পংখি বাড়িতে এসে জানতে পারে যে তার ছোটভাই ফমুকে পাওয়া যাচ্ছে না। গভীর রাত অবধি বাড়ির সবাই জেগে। মা বার বার মূর্ছা গেছে। ছোটবোন আছিয়া ছুটে এসে খবর জানিয়ে মার কাছে ফিরে যায়। পংখি কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে উঠানে। কি করবে ভেবে পায় না। মনে পড়ে রক্ত লাগা হাত ধুয়ে ফেলার কথা। আছিয়া আবার কুপি হাতে ঘর হতে বের হয়ে গোয়াল ঘরের দিকে যাচ্ছিল। পংখি ডাকে, আছি, কুপ্পিটা রাইখা যাইস। ‘আইচ্ছা’ বলে আছিয়া গরুর ঘরের দিকে যায়। ফমুর নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে বাড়িতে যে নিয়মের অন্যথা হয়েছে তার পুরোটা ঐ অবলা পশুদের ভাগ্যে জুটেছে। রাতের খাবার এখনো ওদের জুটেনি। আছিয়া সেই খাবার দিয়ে আসার জন্য যায়। ঘাস কাটাই ছিল কিছু। তাইই অবলা পশুদের খাবারপাত্র মাটির চাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দিতে হবে। এদের দেখভাল করতো ছোট ভাই ফমুই।
কুপি নিয়ে আছিয়া গরুর ঘরে প্রবেশ করতেই অবলা গরু দুটো নড়চড়ে উঠে ফমুর পরিবর্তে আছিয়াকে দেখে ওরাও বুঝি খানিকটা উদ্বেগের প্রকাশ ঘটাল। অনুচ্চস্বরে ‘হাম্বা’ বলে আছিয়ার দিকে ছল ছল দৃষ্টিতে তাকায়। আছিয়া ঘাসের বস্তায় হাত দিতে যাওয়ার আগে একটু থমকে দাঁড়ায়। অবলা পশুর দিকে তাকিয়ে তার হৃদয়ে জেগে ওঠে বেদনা। ছোট ভাইর নিখোঁজের পর এ পর্যন্ত নিজের বুকের কষ্ট বহুকষ্টে সামাল দিয়েছে। সামলেছে সংসার এবং মাকেও। কিন্তু কান্না চাপতে চাপতে বুকে তার ব্যথা হয়ে গেছে। আর পারে না নিজেকে ধরে রাখতে। বুকের ভেতর দলা পাকানো কান্নাগুলো সশব্দে বের হয়ে আসে। আছিয়া গোয়াল ঘরের খুঁটি দু’হাতে চেপে ধরে অঝোরে কাঁদতে থাকে। তার কান্না যেনো শেষ হতে চায় না। ভুলে যায় গরুর খাবার দেবার কথা। গরুগুলোও নীরব দর্শক হয়ে যায়। ‘টু’ শব্দটি তারা করে না। ওরা জানে না আছিয়ার এই অঝোরে কান্নার হেতু। এভাবে কতক্ষণ কেঁদেছে আছিয়ার খেয়াল হয় না। তবে গোয়াল ঘরে বেশ দেরি করে ফেলেছে এ কথা মনে হতেই আছিয়ার কান্নার বেগ প্রশমিত হয়। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছে নেয়। নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করে। কপাল গাল মুখ সবকিছুই শাড়ির আঁচলে মোছে। কান্নার চিহ্নকে মুছে ফেলতে সচেষ্ট হয়। মার সামনে সে যতোটা পারে স্বাভাবিক থাকতে চায়। কবিরাজ এসেছিল, বলেছে, সবাইকে শান্ত থাকতে।
আছিয়া ঘাসের বস্তায় হাত চালায় দ্রুত। পটাপট গুচ্ছ গুচ্ছ ঘাস বের করে গরুর সামনে শূন্য চাড়িতে রাখে। অন্যদিন হলে গরু দু’টোর সামনে ঘাস নিতেই হাত থেকেই মুখ লাগিয়ে খাওয়া শুরু করে। কিন্তু আজ আছিয়া অবাক হলো, অবলা গরুর কাণ্ড দেখে। এতো রাতে খাবার দেওয়া সত্ত্বেও ওরা মুখেই তুলল না। নাক দিয়ে শুঁকে শুঁকে মাথা তুলে শুধু আছিয়াকে দেখছে ছল ছল চাহনিতে।
কিরে খাস না! ছোড ভাই নাই, খুঁজলে কুন লাভ নাই, নে খা-। আছিয়া গরুগুলোকে খাওয়ার জন্য মৃদু শাসন করে। কিন্তু না, গরুগুলো কিছুতেই ঘাস মুখে তুলছে না। এ রকম অদ্ভুত কাণ্ড তো সে কোনদিন দেখেনি। ফমুর পরিবর্তে সেও গরুর খাবার দিয়ে থাকে। দিব্যি খায়। ফমুর মতোই গরু দুটো তাকেও বেশ মানে। আদর-সোহাগ সেও করে। আছিয়া গরু দু’টোর কাছে গিয়ে গলায় হাত বুলিয়ে দেয়। অন্যদিন হলে জিহ্বা বের করে আদরের জবাবে আদর দেয়। আজ কেমন নিথর নিরব দাঁড়িয়ে থাকে। তাহলে কি পশুরাও সব টের পায়? ফমু ভাইর কোন অমঙ্গল হওয়ার ইঙ্গিত কি? আছিয়ার চোখ ভরে ওঠে আবার অশ্রুতে। গোয়াল ঘরে আর থাকতে মন চায় না। বাড়ির অদূরে পেঁচার ডাকও ভেসে আসছিল। আছিয়ার মনে পড়ে বড় ভাই কুপি চেয়েছিল। এতো দেরি করা ঠিক হচ্ছে না। চটপট কুপি হাতে উঠানে আসে। বড় ভাই বসে আছে একটা জলচৌকিতে। এভাবে নীরবে বসে থাকার লোক বড় ভাই না।
কুপিটা রাইখ্যা আমার লাইগ্যা এক লোটা পানি আন।
আনিরো বাইজান। আছিয়া কুপিটা ভাইর সামনে রেখে দৌড়ে যায় কুয়ার দিকে। কুয়া থেকে পানি তোলার কোন দরকার নেই। কুয়ার পাশেই আছে একটা বিশাল মাটির মটকা। মাটিতে আধাআধি শরীর গেঁড়ে দেওয়া। যারা কুয়ার পানি তুলে ব্যবহার করার যোগ্যতা রাখে না কিংবা জরুরি পানির প্রয়োজন পড়ে তারা এখান থেকেই পানি ব্যবহার করে থাকে। আছিয়া মাটির লোটা কুয়া থেকে নিয়ে পানি ভরে। দ্রুত তা এনে রাখে বড় ভাইয়ের সামনে।
পংখি পানি পেয়ে কুপির খুব কাছে এসে হাত দেখে। পরখ করে লেগে থাকা রক্ত কি তাহলে তার সহোদর ভাই ফমুর? এই তাজা রক্ত কি তার গায়ে প্রবাহিত রক্তেরই ধারা? ঐ দেহহীন মুণ্ডু কি ফমুর? কিন্তু এতো রাতে ফিরে গিয়ে তা পরখ করার মতো সাহস পংখি বুকে পেলো না। যদি খুনীরা ফমুকে খুন করে থাকে তবে নিশ্চয়ই টার্গেট ছিল সে। তাকে না পেয়ে ফমুর উপর নিয়েছে প্রতিশোধ। মনে পড়ে আজ তারই ফেরার কথা ছিল ঐ সময়। বাড়ি ফিরে যাবার কথা ছিল পূবের পাড়ায় নছিমুদ্দিনের বাড়ি। নছিমুদ্দিন ভাগে চাষ করে তাদের জমি। এবার বোরো ধানের ভাগ নাকি ঠিকমতো দেয় নাই। ছোট ভাই ফমুর কাছ থেকে জানতে পারে। ফমুকে বলেছিল আজ একটু আগুয়ান বাড়ি ফিরবে। ফিরেই জমির ব্যাপারে আলাপে যাবে। নছিমুদ্দিন অবশ্য কাজটা নিজের বুদ্ধিতে করে নাই তা সে আন্দাজ করেছে। যা হোক নছিমুদ্দিনের কাছে গেলেই সব মামলা বোঝা যেতো। পংখির কাছে ঘটনা আরো পরিষ্কার হয়ে যায়। আজ সে-ই ছিল ওসমানের লক্ষ্যবস্তু।
পংখির মন ছটফট করে ওঠে হাসপাতাল রোডে ফিরে যেতে। কিন্তু আবার ফিরে যাওয়া কি ঠিক হবে? যদিও সে জানে পংখির সামনাসামনি হবার মতো সাহস কারু বুকে নেই। তবু এভাবে গভীর রাতে লাশের মাথা পরখ করতে যাওয়া বোকামী ছাড়া কিছুই না। মনে মনে ভেবে স্থির করে খুব ভোরে এসে খুঁজে দেখবে ঐ মুণ্ডুটা কার, আর মুণ্ডুর সঙ্গের দেহখানার খোঁজও করবে।
লোটা থেকে পানি ঢেলে পংখি হাত রগড়ে রক্তের দাগ ধুয়ে ফেলতে থাকে। এমন সময় আছিয়া এসে দাঁড়ায় নীরবে। বড় ভাইয়ের হাতে রক্ত এই প্রথম তার নজরে আসে। এমন দৃশ্য সে এর আগেও বহুবার দেখেছে। নতুন না। খুন-খারাবি করা তার ভাইয়ের স্বভাব। তাই আজও এমন কোন ঘটনা ঘটিয়ে এসেছে। এতে আর সন্দেহ কি! তার বড় ভাই একটা পিশাচ। মানুষ না। মানুষ হলে মানুষকে কিভাবে খুন করতে পারে? অন্য মানুষকে খুন করলে নিজের মানুষও খুনের শিকার হতে হয়। যেমন আজ ছোট ভাই ফমুর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সে নিশ্চিত ফমু তার ভাইর কৃতকর্মের জের হিসেবেই জীবন দিতে বাধ্য হয়েছে।
আছি, আরেকটু পানি দে বইন!
আছিয়া মুখে কোন কিছু না বলে লোটা হাতে আবার কুয়ার পাড়ে ছোটে। দ্রুত পানি ভরে নিয়ে আসে বড় ভাইয়ের জন্য। বিরক্তির সঙ্গে লোটাটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে সামনে রাখে।
আছি! পানিডা আমার হাতে এটু ঢাল বইন!
বড় বাইজান! তুমি আইজও খুন করছ, না?
না।
তাইলে তোমার হাতে অক্ত কেন?
তোর অতো জাইন্যা কি অইবো, পানি ঢাল!
আছিয়া চুপ মেরে যায়। এই যে এইটুকু কথা বলেছে এটাই বেশি। ছোট থাকতে এই বড় ভাইর সঙ্গে তার বেশ মিল-মহব্বত ছিল। ভীষণ আদর করতো তাকে। স্কুল থেকে ফিরল একটা কিছু তার জন্য নিয়ে ফিরতো। কিন্তু কেমন হঠাৎ বদলে গেল ভাই। বাবার মার্ডার হওয়ার পর থেকে তাদের সংসারে সবকিছু গেল তছনছ হয়ে।
পানি ঢালা শেষ হলে আছিয়া সরে আসে উঠান থেকে। ঘরে এসে মা’র কাছে আসে। মা তখনো হা-হুতাশ ধ্বনি আর থেকে থেকে বিলাপ করছে।
‘আছি’Ñ পাশের ঘরে যেতে উদ্যত হলে পেছন হতে মা’র ডাক তার কানে আসে।
জ্বে মাও, আমারে ডাকো?
হু-ন
কও কি কইবা?
তোর বড় বাইজানের আমার কাছে ডাক!
জ্বে, আচ্ছা। বলে আছিয়া আগের গতিই বজায় রাখলো। পাশের ঘরে আছে তার বড় বোন খাইরুন। পাশের গাঁয়েই তার বিয়ে হয়েছে। ফমুর নিখোঁজের খবর চাউর হতেই সে ছয় মাসের দুধের বাচ্চাকে সঙ্গে করে ছুটে এসেছে। এই কিছুক্ষণ আগেও সে ছিল সজাগ। বাচ্চাকে দুধ দিয়ে ঘুম পাড়াতে গিয়ে নিজেও ঘুমিয়ে পড়েছে। কিছুই খায়নি। আছিয়ার একথা মনে হতেই তার কিশোরী মনে এক দায়িত্বের অনুভূতি জেগে উঠলো। বোনটা এতোদূর হতে একা ছুটে এসেছে ভাইর খবর পেয়ে। অথচ এতো রাত অবধি তার পেটে কিছুই পড়েনি। কোলে শিশু এমন মেয়েলোকের না খেয়ে থাকা ঠিক না। তাই বড় বোনকে ডেকে কিছু খাওয়ার জন্য তাগিদ দেবে। না খেয়ে তাকে ঘুমাতে সে দেবে না। রান্নাবান্না অবশ্য সব সে-ই করেছে। বিকেলে মেন্দার মা এসেও অনেকটা সাহায্য সহযোগিতা করেছে। ফলে রান্নার কাজ ফেলে রাখেনি। যদিও তেমন কোন সালুন সে পাকাতে জানেও না। আর আজ বাড়ির সবার মনের যে অবস্থা গেছে তাতে মোটে রান্না না হওয়াই ছিল স্বাভাবিক ঘটনা।
আছিয়া অন্ধকার ঘরে ঢুকে একটু দাঁড়ায়। অনুচ্চস্বরে ডাকে আফা- ও আফা। জবাব আসে না। কাছে গিয়ে ঘুমন্ত বোনের শরীর স্পর্শ করে মৃদু ঠেলা দিয়ে ডাকে আফা, ও আফা-
কী-কী-কীরে কী অইছে- ভীত বিহ্বল হয়ে বড় বোন শোয়া থেকে বিছানায় উঠে বসে।
আফা ভয় পাইছো?
হঃ কেন ডাকোছ?
ভাত খাইবা না?
না। আমার খিদা নাই।
না, চল সামান্য খাইবা। বড় ভাই আইছে।
না, তুই যা। খাইরুন আবার আগের মতো শুয়ে পড়ে।
আছিয়া আর পীড়াপীড়ি করে না। খাওয়ার মত মন তারও নেই। ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে ঘর হতে। বারান্দায় এসে দেখে বড় ভাই জামা কাপড় খুলে একটা তালপাখা দিয়ে বাতাস খাচ্ছে। কুপিটা একটা বেঞ্চের ওপর। বড় ভাই বসেছে বাবার পুরনো হাতাওয়ালা কালো কুচকুচে চেয়ারে। চেয়ারটা বাবার আমলের নয়। দাদার। মেহগনি কাঠের তৈরি। অত্যন্ত সূক্ষ্ম কারুকাজ খচিত এ চেয়ার দাদা বানিয়েছিলেন আহ্লাদ করে। তিনি অবশ্য ঐ চেয়ারের জন্য উপযুক্তও ছিলেন। যেমন ছিলেন তিনি ভূসম্পত্তির মালিক তেমনি বিদ্বান ও সুপুরুষ। দাদার চেয়ারে বাবাকেও মানানসই লাগতো না তার। কারণ বাবাও ছিল বর্ণহীন মূর্খ। তবে বাবার চেহারা ছুরত ছিল মাশাল্লা। জমিদার জমিদার ভাব। যেমন লম্বা তেমন স্বাস্থ্য। প্রথম জীবনে টকটকে ফর্শা রং ছিল বাবার। বাবার রং শ্যামলাই। আর লম্বায়ও বেশ কম। সেই বাবা-মায়ের ছেলে তার বড় ভাই না পেয়েছে বাবার রং গড়ন না মায়ের কোনকিছু। বড় ভাইকে ঐ চেয়ারে বসা আছিয়ার কোনদিন ভাল ঠেকেনি। যদিও বংশগত দিক দিয়ে তিনিই ঐ চেয়ারের মালিক হয়েছেন। আছিয়ার তবু মনে হয় সবার জন্য সবকিছু মানানসই হয় না।
বড় ভাই, মাও তোমারে ডাকে। আছিয়া কথাটা বলেই আবার ঘরে ঢোকে। সে জানে মা’র ডাকে সাড়া দেবার মতো ছেলে তার ভাই না।
পংখি কি যেনো ভেবে চেয়ার থেকে ওঠে। হাতের কিরিচটা কোথায় রাখবে একটু ভাবে। যদিও ঐ জিনিসটা তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। এ মুহূর্তে তার ঐ জিনিসের সঙ্গ ভাল লাগছিল না। কোথাও রাখতে পারলে বাঁচে। বারান্দায় রেখে যাওয়াও ঠিক না। অগত্যা হাতে নিতেই হলো। ঘরে ঢুকে ইতিউতি তাকিয়ে কিরিচটা রেখে দিলো একটা ছিকার ভেতর। তারপর মায়ের বিছানার পাশে গিয়ে বসল ধীরে ধীরে। মায়ের একটা হাত টেনে নিল নিজের কোলে।
পংখি?
অন্ধকারেও মায়েরা ঠিকই চিনতে পারে তার সন্তানকে। তার জায়গায় হাসপাতাল রোডে মা হলে ঠিকই চিনতে পারতো ঐ মুণ্ডু ফমুর কি না।
মাও!
পংখি!
এরপর শুরু হয় মায়ের বিলাপ কান্না। সে কান্নার শব্দে সমস্ত বাড়ি জেগে উঠছিল। পংখি মাকে কোন সান্ত্বনাও দেওয়ার চেষ্টা করে না। শুধু মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা আরো দৃঢ় করে। মোবারকের বংশ নিপাত না করা পর্যন্ত সে তার হাতকে সংবরণ করবে না। মায়ের হিমশীতল শরীর ছুঁয়ে সে শপথ করলো আবার।