আমীরুদ্দীনের গুরুদায়িত্ব মঞ্চ আগলানো। পংখি ভাই আছে তার আশপাশেই। আরো কিছু বাহিনী মাঠের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা আছে। জরুরি মুহূর্তে আমীরুদ্দীনের নির্দেশে তারা সাড়া দিতে প্রস্তুত। অতন্দ্র প্রহরী তারা। লীগনেতা বুরহান তরফদার আবার আমীরুদ্দীনের ভগ্নিপতি। আপন নয় খালাত। সেই সুবাদে সে তাঁর স্নেহের পাত্র। বুরহান চায় আমীরুদ্দীন তার আশপাশে থাকুক। বলা তো যায় না, পার্টির ভেতরের শত্র“রা কখন তার বিভীষণ হয়ে ওঠে। সামনেই ইলেকশন। বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী ছাত্রনেতা আমীরুদ্দীনকে তার কাজে লাগবেই।
আমিরুদ্দীন আরো বড় নেতা হলো। এখন সে মহকুমা ছাত্রলীগের জেনারেল সেক্রেটারি। হাসিবুর রহমান বাবলু সভাপতি। তিনি পার্টির পুরো দায়িত্ব আমীরুদ্দীনের উপর ছেড়ে ঘুরে বেড়ান লীগনেতাদের সঙ্গে। ঢাকায় যায় ঘন ঘন। পয়সা কড়ি যখন যা লাগে খোঁজখবর রাখে ঠিকই। দায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমীরুদ্দীনের গতিও গেল বেড়ে। কালো সুজুকি মোটরসাইকেলে সারাদিন শহরের এ মাথা ও মাথা করতে হয় তাকে। এদিকে এতোদিন যে ইউনিয়ন তাদের সহায়ক শক্তি ছিল তাদের সঙ্গেও আর আগের সদ্ভাব নেই। কলেজ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একবার তুমুল মারামরি হয়ে গেছে। শহরের দু’একটি পাড়ায়ও ছিটেফোঁটা সংঘর্ষ হয়েছে ওদের সঙ্গে। আমীরুদ্দীন এমন একটি মারামারিতে নেতৃত্ব দিয়ে ইউনিয়নকে রাম ধোলাই দিয়েছে। কিন্তু হলে কি হবে। আবারও তারা লাগার পাঁয়তারা করছে।
বিকেলে একটা মিটিং ছিল পার্টির অফিসে। সদ্য কারামুক্ত লীগনেতা শাহাবুদ্দীন ভাই এসেছেন। আমীরুদ্দীন তাই পার্টির সকল পর্যায়ের নেতা ও সক্রিয় কর্মীদের অফিসে উপস্থিত হওয়ার জন্য বলে। অফিস নেতা-কর্মীতে ঠাসা। গমগম করছে। দুটো মাত্র ফ্যান প্রাণপণে ঘুরে গ্রীষ্মের তাপদাহ থেকে স্বস্তি দিতে সচেষ্ট। কিন্তু এতোগুলো মানুষকে স্বস্তি দিতে প্রয়োজন অন্তত ৮টি ফ্যান। কোথায় পাবে তারা ৮টি ফ্যান আর বিশাল অফিস! ফলে অফিসের সকল কর্মী-নেতারা ঘেমে নেয়ে উঠছিল।
লম্বা অফিসের পশ্চিম দিকে একটা জলচৌকি তার উপর টেবিল এবং বেশ কয়েকটি চেয়ার। ঐ চেয়ারগুলোতে নেতারা বসে। আর সামনে ছড়ানো ছিটানো ফোল্ডিং চেয়ারে বসে অধস্তন নেতা-কর্মীরা। দু’চারজন মহকুমা নেতারা চৌকির ওপর রাখা চেয়ারে বসে হাটের সোরগোলে পরিণত হয়েছে।
শাহাবুদ্দীন ভাইসহ আমীরুদ্দীন প্রবেশ করল। মোটরসাইকেলে করে শাহাবুদ্দীন ভাইকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে সে। তাদের প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে শ্লোগান ওঠে : কারামুক্ত শাহাবুদ্দীন ভাই জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ!
আমীরুদ্দীন হাত উঠিয়ে শ্লোগান বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়, শ্লোগান থেমে যায়। কিন্তু ফিসফাস অনুচ্চস্বরে কথা বলাবলি চলতেই থাকে। আমীরুদ্দীন রেগে উঠে দাঁড়ায়।
আপনারা চুপ করুন! চুপ না করলে পার্টির সভা শুরু হবে না। আমাদের মাঝে উপস্থিত আছেন সদ্য কারামুক্ত সংগ্রামী ছাত্রনেতা শাহাবুদ্দীন ভাই। তিনি আপনাদের সামনে মূল্যবান বক্তব্য রাখার জন্য এখানে হাজির হয়েছেন।
আমীরুদ্দীনের ধমকে কাজ হলো। সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেল।
আমীরুদ্দীন কিছু সময় থেমে আবার বক্তব্য শুরু করলো। ভাইসব! আপনাদের জন্য একটি দুঃসংবাদ আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রনেতা আজ রেসকোর্স ময়দানে কতিপয় গুণ্ডাদের হাতে মারাত্মকভাবে প্রহৃত হয়েছে। তার নাম আবদুল মালেক। অবস্থা আশঙ্কাজনক। আমরা এমন কাপুরুষোচিত হামলার নিন্দা করি।
আমীরুদ্দী ভাই, আমরা ঠিক চিনলাম না, কোন মালেক, ঘটনাটা একটু খুলে বলুন। সভার ভেতর থেকে একজন উঠে বলে।
আমীরুদ্দীন তাকে হাতের ইশারায় বসতে বলে। শাহাবুদ্দীন ভাইর দিকে তাকায়। আমীরুদ্দীনের অসহায় অবস্থা শাহাবুদ্দীন বোঝে। আসলে আমীরুদ্দীন ঘটনা বিস্তারিত জানে না। কী বা সে বলতে পারে। শাহাবুদ্দীন উঠে দাঁড়ায়।
প্রিয় ভাইয়েরা! আমীরুদ্দীন ভাই যে মালেকের আহত হওয়ার কথা বলেছে, তিনি ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা। ঘটনার বিবরণ আপনারা আগামীকালের পত্রিকায় পাবেন। এখন আমাদের হাতে সময় কম। যে উদ্দেশ্যে আপনারা এখানে সমবেত হয়েছেন সেই কাজ শুরু করা দরকার। কি বলেন?
উপস্থিতির কেউ ‘জ্বী’ বলে সায় দিলেও অধিকাংশই থাকলো চুপ। ওরা মনে মনে চাচ্ছিল ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ শুনতে।
ফিসফাস, গুঞ্জন, কথা বলাবলির মধ্যে আমীরুদ্দীন উঠে দাঁড়াল। প্রিয় কর্মীভায়েরা, এখন আপনাদের সামনে মূল্যবান বক্তব্য রাখবেন সদ্য কারামুক্ত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের নেতা সংগ্রামী ছাত্রনেতা জামালপুরের কৃতি সন্তান জনাব শাহাবুদ্দীন আহমদ শাহাব ভাইÑ
এরপর শ্লোগান শুরু হলোÑ কারামুক্ত শাহাবুদ্দীন ভাই, জিন্দাবাদ! জিন্দাবাদ। মুহূর্মুহূ শ্লোগানে সমস্ত পার্টি অফিস উত্তপ্ত হয়ে উঠল। শাহাবুদ্দীন শ্লোগানমুখর পরিবেশে আসন ছেড়ে হাত তুলে সবাইকে থামতে নির্দেশ দিতে থাকেন। মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, আপনারা শ্লোগান বন্ধ করুনÑ শান্ত হয়ে বসুন। অনেক জরুরি কথা আছে। বসুন সবাই, বসুন। শাহাবুদ্দীনের সঙ্গে আমীরুদ্দীনও আসন ছেড়ে হাত উঁচিয়ে নির্দেশ দেয় শান্ত হতে।
কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই শান্ত হয়ে বসে। একটা নীরবতা এসে গোটা পরিবেশকে ভাবগম্ভীর করে তোলে।
সংগ্রামী ছাত্রনেতা ছোট ভাই আমীরুদ্দীন, উপস্থিত প্রিয় সাথী ও বন্ধুগণÑ সবাইকে লাল সালাম।
বন্ধুগণ, দেশ আজ টালমাটাল। ’৪৭-এ আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম তা বিগত বাইশ বছরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। পশ্চিমা শাসকরা আমাদের এই পূর্বপাকিস্তানকে শোষণ করা ছাড়া আর কিছু দেয়নি। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বারবার লৌহকারায় অন্তরীণ করে তারা আমাদের এই স্বাধীকার আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিতে চায়। কিন্তু আজ বাঙালীরা জেগেছে। কোন ষড়যন্ত্র কোন ভাঁওতাবাজী আমাদের এই আন্দোলনকে দমাতে পারবে না…
দীর্ঘ প্রায় সোয়া একঘণ্টা শাহাবুদ্দীন বক্তৃতা করল। উপস্থিত নেতা-কর্মীরা উজ্জীবিত হলো। শ্লোগান দিতে দিতে সবাই বের হয়ে গেল যে যার পথে।