দরোজার উপর অর্ধ চন্দ্রাকৃতির খিল খুলে বাসায় ঢুকতে আরজুর পা থমকে গেল। ভয়ে কেঁপে উঠল তার পা দুটো। রাত করে বাইরে থাকা আব্বা একদম পছন্দ করেন না। হোক না তা যতো কাছে। তাছাড়া এখন দেশের পরিস্থিতিও ভাল না। আইন-শৃঙ্খলা আগের মতো নেই। চারদিকে বেশুমার চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। মানুষ যে যার চৌহদ্দিতে আড়ষ্ট জীবন কাটাচ্ছে।
দরোজা ফাঁক করে আলতোভাবে শরীর গেটের ভেতরে গলিয়ে খিলটা নিঃশব্দ স্থাপন করে ঘুরে দাঁড়াতেই নূপুরের মুখোমুখি হলো আরজু। নূপুর বছর তিনেকের ছোট হলেও তার সঙ্গে সম্পর্কটা কখনো বান্ধবীর পর্যায়ে নেমে আসে। বেশ রাশভারী মেয়ে নূপুর। অনেক কিছু বোঝে। বিশেষ করে তাকে। তাই মনের অনেক কথা নূপুরকে আরজু খুলে বলে। সমবয়সী বান্ধবীর মতো নূপুর মন দিয়ে শোনে। প্রয়োজন মতো মন্তব্য ও পরামর্শ রাখে। আরজুর মনেই হয় না নূপুর এখনো কলেজ দোরগোড়ায় পা না দেওয়া এক কিশোরী বালিকা। নূপুরের ভেতর কিছু অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। মানুষকে কাছে টানার। আন্তরিকতা ও ভালবাসা দিয়ে বিমুগ্ধ করার আচরণ নূপুর বেশ ভালই জানে।
মেঝ আপু, তুমি এতো রাত করলে?
কেন, আব্বা রেগে আছেন?
দেশের চিন্তায় এমনিতেই আব্বার মেজাজ-মর্জি ভাল নেই। তুমি বাসায় নেই জেনে আম্মার সঙ্গে খুব বকাঝকা করছিলেন।
এখন?
না, এখন চুপ। নিজ ঘরে বসে রেডিও শুনছেন।
আব্বার ঘরে যাবো?
না, এখন যেয়ো না।
আরজুর খেয়াল হলো এতো রাত করে ফিরে সে অন্যায় করেছে। তার জন্যই আম্মা বকা খেলেন শুধু শুধু। আম্মার ঘরেই প্রথম যাওয়া দরকার। আরজু অবশ্য জানে আম্মা কখনো এ নিয়ে তাকে কিছু বলবেন না। মানুষ এমন সর্বংসহা হয় কি করে আরজু বোঝে না। আম্মাকে এ জীবনে উঁচু গলায় কথা বলতেও সে দেখেনি। আব্বা বলেন, মাটির মানুষ। আরও বলেন, হবে না, মীর বংশের মেয়ে, যাকে বলে প্রকৃত খানদানী পরিবার। কিন্তু আব্বা আপনি? এমন একটা কৌতুকপূর্ণ প্রশ্ন মনে আসায় আরজুর হাসি পেল। হাসতে হাসতে আম্মার ঘরে প্রবেশ করে আরজু।
আম্মা, আম্মা আমি আইছি।
এতো দেরি করলি কেন?
আব্বা তোমাকে বকছে?
ঐ আর কি, তোর আব্বার স্বভাবÑ
জমিদারিÑ
ঠিক বলেছিস মা, জমিদারী নেই ঐ মেজাজটা ঠিকই আছে।
আম্মা, আব্বা খুব রেগে?
না, এখন তেমন নয়, যাবি? যা।
আম্মা, দেশের অবস্থা খুব খারাপ।
আমীরুদ্দীন কী বলল?
আমীরুদ্দীন ভাই বাসায় এ খবর আম্মার কাছে জেনে আরজু একটু লজ্জিত হলো। আম্মার কথার সঙ্গত জবাব খুঁজে পাচ্ছিল না। আবার সত্যি কথাটা লুকানোর স্বভাব তার নয়।
জ্বী আম্মা, আমীরুদ্দীন ভাই বললেন, দেশের অবস্থা ভাল না।
তোর আব্বাও চিন্তায় অস্থির।
আম্মা, বুকে ফুঁ দিয়ে দাও তো, আব্বার ঘরে যাচ্ছি।
ফুঁ লাগবে না সামনে হাজির হলেই রাগ পানি। তোর আব্বার রাগতো জানিস। এই আগুন এই ঠাণ্ডা।
আরজু জানে আব্বা যতো মেজাজী হোক ছেলে-মেয়েদের ওপর কখনো খুব কঠোর হন না। মেজাজ যতটুকু ঢালেন আম্মার ওপর।
আরজু আব্বার ঘরের দরোজার পর্দা উঠিয়ে উঁকি মারে। দেখে ইজি চেয়ারে বসে কোলের ওপর ট্রানিজিস্টার রেখে কি যেনো শুনছিলেন। বোঝা গেল মনযোগ দিয়েই শুনছেন। ঘরে ঢোকা ঠিক হবে না ভেবে পর্দা ছেড়ে দিয়েছে এমন সময় আব্বার কন্ঠস্বরÑ কে ওখানে?
আব্বা আমি। আরজু লক্ষ্য করলো তেমন ভয় পায়নি সে। গলার স্বরও স্বাভাবিক ছিল।
এদিকে আয় মা!
আরজু পর্দা সরিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। এ ঘরটি বিশেষভাবেই আব্বার। একটা পুরনো আমলের মেহগনি কাঠের উঁচু পালঙ্ক। বিশাল আকৃতি দুটো আলমারি যার ভেতর মোটাসোটা মূল্যবান বইপুস্তক। একটা কালো রঙের টেবিল। বেশ বড় সাইজের টেবিলটিতে একপাশে দুটো তাক আছে। বই সাজানো। আর একটা ইজি চেয়ার ও খানতিনেক হাতবিহীন চেয়ার। এ নিয়েই অধ্যাপক চৌধুরী শরীফ হোসাইনের নিজস্ব জগত। আব্বাকে নিয়ে আরজুর গর্ব হয়। অহংকারও হয় খানিকটা। প্রত্যেক মেয়েরই বোধহয় আপন জন্মদাতা পিতাকে নিয়ে আবেগ থাকে। মেয়েরা বাবার প্রতি অনুরক্ত হয়। ভালবাসার পাত্র-পাত্রীদের মাঝে বাবাই মেয়েদের প্রথম ব্যক্তি, যার প্রতি পক্ষপাত থাকে। তবে আরজুর আবেগ একটু ভিন্ন ধরনের। তার আব্বা কলেজ অধ্যাপক বলে নয়। কিংবা এক সময়ের বিখ্যাত জমিদার মনোহর আলী চৌধুরীর অধঃস্তন পুরুষ হিসেবে নয়। এ ভিন্ন বোধটি আব্বার আদর্শ চরিত্রের জন্য। কলেজে ছাত্র-ছাত্রী মহলে অধ্যাপক শরীফ শুধু একজন ভাল ইতিহাস পড়ান এ জন্য নয়, সর্বদিক বিবেচনায় একজন আদর্শ ব্যক্তি হিসেবে প্রিয় ব্যক্তিত্ব। যারা আব্বার রাজনীতিকে পছন্দ করে না তারাও ব্যক্তি শরীফ সম্পর্কে টু শব্দ কেউ করে না। এ ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমান বলে কোন তফাৎ নেই।
আরজু ইতিহাস পড়তে ভালবাসে। আব্বাই তাকে ইতিহাসের অনুরক্ত ছাত্রী বানিয়েছেন। আব্বা বলেন, ইতিহাস না জানলে মানুষের জ্ঞান পরিপূর্ণ হয় না। ইতিহাস মানুষের আগামী জীবনের দিগদর্শন।
কোলের ওপর হতে রেডিও সরিয়ে অধ্যাপক শরীফ মেয়ের দিকে আগালেন। আরজুর একটা হাত ধরে নিয়ে বসলেন বিছানায়।
আব্বা, দেশের অবস্থা খারাপ, না?
হ্যাঁ মা, এ দেশটা নিয়ে চক্রান্ত চলছে আল্লাহ জানেন কী হবে।
কারা চক্রান্ত করছে আব্বা?
যারা মূর্খ, ইতিহাস জানে না।
কোন ইতিহাস আব্বা?
আমাদের মুসলমানদের ইতিহাস। এইতো সেদিনের। ১৭৫৭ সাল। পলাশীর প্রান্তরে যে যুদ্ধে নবাব সিরাজ হারালেন বাঙলার স্বাধীনতা, কেন?
সেদিনের কথা বলছেন আব্বা, সেতো দুশো বছর আগের ইতিহাস।
হ্যাঁ, সময়ের দিক দিয়ে যদিও দুশো বছরের কিন্তু এ ইতিহাস তো আমাদের পূর্বপুরুষের সামনেই ঘটে যাওয়া। আমাদের পূর্বপুরুষ তো মুর্শিদাবাদের। এই আমার দাদার দাদা ক্ষেতে হালচাষ দেখতে গেছেন। দেখলেন, ইংরেজ বাহিনী পলাশীর দিকে রণসজ্জায় এগুচ্ছে। আমার দাদার দাদা ভাবলেন আমাদের নবাব কম কী, লড়াই লাগলে পারবে না। কিছুকাল আগেই কোলকাতার লড়াইয়ে নবাব বিজয়ী হয়েছেন। তাছাড়া রাজায় রাজায় যুদ্ধ, তাতে তাঁদের কী। তাঁদের যে কর দেওয়ার দিতেই হবে। লেগে গেলেন নিজ কাজে। সেদিন যদি আমার দাদার দাদারা বুঝতে পারতো যে এই যুদ্ধ মানে দুশো বছরের গোলামী তবে দেশীয় ছোট-বড় জমিদার প্রজাবৃন্দ একত্র হয়ে নবাবের পাশে দাঁড়ালে ইংরেজ শক্তি পালাতে পথ পেতো না।
কিন্তু আব্বা, ইতিহাসটা জানবে কী করে মানুষ? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তেমন ব্যবস্থা কোথায়?
এখানেই তো গলদ। আমি শিক্ষক সম্মেলনে বহুবার বলেছি এ দেশের মানুষকে প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ইতিহাসকে পাঠ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে তা অশুদ্ধ অপূর্ণাঙ্গ। এ দেশের ছাত্র-ছাত্রীদের মুসলমানদের ইতিহাস পড়াতে হবে। কিন্তু কে শোনে আমার কথা।
আব্বা আপনি এতো চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিছুই ঠিক হবে না। চক্রান্ত অনেক গভীরে। এ কথাই সেদিন কলেজে শিক্ষক মিলনায়তনে বলতে গিয়েছিলাম। দু’তিন জন শিক্ষক তেড়ে উঠলেন। বলেন কিনা, আপনারা বিভেদের রাজনীতি করেছেন। আমরা ঐক্যের রাজনীতি চাই। ধর্মকে উপজীব্য করে মানুষকে ধোকা দেওয়া হয়েছে এতোদিন।
আব্বা, আপনি এসব আর বলবেন না কলেজে। চারদিকের পরিবেশ ভাল নয়। শুধু শুধু আপনি ওদের রোষানলে পড়তে যাবেন কেন?
কিন্তু সত্য কথা না বলে চুপ করে থাকাও যে পাপ। যতদিন পারি বলব। যা হবার হবে।
আরজু দেখল অধ্যাপক শরীফের ফর্সা মুখ গোলাপী হয়ে উঠেছে। কখন এ রঙ ধারণ করে আরজু বিলক্ষণ জানে। এর চেয়ে বেশি ঘাটানো ঠিক হবে না। দুশ্চিন্তা তাঁকে ঘিরে ধরেছে।
আব্বা, আমি আসি? খেতে আসেন।
আরজু তার আব্বাকে নিয়ে খেতে ভালবাসে। আব্বাও। তাই বাসার সবাই খেয়ে নিলেও আরজু আব্বার জন্য এবং অধ্যাপক শরীফ তার মেয়ে আরজুর জন্য অপেক্ষা করার ঘটনা খুব স্বাভাবিক।
খাওয়ার টেবিলে মুখোমুখি আরজু ও অধ্যাপক শরীফ। দু’জনেই বিনাবাক্যে খেয়ে চলেছে। এটাই নিয়ম এ বাসার। খাওয়ার সময় খুব প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া বলা নিষেধ। অধ্যাপক শরীফের সব ছেলেমেয়েই একথা জানে এবং মানে।
মা, আমি ভেবেছি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হবো।
আব্বা, আপনি বলেছিলেন রাজনীতি ত্যাগ করেছেন, আর করবেন না।
না, আমার সিদ্ধান্তে ভুল ছিল। দেশকে বাঁচাতে হবে। সবার উপরে দেশ।
কোন পার্টিতে যোগ দেবেন আব্বা?
কেন আমাদের বাপ-চাচার পার্টি। যে পার্টির সঙ্গে আমার ঘাম ও রক্ত মিশে আছে।
আরজু নিশ্চুপ হয়ে যায়। আর কথা বাড়ায় না। আজ আব্বার আচরণে খানিকটা একরোখা ভাব প্রকাশিত। আব্বা যদিও বরাবর একটু রগচটা ধাঁচের মানুষ। কিন্তু এরপরও কখনো মাত্রা ছাড়িয়ে কোন কাণ্ড ঘটিয়ে বসে না। বরং সব সময় আপন অবস্থান সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন থেকে মানবিক গুণাবলীর এক অপূর্ব প্রকাশ ঘটিয়ে মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। আর তার আব্বাকে কখনো সে দেখেনি আপন স্বার্থবুদ্ধিতে বিভোর হতে। অতএব যা ভাবছেন তিনি এর মাঝে সারবত্তা কল্যাণ আছে নিশ্চয়ই।

আমীরুদ্দীন শুয়ে শুয়ে পত্রিকা পড়ছিল। জানালা দরোজা খোলাই ছিল। পূর্ণিমা রাত বলে জানালা-দরোজা দিয়ে চাঁদের আলো আছড়ে পড়েছে ঘরে। তাই ইচ্ছে করে না এই উদার চাঁদের আলো প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। টেবিলল্যাম্পটা এমনভাবে স্থাপন করেছে যাতে আলোটা শুধুমাত্র তার পঠিত কাগজের ওপর আপতিত হয়। ঘরময় চাঁদের আলোর মায়াময় পরিবেশ বিঘিœত না হয় সে জন্য এ ব্যবস্থা।
পত্রিকায় মন বসছিল না তার। তেমন খবর কিছু নেই। ঢাকায় লীগের মিছিলে পুলিশের এক বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পড়ে মনে হলো না খুব সিরিয়াস কিছু। আমীরুদ্দীন পত্রিকা ভাঁজ করে সিথানের পাশে রেখে দিলো। চোখের সামনে আরজুর মুখ ভেসে উঠলো। কিন্তু আগের মতো মন উতলা হলো না। আরজুর অবয়বে এখন আমীরুদ্দীনকে লক্ষ্য করে কিছু প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়া খুবই কঠিন। সেও ঠিক জানে না। প্রতিদিন সূর্যোদয় ঘটে নতুন উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার খবর নিয়ে। একটা কুয়াশাচ্ছন্ন পথে তাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে। পেছনে ফিরে তাকানোর সময় হাতে নেই।
আমীরুদ্দীন দরোজা দিয়ে পশ্চিম দিকে নদীর দিকে তাকায়। নদীর রূপ দেখার উদ্দেশ্য তার নয়। এই ভর রাতে তা সম্ভবও নয়। তাছাড়া নদী এখন ক্ষীণপ্রায়। বর্ষার উচ্ছলতা ছাড়া নদীর রূপ দেখার কি আছে? আমীরুদ্দীন তাকায় এই শাখা নদীর ওপারের ভূখণ্ডের দিকে। ঐ চরের প্রতি রয়েছে তার আলাদা আকর্ষণ। শৈশবের কৌতূহল এখন রূপ নিয়েছে ভালবাসায়। হানিফের সঙ্গে সম্বন্ধ গড়ে না উঠলে সে জানতেই পারতো না ওদের জীবনকে। ঐ চরের কালো মানুষের দীলে কী মহব্বত ভালবাসা আমীরুদ্দীন জেনেছে। এখন তো ঐ চর তার নিরাপদ আশ্রয়। পার্টি থেকে যেদিন নির্দেশ আসে গা ঢাকা দিতে আমীরুদ্দীন সোজা গিয়ে উঠে হানিফের বাড়িতে। হানিফের বাবা-মা ভাইবোন সবাই আমীরুদ্দীনকে আপনজন হিসেবে জানে। তারা শুধু নিরাপত্তাই দেয় না। আন্তরিকতা ভালবাসা দেয় তাকে অঢেল।
আমীরুদ্দীনের সঙ্গে হানিফের সম্পর্ক গড়ে ওঠে অদ্ভুত কায়দায়। সেই ক্লাস এইটে পড়ার সময় শুকনো মওসুমে শান্দার পাড়ায় ঘুড়ি উড়াতে হানিফের সঙ্গে পরিচয়। প্যাঁচ খেলে ঘুড়ি কেটে দেওয়ায় প্রচণ্ড ক্ষোভে-দুঃখে হানিফ তেড়ে আসে আমীরুদ্দীনকে মারতে। আমীরুদ্দীন বুঝতে পারে চরের এই হিংস্র বলশালী ছেলের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না। আমীরুদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে সারেন্ডার করে। বলে, ‘ভাই ভুল হয়ে গেছে, তোমার ঘুড্ডি দেহি নাই, নাও এই ঘুড্ডি তোমার, আমারে মাইরো না।’
হানিফ যেভাবে রোষে এসেছিল আমীরুদ্দীনের কথায় দমে গেল। কিছুক্ষণ পর আমীরুদ্দীনকে ভালভাবে পরখ করে জিজ্ঞেস করে, ঐ বড়লোকের পুনাই, থাহস কোন বাড়ি?
হাতের ইশারায় আমীরুদ্দীন নদীর কিনারের সুপারি গাছের সারি একটা বাড়ির অস্তিত্ব দেখিয়ে দিলো। যদিও শান্দার পাড়ার বিস্তীর্ণ মাঠ হতে আমীরুদ্দীনের বাড়ি মালুম হওয়ার কথা নয়। কিন্তু ধারেকাছেই তাদের বাড়ি এটা বোঝাবার জন্য সেদিন সে ঐভাবে নিজ বাড়ি নির্দেশ করলো।
না, তোর ঘুড্ডি নিমু না, যা আইজ ছাইড়া দিলাম, সুতায় মাঞ্জা কম দিবি। হানিফ গজ গজ করতে করতে চলে গেল।
আমীরুদ্দীন এরপর শান্দারপাড়ায় গেলে এদিক ওদিক দৃষ্টি ফেলে হানিফকে খুঁজে নিতো। সুতোয় মাঞ্জা দেওয়া, ঘুড়ি বানানো এবং নানা ধরনের খেলা আমীরুদ্দীন শেখায়। এভাবে হানিফের সঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্যতা। যদিও লেখাপড়া অজানা অবহেলিত ঐ চরের কালো কুচকুচে ছেলের সঙ্গে আমীরুদ্দীনের এই বন্ধুত্বের সম্পর্ককে অনেকেই সুনজরে দেখেনি। তার বাবা তো নয়ই, এমনকি ছোট বোনেরাও এ নিয়ে অনেক উপহাস করেছে। সেসব আমীরুদ্দীন আমল দেয়নি। হানিফের সঙ্গে সম্পর্কের সুবাদে ঐ অজপাড়াগাঁয়ের মানুষের সঙ্গে আমীরুদ্দীনের গড়ে উঠেছে এক গভীর সম্পর্ক।
লীগের জেলা সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর হানিফকে কেন্দ্র করে ঐ চরে আমীরুদ্দীন ধীরে ধীরে সংগঠন গড়ে তোলে। তার বিশ্বাস ঐ চরবাসীও একদিন তাদের অনেক উপকারে আসবে। সংগঠন থেকে ছোটখাট আর্থিক সহায়তা ছাড়াও মাঝেমধ্যে মেডিকেল টিম নিয়ে টিকা দান কর্মসূচি ও ছোটখাট চিকিৎসার ব্যবস্থা আমীরুদ্দীন করেছে। তাছাড়া অশিক্ষিত মানুষগুলোকে নিজেদের অধিকার, দেশের প্রতি কি করণীয় তা মাসে দুবার মিটিং করে বোঝানের চেষ্টা করে এসেছে সে। আমীরুদ্দীন বিশ্বাস করে ঐ চর তাদের জন্য কালে কালে দুর্গ হয়ে উঠবে। একদিন আওয়ামী নেতারা টের পাবে। সেদিনও খুব দূরে নয়। তবে আমীরুদ্দীনের এসব কর্মকাণ্ড একশ্রেণীর শহরের কায়েমী স্বার্থবাদীরা সুনজরে নেয়নি। তারা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছে সাদাসিধে চরের লোকদের এতোদিন তারা বিভেদ বিসংবাদ লাগিয়ে যে ফায়দা হাসিল করেছে তাতে টান পড়ার সম্ভাবনা। হানিফই সেদিন আমীরুদ্দীনকে এসব খুলে বলে গেল। আরও বলল, চর তোমার জন্য আগের মতো নিরাপদ নয়। তবে হানিফ বাঁইচা থাকতে শান্দারপাড়ায় আমীরুদ্দীনের কোন ক্ষতি করতে পারবো। সে ভরসাও সে দিলো।
আমীরুদ্দীন সেই চরের দিকে দৃষ্টি রেখে এখন ভাবছিল রাসু সর্দারের কথা। যার কাছে হানিফের অস্তিত্ব মূষিকের কাছে সিংহের মতোই। এ শহরের বিশাল পান্ডা মুসলিম লীগের এককালের খুঁটি। ঐ চর একসময় তার কথায় উঠতো বসতো। এখনো একাংশে ঐ রাসু সর্দারের হুকুমেই চলে। চরের উৎপাদিত শস্যের তিনভাগের দুইভাগ চলে যায় ঐ সর্দারের মাথার ওপর যারা আছে তাদের হাতে। সর্দার এবং তার দলবল পায় ঐ দুইভাগ থেকে নিয়মমাফিক হিস্যা। এ নিয়ম চলে আসছে যুগযুগান্তর ধরে। গোটা চরকে ভাগাভাগি করে খাচ্ছে শহরের কতিপয় শক্তিধর ব্যক্তি, যাদের হাতে আছে রাসু সর্দারের মতো লাঠিয়াল বাহিনী।
আমীরুদ্দীন এখন তাদের কাছে বিভীষণ। লীগের লিডার, আওয়ামী লিডার তরপদারের আত্মীয়, হানিফের মতো দুর্ধর্ষ বন্ধু, এককথায় চরবাসীর আপনজন আমীরুদ্দীনের গায়ে হাত দেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। তাই সাহস করে কেউ কিছু বলছে না। কায়েমী স্বার্থবাদীরা ভিন্ন পথে এগুচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি করে চরে সংঘাত, সংকট বাধিয়ে দেওয়া। এর মানে আমীরুদ্দীন সেখানে বিতর্কিত ব্যক্তি হয়ে যাবে। ঐক্যের শক্তি না থাকলে হানিফ এবং আমীরুদ্দীনের মজবুত নেতৃত্বের বল থাকবে না।
আমীরুদ্দীন মনে মনে ভাবে যাহোক কালই একবার চরে যাবে। হানিফের সঙ্গে জরুরি কথা বলবে। এমন কিছু খবর তার কাছে আছে যা হানিফের কানে যাওয়া জরুরি। আর আরেকটি বিষয় আমীরুদ্দীনের মনে পড়ে, পংখির কথা। পার্টির সিদ্ধান্ত মোতাবেক পংখি ভাইকেও সে এ ব্যাপারে জড়াতে পারে। নিরাপত্তার স্বার্থেই তার সঙ্গে পংখিকে নেবে দুএকদিন। পংখির যাতায়াত আগেও ছিল। শুধু ভাড়াটে গুণ্ডা হিসেবে। এবার আওয়ামী কর্মী হিসেবে সেখানে সে তাকে পরিচিত করাবে। আগামীকাল সকালেই পংখি ভাইর সঙ্গে আলাপ করবে এ বিষয়ে। সেই আলাপের সূত্র ধরেই হানিফকে বলবে খুব শিঘ্রী একটা মিটিং ডাকতে চরে। ঐ মিটিংয়ে প্রধান বক্তা হিসেবে আওয়ামী নেতা কাউকে নেবে। পংখি থাকবে তার আশপাশে। সুযোগ মতো লোকজনকে জানিয়ে দেবে পংখির পরিচয়।
আজকাল রাতে আমীরুদ্দীনের মাথায় নানান চিন্তা এসে ভর করে বলে ঘুম আসতেই চায় না। অথচ ঘুমানোর ইচ্ছে নিয়েই বাসায় ফিরেছিল। আর অধিক রাত জাগা ঠিক হবে না ভেবে উঠে দরোজা-জানালা বন্ধ করে। বাতিটা নিভিয়ে বিছানায় এসে শোয়। একটু পর কিন্তু খাটের নিচে খচ্ খচ্ খচ্ শব্দ হতে থাকে। মনে হতে থাকে কে যেনো কাগজের পাতা উল্টাচ্ছে। আমীরুদ্দীন আমল দেয় না। শব্দ অনেক কারণেই হতে পারে। ইঁদুর বসে বসে কাটছে কিছু হয়তো। কিংবা মনের ভেতর উদ্বেগ থেকেও মানসিক বিকার হতে পারে।
আমীরুদ্দীন আমল না দিয়ে পাশ ফিরে শোয়।