ব্রহ্মপুত্র নদীর মুখোমুখি রাসু সর্দারের বাড়ি। কালো কুচকুচে রঙের ইজিচেয়ারে বসে হুঁকো টানছে রাসু সর্দার। র্গু র্গু র্গু র্গু হুঁকোর শব্দটা বিরক্তিকর মনে হয়। অথচ নেশাটা বেশ চড়েছে। হুঁকোটার নল ছুঁড়ে ফেলে। গলা ছেড়ে ডাকে- মায়মুনা… মায়মুনা…

দৌড়ে আসে মেয়ে মায়মুনা! পাগলী হলেও বাপের ডাকে সব সময় দৌড়ে আসে। কিছু করতে পারুক বা না পারুক বাপের ভক্ত সে।

‘বা-বা-বা-বা’ জড়ানো ভাষায় বাপের কাছে এসে ডাকতে থাকে মায়মুনা।

মেয়েকে দেখে রাসু সর্দারের বিরক্তি রাগ খানিকটা প্রশমিত হয়। এ জীবনে মানুষের মঙ্গলামঙ্গল সে কম করেনি। হিন্দু জমিদারদের সঙ্গে লড়াই করে রক্ষা করেছে মুসলমানদের। মুসলিম লীগের স্বার্থে বহু মানুষের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, মাথা ফাটানো কম করেনি। আল্লাহ তার শাস্তি স্বরূপ মনে হয় এই মেয়েটিকে পাঠিয়েছেন। আইবুড়ো হয়েছে মেয়ে তার। কিন্তু বিয়ে দিয়ে শ্বশুর বাড়ি পাঠানো সম্ভব নয়। কিন্তু বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠানো সম্ভব নয়। সে যতদিন বেঁচে আছে ততদিন হয়তো এ মেয়ের কোন সমস্যা হবে না। কিন্তু মারা গেলে কী হবে এর ভবিষ্যৎ! বড় ছেলেটা পাগল, তার অবস্থা আরো খারাপ! নিজের কোন কাজই নিজে করতে পারে না। আর ছোটটা শয়তানের লাঠি।

কী সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে তার। একবার একটা সম্বন্ধ এসেছিল। চেনা জানার মধ্যেই। এক লাঠিয়াল সর্দারের পোলা। বিয়ে দিতে মন সায় দিলো না। একেত মেয়ে তার পাগলী। তার উপর লাঠিয়ানের পোলা। হোক শিক্ষিত। মেট্রিক পাস দিয়ে সুগার মিলে চাকুরি করে। খুব ধরাধরি করে। রাসু সর্দার অনড় থাকে। না, জীবন নিয়ে খেলা নয়। নিজের মেয়ে তো!

না, মা তোমার কিছু করন লাগবো না- আমিই আনতাছি। বলে রাসু সর্দার ইজিচেয়ার থেকে উঠে।

পুঁ… পুঁ… পুঁ… শব্দ করে উঠে চেয়ার থেকে। রাসু সর্দারের বয়স হইছে চেয়ারের হয় নাই? হইছে। অন্তত চল্লিশ বছর বয়স এই চেয়ারের। আরো বেশিও হতে পারে। হিন্দু জমিদার নন্দীদের বাড়ি থেকে লুট করা। ঘর থেকে ক্যাপস্টান সিগারেটের প্যাকেট হাতে পুনরায় এসে বসে রাসু সর্দার। হুঁকোর কলকি থেকে বিশেষ ভঙ্গিমায় একটা আঙ্রা নিয়ে সিগারেট ধরায়। ধুয়া উদগীরণ করে একটা তৃপ্তির ধ্বনি তোলে-আহ্…।

যাক এবার যুৎ করে চিন্তা করা যাবে। হুঁকোর র্গু র্গু শব্দটা তার চিন্তায় বাধা হচ্ছিল। চিন্তা করতে থাকে চরের জনসভা নিয়ে। যে কোন মূল্যে চরের আজকে সভা বানচাল করতে হবে। তা না হলে তেভাগা আর বহাল রাখা সম্ভব হবে না। তাতে জোতদার মহাজনদের হবে মারাÍক ক্ষতি। ক্ষতি তার নিজের বেশি। প্রতি বছর ঘরে বসে যে ধানের ভাগ পায় সে, তা যাবে বন্ধ হয়ে। এখন তার ইনকামের সোর্স ওটাই। শহরের বাজার-দোকান থেকে তেমন তোলা উঠে না। নিজে উপস্থিত হলে একেবারে খালি হাতে ফিরায়ে দেয় না। মান দেয়। কিন্তু টাকা-পয়সা দিতে চায় না। বলে- রাসু ভাই, আয় ইনকাম ভালা না। সপ্তাহে একদিন তোলায় তার বাজার খরচটা এসে যায়। মাল দেয় বলে সেও বুঝে শুনে তাদের দোকানে হানা দেয়। রাসু সর্দার বলে কথা। নদী মরে যেতে পারে কিন্তু তার রেখা থাকে। রাসু সর্দারের সেই দিন না থাকতে পারে। সেই মুসলিম লীগের দাপট না থাকতে পারে। না থাকতে পারে তার যৌবনের শক্তি ও সামর্থ। তাই বলে সে তার মাথা নীচু করতে পারবে না। কেউ কোন দিন যাতে তাকে না বলতে না পারে। সে বিষয়ে সে সজাগ থাকে। কারু ওপর জোর জবরদস্তি করতে চায় না।

রাসু সর্দার শুধু তোলা তুলে না, সবার অনেক উপকারও করে। বিশেষ করে প্রশাসনের সঙ্গে সর্দারের বেশ জানা শোনা। যে কোন এসডিপিও কিংবা এসডিও জামালপুর এলেই সর্দারের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সর্দার যে এলাকার শক্তিশালী লোক, এ কথা জানতে পেরে প্রশাসনের লোকেরা সর্দারকে খাতির করে। তাছাড়া সরকার চায় আ’লীগের লোকদের দমন করে রাখতে। এ ক্ষেত্রে রাসু সর্দারকে তাদের প্রয়োজন পড়েই।

রাসু সর্দার বলেছি সিগারেট ক্যাপস্টান টানতে টানতে এসব কথা ভাবতে থাকে। পরীক্ষা হয়ে যাবে আগামী দিনের চর শাসন করবে কারা। রাসু সর্দার, না আ’লীগের পাণ্ডারা। আ’লীগের পাণ্ডাদের কথা মনে পড়তেই পংখির কথা তার মনে পড়ে। পোলাটার সাহস কতো! তার ছোড পোলাডাও তার সঙ্গে উঠে বসে। নিজ ঘরেই বিভীষণ। এতো তামাসা করছিল ঐ পোলাডারে নিয়া। গভরমেন্ট স্কুলের ছাত্র আছিল। কিন্তু মেট্টিক পাস দিতে না দিতেই রাজনীতি আর গুণ্ডামিতে ঢুকে গেল। পোলাডার দোষ কী। লোহু-লোহু-রক্তের ধারা যাবে কোথায়। রাসু সার্দারে রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে না! কিন্তু  রাসু সর্দারের রক্ত তো খারাপ না। সৈয়দ রইস উদ্দিন ওরফে রাসু সর্দারের বাবা জামালপুর শহরে মশহুর আলেম সৈয়দ আলী হোসেনকে কে না চেনে। চেহারাটা ওর দাদার মত দেখতে লম্বা চওড়া। নাক খাড়া। ধব ধবে ফর্সা। হাত দু’টো ওর দাদার মতই লম্বা। লোকেরা বলত বঙ্গ বিজয়ী ইখতিয়ার উদ্দিন বুঝি আবার ফিরে এলো। আজ অন্তত ছেলেটা তার পার্টির সমর্থক হলে তার পাশে দাঁড়ালে জামালপুর শহরে এমন কোন বেটার হিম্মত ছিল না রাসুর বিরুদ্ধে খাড়ায়। আজ তারই পোলা দাঁড়াবে তার বিরুদ্ধে। পংখি আজ বিশাল শক্তিশালী। সমস্ত চরবাসী তার সঙ্গে। তাদের বিশ্বাস পংখিরা ধানের তেভাগা বাতিল করে আধাআধি চালু করবে। এতে কৃষক পাবে অর্ধেক। জোতদার পাবে অর্ধেক। সর্দার বাদ। চরবাসী হানিফের দলে তাই যোগ দিয়েছে। জনসভাকে সফল করতে বেশ কয়েকদিন মিছিল-মিটিং হয়েছে। রাসু সর্দার তাই চিন্তিত। নদীর দিকে তার দৃষ্টি। বর্ষার নতুন পানি উচ্ছলতায় ধেয়ে চলেছে। কোথা থেকে বহন করে আনা কচুরিপানার ঘূর্ণির মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া দৃশ্য রাসু সর্দারের চোখে পড়ে। রাসু সর্দার কোন কূল কিনারা করতে পারে না। বারো’শ লাঠিয়াল নামবে। জোতদারদের আশ্বস্ত করেছে। কোন ভয় নাই। কোন প্রকারে আ’লীগের মিটিং হতে দেবে না। কিন্তু রাতে যে খবর এলো তাতে দুঃশ্চিন্তার অনেক কারণ আছে। শত শত ছাত্রলীগের ক্যাডার নাকি চরে ইতোমধ্যে অবস্থান নিয়েছে। যে মাঠে জনসভা হবে সেখানে। ‘থু!’ রাসু সর্দার থুথু ফেলে বেশ জোরে। এতো চিন্তা করে কী লাভ। রাসু সর্দার জীবনে হার মানে নাই। আজও মানবে না। দেশের জন্য না হয় বীরের মত প্রাণ দেবে। রাসু সর্দার চেয়ার ছেড়ে উঠে অন্দরের দিকে যায়। ঘরে ঢুকতেই মায়মুনা তার কাছে এসে দাঁড়ায়। আঙুলের ইশারায় বোঝাতে চায় বৈঠকখানায় কেউ ডাকছে।

আজকাল মায়মুনা ইশারায় কথা বলতে পছন্দ করে। মুখের উচ্চারিত শব্দ অন্যের বোধগম্য নয় তা বুঝতে পারে। তাই নিকটজন যারা তার ইশারা-ইঙ্গিত বোঝে তাদের সঙ্গে ওটাই ব্যবহার করে।

রাসু সর্দার মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত রেখে একটু সোহাগ দিল। একমাত্র এই মেয়ের দিকে তাকালে সর্দারের মনটা ভিজে যায়। যত ক্ষোভ রাগ দুঃখ কষ্ট মুহূর্তেই পানি হয়ে যায়। মনে হয় এই মেয়ের কঠিন জীবন তাকে বলছে : সর্দার! খামোশ হও! আর কত মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলবা? কিন্তু তার পক্ষে কীভাবে সম্ভব পরাজয়। পরাভব মানা?

না, তা কখনোই সম্ভব না। সর্দারের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠে। রাগে গজরাতে গজরাতে বৈঠকখানায় এসে হাজির হয়। বৈঠকখানায় বসা ছিলো লাঠিয়াল সর্দার বেনু আর মনা। মনা এক সময় কুখ্যাত ডাকাত সর্দার ছিল। এখন লাঠিয়াল দলে। রাসু সর্দার ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ওরা উঠে দাঁড়ায়।

স্লেমালাইকুম সর্দার ভাই!

বস-বস। কী খবর, বেনু মনা?

বাসু সর্দার তার নিজস্ব আসনে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করে।

সর্দার ভাই! খবর ভালা না। পংগির দল ভারী।

আমাগো এইবার রাম দা দেন, কোপাইয়া হালাইয়া দিই মাংগির পুতেরে।

মনা বলল। মনা এ কাজে সিদ্ধহস্ত। কিন্তু লাশ পরুক রাসু তা চায় না। পরিস্থিতি তাতে বেসামাল হয়ে যাবে। এমনিতে আ’লীগ দ্যাশ স্বাধীনের কথা বলে মানুষদের মন উতলা করেছে। লাশের ওজন ভারী, বুঝলা মনা? লাশ চাই না। খালি সভাটা বানচাল করতে পারলেই আমরা জয়ী।

বলে সর্দার পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে একটা সিগারেট ধরায়।

কী মিয়ারা খাইবা নিহি, বড় সাহেবী সিগারেট, লও-শরম কইরো না।

সংকোচবোধ করে বেনু ও মনা। কিন্তু এমন উদার দিলে সর্দার দিচ্ছে, না খেলে মনে কষ্ট পাইবো। সর্দার কখনো এমন ব্যবহার করে না। আজ এমন উদার দিলে দিচ্ছে যখন। বেনু মনা এগিয়ে সর্দারের হাত থেকে দুটো সিগারেট নিয়ে ধরায়। সমস্ত ঘর সিগারেটের ধূঁয়ায় আচ্ছন হয়ে পড়ে। কেমন এক ধোঁয়াটে পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

যা? আইজ লাশের কারবার করুম- লাশ চাই মাথা দেইখ্যা- রামদা পাঠাইয়া দিছি জায়গা মত রামদা হাজির হবো। তোরা দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে সামলাবি। পূর্ব-পশ্চিমে থাকবো সোনা আর বসু। আমি তো আছিই। যা ত্বরা কইরা যা চরে!

রাসু সর্দার উঠে পড়ে।

বেনু ও মনা তৎক্ষণাৎ উঠে হাঁটা দেয়।