চরের জনসভায় বিপুল লোকের সমাগম ঘটে। সমস্ত চরের মানুষ যেন উপস্থিত। শহর থেকেও জনসভায় যোগ দিয়েছে শত শত লোক। অবহেলিত চরবাসী এই প্রথমবার শহরের লোকদের সঙ্গে একাÍ হতে পারল। তাই চরবাসীর চোখে-মুখে আনন্দ ও আশার ঝিলিক।

আমীরুদ্দীনের বন্ধু হানিফ চরের জনপ্রিয় নেতা। প্ল্যাকার্ডে প্ল্যাকার্ডে গোটা জনসভা ছেয়ে গেছে। প্ল্যাকার্ডে লেখা, তেভাগা মানি না, আধাআধি চাই, পাটের সর্বনিু মূল্য ৪০ টাকা চাই, পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার দিতে হবে, কৃষক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও ইত্যাদি।

শ্লোগানে মুখরিত জনসভা। কিছুক্ষণ পরপর মাইকে আমীরুদ্দীন সবাইকে শান্ত হয়ে বসার অনুরোধ করছে। জামালপুর শহর লীগের বড় নেতা বুরহান তরফদার জনসভার প্রধান অতিথি। ছাত্রলীগ সভাপতি হাসিবুর রহমান বাবলু, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত। এছাড়া চরের মোঃ হানিফ, কৃষক নেতা ইউনূস মৃধা ও শ্রমিক নেতা ইজ্জত আলী জনসভায় হাজির।

আমীরুদ্দীন যতোটা আশা করেছিল তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের সমাগম হয়েছে জনসভায়। চরবাসী এবার লীগের পতাকার তলে সমবেত হয়েছে। সামনের ইলেকশন পর্যন্ত চরে মাঝে-মধ্যে সভা, মিটিং এবং জনসংযোগ কার্যক্রম চালু রাখলে মুসলিম লীগের বাক্সে একটা ভোটও পড়বে না। ভরাডুবি হবে ওদের।

কিছু একটা ঘটার আশঙ্কা করে আমীরুদ্দীন জনসভায় বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখে। ছাত্রলীগের চৌকস কর্মী পংখি বাহিনী এবং চরের সাহসী কর্মী দিয়ে তিনটি নিরাপত্তা বেষ্টনি সৃষ্টি করা হয়েছে। নিরাপত্তার জন্য শহর থেকে পুলিশ ও আনছার বাহিনীর সদস্যরাও উপস্থিত।

অপরদিকে রাসু সর্দারের লাঠিয়ালবাহিনী জনসভা বানচাল করার জন্য মোতায়েন করা। সে খবর আমীরুদ্দীনের কাছে পূর্বেই ছিল। কর্মীদের নির্দেশ দেয়া আছে কোন ধরনের গোলযোগকারী ও হামলাকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ করতে।

মুহূর্মুহূ শ্লোগানের মাধ্যমে গোটা জনসভাকে এক গর্জমান সমুদ্রের মত উত্তাল করে তুলল আমীরুদ্দীন। লীগ নেতা, ছাত্রনেতা, কৃষক, শ্রমিকনেতা একের পর একজন বক্তৃতা শেষ করে। অবশেষে প্রধান অতিথি বুরহান তরফদারের পালা। আগামী নির্বাচনে লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী তিনি। আমীরুদ্দীন তাই ঘোষণার বিশেষণ জুড়ে দিলো ‘কৃষক দরদী নেতা’। বিপুল করতালির মাধ্যমে স্বীকৃত হলো কৃষক দরদী নেতা বুরহান তরফদার।

তরফদার শাদা আদি কাপড়ের পাঞ্জাবি আর পপলিনের পায়জামা পরেছে। কাঁধে ঝুলানো দামি শাল। এমনিতে লম্বা ছিপছিপে। গায়ের রং ফর্সা। চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা। ব্যক্তিত্ব আছে। শহরের জনপ্রিয় বুরহান উকিল। মাইকের সামনে দাঁড়াতেই জনসভা থেকে আবারও করতালি পড়তে থাকে। শ্লোগান ওঠেÑ বুরহান ভাই এগিয়ে চল, আমরা আছি তোমার সঙ্গে। বুরহান তরফদার ত্রিশ মিনিটের মত বক্তৃতা দিলেন। বললেন, কৃষকের ওপর থেকে খাজনা ও ট্যাক্সের হার কমাতে হবে। সকল বকেয়া খাজনা ও ঋণ মওকুফ করতে হবে। সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল ও তহসিলদারদের অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। বর্গাচাষীদের আধাআধি পদ্ধতিতে চাষ করতে দিতে হবে। জাল যার মাছ তারÑ এই ভিত্তিতে জলমহালগুলোর ইজারা পদ্ধতি বাতিল করতে হবে। পূর্ব পাকিস্তানের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জন সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। জরুরি আইন প্রত্যাহার, নিরাপত্তা আইন ও অন্যান্য সকল কালা-কানুন বাতিল করতে হবে। সকল মিথ্যা মামলা তুলে নিয়ে সকল রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে। মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলাসহ সকল রাজনৈতিক মামলা তুলে নিতে হবে। পূর্বপাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন দিতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও বোনাস দিতে হবে। ইত্যাদি।

বুরহান তরফদারের নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা শেষে সভাপতি মোঃ হানিফের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাধ্যমে জনসভার কার্যক্রম সমাপ্ত হয়। কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটায় আমীরুদ্দীন স্বস্তি অনুভব করে। সন্ধ্যার আগেই জনসভা শেষ। চরের লোকেরা শ্লোগান দিতে দিতে যে যার ঘরে ফিরে যায়। আমীরুদ্দীন ও লীগ নেতা-কর্মীরা শহরে ফিরে আসে। রাতে লীগের একটা মিটিং আছে, পার্টির অফিসে। আমীরুদ্দীন সেদিকে রওনা দেয়।

সারাদিন উদ্বেগ উৎকণ্ঠায় আরজুর সময় কাটে। কান খাড়া করে রাখে চরের জনসভার খবরের জন্য। বিকেল পর্যন্ত খবর ছিল জনসভা ভালভাবে শেষ হয়। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা সংঘটিত হয়নি। তারপরও আরজু স্বস্তি পাচ্ছিল না। পাপিয়াদের বাসায় যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু মুখ ফুটে মাকে বলতে সাহস পাচ্ছে না। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমে ঘোলাটে হয়ে পড়ছে। আইন-শৃ´খলা পরিবেশ আগের মত নেই। অস্থিরতা দিন দিন বাড়ছে। সন্ধ্যার পর বাসার বাইরে যাওয়া একদম বারণ সবার। যদিও পাপিয়াদের বাসা রাস্তার ওপারেই। পাপিয়াদের বাসায় হরহামেশা যাওয়া-আসা করে থাকে ওরা। কিন্তু ইদানিং যাওয়া-আসা অনেকটা কম হয়।

নিজের ঘরে পায়চারি করতে থাকে আরজু। সেই কখন সন্ধ্যা হলেও পড়ার টেবিলে বসতে ইচ্ছে করে না। উদ্বেগ আমীরুদ্দীন ভাইয়ের জন্য। রাজনীতি তাকে এমনভাবে পেয়ে বসেছে যে সে সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ। রাজনীতি মানুষের চরিত্রে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। শান্ত, সুবোধ ভাল ছাত্র হিসেবে সুখ্যাতি ছিল যার, সেই আমীরুদ্দীনের কতো পরিবর্তন!

আরজু পড়তে বসস নাই? বাইরে থেকে মা কখন তার ঘরে ঢুকে পড়েছেন তা টের পায়নি আরজু। মায়ের কণ্ঠস্বরে চমকে ওঠে সে। অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবেই।

জ্বী আম্মা, বসতেছি। মনটা ভাল লাগতেছে না।

কেন কী হইছে তোর?

মেয়েকে প্রশ্নটা করে নিজেই অপ্রস্তুত হয়ে যায় সাহেরা বেগম। তিনি বিলক্ষণ জানেন আরজুর সঙ্গে মাস্টার সাহেবের ছেলের সম্পর্ক আছে। প্রথম প্রথম সে এটাকে খারাপ নজরে দেখেনি। দুই পরিবারের মধ্যে সৌহার্দ্য-সম্পর্কের কারণেই। তাছাড়া আমীরুদ্দীন ছেলে হিসেবে তার অপছন্দের নয়। আরজু বুদ্ধিমতী মেয়ে। কখনো বাড়াবাড়ি কিংবা অসঙ্গত কিছু করবে না এমন বিশ্বাস তার আছে। আগের আমীরুদ্দীন আর নেই। মেয়ের দিকে তাকালেন সাহেরা বেগম। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাভরা মুখ মেয়ের। কান্নাভেজা গাল। মায়ের চোখ এড়াতে পারল না। তাই ইদানিং আমীরের সঙ্গে মিশুক তা তিনি না চাইলেও এ ব্যাপারে হঠাৎ কঠোর নীতি অবলম্বন করতে চান না। দেশের অবস্থা ভাল না। দু’একটা সম্বন্ধ আসছে। বিয়ে দিয়ে দেয়ার চিন্তা ওর আব্বারও।

পাপিয়াদের বাসা থেকে বেড়িয়ে আয়।

আব্বা রাগ করবেন না তো? আরজু মায়ের চোখের দিকে তাকায়।

মনটা হালকা হলে তবে আসিস। আমি উনাকে সামলাব। যা কোন সমস্যা হবে না।

আরজু দ্রুত ড্রেস চেঞ্জ করে নেয়। নিজ ঘর থেকে বের হয়ে আসে রান্নাঘরে। ‘আম্মা আমি আসি’। বেরিয়ে পড়ে বাসা থেকে। পাপিয়াদের বাসায় গেলে নিশ্চয়ই খবর মিলবে আমীরুদ্দীনের। এই আশায়।

রাস্তা পার হয়ে আরজু এদিক ওদিক তাকায়। বেশ ফাঁকা রাস্তা। পাপিয়াদের বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নক করতে থাকে।

খট খট খট খট…।

বেশ অনেকক্ষণ পর টিনের দরোজা খুলে আÍপ্রকাশ করে পিয়ারী। ওমা আরজু আপা! একটু আগে পাপিয়া আপা তোমার কথাই বলছিল। পাপিয়া আপা! আরজু আপা এসেছে- গলা ছেড়ে চিৎকার করতে করতে পিয়ারীর ভো দৌড়। খুব চঞ্চল প্রকৃতির মেয়ে পিয়ারী। সবসময় দৌড়-ঝাপের মধ্যে থাকে। ধীরে-সুস্থে চলাফেরা করতেই জানে না। চলতে-ফিরতে ব্যথাও পায়। তাতে কী। স্বভাবের কোন পরিবর্ত নেই তাতে। আর বকাঝকা, ওটা ডালভাত। আরজু বারান্দায় উঠে পাপিয়ার ঘরের দিকে যাচ্ছিল। মাঝপথেই পাপিয়া প্রায় দৌড়ে এসে হাজির। আরজু দরোজা লাগায়। পাপিয়া ঘরে ঢুকেই বিছানায় বসে সোজা প্রশ্নÑ আমীরুদ্দীন ভাইর খবর কীরে?

এখনো ফেরেনি রে। আম্মা খুব চিন্তা করছেন। আব্বাও। গা গরম করেছে বলে টিউশনিতে যাননি।

খালুজান শান্ত, ধীর-স্থির প্রকৃতির আর আমীরুদ্দীন সম্পূর্ণ বিপরীত। খালুজানের জ্বর? আরজু ভাবতে থাকে কী করবে এখন সে। চল পাপিয়া, খালুজানকে দেখে আসি! বলে বিছানা থেকে নামে।

ঠিক আছে চল!

পাপিয়ার পেছন পেছন আরজু হাঁটে। পাশাপাশি দুটো ঘর রেখে একদম দক্ষিণ দিকের ঘরটি খালুজান-খালাম্মার। ঘরের দরোজার সামনে এসে দাঁড়ায় ওরা। আরজু এসেছে আপনাকে দেখতে আব্বা! পাপিয়া বাইরে থেকে ঘরে ঢোকার অনুমতি চাইল এভাবে।

এসো মায়েরা, ভেতরে এসো! ভেতরে এসোÑ গভর্নমেন্ট স্থলের ডাকসাইটে মাস্টার আতাহার বিএসসি গলার স্বর এমন মোলায়েম দরদে ভরা তা ভাবাই যায় না। আরজু ভাবে।

খালুজান, আপনার জ্বর? আরজু চেয়ারে বসতে বসেত জানতে চায়। পিয়ারী বসে বাবার পায়ের কাছে, খাটে। হাত দিয়ে শরীরের তাপও পরখ করে একবার।

না, তেমন কিছু না। অল্প গা গরম হয়েছে। তোমার আব্বা কেমন আছেন?

আব্বা শারীরিক দিক দিয়ে ভালই, তবে দেশের কথা ভেবে খুব মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন।

শুনলাম তিনি নাকি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন?

ঠিকই শুনেছেন খালুজান। আম্মা চান না। কিন্তু তিনি বলেন দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে রাজনীতিই একমাত্র উপায় দেশকে বাঁচাতে। মানুষকে সঠিক পথ চেনাতে হবে।

শুনলাম তিনি নাকি ইলেকশনও করবেন?

জ্বী! ঢাকায় গিয়েছিলেন। মুসলিম লীগের নেতাদের মধ্যে কার কার সঙ্গে দেখাও করে এসেছেন।

কিন্তু উনি যে রাজনীতি করেন, সে দল আর ক্ষমতায় আসতে পারবে? দেশের হাওয়া অন্যদিকে। আমার ছেলেই এখন বিরোধী রাজনীতিতে। এই তো তার জন্য আমরা কতো চিন্তা করছি। বাসায় ফিরল না। কখন ফিরবে কে জানে!

আরজু চুপ করে থাকে। আমীরুদ্দীনের সম্পর্কে কোন কথা বলা তার পক্ষে সমীচিন নয়। লজ্জাও পেয়ে বসে। মাথা নিচু, দৃষ্টি নিবন্ধ করে নিজের পায়ের আঙুলের দিকে।

তোমার আব্বাকে আমার সালাম জানাবে, বলবে আমি উনার সঙ্গে দেশের অবস্থা নিয়ে কথা বলতে চাই।

জ্বী আচ্ছা- তাহলে আমি উঠি? আরজু চেয়ার ছেড়ে ওঠে। সোজা পাপিয়ার ঘরে আসে। এখানে তার জন্য টেবিলে সাজানো চিড়া ভাজা, নাবিস্কো বিস্কুট আর গরম চা।

পাপিয়া! আমীরুদ্দীন ভাই এলে আমাকে রাতে একটু খবর দিস। বলে আরজু উঠে পড়ল।

কিন্তু তা কীভাবে? আমাদের বাসায় তো তোদের মত টেলিফোন নেই! ঠিক আছে ভাইয়াকে বলব নিজের খবরটা দিয়ে আসতে। হি-হি-হি… হেসে ওঠে পাপিয়া।

না না না- খবরদার! উনি আমাদের বাসায় গেলে আব্বা ভীষণ মাইন্ড করবেন!