সবার জীবনেই কিছু সুন্দর ঘটনাবহুল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থাকে আমারও আছে। তবে অতি সম্প্রতি যে অভিজ্ঞতার সন্মুখীন হয়েছি আজ তার কিছু তুলে ধরছি। গতমাসে আমাদের অফিস থেকে চারদিনের একটা ট্যুর ছিল কক্সবাবাজারে। আমি কিছুটা পারিবারিক ও কিছুটা নিজের শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে ঐ ট্যুরে যাইনি।

ঐ ট্যুরে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছিল। সেটা হচ্ছে কক্সবাজার যাওয়া আসা দুটি সময়ে মাঝপথে গাড়ী বিকল হয়ে যাওয়া। ঐ ট্যুরের নেতৃত্বে ছিলেন আমাদের সম্মানিত পরিচালক ও সিনিয়র সম্পাদক জনাব কামরুজ্জামান স্যার। যাই হোক ঐ ট্যুরে যে টাকা ব্যয় হওয়ার কথা ছিল তার থেকে কিছু টাকা বেঁচে যাওয়ায় স্যার ঠিক করলেন ঢাকার বাইরে কোথাও একদিন ঘুরে আসার। সবার সম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় ঢাকা থেকে চাঁদপুরে নৌ বিহার। উদ্দেশ্য চাঁদপুরের ইলিশ দিয়ে একটা খাবারের আয়োজন ও কিছু সময় ঐ শহরের কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে আবার দিনে দিনেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া। সেই অনুযায়ী যাত্রার দিন ঠিক হলো ২৬ অক্টোবর শনিবার। এরমধ্যেই স্যার উনার চাঁদপুরের এক বন্ধুকে ইলিশভোজের আয়োজনের জন্য বলে দিলেন।

আমি কিছুটা অসুস্থতা থাকা সত্বেও এই নৌবিহারে সবার সাথে সামিল হলাম। ভাবলাম একে জার্নির ধকল নেই দ্বিতীয়ত একদিনের ব্যাপার। যাত্রা শুরু করলাম নির্দিষ্ট দিনে সকাল সাতটায় সদরঘাট লঞ্চ ঘাটের উদ্দেশ্যে। সবাই একত্রিত হয়ে যথাসময়ে এমভি.বোগদাদিয়া-৭ লঞ্চে উঠলাম।আগেই বুকিং দেয়া ছিল প্রথমশ্রেণীর দুটো কেবিন। একটি পুরুষদের ও অপরটি মহিলাদের জন্য।লঞ্চটি তার নির্দিষ্ট সিডিউল অনুযায়ী সকাল ৮.৩০ মিনিটে ঢাকা থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিল। আমরা সকালের নাস্তা সেরে নিলাম সকাল ৯টায়। এরপর সবাই ডেকে এবং ছাদে অনেক মজা করলাম। জমিয়ে আড্ডা মারলাম। সেইসাথে উপভোগ করছিলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এরমধ্যেই কখন যে লঞ্চ চাঁদপুরে এসে ভিড়ল টের পাইনি। ওহ সেদিন কিন্তু থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল। কখনো ঝিরিঝিরি কখনো প্রবল বেগে। আমরা সবাই কাকভেজা হয়েই ছাদে এবং বারান্দায় দাঁড়িয়েই মজা করছিলাম। কেউ কেবিনে থাকতে রাজী নই। সবাই বেশ উপভোগ করছিলাম।

যথাসময়ে স্যারের কুমিল্লার বন্ধু লোকজন নিয়ে এসে আমাদের নিয়ে গেলেন উনার ‘চিত্রলেখা’ নামক জায়গায় অবস্থিত নিজস্ব বাসভবনে। সবাই যে যার মতো করে একটু রেস্ট নিলাম। বাসার লোকজন আমাদের চা-নাস্তা দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিলেন স্যার উনার বন্ধু ও পরিবারের সাথে। ইতিমধ্যে নামাজের সময় হলো। নামাজ শেষে ৩০ মিনিট সময় সবাইকে নিয়ে স্যারের বন্ধুর শ্যালক ও মেয়ে শহরের মধ্যেই ঘুরিয়ে আনলেন। শরীর ভালো লাগছিল না বলে আমি ঐ বাসায় থেকে গেলাম। এরপর বেড়ানো শেষে বাসায় ফিরে এসে দুপুরের খাবারের জন্য আগে থেকে বুকিং দেয়া চাঁদপুর ক্লাবমোড়ে অবস্থিত “এলিট” রেস্তোরাঁয় এলাম। খাবারের ম্যেনুতে ছিল সাদা ভাত, ইলিশ মাছ, দেশী মুরগী, সালাদ ও ডাল।প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। তাই খাবার শেষে সবাই অপেক্ষা করছিলাম কখন বৃষ্টি কমবে।

দুপুর সাড়ে তিনটায় বৃষ্টি থামলে আমরা ত্রীমোহনী অর্থাৎ ডাকাতিয়া নদীতে যেখানে তিননদীর সংযোগস্থল ঐ স্থানে রওয়ানা হলাম। ওখানে পৌঁছনোর পর শুরু হলো আবার বৃষ্টি। প্রথমে হাল্কা গুড়ি গুড়ি তারপর সজোরে। ছাতা, এমনকি একস্ট্রা কোনো জামাকাপড়ও কেউ নেই নি। কারণ ব্যপারটা কারো মাথায়ই ছিল না। দু একজন শুধু ছাতা নিয়েছিল।

সেই লঞ্চ থেকেই আধভেজা জামাকাপড় গায়ে। তারওপর কোনো আশ্রয়স্থল না থাকায় বৃষ্টিতে ভিজে সবাই একাকার। গাছের নীচে আশ্রয় নিয়েও কোনো কাজ হয়নি। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে চারটা বেজে গেল। ঐ একই লঞ্চেই ফেরার কথা। আগে থেকেই আসা-যাওয়া বুকিং ছিল। এরমধ্যেই ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া নেয়া হলো লঞ্চঘাটে পৌঁছনোর জন্য। ঝুম বৃষ্টির মধ্যেই সবাই একে একে নৌকায় উঠছিলো। বিপত্তি ঘটলো আমার বেলায়। আমাকে দুজনে ধরে নৌকার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলো। নৌকার কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ পা পিছলে আমি পড়ে গেলাম সজোরে। এক পা ঢুকে গেল স্লাবের গর্তে। বেশ ব্যথায় কান্না আসলো। চোখের পানি বৃষ্টির পানি একাকার হয়ে গেল। পাঁচ-ছয়জনে ধরাধরি করে আমার পা গর্ত থেকে উদ্ধার করলো।
তারপর নৌকায় নিয়ে বসিয়ে সবাই আমাকে যত্ন করছিল এমনকি মাঝি ভাইয়েরা পর্যন্ত। যাক অবশেষে আবারও লঞ্চে ফিরে এলাম।এ রপর আর কেউ কেবিন থেকে বের হইনি।সবাই ভিজে চুপচুপে।

কেবিনের মধ্যে কোনোরকমে এসি ও ফ্যানের বাতাসে কাপড়-চুল শুকানোর চেষ্টা। আমি ভেজা শরীরেই শুয়ে থাকলাম।ভীষণ ব্যথা করছিল। মাগরিবের পর শেষ হলো চা পর্ব। আমাদের এক কলিগের বাসা চাঁদপুর শহরে। সে আগেরদিন চলে গেল আমাদের জন্য তার বাসা থেকে পিঠা বানিয়ে আমাদের খাওয়াবে বলে। সে তিন রকমের পিঠা নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। সেই পিঠা এবং আগে থেকে আমাদের আয়োজন রাখা পেটিস, আপেল দিয়ে চা-নাস্তা পর্ব শেষ হলো। এরপর সবাই আমাদের কেবিনে চলে এলো। যেহেতু আমি শুয়ে আছি তাই আমাদের কেবিনেই চললো গান, কবিতা, কৌতুক। জমে উঠলো আড্ডা। আমি ভুলে গেলাম আমার কষ্ট।

রাত ৮ টায় লঞ্চ সদরঘাটে পৌঁছনোর পর যার যার বাসায় ফেরার পালা। সবাই চলে গেল যে যার মতো করে। আমাদের কয়েকজনকে অফিসিয়াল গাড়ী দিয়ে স্যার যার যার বাসায় পৌঁছে দিলেন।

এভাবেই হাসি-কান্নার মিশেলে উপভোগ করলাম একটা দিন।