চাকরির আবেদন ফরম জমা দিয়ে মোস্তফা কামাল বাসার দিকে ফিরছেন। অর্ধেক পথ যাবার পর মনে পড়ে আবেদন পত্রের সাথে পাসপোর্ট সাইজের ছবি দেয়া হয়নি। মেজাজটা সাথে সাথে বিগড়ে যায়। নিজের ওপর নিজেরই রাগ ধরে যায়। তবে ইদানিং তিনি রাগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। সাথে সাথে মাথাটা নিচু করে মাটির দিকে তাকান। তার মনে পড়ে দাদীর কথা। দাদী বলতেন, যখনই তোর রাগ আসবে তুই মাটির দিকে তাকাবি। রাগ না কমলে বসে পড়বি। তবুও যদি না কমে তবে শুয়ে পড়বি। এরপরও যদি না কমে তবে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিবি। দেখবি একবার না একবার কমেই যাবে। মোস্তফা কামাল মাটির দিকে একটানা তাকিয়ে আছেন। তবু তার রাগ কমছে না। তিনি ফুটপাতে বসে পড়লেন। নাহ রাগ কমছে না। এখন শুয়ে পড়া দরকার। কিন্তু এ ফুটপাতে তিনি শোবেন কিভাবে। তার রাগ যেন আরও বেড়ে যাচ্ছে। এক গ্লাস পানি খাওয়া দরকার। তিনি আশে পাশে তাকিয়ে দেখলেন। নাহ পানি পাওয়া যায় এমন কোনো দোকান তার নজরে আসছে না। তিনি হতাশ হলেন। উল্টো তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। সরু রাস্তার ঠিক খাড়া ওপরে এক টুকরো আকাশ। দু’পাশে বহুতল দালান। দুপুরের আকাশে তাকানোও কঠিন। সূর্যের প্রখর তাপে চোখ ঝলসে যায়। মোস্তফা কামালের গলা শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে। তিনি চোখ বন্ধ করে একটা ঢোক গিললেন। কিছু ভেবে আকাশ থেকে চোখ নামাতে গিয়ে চোখ আটকে গেলো সামনের ছয় তলা ভবনের তিন তলার বারান্দায়। যেন বড়শিতে মাছ আটকে গেছে। মোস্তফা কামাল চেষ্টা করছেন চোখ নামাতে কিন্তু পারছেন না। অবশেষে যখন নামালেন তখন বারান্দা খালি। কেউ নেই। মোস্তফা কামালের বুকে আরেকটা হাহাকার ধ্বনি ঢেউ খেলে গেলো।

পাশাপাশি দুটো কলেজে তিনি আবেদন পত্র জমা দিয়ে এসেছেন। একটা হাতে হাতে দিয়েছেন। আরেকটা কলেজের সামনে টানানো বাক্সতে। ফুটপাত থেকে দাঁড়িয়ে তিনি হাঁটা শুরু করলেন। সেই কলেজের দিকে যেখানে আবেদন পত্রটা হাতে হাতে জমা দিয়ে গেছেন। কলেজের অফিস কক্ষে ঢুকতেই চেয়ারে বসে থাকা ভদ্রলোক চমকে উঠলেন। আরে আপনি! একটু আগে না এসেছিলেন। কোনো সমস্যা? মোস্তফা কামাল না সূচক মাথা নাড়লেন। তার চেহারায় ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছে। সারা শরীর ভিজে চুপসে গেছে ঘামে। ঘামের গন্ধে তার নিজেরই দম বন্ধ হয়ে আসছে। মাথা নাড়ার পরপরই তিনি আমতা আমতা করে বললেন, আমার আবেদন পত্রটা দিন। এখন জমা দেবো না। দেখি পরে হয়তো জমা দিতে পারি। চেয়ারে বসা ভদ্রলোক অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি অনেকটা পুতুলের মতো হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই আপনার নাম? মোস্তফা কামাল নাম বলতেই ভদ্রলোক যন্ত্রের মতো তার আবেদন পত্রটা দিয়ে দিলেন। মোস্তফা কামাল আবেদন পত্র হাতে নিয়েই বেরিয়ে এলেন। ভদ্রলোকের চোখ মুখ তাকে যেভাবে গিলছিলো তা তার মোটেই ভালো লাগছিল না।

বাইরে বেরিয়েই তিনি ভাবলেন অন্য কলেজটাতেও যাবেন কি না। কিন্তু তার মনে পড়লো, সে কলেজের বাক্সটিতে তিনি আবেদন পত্র ফেলে এসেছেন। তালা মারা বাক্স খুলে আবেদন পত্র বের করে আনা সম্ভব না। অনেকটা হতাশ হয়ে তিনি বাসার দিকে রওনা করলেন। আবেদন পত্র ফিরিয়ে আনা কলেজের জন্য ব্যাংক ড্রাফট করতে হয়েছে তিনশত টাকার। আর বাক্সে ফেলা আবেদন পত্রে যে কলেজে জমা দিয়েছেন সে কলেজের জন্য ব্যাংক ড্রাফট করতে হয়েছে দুইশত টাকার। দুটোই প্রাইভেট কলেজ। বেতনও খুব কম। মোস্তফা কামাল বেতনের কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। অফিস কক্ষ থেকে তা জানানো হয়নি। বলা হয়েছে ভাইভাতে বেতন নিয়ে আলোচনা করা হবে। তবে বেতন যে খুবই কম তা তিনি শুনলেন বাইরের মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করে। বেতন কত তা না জেনে আবেদন করতে ভালো লাগে না। কষ্ট করে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পরে যদি শোনা যায় বেতন পাঁচ থেকে আট হাজারের মধ্যে। তখন মনে হয় ব্যাংক ড্রাফটের টাকাটাই জলে গেলো। আর লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে তাও জানার উপায় নেই। মোস্তফা কামালের মনে হাজারো চিন্তা একসাথে খেলা করে। বাসার কাছাকাছি পৌঁছেই একটি চায়ের স্টলে জারের পারি দেখে তার মনে হলো তার পানির পিপাসা পেয়েছিলো অনেকক্ষণ আগে। তিনি দোকানে গিয়ে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খেলেন। দ্বিতীয় গ্লাস খাওয়ার সময় চোখে পড়লো গ্লাসের তলায় একটি পোকা। তষন তার অর্ধেক পানি খাওয়া হয়ে গেছে। মোস্তফা কামাল এশসাথে রাগ ও ঘৃণায় দোকানিকে পোকাটা দেখালেন। দোকানি কিছু না বলে হা করে চেয়ে রইলো। পকেট থেকে দু’টাকা বের করে দোকানিকে দিতে দিতে বললেন, ভাই মানুষকে ঠকাবেন না।

আবেদন পত্রে ছবি যোগ করে পরদিন আবার জমা দিতে গেলেন। জমা দেয়ার সময় গতকালের ভদ্রলোক হা করে তাকিয়ে থেকে বললেন, ভাই আপনি আশ্চর্য লোক। মোস্তফা কামাল কিছু না বলে শুধু একটি মুচকি হাসি দিয়ে বেরিয়ে এলেন। মানুষের হাসির মাঝে সুখ থাকে, দুখও থাকে। মোস্তফা কামালের হাসির মাঝে যে কতটুকু দুঃখ আছে তা ঐ ভদ্রলোক বুঝতে পারেননি। মোস্তফা কামাল রাস্তায় নেমেই ঐদিনের ঐ বাড়িটির সামনে এলেন। যে বাড়ির তিনতলার বারান্দায় কিছু তার চোখকে অনড় করে দিয়েছিলো। বাড়িটির সামনে এসে তিনি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন। মনে হলো তার ঘাড় থেকে কিছুটা হলেও বোঝা নেমে গেছে। তিনি বাড়িটির বিপরীত দিকের রাস্তায় বসে তাকিয়ে আছেন তিনতলার বারান্দায়। মাঝে মাঝে তিনি মাথা নামিয়ে আবার কৌশলে সেদিকে তাকাচ্ছেন। কারণ রাস্তায় প্রচুর লোক। কে কি মনে করে কে জানে। মানুষের চোখের চাহনিতে তিনি ভয় করেন না তবে লজ্জা পান। নাহ বারান্দায় কেউ নেই। বারান্দায় দু’একটা কাপড় শুকাতে দেয়া হয়েছে। মোস্তফা কামালের কেমন যেন বিরহ বিরহ লাগছে।

হঠাৎ রোদ পড়ে গিয়ে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়। ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। মোস্তফা কামাল ফুটপাতে বসে বৃষ্টিতে ভিজছেন। রাস্তার লোকজন মূহুর্তেই কমে যায়। চারদিক ভয়ানক অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। মাঝে মাঝে দু’একটা প্রাইভেটকার বৃষ্টি আর অন্ধকারের মাঝে জোনাকির আলো ফেলে শব্দ করে চলে যায়। শুধু একা বসে থাকেন মোস্তফা কামাল। এ অবস্থায় তাকে কেউ দেখলে পাগল ছাড়া কিছুই বলবে না। তিনি তাকিয়ে আছেন তিনতলার বারান্দার দিকে। হঠাৎ কেউ এসে দ্রুত কাপড়গুলো নিয়ে ভেতরে চলে গেলো। তখন বিজলির ঝলকানিতে তিনি যাকে দেখলেন, বুঝলেন, এতো সেই।