আমীরুদ্দীনের আজ অনেক কাজ। চারদিক থেকে যে খবর এসেছে, তাতে আজকের বিকালে চরের জনসভায় আক্রমণ হতে পারে। বড় সড় আক্রমণই হতে পারে।  তাই পার্টির নেতাদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করে পূর্ব প্রস্তুতিকে আরো জোরদার করতে হবে। পংখি ভাইর সঙ্গেও একবার দেখা করা দরকার। এদিকে পংখি বাহিনী সাধারণ চরবাসীদের পক্ষে। অপরদিকে রাসু সর্দার ভূ-স্বামী জোতদারদের পক্ষে। রাসু সর্দার  এখনো এই শহরের মূর্তিমান আতঙ্ক। তাকে মোকাবিলা করার মত শক্তি এখনো দেখা যাচ্ছে না। তবে বিগত বছরে রাসু সর্দারের লোকেরা চরে বেদম মার খেয়েছিল। একটা লাশও পড়েছিল। সর্দারের লোকের। ভাড়া করা লাঠিয়াল বাহিনীর মনোবল ততো মজবুত থাকে না। রাসু সর্দার নিজে ভাড়াটে গুন্ডা। তার বাহিনী লাঠিয়ালরাও ভাড়া করা। আর পংখি ভাড়া করা হলেও একটা রাজনৈতিক চেতনা আছে। দেশকে ‘জয়বাংলা’ বানাতে হবে। চরের লোকদের ন্যায্য অধিকার দিতে হবে। চরবাসী আছে পংখি এবং তাদের সঙ্গে। কাজেই চিন্তার তেমন কোন কারণ নেই।

আমীরুদ্দীন এসব ভাবতে ভাবতে ঘর থেকে পা বাড়ায়। গেইট অতিক্রম করার সময় একটু দাঁড়ায়। গত রাতের বৃষ্টিতে গেইটের কামিনীগাছগুলো আরো সতেজ ও সবুজ হয়ে ওঠেছে। আরজুর মতো। হ্যাঁ, আরজু দিন দিন বেশ সুন্দরী হচ্ছে। আরজুর মুখে ‘আমার খুব চিন্তা হচ্ছে’ কথাটা আমীরুদ্দীনের কানে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। মেয়েদের ব্যাপারে আমীরুদ্দীনের অজ্ঞতার শেষ নেই। আরজুর মত বুদ্ধিমতী মেয়ে সম্পর্কে তার অজ্ঞতা আরো প্রকট। কিন্তু আজ সকালে ওর মুখে যে উদ্বেগের চিহ্ন দেখেছে তাকে সে ভালবাসার অধিকার না বলে পারবে না। যে অধিকারের বলে সে বলতে চেয়েছিল -‘আজকের চরের জনসভায় না গেলে হয় না।’ কিন্তু তা যে হয় না। এতো বড় একটা জনসভা। সে ছাড়া হতে পারে না। তাছাড়া  অভিভাবক দলের নেতারা তার ওপরই ভরসা করে। সামনে ইলেকশন। চরের লোকদের লীগের ঝাণ্ডার নীচে আনতে পারলে বিরাট কাজ দেবে। এতো দিন ওরা ভোট দিতো মুসলিম লীগে।

আমীরুদ্দীন দ্রুত পা চালিয়ে বকুলতলায় এসে দাঁড়ায়। বিরাট বকুলগাছ, ঝাকড়া চুলের নজরুলের মতো। তিন রাস্তার মোড়ে বকুলতলায় দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে রিকশার খোঁজ করে সে। দু’একটা রিকশা চলাচল করছে। আরোহী নিয়ে। খালি নেই। এ রকম সময় খালি রিকশা পাওয়া দুষ্কর। ছোট শহর তো।

আমীরুদ্দীনের মনে পড়ল সুধীর ময়রার কথা। এ সময় গরম গরম কাঁচাগোল্লা নামায় সুধীর। সেই স্কুল জীবনের হাফপ্যান্ট পরা বয়স থেকে সুধীরের কাচাগোল্ডার ভক্ত সে। আজও না খেয়ে কোন দিকে যাবে না। নট নড়ন চড়ন নট কিচ্ছু। গুটিসুটি পায়ে সুধীরের দোকানে ঢোকে আমীরুদ্দীন।

আদাব দাদা! দোকানে ঢোকার মুখে ক্যাশবাক্সে বসা সুধীর দু’হাত তুলে প্রণামের ভঙ্গিতে আমীরুদ্দীনকে সম্মান জানায়।

সুধীর আজ তার প্রতি বেশিই সম্মান দেখালো যেন। এমনিতে সুধীরদাকে সে বড় ভাই হিসেবে সম্মান করে। অবশ্য এর পেছনে কারণ হয়তো এই : আমীরুদ্দীন জামালপুর শহরের উঠতি ছাত্রনেতা। ছাত্র সংগঠন বলতে শহরে লীগ আর ইউনিয়ন বোঝায়। ইসলামী ছাত্র-সংগঠন একটা আছে। ‘সংঘ’ তাদের তেমন টের পাওয়া যায় না। ছাত্রনেতাদের মধ্যে আমীরুদ্দীনের পজিশন এখন তিন নম্বরে। সুধীররা এসব টের পায়। বোঝে ভাল। ব্যবসা করে শুধু শুধু নয়। খোঁজ রাখে সব কিছুর। কাকে খুশি রাখতে হবে। কাকে কিভাবে খুশি রাখা যায় এসব ওরা বোঝে।

আমীরুদ্দীন লম্বা বেঞ্চিতে বসে। বাজারের দু’চারজন কাস্টমার সুধীরের দোকানে বসে। তারাও গরম কাঁচাগোল্লার আশায় বোধহয়।

এদের একজন দাঁড়িয়ে হাত তুলে ‘স্লামালাইকুম আমীরুদ্দীন ভাই’ বলল। আমীরুদ্দীন হাতের ইশারায় সালামের জবাব নেয়। আরেকটু জায়গা নিয়ে সে বসে।

সুধীর দা। এক ছটাক কাঁচাগোল্লা পাঠাও!’ সুধীরের দিকে না তাকিয়ে বলল।

জ্বে জ্বে দাদা, এই বিশু! দাদারে প্লেট পরিষ্কার কইরা এক ছটাক কাঁচাগোল্লা দে! জলদি গ্লাস পরিষ্কার কইরা পানি দিস!

সুধীরের স্বভাবজাত হাঁক ডাক। সুধীর শুধু হাঁক ছেড়েই দায়িত্ব শেষ করল না। ক্যাশবাক্স রেখে উঠে হন্তদন্ত হয়ে দোকানের পেছনের দিকে ছুট দিল। পেছন দিকটা সুধীরের মিষ্টি প্রস্তুতের রান্নাঘর। এখনো কাঁচাগোল্লা সামনের শোকেসে উঠায়নি। উননে আছে। সুধীর সে কারণেই উঠে গেছে রান্নাঘরে। আমীরুদ্দীন ছাত্রনেতা বেশিক্ষণ বসবে না। তাই তাকে আরো আগে বিদেয় করা চাই।

পর্দা তুলে সুধীর রান্নাঘরে ঢোকার সময় আমীরুদ্দীনের নজরে পড়ল লোহার কড়াইয়ে কাঁচাগোল্লা খুন্তি দিয়ে নাড়াচাড়া চলছে।

এই বিশু! দাদারে আগে দে! সুধীরের কণ্ঠ।

আমীরুদ্দীনের কানে আসল। বোঝা গেল সুধীর আজ আমীরুদ্দীনকে একটু বেশি তোয়াজ করছে। আজকের চরের জনসভার খবর তার কাছে না থাকার কথা নয়। আর সে জনসভার আমীরুদ্দীনও বক্তা।

দাদা! একটু সামলাইয়া খায়েন। ততা বেশিÑ হপায় চুলা থাইকা আনছিÑ বলতে বলতে সুধীর কাঁচাগোল্লার প্লেটটা আমীরুদ্দীনের সামনে বিনয়ের ভঙ্গিমায় রাখে। এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে কর্মচারী বিশু।

আমীরুদ্দীনের মন অস্থির। ধীরে সুস্থে খাওয়ার সময় নেই। তাই এতো গরম কাঁচাগোল্লা খাওয়ার জন্য পরিবেশন করায় মনে মনে সে বিরক্ত হয়।

সুধীর দা! তোমার কাঁচাগোল্লা আগে আগে নামাতে পারো না? ইস! কী ততা!’

আমীরুদ্দীনের কথায় বিরক্তি এবং রাগ ঝরে পড়ে।

দাদা! দুধ পাইতে দেরং অয়Ñ ব্যাটাগো এতো কইরা কই আরো সহালে দিবিÑ দেয় না, দাদা। দেহি কী করি….

সুধীর দু’হাত মাজতে মাজতে বিনয়ের সঙ্গে বলল।

কাঁচাগোল্লা খেতে আজ তেমন স্বাদ পেলো না। গরম গরম খাওয়ার জন্য বোধহয়। নাহ্ তা নয়, উদ্বেগে মুখের স্বাদ নষ্ট হয়ে গেছে।

দোকানের বাইরে এসে একটা খালি রিকশা পেয়ে হাত দিয়ে থামায়।

কলেজে যাবা?

কাছে আসলে আমীরুদ্দীন জিজ্ঞাসা করে রিকশাওয়ালাকে ‘লন যাই।’

আধ বয়সী খোঁচা খোঁচা দাড়িমুখো কালো রঙের পেশাল দেহের রিকশাওয়ালা এক গাল হেসে বলল।

আমীরুদ্দীন রিকশাায় চেপে বসল। রিকশা চলতে থাকে। কলেজে কমন রুমে লাগের কর্মী সমাবেশ আছে। আমীরুদ্দীন প্রধান বক্তা। সেই কর্মী সমাবেশে আজকের চরের প্রোগ্রাম সম্পর্কে কিছু দিক নির্দেশনা দিতে হবে। আমীরুদ্দীনের উচিত ছিল আরো ঘণ্টাখানেক আগে কলেজে উপস্থিত হওয়া। উপস্থিতির ব্যাপারটা তদারকি করতে পারতো। অবশ্য আগের চেয়ে কর্মীরা এখন অনেক বেশি তৎপর। আগের মতো তো সাধাসাধি ডাকাডাকি না করলেও চলে। দেশের চলমান রাজনীতির হাওয়ার গুণেই বোধহয়। বাঙ্গালীরা আসলে সত্যিই জেগেছে। পশ্চিমারা আর দাবিয়ে রাখতে পারবে না। অশিক্ষিত মূর্খ সভ্যতার আলো বঞ্চিত চরবাসী যখন জেগেছে তখনÑ ‘কুছ পরওয়া নেহি’। আমীরুদ্দীনের চিন্তাধারায় উর্দু তিনটি শব্দ প্রবেশ করায় জিভে কামড় দেয়। শালা! পাঞ্জাবীর বাচ্চা! বলে কি-না- ‘উর্দু উর্দু উর্দু উইল বি দ্য স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান’ আজ বক্তৃতার শুরুতে জিন্না সাহেবের এই কথা দিয়েই শুরু করবে সে। কীভাবে বাইশ বছর এই ভেদ নীতির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করেছে তা তুলে ধরবে। কীভাবে বাইশ পরিবার এই নীরিহ সাধাসিধা বাঙ্গালী জাতির ওপর জোঁকের মতো বসে রক্ত শুষে নিচ্ছে। রিকশা হঠাৎ ব্রেক করার ধাক্কায় আমীরুদ্দীন বাস্তব জীবনে ফিরে এলো। দেখল তার সামনে গেইটে বড় হরফে লেখা ‘আশেক মাহমুদ কলেজ’।

কলেজে এসে পড়েছে। রিকশা থেকে নেমে আমীরুদ্দীন কাঁধে ঝুলানো পাটের ব্যাগ থেকে একটা আধুলী খুঁজে পেতে রিকশাওয়ালার হাতে তুলে দেয়। এমনিতে ভাড়া চারআনা বা এক সিকি। কিন্তু আমীরুদ্দীন মেহনতি মানুষদের মজুরী সব সময় বেশি দেয়। কলেজ গেইটে পেয়ে যায় লীগের কর্মী কয়েকজন। আমীরুদ্দীনকে দেখে তারা এগিয়ে সালাম এবং হ্যান্ডশ্যাক করে।

সমাবেশ শুরু হয় নাই?

আমীরুদ্দীন কর্মীদের জিজ্ঞেস করে।

প্রিন্সিপ্যাল স্যারে কমন রুমে সমাবেশ করতে নিষেধ করেছেন। উপস্থিত কর্মীদের একজন বলল। ছেলেটি সাইজে ছোট হলেও গলায় বেশ তেজ আছে।

নিষেধ করছে মানে!

আমীরুদ্দীন বিস্ময় প্রকাশ করে।

প্রিন্সিপ্যাল স্যারের অনুমতি নিতে হবো- জনসভা করতে।

সেই আগের ছেলেটি বলল।

স্যার তো ঠিকই কইছে, আমরাই স্যাররে কইছি, কমন রুমে কোন পার্টি সভা সমাবেশ করতে অনুমতি নিতে হোবো। যাতে একই সময় দুই পার্টি সমাবেশ করতে না পারে।

এখন কী হোবো!

কর্মীদের চোখে মুখে হতাশার স্পষ্ট ছাপ।

চলো, আমার সঙ্গে তোমরা! একটা ব্যবস্থা হোবো। আমীরুদ্দীন কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কলেজের দিকে হাঁটতে থাকে।

আমীরুদ্দীন যতোই সামনে আগাতে থাকে লীগের কর্মীরা এসে শরীক হয় সম্মিলিত হাঁটায়। ক্রমে ক্রমে একটা মিছিলে রূপ নেয়।

আমীরুদ্দীন শ্লোগান ধরে-

জয় বাংলা….

জয় বাংলা….

জয় ছাত্রলীগ….

জয় ছাত্রলীগ….

আমীরুদ্দীন শ্লোগান দিতে দিতে আগাতে থাকে। শ্লোগান শুনে রাস্তার ছাত্ররা ক্রমে শরীক হয় মিছিলে। এক পর্যায়ে পুকুরের পাশে এসে থামে মিছিল। পুকুরের পাশে মাটির ঢিবি আছে যা একটা অস্থায়ী মঞ্চের মতো ছাত্র-সংগঠনগুলো ব্যবহার করে। আমীরুদ্দীন সেই মঞ্চে গিয়ে দাঁড়ায়। তার পাশাপাশি কলেজের উঠতি নেতা অপু, বিল্লাল। শাকুর ওরাও দাঁড়ায়। মঞ্চের সামনে শ’ পাঁচেক ছাত্র-ছাত্রী বসে। উৎসুক শ্রোতা ছাত্র-ছাত্রীরা এদিক-ওদিক দাঁড়িয়ে। তাও শ’ পাঁচেক হবে। এরা সবাই আমীরুদ্দীনের বক্তৃতা পছন্দ করে। বক্তৃতার ব্যাপারে আমীরুদ্দীন এখন তরুণদের মধ্যে এক নম্বর। আমীরুদ্দীন আবার শ্লোগান ধরে-

জয় বাংলা….

জয় বাংলা….

জয় ছাত্রলীগ….

জয় ছাত্রলীগ….

বাংলা কেন শ্মশান হলো আইউব শাহী জবাব চাই… পদ্মা-মেঘনা-যমুনা তোমার আমার ঠিকানা…. শ্লোগানে শ্লোগানে মুহূর্তে সমাবেশ মুখরিত হয়ে উঠল।

এরই মধ্যে ঘোষণা হলো- সংগ্রামী ছাত্র-ছাত্রী ভাই ও বোনেরা! এখন আপনাদের সামনে মূল্যবান বক্তৃতা রাখবেন সংগ্রামী ছাত্রনেতা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শেখ আমীরুদ্দীন….

আমীরুদ্দীন হ্যান্ডমাইকটা ঘোষক অপুর কাছ থেকে নেয়। মনে মনে ঠিক করা আছে আজ সে কী বলবে। সংক্ষিপ্ত অথচ দরকারী কথা বলবে সে। চরের জনসভাকে সার্থক করতে উপস্থিত ছাত্রদের করণীয় কী তাও বলবে। আমীরুদ্দীন বক্তৃতা দিতে শুরু করে। সংগ্রামী ছাত্র-ছাত্রী ভাই-বোনেরা! সবাইকে বিপ্লবী অভিনন্দন।

দেশ আজ মহা সংকটে। আমরা ঊনিশ’শ সাতচল্লিশে ভারত ভাগ হয়ে স্বাধীন হয়েছিলাম। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের দুটি অংশ নিয়ে এই দেশ। আমাদের আশা ছিল আমরা দুবেলা দু’মুঠো পেট পুরে খেতে পাবো। আমরা শিক্ষা বাসস্থান এবং চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার পাবো। কিন্তু ভাই-বোনেরা, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমরা লক্ষ্য করছি, আমরা পূর্ব পাকিস্তানবাসীরা তা পাই নাই। আমাদের পাট বিক্রি করে বিদেশী মুদ্রা আয় হয়। সেই পাট দিয়ে মিল ইন্ডাস্ট্রি বসায় পশ্চিম পাকিস্তানীরা। তারা সেই পাট বিক্রি করে কোটি  কোটি টাকা আয় করে প্রাসাদ বানায়। আর আমরা দুবেলা ভাত পাই না। আমাদের মুখের ওপর জিন্না সাহেব বলেছিলেন- উর্দু উর্দু উইল বি দ্য স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান- আমরা তার দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিয়েছি। ভবিষ্যতেও আমরা আমাদের অধিকার আদায় করে ছাড়ব…