীপান্তরে” মিলে মিশে অপার মুগ্ধতায় পাঠকের মনকে আকৃষ্ট করবে যা আমাকে করেছে।

উপন্যাসের কয়েক পাতা পড়ার পর কৌতুহল ধরে রাখতে পারছিলাম না। শাহানারা কোথায় গেল? দিপ্তীময়ী এখানে কেন? বেহালা বাজায় কে? ভাবলাম শেষ কয়েক পাতা পড়ি কৌতুহল থাকবে না। সময় নিয়ে পরে আরমসে পড়বো। পরক্ষণেই ভাবলাম, চুরি করবো? বই পড়া নিয়ে চুরি? নাহ্, এসব আমাকে মানায় না। নিজেকেই নিজে শাষণ করলাম। মনযোগ দিয়ে সিরিয়ালি পড়া শুরু করলাম এবং শেষও করলাম। কোনো চুরি করিনি। আপা যদি এর ভেতর থেকে কিছু জানতে চায়, বলতে পারবো। এ কাজটিই মনে হয় আমি সবচেয়ে ভালো পারি।
যা হোক ফিরে যাই উপন্যাসে, তবে খুব সংক্ষিপ্তভাবে। আপনাদের পড়ার জন্য কিছু রাখতে হবে তো।
প্রথম দিকে লেখক এটি একটি রোমান্টিক আবহাওয়া দিয়ে শুরু করেছেন এবং বিয়ের আগের রাতে প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যায়। আহা! কি চমৎকার ভালোবাসা এখানে। কিন্তু ক্ষতি হলো এতে দিপ্তীময়ীর। বিয়ে বাড়িতে কনে নেই। বরযাত্রীর কানে এ খবর পৌঁছায় বাতাসের বেগের আগে।
বরপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয় ও বাড়ির আরেক মেয়েকে আনবে তাদের উড়নচন্ডি ছেলের জন্য। যদি বিয়ের পর স্থির হয়।

প্রবাদ আছে, “কয়লা ধুলে ময়লা যায় না”।আসলেই যায় না। মিহির তা প্রমাণ করেছে বারবার।
এদিকে শাহানারার শ্বশুরবাড়ির সবাই মেনে নিতে একটু সময় লাগলেও বেশ ভালোভাবে ওদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং উন্নতি হতে থাকে।
কপাল পুড়লো শুধু দিপ্তীময়ীর। যে কিনা পড়াশোনায় ভালো ছিল, স্বপ্ন ছিল, বোনের জন্য পাগল ছিল। অনিচ্ছায় বিয়ে হওয়ার পরও নিয়তি মেনে সব গুছিয়ে চলছিল। বুঝলো না শুধু নিয়তি, বুঝলো না সমাজের কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ।

একদিকে ধনাঢ্য আশরাফ চৌধুরী ছিলেন রাগী দাম্ভিক, অবয়বের আড়ালে মমতা লুকিয়ে রেখেছিলেন অপরদিকে মাহতাব চৌধুরী ছিলেন নরম মনের মানুষ । এসব কিছুর টানা পোড়েনে সফল একটি সামাজিক উপন্যাস “দ্বীপান্তরে”
একদিক থেকে ভাবলে উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দিপ্তীময়ী। আবার শাহানারাকেও সাইডে রাখা যায় না। ঋতুর ক্রমাগত পরিবর্তনের পাশাপাশি সবকিছুরই পরিবর্তন হচ্ছিল।

দিপ্তীময়ী কি পেয়েছিল তার প্রাপ্য মর্যাদা ? খুঁজে পেয়েছিল কি বোন শাহানারাকে? সে কি প্রেমিকের সাথেই গিয়েছেল নাকি কোনো দূর্ঘটনা? আর কুঠিবাড়িতে সেই বেহালা বাদক? কি তার পরিচয়? দিপ্তীময়ী সাথে তার কি কোনো সম্পর্ক ছিল?
আমি আমার কৌতুহল শেষ করেছি। এবার আপনাদের পালা।

ভালো লাগা কিছু উক্তিঃ

“প্রকৃতি মানুষকে ঠকায় না,এই যে গাছ- গাছালি, ওরাও শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়, ওদেরও জীবন আছে, শুধু কথা বলতে পারে না। মানুষকে নিঃস্বার্থ ভাবে ওরা দিয়ে যায়, অথচ হিংস্র মানবকুল ওদের উজার করতে দ্বিধাবোধ করে না।”

“দিপ্তীময়ীর জীবনটা নদীর কূল ভেঙে কূল গড়ার মত। পৃথিবীতে কত মেয়েদের চাওয়া পাওয়ার ব্যর্থ ইতিহাস আছে।দিপ্তীময়ীর পাশে বাবা ভাই দাঁড়িয়েছে , সবার জীবনে হয়তো এমন করে দাঁড়াবার কেউ নেই।”

“যেও না দিগন্ত। থেকে যাও এখানে, বাকি জীবনটা না হয় কাটিয়ে দেবো তোমার বেহালার সুর শুনে, কিন্তু কিছুই বলতে পারছে না দিপ্তীময়ী।”

ধন্যবাদ লেখককে চমৎকার পরিপাটি একটি উপন্যাস উপহার দেয়ার জন্য। তাঁর লেখনী হোক অনেকের অনুপ্রেরণা।
দিপ্তীময়ী, শাহানারা , ফওজিয়া , রিতার সাথে রয়েছে আরও অনেক চরিত্রের আনাগোনা।
তবুও বলতে পারি, কেউ পথ হারাবে না।