রাতে দুশ্চিন্তায় ঘুম হয়নি আরজুর। নানা আজেবাজে চিন্তা এসে মনকে উতলা করে। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করে রাত পার করেছে। রাতটা দীর্ঘ মনে হয় তার। কাটতেই চায় না। ঘুম না হওয়ায় ক্লান্তি ও অবসাদে শরীরে ভেঙ্গে আসছে। ফজরের আজান কানে যেতেই উঠে পড়ে। কলপাড় থেকে অজু করে নামাজ পড়ে দোয়া করে আমীর ভাইয়ের জন্য। পরে আবার একটু শুতে যায়।

খট-খট-খট-খট…

এমন সময় বাইরের গেটে অস্থির করাঘাত। টেবিলে রাখা ঘড়ির দিকে নজর পড়ে। পৌনে ছ’টা। এতো ভোরে কে এলো? আমীর ভাইয়ের বাসা থেকে কেউ নয়তো? আরজু হন্তদন্ত হয়ে ওঠে। গেটের কাছে ছুটে আসে। গেট পর্যন্ত এসে মনে পড়ে গেটে তালা। চাবি আম্মার কাছে। কে? কে? আরজু ভয়ার্ত কণ্ঠে গেটের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে।

আমি- পাপিয়া। দরেজা খোল আরজু…

খুলছি, একটু দাঁড়া- চাবি আনতে যাই। গেটে তালা। আগে গেটে তালা দেয়া হতো না। দিনকাল খারাপ বলে আব্বা তালা দেয়া শুরু করেছেন। তাতে অবশ্য ভেতরে প্রবেশ অসম্ভব বলা যাবে না। দেওয়াল টপকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে পারা যাবে।

আরজু দৌড়ে আম্মার ঘরের দরোজার কাছে এসে ডাকে-

আম্মা-আম্মা গেটের চাবি, পাপিয়া আইছে।

এতো বিয়ানে পাপিয়া আইছে কেন- পোলাটার কোন খবর নিয়া আসে নাই তো?

বিলকিস বানু সকালে ফজর নামাজ শেষে জায়নামাজে বসে তবসিহ জপছিলেন। হন্তদন্ত হয়ে জায়নামাজে তসবিদানা রেখে উঠলেন।

চাবি সাধারণত তোষকের নিচে থাকে। ছুটে এসে তোষকের একপাশ তুলে চাবি বের করে ঘর থেকে বের হয়ে আসেন। আরজুর হাতে তুলে দেন।

পাপিয়া এতো বিয়ানে কেন? মেয়েকে জিজ্ঞাসা করেন।

জানি না আম্মা। আরজু দায়সারা জবাব দেয়।

মেয়ের চেহারায় ক্লান্তি আর বিষাদ ভরা। বিলকিস বানুর মন খারাপ হয়ে গেল। বোঝা যাচ্ছে আরজু রাতে ঘুমায়নি। রাতে আমীরদের বাসায় গিয়ে কোন খবর না পেয়েই নিশ্চয়ই…। কী যে বিপদ হয়েছে এই মেয়েকে নিয়ে। প্রথম প্রথম সুযোগ না দিলে এমনটা হতে পারতো না।

বিলকিস বানু চাবি দিলেও গুটিগুটি পায়ে মেয়ের পিছন পিছন হেঁটে গেট পর্যন্ত এলেন। আরজু গেটের তালা খুলে টিনের দরোজা খুলে দেয় দ্রুত। পাপিয়া প্রবেশ করে। চোখে মুখে উদ্বেগ। ফ্যাকাসে চেহারা। খালাম্মা, ভাইয়া এরেস্টেট। গতকাল সন্ধ্যায় রাসু সর্দারের লোকেরা চরে একটা মার্ডার করে। সেই মার্ডারের আসামী করে চরের হানিফ ভাইয়াসহ লীগের আরও নেতাদের এরেস্ট করে।

আমীর ভাইকে কখন ধরল? আরজু প্রশ্ন করে।

রাতে। লীগের অফিসে মিটিংয়ে ছিল। সেখান থেকেই সব নেতাদের এরেস্ট করে। রাতেই আমরা খবর পাই। আব্বা থানায় গেছে। মার্ডার কেসের আসামী সহজে ছাড়বে না।

এসো মা তোমার খালুজানকে খবরটা দিয়ে যাও- বিলকিস বানু পাপিয়াকে অধ্যাপক শরীফ হোসাইনের কাছে নিয়ে আসেন। ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী শুধু নয়, আতাহার বিএসসির পরিবার তাদের পরম আত্মীয়। বিপদের দিনে তার স্বামী নিশ্চয়ই একটা কিছু করবেন। পাপিয়ার আর বলা লাগল না। বিলকিস বানুই সব খুলে বললেন।

কী সর্বনাশের কথা! বলেই অধ্যাপক শরীফ খাটে বসা তসবিহ তাহলিল করা থেকে উঠে পড়লেন।

মাস্টার সাহেব কোথায়?

আব্বা সেই সাত সকালে থানায় গেছেন।

ঠিক আছে আমিও যাই-

অধ্যাপক শরীফ দ্রুত কাপড়-চোপড় পরতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আরজু পাপিয়া নিঃশব্দে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। দু’জনে আরজুর ঘরে এসে দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসে। নূপুর এসে প্রবেশ করে ঘরে। নূপুর আবার ফজর নামাজ শেষে সকালে উঠে কুরআন তেলাওয়াত করে থাকে। আরজুর ঘরই তার চয়েস। সেভাবেই সে এসেছে।

কী ব্যাপার পপিয়া আপা, এতো সকালে! তোমাদের দু’জনের মুখ এতো অন্ধকার কেন- কোন দুঃসংবাদ-

নূপুর, আমীর ভাই এরেস্টেট। রাতে পুলিশ ধরেছে- একটা মিথ্যা মার্ডার কেসে- আরজু বলল।

আমীর ভাই এরেস্টেট! কী সাংঘাতিক ঘটনা-

নূপুর, আয় আমরা আমীর ভাইর জন্য দোয়া করি- আল্লাহ তায়ালা তাকে মিথ্যা মামলা থেকে বাঁচান-

আমি দশ মিনিট কুরআন তেলাওয়াত করে নিই- তোমরাও মনে মনে দোয়া ইউনূস একশবার পড়- এরপর দোয়া হবে। নূপুরের কথামতো তিনজন মিলে দোয়া করল। মোনাজাত করল আরজু। মোনাজাতে চোখের পানি ছেড়ে অনেকক্ষণ দোয়া করল।

মোনাজাত শেষে পাপিয়া ফিরে গেল নিজ বাসায়।

পাপিয়া চলে যেতেই আরজু ঘরের দরোজা বন্ধ করে বিছানায় উপুড় হয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকে। বারণ করেছিল জনসভায় না যেতে। শুনল না। কোন কথাই সে শোনে না। শুনবে কেন, সে তার কী হয়। কিছুই না। কিছুই না। কিছুই না। আরজুর কান্নায় আরো বেগ পায়। কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছে না।

নিজ ঘরে এভাবেই পড়েছিল বেলা সোয়া এগোরাটা পর্যন্ত আরজু। কোর্ট থেকে ফিরে অধ্যাপক শরীফ হোসাইন জানালেন, আমীরুদ্দীনের জামিন হয় নাই। জেল হাজতে পাঠিয়েছে। শুধু আমীরুদ্দীনের নয়, মামলায় আসামী অপরাপর লীগ নেতাদেরও। উপরের নির্দেশে।

এরপর? এরপর দেশের পরিস্থিতি আরো উত্তাল হয়ে উঠল। স্বাধীকারের আন্দোলনে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। আমীরুদ্দীনের ভাগ্যে হলো না সেই গণ অভ্যুত্থানে শরীক থাকা। কারণ আমীরুদ্দিন তখন ময়মনসিংহ কারাগারে পঁচছে। আর তার আরজু? তার জীবনেও ঘটল সবচেয়ে বড় ঘটনা। দেশের অবস্থা, পরিস্থিতি বিবেচনা করে অধ্যাপক শরীফ হোসাইন বিয়ে দিয়ে দিলেন আরজুকে। ঘটা করে নয়। অনেকটা চুপিচুপি। ছেলে ময়মনসিংহ জেলা জজ কোর্টের এডভোকেট। তাই সেই প্রতিবেশী, যাদের সঙ্গে এতো সৌহার্দ্য সম্পর্ক, তারাও বাদ পড়ল বিয়ের অনুষ্ঠানের আমিন্ত্রতদের তালিকা থেকে। এসব কিছু নীরবে-নিভৃতে অশ্রুপাত করে আরজু সয়েছে। সইতে হয়েছে। মেয়ে বলে। মেয়েদের প্রতিবাদের ভাষা তো অশ্রুই।

(সমাপ্ত)