কাল রাতে অঝোরে বৃষ্টি ঝরেছে। বর্ষাকাল শুরু হয়নি যদিও কিন্তু গত রাতের বৃষ্টির ভাব ছিল পূর্ণ বর্ষাকালের। আরজুর অবশ্য বৃষ্টি ভালই লাগে। টিনের চালে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি ঝরা থেকে যে শব্দধ্বনি সৃষ্টি হয়, আরজুর কাছে তা ধ্র“পদ সঙ্গীতের মূর্ছনা বলে অনুভূত হয়। তবে কাল রাতটি ছিল তার অন্য রকম। যখন থেকে একটা খবর সে জেনেছে মনটা উদ্বেগে ভরে গেছে। কিছু ভাল লাগেনি। বৃষ্টির ধ্বনি কান্নার মতো মনে হয়েছে। সারারাত চোখের পাতায় ঘুম এসে ধরা দেয়নি। ঘুম না হওয়া তার নতুন কিছু নয়। ইনসোসেনিয়া রোগের ধাঁচ তার আছে। তবে উদ্বেগে নির্ঘুম কাটানো যে কতো কষ্টের তা গত রাতে সে টের পেলো।

সকালটা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ঘন নীল আকাশে বৃষ্টির কোন লক্ষণ নেই। রাতে ঘুম না হওয়ায় শরীরে ক্লান্তি ও অবসন্ন ভাব প্রবল। আরজু তাই ফজরের নামায পড়ে রান্নাঘরে ঢুকল চা বানাতে। পানি চাপাল তিন চার কাপের। কারণ এ সময় আব্বা-আম্মা এককাপ চা পেলে খুব খুশি হবেন। রান্নাঘর হতে আবার ঘরে আসে তার নিজস্ব বিস্কুটের টিনটা নিতে। পড়ার টেবিলের ড্রয়ার টেনে টিনটা বের করে। হাতে নিতেই বেশ হালকা মনে হয়। বোধহয় ওতে বিস্কুট নেই। নাড়া দেয়। না, কোন শব্দ নেই। মানে বিস্কুটগুলো হাওয়া। পালঙ্কে শোয়া পিয়ারীর দিকে দৃষ্টি পড়ে আরজুর। ঐ পাজীটার কাণ্ড নিশ্চয়ই। বিস্কুট খেকো কোথাকার! কেমন অসহায় মুখ! মনে হচ্ছে ভাজা মাছটা উল্টে খেতে জানে না। আর লুকিয়ে চুরিয়ে খেতে ওস্তাদ। চা’র জন্য চাপানো পানির কথা মনে পড়ায় আরজু দ্রুত ঘর হতে নিষ্ক্রান্ত হয়।

ট্রেতে তিনকাপ ধূমায়িত চা নিয়ে আরজু আব্বার ঘরে প্রবেশ করার জন্য দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আওয়াজ দেয়, আব্বা চা। সাধারণত আব্বা-আম্মা একসঙ্গে থাকলে আরজুরা ঘরে প্রবেশের আগে জানান দেয়। ওদের আব্বা-আম্মাও ছেলে-মেয়েদের ঘরে হুট করে ঢুকে পড়েন না। এটা আরজুর আব্বা সবাইকে শিখিয়েছেন। সবার ব্যক্তিগত জীবন থাকে। নিজ ঘরে সেই জীবনের অন্য কেউ সাক্ষী হওয়া উচিত নয়। এটা আব্বার মত।

ভেতরে আয় মা। আব্বার কোমল স্বরে আমন্ত্রণ পেয়ে আরজু হাসতে হাসতে ঢোকে।

দিনটা বেশ ঠাণ্ডা, তাই ভাবলাম তোমাদের এককাপ চা দিই। ভাল লাগবে। বিস্কুট ছাড়াই দিতে হলো। কী করবো, তোমার রাক্ষুসী মেয়েটা একটিন বিস্কুট সাবাড় করে দিয়েছে।

সত্যি এখন এককাপ চা যা জমবে না! ভাবছিলাম তোর মাকে বলি। তিনি আবার তসবি-তাহলিল পড়ছেন। খুব ভাল করেছিস মা। আর বিস্কুট তো আমার স্টকে আছে।

তোমার আবার বিস্কুটের স্টক আছে নাকি?

আছে…আছে… এই তোর মা’র রাতে হঠাৎ ক্ষিধা লেগে যায়। তোর মা আবার ক্ষিধা একদম সহ্য করতে পারে না।

আরজু অবাক হয় মার প্রতি আব্বার ভালবাসার এই অপূর্ব নিদর্শন দেখে। অথচ বাইরে থেকে ওরা টেরই পায় না তার আব্বার হৃদয়ে এমন ভালবাসার বহমান নদীর অস্তিত্ব।

নিশ্চয়ই গতরাতে তোর ঘুম হয়নি।

জ্বী আব্বা।

এই বয়সে তোদের ঘুম হয় না জেনে অবাক হই! আমার অল্প বয়সে ঘুম না হওয়া কাকে বলে জানতামই না।

আব্বা, আপনাদের কালটা ছিল শান্তিপূর্ণÑ কোন উদ্বেগ ছিল নাÑ

ঠিক তা নয়, আমরাও একটা অস্থির সময় কাটিয়ে এসেছি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল, ইংরেজ খেদাও আন্দোলন এসব আমাদের সামনেই ঘটেছে। কিন্তু আমরা এসবে খুব কম মাথায় ঢুকিয়েছি। অবশ্য আমি নিজে একটু ব্যতিক্রম ছিলাম। আমাদের পরিবার ছিল বরাবর রাজনীতি ঘেঁষা। তোর দাদা তো রীতিমত রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পুরোদস্তুর কংগ্রেসী। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন আলেমে দ্বীন। পরহেজগার মুমীন বান্দাহ। কিন্তু রাজনীতির প্লাটফর্মটা ছিল গান্ধীর। আমরা বড় হয়ে একবার প্রশ্ন করেছিলাম।

দাদা কী বললেন?’

বললেন, আপাতত স্বাধীনতা পাওয়াই আমাদের মকসূদ হতে হবে। একটা দেশ হোক আগে।

মানে পাকিস্তান চাননি?

না, বাবার চিন্তা অন্যরকম ছিল।

কী, তোমরা মেয়ে-বাবাতে কী এতো বকর বকর করছ?

তোমার শ্বশুর সাহেবের কথা বলছি গো। বলছি বাবা ছিলেন কংগ্রেসী।

সে তো আমার বাপজানও ছিলেন।

দুজন কংগ্রেসী ছিলেন বলেই তো দুই দোস্ত বেহাই হয়েছিলেন।

নানাজীও কংগ্রেসী ছিলেন, আশ্চর্য!

আব্বা, আপনি মুসলিম লীগে এলেন কিভাবে?

আমি তো প্রথমে মুসলিম লীগার ছিলাম না। বাবার মতো আমিও পুরোদস্তুর কংগ্রেসী ছিলাম। হিন্দুদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে মুসলিম লীগকে ‘সলিমুল্লাহর পাগলামী’ বলে বিদ্রুপ করতাম। কিন্তু একদিন আম্মার মুখে ইংরেজদের খেলাফত আন্দোলন দমন ও হিন্দু জমিদারদের নির্যাতনের কাহিনী শুনে আমার কেন যেন মনে হলো কংগ্রেসে আমাদের স্বার্থ বিঘিœত হচ্ছে। মুসলমানদের স্বার্থ আমাদেরই দেখতে হবে। সন্দেহ আরো দানা বেঁধে উঠলো গান্ধীর অখণ্ড রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন প্রকাশ্য হয়ে যাওয়ায়। তখন মুসলিম লীগ ’৪০-এ লাহোর প্রস্তাব নেয়। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে মুসলমানদের আলাদা স্বাধীনতা দাবি করে। ঐ প্রথম হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য পৃথক পৃথক রাষ্ট্র করার প্রস্তাব পেশ করা হয়। ঠিক সে সময় আমার ধারণা বদ্ধমূল হলো যে মুসলিম আবাসভূমির জন্য আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

আর দাদা?

তোর দাদা ছিলেন ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। আমাকে বাধাও ছিলেন না নিজে মত পরিবর্তন করলেন না।

দাদার মত কি ছিল আব্বা?

তোর দাদা বিশ্বাস করতেন, অখণ্ড ভারত স্বাধীন হলে মুসলমানরাও অখণ্ড থাকবে। ইসলাম ধর্মের সৌন্দর্য ও মুসলমানদের চরিত্র মাধুর্য তুলে ধরতে পারলে হিন্দুদের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়ে যাবে। দাওয়াতে দ্বীনের কাজ ভাল হবে। গোটা ভারতে মুসলিম সংখ্যাধিক্য ঘটতে থাকবে। তাছাড়া পিছিয়ে পড়া মুসলমানরা প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসবে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে। তোর দাদা বলতেন হিন্দু-মুসলমান এমনিতেই একত্রে থাকতে পারবে না। একদিন এমনিতেই ওরা বিভক্ত হয়ে পড়বে।

তাহলে আগে হতে আপত্তি কোথায়?

তোর দাদা বলতেন ইংরেজ ও হিন্দু মিলে মুসলমানদের বিভক্ত করে দিতে চাইবে। এমন স্বাধীনতা দেবে যা মুসলিম শক্তিকে খর্ব করবে।

দাদা কি আমৃত্যু এই মত পোষণ করতেন?

তোর দাদা যখন মারা যান তার কিছুকাল আগে ’৪৬-র নির্বাচনে মুসলিম লীগ বিপুল বিজয় রাভ করলো। এ নির্বাচন ছিল মুসলমানরা পাকিস্তান চায় কিনা তা ভোটের মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া। মুসলমানরাও মুসলিম লীগে অকুণ্ঠ সমর্থন জানায়। প্রাদেশিক আইন পরিষদগুলোর মোট ৫০৭টি আসনের ৪৭২টি পেলো মুসলিম লীগ। কেন্দ্রীয় পরিষদে মুসলিম লীগ সবগুলো আসনই পেলো। এ বিজয় পাকিস্তান হাসিলের চূড়ান্ত পদক্ষেপ ছিল। সে সময় তোর দাদাকে খানিকটা উৎফুল্ল দেখেছি। মুখে কিছু প্রকাশ না করলেও আমার কাছে ওসব খবর জেনে আনন্দ প্রকাশ করতেন। একদিন বললেন, খোদা আমার মৃত্যু স্বাধীনভূমিতে যেনো করে। আল্লাহ তোর দাদার ইচ্ছা পূরণ করেছিলেন। ’৪৭-র ১৫ আগস্ট তিনি ইন্তেকাল করেন।

সাত সকালে তোমরা বাপ-মেয়েতে কী এতো ইতিহাস নিয়ে ঘাটাঘাটি করছো?

আরজুর মা, ইতিহাস হচ্ছে সবচাইতে প্রয়োজনীয় শিক্ষা, আজকাল ছেলে-মেয়েরা ইতিহাস জানে না বলেই যে যা বলে তাতেই লাফ দেয়। ‘জিন্দাবাদ মুর্দাবাদ’ ধ্বনি তোলে।

আব্বা আমি আসি। আরজু চায়ের কাপগুলো ট্রেতে সাজিয়ে প্রস্থান করলো।

ঘুম আসতে রাত বেশ গভীর হয়ে পড়ে। তাই সকালে খানিকটা ঘুমিয়ে নেয় আমীরুদ্দীন। বৃষ্টি হওয়ায় রাতটা ছিল ঘুমের জন্য খুবই উপযোগী। কিন্তু তার মাথায় ঘুরপাক খায় পরদিনের চরের সমাবেশ নিয়ে। এই প্রথম তাদের দল চরে সমাবেশ করতে যাচ্ছে। এটা রীতিমত একটা দুঃসাহস। রাসু সর্দারের লোক ঘোষণা দিয়েছে ঐ চরে যে মিটিং করবে তার মাথা উড়ে যাবে। আর রাসু সর্দার যা বলে তা করে। বয়স হয়েছে কিন্তু শক্তি তেজ এখনো কমেনি। সর্দারের আন্ডারে নাকি বারশ লাঠিয়াল ও অন্যান্য অস্ত্রধারী কাল নামবে। আমীরুদ্দীন তাই এই মিটিং নিয়ে চিন্তিত। পংখী ভাইর সঙ্গে গতরাতে যা আলাপ হয়েছে তা পর্যাপ্ত বলে মনে হয়নি। তবে চরের সাধারণ মানুষ তাদের দলের সাপোর্টার বেশি। চরের লোক জানে রাসু সর্দারের খপ্পর হতে বাঁচতে না পারলে তাদের জীবনের উন্নতি হবে না। তেভাগার হাত হতে বাঁচা যাবে না। তাই চরের সাহসী ছেলে হানিফের নেতৃত্বে লোকজন এখন তাদের দলের ব্যানারে সমবেত হয়েছে। এতদিন চর দলের কাজ ছিল ঘরোয়া পর্যায়ে। প্রোগ্রাম যা হতো ঘরে ঘরে। এই প্রথম তেভাগার বিরুদ্ধে আওয়াজ নিয়ে প্রকাশ্যে জনসমাবেশ হতে যাচ্ছে। চরের কথিত মালিক শহরের বড় বড় ভূস্বামীরা নিশ্চয়ই বসে নেই। তাদের আছে দেদার অর্থ ও রাসু সর্দারের বিশাল বাহিনী।

আমীরুদ্দীন বারান্দার চেয়ারে বসে সারাদিনের করণীয় বিষয় মনে মনে ছক বেঁধে নিচ্ছে।

ভাইয়া, আরজু আইছে-

আমীরুদ্দীন চমকে ওঠে। গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিল সে। এমন সময় আরজু কেন আসলো তার কাছে?

আসতে বলব?

কি বলবে ভেবে পায় না। আরজু নিশ্চয়ই প্রোগ্রামের কথা জেনে গেছে। সে সম্পর্কেই কিছু বলবে। আমাদের নাস্তাটাও পাঠিয়ে দিস। একটু পরোক্ষভাবেই জবাব দিলো। পাপিয়া মুখে ঈষৎ হাসি টেনে কপট অভিমানের ভঙ্গিমা করে প্রস্থান করলো। আমীরুদ্দীনের চোখে তা এড়ায়নি। ভাল লাগলো পাপিয়ার ঐ ভঙ্গিমা। তবে এ মুহূর্তে আরজুর উপস্থিতি আদৌ কাক্সিক্ষত ছিল না। সে বিলক্ষণ জানে আরজু তাকে আজকের প্রোগ্রামে যেতে বারণ করবে। সে তা শুনবে না। আরজু মন খরাপ করে চলে যাবে।

আমীর ভাই কেমন আছেন? আরজু আমীরুদ্দীনের পেছন থেকে কথা বলে। আজকাল আরজু কিছুটা আড়ালে আবডালে থাকে। সামনে আসে না। আমীরুদ্দীনও আগের মতো ব্যাকুল হয় না আরজুর জন্য। বরং সে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এমন ব্যস্ত থাকে মনেই পড়ে না আরজুর কথা।

ভাল, তুমি? আমীরুদ্দীন সংক্ষিপ্ত জবাব দেয়। এরপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। আমীরুদ্দীন জানে এ নীরবতা ভাঙ্গার দায়িত্ব তার। কি ভেবে এতো সকালে?

কাল রাতে কেমন ঘুমালেন?

না, ঘুম খুব ভাল হয়নি। মাঝরাত পর্যন্ত ঘুম আসছিল না। তুমি?

আমি জম্পেস ঘুম দিয়েছি। বৃষ্টি ছিল কি না। স্বপ্নও দেখিছি। স্বপ্নটা আপনাকে বলতে চাই, শুনবেন?

আমীরুদ্দীন কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকেÑ স্বপ্ন! কি এমন স্বপ্ন যা আমাকে শুনাতেই হবে।

না শুনাতেই হবে এমন নাÑ তাহলে থাক বলব না।

আমীরুদ্দীন বুঝতে পারে আরজু তার কথায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি। আর মেয়েদের উৎসাহে বাধা পড়লে বেলুন ফুটো করে দেবার মতো চুপসে যায় মুহূর্তে আর সহজে ফেরানো যায় না। তাই আমীরুদ্দীন ব্যস্ত হয়ে বলেÑ

না, স্বপ্ন তো অবশ্যই শুনতে হবে, স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বেঁচে নাকি?

বাঁচে, স্বপ্নহীন বহু মানুষ আছে।

আমি বিশ্বাস করি না।

আমি করি।

যাকগে তোমার স্বপ্নটা বলো।

কিন্তু আমার যে বলার উৎসাহ নেই।

না আমাকে শুনতেই হবে, তুমি না আজকাল কৃপণ হয়ে গেছ।

এ ক্ষেত্রে আত্মসমালোচনা করলে ভাল হয়।

আমীরুদ্দীন চুপচাপ হয়ে যায় কিছুক্ষণ। আরজু খুব সহজ মেয়ে নয়। মনের দিক দিয়ে কখনো তার চেয়ে বয়স্ক মনে হয় তার। অধ্যাপক বাবার সুযোগ্য মেয়ে বটে। কথায় এঁটে ওঠা সবার কাজ নয়। তাই নিশ্চুপ থাকে।

আমীর ভাই, তাহলে শুনুন আমার স্বপ্নটা। দেখলামÑ আপনি একটা নৌকায় চড়ে নদী পার হচ্ছেন। আপনার সঙ্গে অনেক লোক। প্রত্যেকের হাতে লাঠিসোটা বল্লম। আরেকটু পেছনে আরেকটা নৌকা। সেটাতেও বহু লোক। লাঠিসোটা বল্লম হাতে। আরও একটা নৌকা একটু দূরে সেটাতে আমাদের পরিবারের সবাই। আমি চিৎকার করে আপনাকে ডাকছি। শুনছেন না। ডাকতে ডাকতে ঘুম ছুটে যায়। দেখি আমার সমস্ত শরীর ঘেমে গেছে।

আরজু স্বপ্নটা বানিয়ে বলে সত্যি সত্যিই ঘেমে উঠেছে। মিথ্যে কথা বলা যে এতো কঠিন তা আবার আজ হাড়ে হাড়ে টের পেলো।

বোবায় ধরেছিল বোধহয়?

না বোবায় আমাকে ধরে না এ রকম দেখলাম কেন আমীর ভাই?

তুমি মনে হয় দেশটেশ নিয়ে বেশি ভাব। আমাকে নিয়েও!

শোনো, আমরা যা করছি, তা দেশের মঙ্গলের জন্য আর আমাদের চলার পথ কিছুটা কন্টাকাকীর্ণ। রক্তপাত সংঘর্ষ আছে। তা বলে ক্ষান্ত হয়ে বসে থাকলে চলবে না। আমি অবশ্য হাঙ্গামার পক্ষে না। যদি বাধে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষপাতি নই। আর আমরাও শক্তিশালী। এতোদিন যারা নিজেদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতো, তারা বুঝে নিক। আমরা গরীব মানুষের ভাতের অধিকার চাই।

সুন্দর কথা, কিন্তু আপনারা যে সঠিক পথে আছেন তা নিশ্চিত হলেন কিভাবে।

প্রত্যেক মানুষ তার কাজের ব্যাপারে আত্মপ্রত্যয়ী না হলে তা হাসিল করতে পারে না। আমরা অবশ্যই নিশ্চিত সঠিক পথে আছি। তবে চরের ব্যাপারে আমরা যা করছি তা আগামী দিনগুলোতে যাতে চরবাসীকে আমাদের সঙ্গে পাই সে উদ্দেশ্যেই। আমরা সাধারণ ‘খেটে খাওয়া মানুষকে দলে পেতে চাই। তাই তাদের অধিকার সচেতন করে তুলছি। চরবাসী এখন জেগেছে। তারা আমাদের পতাকা তলে।

কিন্তুÑ শুনছি রাসু সর্দার ও তার বাহিনী রক্তের গঙ্গা বহায়ে দেবার জন্য প্রস্তুত।

অতো সোজা নয়। তোমার স্বপ্ন সত্যি। শহর থেকে এমন নৌকাবহর যোগে বিশাল বাহিনী আমাদের অলরেডি পৌঁছে গেছে।

আমীর ভাই! তুমিও যাবে?

আমাকে যে সেখানে বক্তৃতা করতে হবে, যাব না?

আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। জানি বারণ করলে কাজ হবে না।

আমীরুদ্দীন চুপ মেরে থাকে। কী বলবে আরজুকে। আরজু যা শুনতে চায় তা বলা সম্ভব না। অথচ আশ্বস্ত করার মতো কিছু বলা উচিত। আরজু! আমীরুদ্দীন ডাকে। জবাব আসে না।

আবার আরজু! কোন জবাব নেই।

আরজু ঐ ডাক শোনার অনেক আগেই ঘর থেকে বিদায় নিয়েছে। আরজুর চোখে পানি দেখে পাপিয়া বিস্মিত হয়েছে। থামতে বলেছে। কি হয়েছে তাকে বলতে। আরজু কোন সাড়া না দিয়ে দ্রুত প্রস্থান পাপিয়ার ঘর হতে।

পাপিয়ার ইচ্ছে করে ভাইয়ার সম্মুখে গিয়ে জানতে কেন আরজু এমন মন খারাপ করে চলে গেল। আরজুর চোখে পানি কেন। কিন্তু তা সে করল না। লাভ নেই। ভাই তো আগের মতো নেই।