ব্রহ্মপুত্র নদীর শাখা যেখানটাতে জামালপুর শহরে ঢুকেছে তারও আরেকটু পশ্চিম দিকে নদীর কিনার ঘেঁষে রাসু সর্দারের বাড়ি। কয়েক বিঘা ভূমি নিয়ে বাড়ি। বড় বড় পাঁচটি টিনের ঘর। এখন জ্বরাজীর্ণ প্রায়। উঁচু পাকা ভিটে।
সৈয়দ রইসউদ্দিন সর্দার ওরফে রাসু সর্দার চরের দিকে মুখ করে খোলা বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে। বিকেলে স্নিগ্ধ শীতল বাতাস তার শরীরে আরাম দিচ্ছে। নদীর বাঁক ঘুরিয়ে দেবার জন্য এখানে বহুদিন আগে একটা শক্ত ইটের দেয়াল তৈরি করেছিল। বাঁকটা ঘুরিয়ে নিজের বাড়িঘর রক্ষা করা গেলেও কালক্রমে ঐ দেয়াল দুর্বল হয়ে দুতিনটে ফাটল ধরেছে যার ভেতর দিয়ে প্রতি বছর বর্ষায় পানি প্রবেশ করে বাড়ির নিচের মাটিকে একটু একটু করে সরিয়ে নিচ্ছে। রাসু সর্দার জানে একদিন ঐ নদীর কাছে তাকেও পরাজিত হতে হবে। দক্ষিণের পোঁতার ঘরটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছে। অথচ এখন ইচ্ছে করে না আরেকটি শক্ত দেয়াল দিয়ে রক্ষা করার শেষ চেষ্টা করে। কার জন্য করবে? যাদের জন্য এতোসব করল তারাই তাকে বুঝল না। দু’টো ছেলে একটা মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে এক ছেলে প্রায় উন্মাদ। ছোট ছেলেটা হয়েছে লীগের গুণ্ডা। বাপ করল সারা জীবন মুসলিম লীগের জন্য জীবনপাত, তার ছেলে হয়েছে আওয়ামী গুণ্ডা। ভাবতেই রাসু সর্দারের মুখে একদলা থুথু এসে জমে। ঘৃণায় থুঃ ছুঁড়ে মারে সামনে। কাশ জড়ানো থুথু গিয়ে পড়ে ভাঙা দেয়ালের ওপারে পাক খাওয়া পানির উপর। পানি পাক খেতে খেতে এখানে প্রচুর ফেনা জমেছে। থুথু পড়ে গিয়ে ফেনার ওপর।
রাসু সর্দারের বয়স এখন সত্তরের ওপর। দেখে আঁচ করা মুস্কিল এতো বয়স তার। লম্বায় প্রায় ছ ফুট। ছাতি পঁয়তাল্লিশের কম না। গায়ের রং টকটকে ফর্সা। রেগে গেলে লালচে হয় মুখ। হাত দুটো একটু লম্বাই। ইখতিয়ারউদ্দিন বিন বখতিয়ার খিলজীর মতো। বঙ্গবিজয়ী এই বীরের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে রাসু সর্দার গৌরব অনুভব করে। তবে তার এই গর্বের কিছু কারণও ঘটেছে।
ইখতিয়ারউদ্দীন বঙ্গবিজয় করেছিলেন হিন্দু রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করে। আর রাসু সর্দার ঐ চর দখল করেন হিন্দু জমিদার মুকুন্দ সেনের কাছ হতে। পার্টিশনের আগে যখন হিন্দু জমিদারদের প্রতাপের কাছে সাধারণ মুসলমানদের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়, তখন রাসু সর্দার ঐ জমিদারের সঙ্গে সমানে সমান ঝুঝে চরের দখল করার ‘মহান’ ইতিহাস রাসু সর্দারকে বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। হ্যাঁ রাসু সর্দার নয়, এ শহরের অনেকেই ঐ ইতিহাসকে মুসলমানদের জন্য গৌরবের মনে করে।
রাসু সর্দারকে সমীহ করে না এ শহরের একজনকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভয় ও শ্রদ্ধার মিলিত স্রোত মিশে আছে তাতে। অথচ আলাদা করে বোঝা মুস্কিল কতটুকু ভীতি আর কতখানি শ্রদ্ধা তার প্রতি মানুষের। রাসু সর্দারের মনে একটা অমহিকাও আছে। যা প্রায়ই সে শুনিয়ে থাকে লোকজনকে। এ জীবনে মারামারিতে সে পরাজয় বরণ করেনি। অবশ্য যতদিন সে নিজে ময়দানে সর্দার হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছে। কোন শক্তি তাকে পরাজিত করার কৃতিত্ব ছিনিয়ে নিতে পারেনি। এমন গল্প প্রচলিত আছে আয়ুব খান নাকি তাকে টি কে খেতাব দেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু রাসু সর্দার ঊনসত্তরের রাজনৈতিক ডামাডোলে বাঙালী হত্যার প্রতিবাদে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। অবশ্য এর সত্যতা প্রমাণিত হয়নি। তার এই অসীম শক্তির পেছনে আধ্যাত্মিক কারণও আছে বলে রাসু সর্দার মনে করে। পীরের দোয়া আছে তার ওপর। তবে সে দোয়া এমনিতেই আসেনি। একবার ভারতের আসামে খাসিয়া পাহাড়ে গিয়ে এক পীরের সাক্ষাত পেয়েছিল। তখন তার বয়স কতইবা এই ষোল সতের। পীরের সেবা-আর্তি করেছিল চার বছর। পীর বলেছিল যদি মুশরিকদের নির্যাতন হতে মুসলমানদের বাঁচাতে সে তরবারি হাতে তুলে নেয় তবে সে সফল হবে চিরদিন।
রাসু সর্দারের জীবনের বেশিরভাগ গেছে হিন্দু জমিদার আর ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে। এসব লড়াইকে সে ধর্মযুদ্ধই জ্ঞান করে। প্রাণপণ ঝাঁপিয়ে পড়তো। বিজয়ও পেয়েছে। ঐ চর নিয়ে জীবনে সে বহুবার রক্তারক্তিতে লিপ্ত হয়েছে। হিন্দু জমিদারের ভাড়াটে লাঠিয়ালদের নাস্তানাবুদ করেছে। ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গেও লড়াই করার ইতিহাস তার কম না। পার্টিশানের আগে সে একবার ইংরেজ ডেপুটিকে মারার কেসে জড়িয়ে আড়াই বছর জেলহাজত খেটেছে সুদূর এলাহাবাদে। জীবনে জেলহাজত বলতে তার ঐ আড়াই বছরই। আর কোনদিন ঐ স্থানে কেউ নিতে পারেনি। মুসলিম লীগের শাসনামলে তো প্রশ্নই আসে না। সে ছিল জেলার হিরো।
রাসু সর্দার শুরুতে ভয়ঙ্কর প্রকৃতির ছিল না। সাদাসিধে গোবেচারা টাইপের ছেলে ছিল রইসউদ্দিন। বাবা স্থানীয় মসজিদের ইমাম সৈয়দ আলী হোসেন একজন বুজুর্গ ব্যক্তি হিসেবে সম্মানিত ছিলেন। তাছাড়া মেলান্দহের সৈয়দ পরিবার জেলার মশহুর পরিবারগুলির একটি। নামজাদা পরিবারের মোহতারাম ইমাম সৈয়দ আলী হোসেনের ছেলে ভদ্র মার্জিত সুবোধ রইসউদ্দিনের শৈশবকাল ছিল অত্যন্ত পূত পবিত্র ও মার্জিত। শহরের বড় হুজুরের ছেলে সৈয়দ রইসউদ্দিন পারিবারিকভাবেই ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করে। মসজিদকে কেন্দ্র কর মক্তবেই হয় তার আরবী শিক্ষার ব্যবস্থা। বাবা আলী হোসেনের ক্বিরাত ছিল খুবই দরাজ ও সুললিত। ছেলেকে কোরআনের হাফেজ বানাবেন এই ছিল ইমাম সাহেবের খেয়াল। সেভাবে তালিম তরবিয়াত চলছিল। রইসউদ্দিনও মাশাল্লা বাপের ইচ্ছা পূরণের পথে বেশ খানিকটা এগিয়ে গেল। বাপের গলা নাকি রইসের কণ্ঠে ভর করেছে এমন সাধুবাদ পেতে শুরু করেছে তখন। কোরআন হিফজের ব্যাপারে রইসের মনোযোগ ও অগ্রসরমানতা সবাইকে চমৎকৃত করলো। এমন সময় শুরু হলো দেশে ইংরেজ খেদাও আন্দোলনের তুমুল ডামাডোল। রইসউদ্দীনের বয়স তেরো কি চৌদ্দ। জামালপুর শহরে তখন ইংরেজ সাহেবরা চলাফেরা করে হিসেব করে। মহকুমা অফিসারদের মধ্যে যারা ইংরেজ তারা রাস্তাঘাটে ঘোড়সওয়ার সিপাহী সঙ্গে নিয়ে তবেই বের হয়। এমন সময় এক ঘটনা শহরকে করে তুললো আরও থমথমে। একজন ইংরেজ পোস্ট মাস্টারকে ট্রেজারিতে যাওয়ার পথে কয়েকজন মুসলমান কিশোর তীর ও বর্শা দিয়ে আক্রমণ করে বসে। এতে পোস্টমাস্টারের বাঙালি হিন্দু আর্দালীটি মারাত্মকভাবে জখম হয়। এ ঘটনা গোটা শহরকে করে তুললো ভীতিকর। কানাকানি চলল মেয়েমহলেই বেশি। এবার ইংরেজ গোর্খা সৈন্য শহরে নামবে। নেমেই যাকে পাবে আস্ত রাখবে না। গোর্খা সৈন্য কি তখন কেউ জানে না দেখেওনি। শুধু শুনেছে লাল পাগড়ি মাথায় লাল মুখো এক ধরনের হিংস্র মানুষরূপী হিংস্র সৈন্য। যাদের দানবের সঙ্গে তুলনা করলেই মানায় ভাল। ঠিক এমন সময় সর্দার ঘটাল আরেক ঘটনা। মিষ্টির দোকানে মিষ্টি খেতে গেছে। ইমাম আলী হোসেনের পুত্র হিসেবে হিন্দু দোকানেও তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত ছিল। তাই দোকানের ভেতর একটা কালো তালগাছ কাটা বেঞ্চে বসে মিষ্টি খাচ্ছিল। এমন সময় একটা গরীব মুসলমান ছেলে মিষ্টি কিনতে এসেছে। ছেলেটির পরনে স্বদেশী কাপড়ের হলুদ রঙের ধূতি। উদোম গা। বয়স দশ কি বারো। পোয়াখানেক ছানা কিনতে এসেছে। মোহন চাঁন ময়রা তাকে মিষ্টি দেবে না। মুসলমানের কাছে মিষ্টি বেচবে না। রাসু দোকানে বসে বসে এ ঘটনা দেখে তার মাথায় খুন চড়ে যায়। মিষ্টি খাওয়া বন্ধ করে দেয়। হুকুমের স্বরে বলে, দাদা মিষ্টি দিয়ে দেন।
তোমার কথায় দেবো? মোহন চাঁন ময়রা দাঁত খিচিয়ে বলে।
রাসুর মেজাজ আরো বিগড়ে যায়। দাদা, ঐ ছেলেকে মিষ্টি দেন, না দিলে- বাক্য শেষ না করে কিশোর রাসু উঠে দাঁড়ায়।
না দিলে কি করবি, হ্যাঁ? না দিলে কি করবি? বেটা যবনের বাচ্চা-
মুখের কথা শেষ না হতেই রাসু এক লাফে টুলে বসা মোহন চাঁন ময়রার সামনে এসে দাঁড়ায় এবং দুই হাতের মুষ্টি পাকিয়ে দমাদম চালিয়ে দেয় কয়েকটা মুখে। কয়েক ঘা বসিয়েই রাসু ভোঁ দৌড়। যা খেয়ে মোহন চাঁন হাউমাউ কান্নাকাটি শুরু করে। দাঁত ভেঙে যাওয়ায় গলগল রক্ত ঝরতে থাকে গাল হতে। আশপাশের হিন্দু দোকানদার এসে ভিড় করে। সবার মুখে এক কথা যবনের বাচ্চার এতো সাহস। দেখে নেবো আমরা। ইমাম সাহেবের কত শক্তি এবার দেখবো। এ ঘটনা গোটা শহরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেবার উপক্রম হলো। কিন্তু যে সময় চলছিল হিন্দু মুসলমান ভাই ভাই শ্লোগান তুলে ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে মিলিত আন্দোলন গড়ে তোলার কাল। বিপিন লাহিরী শরৎ মিত্তির আর হাদা মিয়ারা তাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উত্তাপ থেকে শহরকে প্রশমিত করলো। সেই ঘটনাই বিখ্যাত করে দিলো রইসউদ্দিনকে। এরপর থেকে জড়িয়ে পড়লো রাজনীতিতে। হঠাৎ বাপও ইহকাল ত্যাগ করলেন। হাফেজ হওয়ার সাধ অপূর্ণ রেখে নেমে পড়তে হলো রুজি রোজগারে। পাঁচ বোন তিন ভাই আর বিধবা মায়ের বিরাট সংসারের ভার রইসউদ্দিনের ওপর এসে পড়ল। ব্যবসা ছাড়া উপায় নেই দেখে ব্যবসার ধান্ধায় পাড়ি জমাল কোলকাতায়।
বাবা… বাবা… বাবা’ ডাকতে ডাকতে সামনে এসে দাঁড়ায় রাসু সর্দারের একমাত্র মেয়ে মায়মুনা। রাসু সর্দার ফিরে আসেন বাস্তবে। খেয়াল হয় তিনি বহুদূর অতীতে চলে গিয়েছিলেন। মায়মুনার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। বড় বড় চোখ গোলগাল মুখ লম্বা, টকটকে ফর্সা স্বাস্থ্য ভাল। হঠাৎ দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না এই মেয়ে মানসিক প্রতিবন্ধী। বয়স পঁচিশ ছাড়িয়ে গেছে কিন্তু আচার আচরণ একদম শিশুর মতো। তেমন ঝুট ঝামেলা করে না। সারাদিন আপন মনে পুতুল নিয়ে খেলে। খাওয়া দিলে ঠিকই খায়। গোসলটা তার মা করিয়ে দেয়। আর কোন কিছু না করে দিলেও চলে। কিন্তু ছেলেটা বড় পাজী। কোনকিছুই সে নিজ থেকে করবে না। সবার বড় অথচ আজও তার সবকিছু তার মাকেই করে দিতে হয়। খাওয়ানো, গোসল, বাথরুম সবকিছুই। স্ত্রী সাবেরার ধৈর্য সহনশীলতার কথা ভেবে রাসু সর্দার অবাক হয়। জীবনে এই মহিলা কিছুই পায়নি তার কাছ থেকে। তবে সাবেরার সঙ্গে সে কখনো রুক্ষ বদমেজাজী হয়ে ওঠেনি। সাবেরাকে সে মনে মনে ভালই বাসে। ‘ভালবাসা’ শব্দটির আকার আকৃতি সে বোঝে না। কোন অবস্থাকে যে ভালবাসা বলবে আর বলবে না এ নিয়ে তার মানসিক জট আছে। যেমন ছেলে-মেয়েদের প্রতি তার ইদানিং ভালবাসার পরিবর্তে বিতৃষ্ণা জাগে বেশি। কেউ সামনে এসে দাঁড়ালে উপদ্রব মনে হয়। একসময় ছোট ছেলে হিশাম তার ভালবাসার পাত্র ছিল। ছেলেটা খুনের দায়ে জড়িয়ে পড়ল। আত্মগোপন করার জন্য মেট্রিক দেওয়া তার হলো না। আর লীগ পান্ডা হিসেবে জুটে গেল খ্যাতি। এখন ঐ ‘বদমাশটা তার চোখের বালি।’
মায়মুনার দিকে রাসু সর্দারের বুক হতে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। এই মেয়ে যদি সুস্থ থাকতো এতোদিনে তার বিয়ে হয়ে যেতো। কোল জুড়ে হাসতো নাতি। সে হতো নানা।
‘বা-বা, বা-বা, বা-বা’ মায়মুনা অনবরত ডেকে যায়।
‘জ্বী জ্বী’ কোমল কণ্ঠে জবাব দেয় রাসু সর্দার। মেয়ের প্রতি তার দরদ একটু অন্যদের চেয়ে বেশি। কারণ ‘পাগলী’ হলেও জ্বালায় না। বরং মাঝেমধ্যে বেশ স্বাভাবিক আচরণ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। রাসু সর্দার জানে কখন মায়মুনা তাকে বেশি বেশি ডাকে। হয় বাপের খাওয়ার সময় হয়েছে তা খেয়াল করিয়ে দিতে, অথবা বাইরে কোন অভ্যাগত এলে ডেকে দিতে।
মায়মুনা একবার বাবার দিকে নদীর দিকে আরেকবার তাকিয়ে আঙুল দিয়ে কি যেনো বোঝাতে চায়। মুখে একটা কিছু উচ্চারণ করে যা বোধগম্য নয়। রাসু সর্দার সে ভাষা বোঝার চেষ্টা করল না। উঠে পড়ল ইজিচেয়ার হতে। বারান্দা ছেড়ে এসে ঢুকল নিজের ঘরে। স্ত্রী সাবেরা ঠিক তখনি এসে ঢুকে ঘরে। জানাল আপনার লোক আইছে। রাসু সর্দার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে লুঙ্গির খুট উঁচু করে ধরে হাঁটা দেয়। ‘বিকেলের চা, নাস্তা রেডি। তা বৈঠকখানায় পাঠাব কিনা? এসব ব্যাপারে সাবেরা সবসময় সতর্ক থাকে। কারণ পান থেকে চুন খসলেই সর্দার সাহেবের মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে যায়। তাতে সংসারে বাড়তি ঝামেলা বাড়ে।
দেখি কোন নবাবের পুত্র আসলো! চা-নাস্তা পাঠাইয়া দিয়ো। এই সময় আরো কিছু লোক আসতে পারে। কথাগুলো বলে রাসু সর্দার হন হন করে হেঁটে বাড়ির উঠান ও দুটো ঘর পার হয়ে এলো।
বড় রাস্তার নিকটবর্তী বিশাল লম্বা বৈঠকখানা। এতোবড় যে দুশো লোক বসে মিটিং করতে পারে। রাসু সর্দার বৈঠকখানায় ঢুকলেন। ঘরে লম্বা লম্বা দশ কি পনের বেঞ্চ পাতা। একটা পুরনো টেবিল ও খানচারেক হাতলঅলা চেয়ার। অনেক পুরনো। একটা একটু বড় সাইজের। রাসু সর্দারের নিজস্ব আসন। সেই নির্ধারিত আসনে এসে বসার সময় ঘরে উপস্থিত ছিল তিনজন লোক। উঠে দাঁড়িয়ে সালাম ও সমীহ জ্ঞাপন করলো। অনেকটা জমিদার ভক্তির কায়দায়। আজকাল অবশ্য অনেকে কায়দাকানুন ভুলে গেছে। শুধু সালাম দিয়েই খালাস। সর্দার ঐসব লোকদের পছন্দ করে না। আদর-লেহাজের কমতি আর মিষ্টান্নতে মিষ্টির ঘাটতি সে একদম সহ্য করতে পারে না। তবে জোর করে শ্রদ্ধা-ভক্তি আদায় করার দিন বোধহয় আর নেই। তাই চুপচাপ থাকে।
সর্দার চাচাজী, একটা জরুরি বিষয় আছিল। সলা পরামর্শ করতে চাই। উপস্থিত তিনজনের একজন বেঞ্চে বসা থেকে উঠে কথাটা পেড়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
‘বল, কি বিষয়?’ রাসু সর্দার আঁচ করতে পারে সি কি বলতে চায়।
চাচাজী, কাইল হানিফের ডাকে চরে সভা হবে, শহর থেকে ছাত্রনেতারা যাবে। বেঞ্চে বসা আরেকজন উঠে বলে।
চিন্তা কি, রাসু সর্দার মরছে নাকি? তোরা মনে করছ কি, আমি বুড়া হয়ে গেছি?
চাচাজী, ঘটনা এইবার একটু ভিন্ন, আপনি শুনেন। অভ্যাগত তিনজনই সমস্বরে বলে উঠল।
বস! সবকিছু খুইলা বল। হুম! রাসু সর্দার হুংকার ছোড়ে। রাসু সর্দারের হুংকার বাঘের মতোই। নদীর এপাড় হতে ছাড়লে তা এপাড়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।