ইতিহাস জানতে গিয়ে আমি মহা বিপদের মধ্যে পড়েছি। ইতিহাস এতটা গভীর ষড়যন্ত্রের ভেতর দিয়ে বড় হচ্ছে সেটা শতকরা নিরানব্বই জন মানুষ অজানা। আমার ইতিহাস জানার আকাঙ্ক্ষা মূলত মানুষের মগজ ও হৃদয়ের গভীরে চলতে থাকা মতাদর্শ ও চিন্তাশক্তি পরখ করা এবং সেই শিকড়ের সন্ধান করার লক্ষ্যে ছুটতে থাকা। একজন চিকিৎসক যেভাবে রোগীর অসুস্থতা ধরতে বিভিন্ন যন্ত্র ও চিকিৎসা জ্ঞানের মাধ্যমে রোগীকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করেন ঠিক সেভাবেই নানা জনের, নানা মতের, নানা জাতের ইতিহাস জ্ঞান রপ্ত করে সেটা মানুষের মগজ পাঠের উপযোগী করে প্রকাশ করা। একটা দেশের সাহিত্য সেই দেশের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ছবি তুলে ধরে। আবার দর্শনও সেই দেশের সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিভিন্ন মতাদর্শ-চিন্তা ও যুক্তি জ্ঞান তুলে ধরে। একজন হিন্দু সাহিত্যিক তার সমাজ সংস্কৃতি ও গতানুগতিক কালচার নিয়ে সাহিত্য রচনা করেন। তেমনি একজন মুসলিম সাহিত্যকও তার সংস্কৃতি ধর্ম ও সেই সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে সাহিত্য রচনা করেন। আর এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যখন পাঠক হই তখন কিন্তু বিপাকে পড়ে যাই। যখন একজন মুসলিম পাঠকের রবীন্দ্র সাহিত্য ভাল লাগে তখন সে জীবন দর্শন হিসেবে রবীন্দ্র চর্চাকে গ্রহণ করে। আমরা দেখি রবীন্দ্র সাহিত্য চর্চার ফলে তার জীবনে মুসলিম সংস্কৃতি ও ধর্ম চর্চা গৌন হয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা ভাবি সাহিত্য কোন কাজ করে না। তবে এটা সত্য সাহিত্য কাজ করে না কাজ করায়।

ইসলাম ও রবীন্দ্র চর্চা কি সাংঘর্সিক? একদম না। সাহিত্য পড়তে পড়তে মগজ আর হৃদয় একসময় এক হয়ে যায়। এই এক হয়ে যাওয়াটাই ইসলামকে দূরে ঠেলে রবীন্দ্রকে কাছে টেনে নেয়। যখন রবীন্দ্র সাহিত্য জ্ঞান বাস্তব জীবন দর্শন হিসেবে গ্রহণ হবে ঠিক তখন রবীন্দ্র জ্ঞান ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্সিক হয়ে উঠবে। রবীন্দ্রনাথ উপনিষদ অনুপ্রেরণায় সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন তাই একজন মুসলিম হিসেবে সেই সাহিত্যের উপর দাঁড়িয়ে ইসলামী মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ রেখে জীবন ও সমাজ গঠন করা সম্ভব না। আর একটা কথা মনে রাখবেন শব্দ গঠন প্রক্রিয়াটা একটা কঠিন কাজ। সবাই কিন্তু এই শব্দ গঠনে পারদর্শীতা দেখাতে পারে না।

রবীন্দ্রনাথ যেভাবে বাংলাদেশে একটা আনুগত্যের বলায় তৈরি করতে পেরেছেন সেভাবে কিন্তু, শরৎ চন্দ্র, অমিয় চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্ররা পারেনি। সাহিত্যের ভেতর হিন্দুদের সংস্কৃতি, ধর্ম ও তাদের দৈনন্দিন জীবন যাপন বারবার ঘুরে ফিরে পাঠ করেছি। এই পাঠে হিন্দু সাহিত্যিকরা একদিকে যেমন পাঠক প্রিয়তা পেয়েছে তেমনি তাদের চিন্তা ও দর্শন মুসলিম মগজে পৌছে দিয়েছে। আর এভাবেই মুসলিম মানসে হিন্দু ভাবধারা আনুগত্যের শেকড় গেড়ে বসেছে। হিন্দুরা সরাসরি তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রচার না করে “বাঙালি” শব্দ ব্যবহার করে মুসলিম সমাজে বড় ধরনের রাজনীতি করে চলেছেন। শব্দ গঠনে পারদর্শীতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা দেশীয় সাহিত্য জগতের দিকে তাকালেই উপলব্ধি করা যায়। হুমায়ূন আহমেদ যেভাবে মানুষের মগজ দখল করেছেন ঠিক সেভাবে আল মাহমুদ, সৈয়দ মুজতবা আলী, মোতাহার হোসেন চৌধুরী,জসিম উদ্দিন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আবু ইসহাক, শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, হুমায়ুন আজাদ, আহমদ ছফা ও ডাঃ লুৎফর রহমানরা সেভাবে পারেনি। তবে হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের মানুষের মগজে কতক্ষণ স্থায়ী হবেন সে কথা অন্য দিন হবে। তবে একথা অকপটে স্বীকার করছি যে শব্দ গঠন প্রক্রিয়া মানুষের হৃদয় ও মগজে প্রভাব বিস্তার করে।

কাজী নজরুল ইসলাম যেভাবে হৃদয় দিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে শরীক হয়েছেন সেভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদ বা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েননি। তিনি স্বাধীনতার জন্য লিখেছেন আর সে জন্য জেল জুলুমের স্বীকারও হয়েছেন। তার কলম হিন্দু মুসলমানের মধ্যে চলতে থাকা বিরোধ ও দাঙ্গা নিষ্পত্তির চেষ্টাও করেছে। হিন্দু-মুসলমানের ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে চলতে থাকা কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির গতিরোধ করার চেষ্টাও করেছেন। নজরুলের সাহিত্য কর্মে যেভাবে হিন্দু -মুসলিম উভয় ধর্ম ও সংস্কৃতির সমন্বয় পাওয়া যায় সেভাবে অন্য কারো সাহিত্যে পাওয়া যায় না। এবার আসি বাঙালি মুসলমানের রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদের চিন্তা ও দর্শনে। তিনি আসলে ইসলামের মধ্যে মানুষের মুক্তি খুঁজেছেন। তরুণ বয়সে যদিও বামপন্থী রাজনীতির সাথে পরিচয় ঘটেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ইসলামী সাম্যবাদী ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। তিনিই বাঙালি মুসলমানের জন্য প্রথম সংস্কৃতির ভাষা নির্মাণের চেষ্টা করেছেন।

এবার আসি আল্লামা ইকবালের চিন্তায়। উর্দু ও ফার্সি ভাষার এই পণ্ডিত একদিকে মুসলিম পুনর্জাগরণ যেমন চেয়েছেন অন্য দিকে মুসলিম পরিচয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের চিন্তাও মুসলিম রাজনৈতিকদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। সেই পথ ধরে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানী রাজনীতিবীদদের নিয়ে ভারতীয় মহাদেশ থেকে আলাদা পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করতে সক্ষম হন। যদিও ইকবাল ১৯৩৮ সালে মৃত্যু বরণ করেন। ইকবালের চিন্তা যেভাবে প্রভাব বিস্তার করার কথা ছিল ঠিক সেভাবে এই দেশে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়নি। এদেশে বামপন্থী রাজনীতি যেভাবে প্রভাব বিস্তার করে ঠিক সেভাবে ইসলামী মতাদর্শ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। তবে এদেশের কমিউনিস্টরা মার্কসবাদ শিখেছে কলকাতার ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে। তাই কমিউনিস্টরা তত্ত্ববাজিতে সফল হলেও বাস্তবে মাঠে ময়দানে মেহনতি মানুষের আর্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনে তেমন কোন ভূমিকা পালন করতে পারেনি। মুখে তাদের লাল বিপ্লববের স্লোগান থাকলেও কাজে ভারতীয় রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ইজ্জত রক্ষার চেষ্টা চলে।

১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর একটু আধটু ইকবাল চর্চা হয় কিন্তু ৭১ এর বাঙালির স্বাধীনতার মাধ্যমে ইকবালের চিন্তা, দর্শন ও মুসলিম মানস সংকটে তার যে অবদান সেটা পুরোপুরি অস্বীকার করে এক নয়া ইকবাল বিদ্বেষ তৈরি করা হয় এবং স্বাধীনতার বিপক্ষ ও পরাজিত শক্তি হিসেবে ইকবালের চিন্তার মূল্যায়ন করা হয়।

ইতিহাস কিভাবে ভেজাল উপাদান দিয়ে রসাত্বক ও আবেগ নির্ভর গল্প বানিয়ে বাজারে প্রচার করা হয় সেই কথা বিভিন্ন ভাবে দেখানোর চেষ্টা করব। আমার ইতিহাস পাঠ এবং তারপর তার মূল্যায়ন যেভাবে করেছি আমি কেবল তা প্রকাশ করে যাব। তারপর মন্তব্য আপনার কাছে। তবে রাজনীতি, সাহিত্য, ধর্ম, দর্শন ও সমাজ চিন্তা মাথায় রেখে আপনার ইতিহাস অধ্যয়নের কাজ শুরু করতে হবে। একজন মুসলিমলীগ লেখক এবং একজন কংগ্রেস লেখকের চিন্তা ও কর্মের বর্ণনা একরকম হবে না। তেমনি একজন ইসলামী মতাদর্শের চিন্তাবিদ ও একজন কমিউনিস্ট ভাবধারার ইতিহাসবিদের বর্ণনাও একরকম হবে না। ৪৭, ৫২ ও ৭১ এর ইতিহাস পড়তে গিয়ে কখনো দ্বিধাবিভক্ত হয়েছি কখনো হতাশ আবার কখনো বিরক্ত ও রুষ্ট হয়েছি। স্বাধীনতার পর একদল শেখ মুজিবুর রহমানকে মুগ্ধ করার জন্য ইতিহাস রচনা করেছেন। আবার আরেকদল শিরাজ শিকদারের কমিউনিস্ট চিন্তা ধারায় ইতিহাস রচনা করতে থাকে। “কোথায় সেই সিরাজ সিকদার ” উচ্চারণের পরেও শিরাজ শিকদারের আদর্শ মরে যায়নি।

তারপর ইসলামী ভাবধারায় মধ্যমপন্থী কিছু ইতিহাস তৈরি হয়ে যায়। এরপর মধ্যমপন্থা ধাঁচের কিছু ইতিহাস বিদদের দেখা যায় যারা ১৯৭৫ এর পর নতুন করে ইতিহাস লিখতে শুরু করে। তবে এসকে সিনহার A Broken Dream, একে খন্দকারের একাত্তরের ভেতরে বাহিরে,মতিউর রহমান রেন্টুর আমার ফাঁসি চাই অথবা শারমিন আহমেদের নেতা ও পিতা ধাঁচের গ্রন্থ লেখকদের চিন্তা ও কর্ম গ্রহণ করতে পারিনি। যারা একসময় দলের একনিষ্ঠ কর্মী থেকে কাজ করেছেন তারপর বিতাড়িত হয়ে বিরুদ্ধ ইতিহাস দিয়ে বিখ্যাত হওয়ার চেষ্টা করেছেন তাদের গ্রন্থ কোন ভাবেই ইতিহাস জ্ঞান হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। আবার পার্লামেন্টে স্বীকৃতি লাভ করা গোলাম মুরশিদের গ্রন্থ “মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর একটি নির্দলীয় ইতিহাস” আমার কাছে আনুগত্যের দলিল মনে হয়েছে। আমার ইতিহাস অধ্যয়ন ঠিক এভাবে এগিয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি হতাশ হইনি। একনিষ্ঠভাবে আমি আমার চিন্তা ও বিচার বুদ্ধি দিয়ে ইতিহাস অধ্যয়ন অব্যাহত রেখেছি।

এখন বলবেন তাহলে কোন ইতিহাস পড়ব ? কোন বই গুলোতে তথ্য নির্ভর ও সত্য ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে এবং যে গ্রন্থের মধ্যে চিন্তার যথেষ্ট খোরাক রয়েছে, যে বই আমার মগজকে সন্তুষ্ট করে । যে ইতিহাস বর্ণনা আমার কাছে সত্য মনে হয়েছে। যেহেতু সাতচল্লিশ পর্যন্ত তিনটি দেশই ভারতীয় মহাদেশের অধীনে ছিল তাই এই তিন দেশের লেখক ও চিন্তাবিদদের চিন্তা ভাবনা উল্টে পাল্টে দেখা যেতে পারে। ড. নীহার রঞ্জন রায়ের “বাঙালির ইতিহাস” দিয়ে শুরু করতে পারেন তারপর শৈলেশ কুমার বন্দোপাধ্যায়ের “জিন্না পাকিস্তান নতুন ভাবনা”।তবে মৌলনা আবুল কালাম আজাদের “ভারত স্বাধীন হলো” গ্রন্থটি একটি দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। যেহেতু আইউব খান রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন তাই তার” Friends not master “চোখ বুলানো যেতে পারে। সুনীতিকুমার চট্টপাধ্যায় ভাষা ও সাহিত্য বিশ্লেষণে অনন্য তার চিন্তা ও গবেষণায় “ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা” গ্রন্থ পাঠ চিন্তার সহায়ক হয়ে উঠবে। বাঙালির এঙ্গেলস খ্যাত বদরুদ্দীন ওমরের “ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ” প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড এবং “পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি” প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড হতে পারে ইতিহাসের শীতল পাঠ ও উপলব্ধি।

বাঙালির সক্রেটিস খ্যাত এবনে গোলাম সামাদের “আত্মপরিচয়ের সন্ধ্যানে” তথ্য নির্ভর একটি গ্রন্থ এবং পত্রিকার সম্পাদকীয় নিয়ে রচিত গ্রন্থ “বায়ান্ন থেকে একাত্তর” এ ছাড়া তার “বিবিধ বিষয়ক নির্বাচিত কলাম” গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস বিষয়ক গ্রন্থ ।ইসলামী সমাজতন্ত্র খ্যাত চিন্তাবিদ আবুল হাশিমের “আমার জীবন ও বিভাগ পূর্ব বাংলার রাজনীতি” পাঠে সহজ হয়ে উঠবে সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, ভাসানী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন।

পড়তে পারেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বাঙালির জাতীয়তাবাদ। আবুল মনসুর আহমদের “আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর এবং “বাঙালির কালচার” পড়ে রাজনৈতিক পাঠ নেওয়া যেতে পারে। অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” হতে পারে নতুন কিছু জানার মাইলস্টোন। পাকিস্তান সৃষ্টিতে তার একনিষ্ঠতা এবং হিন্দুরা মুসলমানের উপর যে অত্যাচার করেছে সেসবের নিখুত বর্ণনা রয়েছে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে। পাকিস্তান সৃষ্টিতে যার অবদান সবচেয়ে বেশি সেই কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নার “Jinnah Speeches as governor general of Pakistan” ভাষণ গুলো দেখা যেতে পারে। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের “এনালস অব রুরাল বেঙ্গল” পড়া যেতে পারে।

কার্লমার্কসের “ভারতে ব্রিটিশ শাসন” এটা মার্কস এঙ্গেলস রচনা সমগ্রের তৃতীয় খণ্ডে রয়েছে। জুলফিকার আলী ভুট্টোর ভারতীয় বন্ধু পিলু মদির লিখিত “জুলফি মাই ফ্রেন্ড” দিবে নতুন তথ্য। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের “বাংলার সূর্য আজ আর অস্ত যায় না। মনিরুদ্দীন ইউসুফের “আমাদের সংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি”। তবে বাঙালির প্রেটো খ্যাত সরদার ফজলুল করিমের “পাকিস্তান আন্দোলন ও মুসলিম সাহিত্য” পাঠ করে ভারতীয় মহাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস অধ্যয়ন করা যেতে পারে। তারপর আপনি নিজেই নিজের হাতে ইতিহাস লিখে হয়ে উঠতে পারেন ইতিহাসবিদ । ইতিহাস নিয়ে যে ফ্যাসিবাদ ও পুজিবাদ চর্চার প্রথা চালু হয়েছে সেই বিজনেসে নয়া ইতিহাসের পেরেক ঠুকার সময় এসে পড়েছে।

মুক্তি যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যে ব্যাপক সমালোচনা ও আলোচনা চলে তার ফলশ্রুতিতে নতুন প্রজন্মের কাজ কি ? নতুন প্রজন্ম কি বিশ্বাস করবে আর কি বিশ্বাস করবে না ? তবে এখানে আমার পরামর্শ থাকবে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাস অধ্যয়ন করা সেই সাথে বিদেশী সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদদের ইতিহাস অধ্যয়ন করা। আপনি যখন শুধু আওয়ামী লীগের লেখা ইতিহাস গ্রহণ করবেন তখন আপনি এক চোখ ওয়ালা মানুষের মতো ইতিহাস অধ্যয়ন করবেন । আপনাকে অবশ্যই হুমায়ুন আজাদ, কবীর সাহেব ও মোনতাসির মামুনদের গণ্ডি পেরিয়ে তার বাইরে আসতে হবে। ইতিহাস কখনো আবেগ ও প্রেম দিয়ে পরখ করে সত্য মিথ্যা যাচাই করা যায় না। আবার দেখবেন রাষ্ট্র যাকে দিয়ে ইতিহাস লেখায় সে কখনো রাষ্ট্রের আনুগত্যের বাইরে যেয়ে ইতিহাস রচনা করে না। তাই আপনার ইতিহাস পাঠ হোক নিরপেক্ষ ও জ্ঞানলব্ধ। রইস উদ্দিন আরিফের “অসমাপ্ত মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি ও বাংলাদেশ” দিয়ে শুরু করতে পারেন নতুন ইতিহাস অধ্যয়ন। ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রথম শহীদ হওয়া মেজর জলিলের “অরক্ষিত স্বাধীনতা ও পরাধীনতা” পড়তে পারেন। মুক্তি যুদ্ধের সময় ভ্রাম্যমান কূটনৈতিক নুরুল কাদিরের লেখা “দুইশত ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা” বইটি গুরুত্বপূর্ণ ও তথ্য নির্ভর ।পড়তে পারেন মইদুল হাসানের “মুলধারা একাত্তর”। প্রথম দিকে বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন তারপর সেই ষড়যন্ত্র থেকে আহমদ ছফা বেরিয়ে আসেন তার প্রবন্ধ ও সাক্ষাতকার মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস নির্ভর। মাসুদুল হকের “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে র এবং সিএইএ” গ্রন্থের দলিল গুলো একাত্তর ও একাত্তর পরবর্তী সময় থেকে সংগৃহীত। মহিউদ্দিন আহমেদের “জাসদের উত্থান পতন অস্থির সময়ের রাজনীতি” পড়তে পারেন। আহমেদ মূসার পাচশত পৃষ্ঠার তথ্য নির্ভর গ্রন্থ “ইতিহাসের কাঠগড়ায় আওয়ামীলীগ” আপনাকে ইতিহাস পাঠে সাহায্য করবে।

এর সাথে বিদেশী সাংবাদিক ও লেখকদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরখ করা যেতে পারে। তবে একটা বিষয় মনে রাখবেন এই বিদেশী লেখকেরাও আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে ইতিহাস লিখেছেন। তবে সবাই এমনটি করেছেন তাও কিন্তু না। জেমস জে নোভাকের “Bangladesh Reflection on the Water” (বাংলাদেশ জলে যার প্রতিবিম্ব)। এই গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের যে বর্ণনা করা হয়েছে সত্যই তা অবিশ্বাস্য। এন্থনি ম্যাসকার্নহাসের “এ লিগেসী অব ব্লাড” (বাংলাদেশ রক্তের ঋণ) এটা খুবই জনপ্রিয় বই বললে ভুল হবে না ! তবে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর ভাইয়ের ছেলের মেয়ে শর্মিলা বসুর “ডেড রেকনিং” পড়তে পারেন দীর্ঘ সময় নিয়ে লিখিত একটি বই। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে ভারত পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ঘুরে এই ডেড রেকনিং লিখেছেন। ওয়ারিয়ানা ফালাচির “ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি” পড়তে পারেন। এখানে শেখ মুজিবুর রহমান, জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইন্দিরা গান্ধী সহ ঐ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র প্রধানদের সাক্ষাতকার রয়েছে। লরেন্স লিফশুলজের “অসমাপ্ত বিপ্লব তাহেরের শেষ কথা” বইটি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা কাণ্ডে সিআইএ এর যোগসাজশের কথা বলেছে। সিদ্দিক সালিকের “উইথনেস টু সারেন্ডার” পড়তে পারেন। যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে আত্মসমর্পণকারী একে নেয়াজির “Betrayal of East Pakistan” পড়তে পারেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনটি সেনা অভ্যুত্থান নিয়ে আবদুল হামিদ পি এসসি লেখা “তিনটি সেনা অভ্যুত্থান”। এটাও আপনার ইতিহাস অধ্যয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।

বাঙালি “মুসলমান” পরিচয়ে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে। পশ্চিম বাঙলার আনুগত্যের বলয় ছিড়ে নতুন করে ইতিহাস গড়বে। ইসলাম নির্যাতন নিপীড়নের বিরুদ্ধে যেভাবে সোচ্চার তেমনি ভিন্ন ধর্মের মানুষের ধর্ম ও সংস্কৃতি পালনেও শ্রদ্ধাশীল।তাই কোন ভাবেই ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যবাদের আনুগত্য মেনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে হিন্দু সংস্কৃতি ও ধর্ম পালনের ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে “জয় শ্রীরাম” অথবা অন্য কোন জয়ধ্বনি করে মুসলমানের আত্মবিসর্জন দেওয়ার কোন মানে হয় না। বাংলাদেশ যে চিন্তায় পৃথক হয়েছিল সেই চিন্তা ও আদর্শ নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে সেক্ষেত্রে তাকে ত্যাগী, অধ্যবসায়ী ও আত্মমর্যাদাবান হয়ে উঠতে হবে। ইতিহাস ষড়যন্ত্র কালো অক্ষর হয়ে যেভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে ধোঁকা দিয়েছে ঠিক সেভাবে কালো অক্ষর নিজ দায়িত্বে সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ করে সেই ভুল শুধরে দেবে।