নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ ও এলোমেলো বিষন্নতা নিয়ে বসে আছি পড়ার টেবিলে। হুড়পাড় শব্দ করে পদ্মার পাড় ভাঙে, ফিসফিস করে দু’এক ফোটা বৃষ্টি নেমেই থেমে যায়।মেঘগুলো কোথায় যেন ভেসে যাচ্ছে, মাঝে মাঝে মেঘের ফাকে চাঁদের জ্যোৎস্না হেসে উঠছে, আমার অবাধ্য মনও মেঘের সাথে বার বার চলে যাচ্ছে-ফিরে আসছে। অজানা অচেনা পথে হাঁটার মত, চোখ বুজলে দেখতে পায় আমাকে…
ইস তুই না বড় হ্যাবলা?
লালিমা কথা বলেই আমার দিকে চেয়ে থাকে। আমি ওর হাসি-খুশি মুখবয়টা বার বার দেখতে পায়।
আবার লালিমা আমার ওড়না ধরে টেনে বলে, দেখলি না স্বপ্ন তোর জন্য চিঠি রেখে গেল।
আমি মুখ ফসকিয়ে বলে ফেলি, কোথায়?
লালিমার সজনে ডাটার মত হাতটা উত্তর দিকে উঁচু করে দেখানোর চেষ্টা করে বলে, ঐ যে সাইন্স বিল্ডিংএর জানালার উপর ইটের নিচে।
আমি পা বাড়াতেই ইংরেজির শিক্ষক ছড়ি হাতে নিয়ে ক্লাসে প্রবেশ করল। ওরে বাবা, আজ ডিসিপ্লিন রচনা মুখস্ত করে আসতে বলেছিল।আমার বুকের মধ্যে ভুমিকম্পন শুরু হয়ে যায়, পড়া তো হয়নি। স্যার দাঁড় করিয়ে হাতে সপাং সপাং মারে, অপমান করে।
আমার পড়া হবে কি করে? গতরাতে বরপক্ষ ছেলেসহ আমাকে দেখতে এসেছিল। হাতে সোনার আংটি পরিয়ে রেখে গেছে। ছেলে ইউরোপের কোন এক দেশে থাকে। বুকের মধ্যে সম্পানের নাও বয়ে যায় সারারাত।
আমাকেও নিয়ে যাবে বিদেশে।সবেমাত্র দশম শ্রেণিতে পড়ি।
চেয়ারম্যান সাহেব বাবার বন্ধু, তাই বয়স বাড়িয়ে জন্ম নিবন্ধন করে দিবে। বিয়ে হয়ে যাবেই।
স্যার ক্লাসে এসেই বলে,কার কার পড়া হয়নি? দাঁড়াও।
যথারীতি দাঁড়িয়ে পায়ের দিকে মুখ করে, মাথা নিচু করে থাকলাম। যারা যারা আমার মত দাঁড়িয়ে আছে, তাদের হাতের উপর চলছে লাঠির আঘাত। স্যার আমার কাছে আসতেই, আমি ডান হাতটা সোজা করে স্যারের সামনে মেলিয়ে দিলাম।স্যারের চোখ আমার রাঙা হাতের সোনার আংটির দিকে। আমার মুখের দিকেও দু’একবার তাকালো; তারপর বলল,তোমার বিয়ে নাকি?
আমি মাথা নিচু করে, নিরবেই দাঁড়িয়ে থাকলাম।
হঠাৎ দড়বড় শব্দে বৃষ্টি নেমে এলো। বাইরে জানালার কাছে কলাগাছের পাতার উপর বৃষ্টির ফোটা জোরে জোরে আঘাত করায় যেন স্মৃতির পাতা থেকে ফিরে এলাম।
শামীমের সাথে বিয়ে হয়েছে আমার, এক বছর হতে চলল।বিয়ে করে বাসর ঘর করে, সোনার গহনা-পোষাক-টাকা-পয়সায় ভরিয়ে দিয়ে চলে গেছে বিদেশে। যাওয়ার সময় বলে গেছে, মন দিয়ে পড়বা, বেশি বেশি ইংরেজি শিখবা। কিন্তু আমার চারিদিকে হাহাকার, মানুষের আহাজারি।পদ্মার ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। দুই তিন কিলোমিটার ভাঙতে ভাঙতে আমাদের বাড়ির পাশে চলে এসেছে।
একাকিত্ব আমার চারপাশ আটকিয়ে ধরেছে।মেঘের মত ভেসে যাচ্ছি উদ্দেশ্যহীন।ইটের নিচের চিঠিটা খুঁজি সারাক্ষণ। কি লিখেছিল স্বপ্ন? স্বপ্ন আমার সাথেই পড়তো। স্বপ্নকে ও স্বপ্ন’র চিঠিকে জানার আগ্রহ মাঝে মাঝে আমাকে পাগল করে তোলে, উতলা হয়ে ওঠে মন। কাশফুলের ঝরা পাপড়ির মত কল্পিত চিঠির উপর মনটা আছড়িয়ে পড়ে।পদ্মার ভাঙনের মত স্মৃতির ধারগুলো ভেঙে ভেঙে পড়ে। দূরে আধো-আলো ছায়ায় দেখা যাচ্ছে, বাড়ন্ত কদম গাছটি পদ্মার ভাঙনের সাথে হেলে পড়ছে।
দু’বছর পরের ঘটনা।
আমার স্বামী আসবে করে- করেও বাড়ি আসে না।টাকা পাঠায়। মোবাইলে কোনদিন কথা বললে, ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে।মোবাইলে কথা বলতে হলেও, কোন মোবাইল ব্যবসায়ীর দোকানে গিয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে। মোবাইল ব্যবসায়ী ছেলেটা বেশ হ্যান্ডসাম। তবে আমার চেয়ে এক বছরের ছোট সে।আপা বলে ডাকতো। দু’সপ্তাহ বা তিন সপ্তাহ পর পর সংবাদ দিত, আপা দুলা ভাই অমোকদিন বিকালে ফোন করবে আপনাকে আমার দোকানে থাকতে বলেছে। যেতাম, অপেক্ষা করতাম। ফোন করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যেতো বা কোন কোনদিন রাতও হয়ে যেতো। আমি ওই দোকানে গেলে বেশ কয়েকজন ছেলে এসে আড্ডা দিত।বুঝতে পারতাম আমাকে নিয়ে ওদের আলোচনা চলতো। এও বুঝতাম আলোচনার বিষয় থাকতো বেশ রোমান্টিক। মাঝে মাঝে মনে হতো, মিশে যায় ওদের সাথে। একদিন ওদের সাথে সিনেমা হলেও ঢুকেছিলাম, সিনেমা দেখেছিলাম। যেদিন সিনেমা হলে সিনেমা দেখছিলাম, সেদিনই লিলিমা আর তার স্বামীও সিনেমা দেখতে গিয়েছিল। কাকতালীয় ভাবে আমি আর লিলিমা এক জায়গায় পাশাপাশি সিটে বসেছিলাম। লিলিমার স্বামী ওর ডান দিকে আর আমি ওর বামদিকের সিটে বসেছিলাম। উহ্ যাদের সাথে সিনেমা দেখতে এসেছিলাম, দেখেছিলাম, তাদের আফসোস। আমি যেন ওদের হাত ছাড়া হয়ে গেছি। চাঁদ হয়ে আলো ছড়িয়েছি ওদের মনে অথচ মেঘ এসে বরষা ঝরিয়েছে ওদের মুখে।
এর মধ্যে আমার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাটা হয়ে গেল। বাড়ির কাছে যে স্কুলে পড়তাম, ওই স্কুলে একাদশ শ্রেণি খোলায়, ওখানেই লেখাপড়া করতাম।বেশ রিলাক্সে সময় কাটছিল। স্বপ্ন জেলা শহরের কলেজে পড়তো। পরীক্ষা দিয়ে ও বাড়ি এসেছে। আমাদের গ্রামের ছেলে হলেও, তেমন কথা হয়নি ওর সাথে। শুধু চিঠি দিতো, আমি পাগলের মত ওর আবেগপূর্ণ চিঠিগুলো পড়তাম। হয়তো আমি চিঠি পড়ে মুগ্ধ হয়ে জোছনাময় অথবা আলোময় দুপুর খুঁজছি, ছুটে চলেছে আমার মন টুনটুনি পাখির মত বসন্ত দুয়ারে, ফুলে ফুলে, ঘুরে ঘুরে, ফুটন্ত পাপড়িগুলো ঝরাতে চায়। নতুন চৈত্রদিনের প্রত্যাশায় সারাক্ষণ মৃদু ওম বাতাস ও তপ্ত ছায়ার সন্ধানে চলি।
একদিন বেরিয়ে পড়লাম,অজানা-অচেনা পথে। স্বপ্ন এর দু’জন বন্ধু স্বাধীন আর উদয় আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। কলকল শব্দে মাঠ থেকে, ক্যানেল দিয়ে, নদীতে পানি নামছে। বেশ খানিক আগে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। ভীষণ অন্ধকার ছিল আকাশটা। কালো মেঘে রাতটাকে আরো কালো করে তুলেছিল।
এখন বেশ পরিস্কার ঝকঝকে লাগছে পরিবেশ। আকাশের মাঝখানে চাঁদটা ঝলমল করে হাসছে, যেন দুপুরের সূর্যমূখী ফুল ফুটেছে-মেলে দিয়েছে পাপড়িগুলো। আমি স্বাধীন আর উদয়ের মাঝে হাটছি। নদীর ধার দিয়ে হেটে চলেছি। স্বাধীনের ডাকে সাড়া দিয়েছি।
‘স্বপ্ন’ এর সাথে মুখোমুখি কথা না হলেও, শুধু ওর আবেগে ভরা চিঠিগুলো পড়েই ঘর ছেড়েছি। আমার শরীর ভর্তি গহনা রয়েছে।বাড়ি থেকে টাকা-পয়সা যা ছিল, সব সঙ্গে নিয়েছি।কোথায় যাচ্ছি জানিনা, শুধু জানি ছায়ার মত, বন্ধু-সহপাঠী স্বপ্ন আছে আমার সাথে। যাকে নিয়ে আমার কল্পনা, আমার উড়ুউড়ু বাসনা, সারাক্ষণ পাখা মেলে থাকে, তার কাছে যাচ্ছি।
দূরে যেতে যেতে ক্লান্ত হয়ে গেছি।ঝড়-জঙ্গল ছেড়ে ক্যানেলের ধারে এক পায়ে দাঁড়ানো একটি তাল গাছের নিচে পৌছালাম।জ্যোৎস্নালোয় দেখা যাচ্ছে, একটা টিনের বেশ বড় বাড়ি। ওই বাড়ি থেকে স্বপ্ন এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে আবেগে কয়েকবার চুমু খেলো। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই ঘটনাটা ঘটছে এবং আমিও ওকে জড়িয়ে ধরলাম। ওর পাতলা বুকটা আমার নরম বুকে লেপটে আছে।ঘনঘন নিঃশ্বাস নিচ্ছি দু’জনেই।কয়েক মিনিট পর আমার ডানহাতটা চেপে ধরে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেল।ওই বাড়ির ভিতর গিয়ে দেখতে পেলাম, একজন কাজী আর দু’জন লোক বসে আছে। কাজী সাহেব খুব তাড়াতাড়ি আমাদেরকে ওজু করে তার সামনে গিয়ে বসতে বলল। স্বপ্ন খুব দ্রুত ওজু করল। আমার বেশ খানিক দেরি হল।আমার মাথায় যেন কোন কাজ করছে না, হ্যাঙ হয়ে গেছে।তারপর যখন তালাকনামায় স্বাক্ষর করলাম তখন বুকটায় যেন বড় কোন পাথর এসে চেপে বসল। চোখে পানি টলটল করছে। আমি কিছুই বলতে পারছি না। না কবুল অথবা না তালাক। শুধু একের পর এক হুজুর কাগজ এগিয়ে দিচ্ছে আর আমি স্বাক্ষর করে দিচ্ছি।আমি কি শাড়ি বদল করছি, না ঘর বদল করছি, বুঝতে পারছি না। আমার এতদিনের সমস্ত আবেগ ও অনুভূতি বিকল হয়ে গেছে। বার বার বাবা-মা আর স্বামীর কথা মনে হচ্ছে। যেন আমার স্বামী শামীম, আমাকে ফোন করে বলছে, ভাল করে লেখাপড়া করবা, মা-বাবাকে দেখবা। যা লাগবে, শুধু বলবা। ওর কণ্ঠ আমাকে ব্যস্ত করে তুলেছে। মৌ, মৌ আমার মৌ, ভাল থেকো, সোনা-মধু ফোন করো… এ যেন বাস্তব এক চিঠি, আমাকে বার বার উতলা করে তুলছে, মৌ কিছু বলো, আমিই শুধু বলছি, তুমি কিছু বলো।আমি খিলখিল করে হেসে পড়েছি।অমনি আমার সামনে বসা হুজুর চুমকিয়ে উঠেছে।যেন ভয় পেয়ে গেছে।
স্বপ্ন, স্বাধীন ও উদয় হুজুরের সাথে মোনাজাত করছে। তখন আমি হাউমাউ করে কাঁদছি।আকাশটা আবার মেঘে ঢেকে গেছে।ঝরঝর করে বৃষ্টি নেমে গেল। আমার শামীমের দেওয়া গহনাগুলো, আমার শরীরকে ধিক্কার দিতে লাগল। আমি উড়ছি খোলা আকাশে, বৃষ্টির মধ্যে।ভারী ভারী গহনা ছুঁড়ে ফেলে পাতলা হচ্ছি।স্বপ্ন এর আবেগপূর্ণ চিঠিগুলো ভিজে ভিজে যাচ্ছে, বৃষ্টির ফোটায়।কালো কালো কাগজে ছড়ানো কালি, কাগজের পাতা থেকে ধুয়ে-মুছে যাচ্ছে। সাদা খন্ডখন্ড কাগজ ভেসে যাচ্ছে নর্দমায়।
২.
এভাবে মেঘের ডানায় উড়তে গিয়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বো, পাখা ও পালক খসে খসে বাতাসে উড়বে, সে কথা কখনো ভাবিনি।
সপ্তাহ যেতে না যেতেই পুলিশের খাচায় বন্দী হলাম। পুলিশের অশ্লীল কথায় শুধুই কেঁদেছি, শালীর মাগী এত কামড় তে,ভাতারের গহনা-টাকা-পয়সা রাইখি যাতি পারতিস। তারপর যাতিস্ নাঙের সাথে।
পুলিশের অশ্লীল গালি শুনেছি আর দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদেছি।মনে মনে ভেবেছি, এ মুখ আর দেখাবো না কাউকে।
আমার তো কিছুই নেই।আমি পৃথিবীর কলঙ্কের ঝুড়ি। ঘরের কার্ণিশে বাঁধা পুরাতন মাচা যেন, যে মাচায় কবুতর মল ত্যাগ করে করে ফেলে যায়, সে মাচা হয়ে গেছি সমাজের চোখে। এখন আমার চারপাশে শুধুই নাকি দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
আমাকে ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়েছে, উঠানের পরিত্যাক্ত জায়গায়।
শামীমের দেওয়া গহনারই বা কি প্রয়োজন? সব প্রয়োজনই তো হারিয়ে গেছে। আমি কি করবো,গহনা-টাকা-পয়সা?
শামীমের আত্মীয়-স্বজন মামলা করেছে। তারা থানার কাস্টরীতে এসে, আমাকে বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য, বার বার অনুরোধ করছে। আবার ভয়ও দেখাচ্ছে, না গেলে জেলে পচিয়ে মারবে।
ওরা স্বপ্ন’র বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেছে। সে কারণে ওই মামলায় স্বপ্নকে ফাঁসানোর জন্য, আমার বাবা, ভাই ও শামীমের বাবা-ভাইরা একাট্টা হয়ে, আমাকে স্বাক্ষী দেওয়ার জন্য চাপাচাপি করছে।তাদের দাবী আমি পূরণ করতে পারছি না, সাফ-সাফ জানিয়ে দিলাম, আমি ও সব মিথ্যে সাক্ষী দিতে পারবো না।
পুলিশের ভুমিকা সম্পূর্ণ ওদের পক্ষে।
আমি সাক্ষী দিলেই অপহরণ মামলায় স্বপ্নর সাজা হবে আর আমি ফিরে যেতে পারবো শামীমের বাড়ি। আবার ফুল হয়ে ফুঁটতে পারবো। আলোকিত হবে আমার জীবন। বেঁচে থাকার জন্য, আমাকে ওরা স্বপ্ন দেখাচ্ছে। হায় আমার জীবন!
কিন্তু আমি পারলাম না, স্বপ্নকে বিপদে ফেলতে, ওর আর কি দোষ, আমিও তো ওকে ফুসলিয়েছি, কাছে পাওয়ার জন্য।বার বার বলেছি, তুমি চলে এসো আমার কাছে।ও যখন আসেনি, তখন আমিই বাড়ি থেকে চলে এসেছিলাম, ওর কাছে।
কাস্টরীতে বসে, এ সবই ভাবছিলাম। এমন সময়, ভাগ্যক্রমে ওই দিনই, থানায় এসেছিল এসপি সাহেব।
উনি পরিদর্শনে এসে, যখন থানা কাস্টরীর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন আমার চোখে চোখ পড়ে গিয়েছিল। জানি না আমাকে দেখে উনার মধ্যে কোনো সহানুভুতির বাতাস বয়ে গিয়েছিল কিনা। তবে আমার সামনে এসে সহানুভূতির সুরে জিজ্ঞাসা করেছিল, কি হয়েছে তোমার?
আমি আমার জীবনের সমস্ত ঘটনা বলে, কাঁদছিলাম।উনি মনোযোগ দিয়ে শুনেছিল কিনা তাও জানি না। তবে পায়ের জুতার খটখট শব্দ করে, ওসি সাহেবের রুমের দিকে চলে গিয়েছিল। আমি আরো দুদিন থানায় আটক ছিলাম। স্বপ্ন’ও আটক ছিল পুরুষ কাস্টরীতে।
কিছু বুঝে উঠার আগেই,দু’জনকেই এক সাথে ছেড়ে দিয়েছিল।
বছর দুয়েক পাশের গ্রামে স্বপ্ন’র মামার বাড়িতে ছিলাম। আগেই জেনেছি, গহনা টাকা-পয়সা হারিয়ে গেছে। অবশ্য স্বপ্ন আমাকে বলেছিল, ওগুলো থানা থেকে, ছাড়া পাওয়ার সময়, ঘুষ হিসেবে দিতে হয়েছিল। আমি স্বপ্নকে বলেছিলাম, কে কাকে ঘুষ দিয়েছে?
ও বলেছিল, মামা দিয়েছে পুলিশকে।
এতদিনে অনেকটায় বুঝতে পেরেছি, আমি অনেক দূরে চলে এসেছি,স্বপ্ন আমাকে বেশ দূরে ঠেলে দিয়েছে। ওর সে আবেগ হারিয়ে গেছে, সব সময় ক্লান্ত ও মলিনমুখে চেয়ে থাকে, মাঝে মাঝে বিরুক্তির ছাপও দেখি ওর মুখে।
ওর ছাত্রজীবনও অতিষ্ট হয়ে উঠেছে।ঠিকমত লেখাপড়া করে না।বিষাদের ছায়া ওকে ঘিরে ধরেছে। আমিও এ বাড়িতে বোঝা হতে চলেছি।আমি কাটাওয়ালা বাবলা গাছে শিকড়হীন আলোকলতা, কণ্টক-ডালের রক্ত চুষে জীবন ধারণ করছি।বাইরে ঝকঝকে হলুদ বর্ণের দেখালেও,সারা অঙ্গে কাটা ফুটে যাচ্ছে।
এত কষ্টের মধ্যেও স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম।বইগুলোও জোগাড় করেছি। খুব গোপনে, আমার মা খোঁজ-খবর নেয়। বান্ধবীদের মুখে শুনি আর ম্লান মুখে হাসি। নিজেকে দেখি আয়নায়, শুকিয়ে যাচ্ছি, যেন ঝরে পড়তে বাকি।
প্রায় মাস দুয়েক হয়েছে,স্বপ্ন ওর মামার বাড়ি ছেড়েছে। যাওয়ার সময় আমাকে কিছুই বলে যায়নি। আমি আর পরগাছা হয়ে এ বাড়িতে কতদিন থাকবো? শুধু অপেক্ষা করছিলাম, বিএ পরীক্ষাটা দেওয়ার জন্য।
আর একবার হারিয়ে যাচ্ছি।কলেজে যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে পড়েছি, উদ্দেশ্যহীন, চৈত্র বাতাসে ঝরা পাতার মত, এলোমেলো উড়ে উড়ে চলছি।আমার মনে হয়েছে, এ বাড়ি থেকে আমি গেলেই, ওরা বেঁচে যায়।সকাল থেকে দুপুর এদিক-ওদিক ঘুরছি। কোথায় যাবো, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এক পা দু পা করে এগুতে এগুতে মনের অজান্তে, হয়তো প্রয়োজনের তাগিদে, বিকেল নাগাত বাবা-মা এর বাড়ির গেটের সামনে এসে পৌঁছে গেছি। পরগাছারও খাবার লাগে, আলো-বাতাসের প্রয়োজন হয়।আমি পরগাছা হলেও, প্রয়োজনে হাত-পা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে দিচ্ছি। আমার এখন প্রয়োজন, খাবার-পোষাক-আষাক এবং বেঁচে থাকার সব উপকরণ।
বাড়ির গেটের সামনে গিয়ে চোখ তুলে সামনে তাকাতেই, প্রথমেই মা’র চোখে চোখ পড়ে।
মা ঘরের পিড়ির উপর ছিল।ঘর থেকে খুব দ্রুত পায়ে, হেটে এসে, মা আমার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে, শাড়ির আঁচল টেনে চোখ মুছতে শুরু করে। হয়তো কিছু বলার চেষ্টা করছে, বলতে পারছে না। মুখ ফুপড়িয়ে কেঁদে ফেলে। আমাকে জড়িয়ে ধরে।আমিও ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকি। মায়ের বুক থেকে আমার মুখটা তুলতে পারছি না, শুধু বুক আর পেট উঠা-নামা করছে। তারপর খুব শান্তভাবে ডান হাতটা দিয়ে, আমার মুখে দু’হাত দিয়ে উঁচু করে ধরে, কী হয়িগিছিস্ মা!
মুখ ও চুয়ালে স্নেহমাখা হাত বুলাতে বুলাতে স্পষ্টভাবে বলতে থাকে, কত শুকিয়ি গিছিস্!কী হতি কি হয়ি গেল মা?
আমি দাঁড়িয়েই আছি উঠানে।মা একবারো বলছে না, আয় মা ঘরে আয়। কী যেন আতঙ্ক মায়ের মধ্যে কাজ করছে। বেশ সময় ধরে দাঁড়িয়ে আছি। এমন এক সময়, গেট দিয়ে বাবা বাড়িতে আসে। আমাকে দেখে শান্ত গলায় বলে, যা ঘরে যা। যেন মা’র বুকে বাতাস লাগে। এত বছর সংসার করেও, মা কতটা বাবার উপর নির্ভরশীল, তা দেখলাম। এবার মা আমার হাত ধরে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে যায়।
বাড়ি ফিরার পর আবারও যেন নিজেকে পরগাছা মনে হতে থাকে। সমাজে কত ছেলে কতবার প্রেম করছে, বিয়ে করছে দুটো তিনটে, অথচ তাদেরকে একবারও কলঙ্ক ছুঁতে পারে না। অথচ একটি মেয়ে কোনো ছেলের সাথে হেসে কথা বললেই আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। বিয়ের সময়, সে সব কথা উঠে আসে। মেয়ে হয়ে জন্মানোটায় যেন পাপ। ছেলেরা তালাক বললেই, বউটিকে বাপের বাড়ি চলে আসতে হয়। ছেলেরা শত অপরাধ করেও বুক ফুলিয়ে বাপের বাড়িতেই থাকে। আর মেয়েরা কোনো একবার পা পিছলে পড়লে, বাপের বাড়ি বা শ্বশুর বাড়ি দুটোই হারায়।
কিছু দিন যেতে না যেতেই আমি বড় ভাই-ভাবীর বোঝা হয়ে যায়। বৃদ্ধ বাবা- মা যেন কোনো ভাবে, যেকোন ছেলের হাতে আমাকে তুলে দিতে পারলেই বাঁচে। ওদিকে আমার স্বামী বিদেশ থেকে এসে ধুমধাম করে বিয়ে করে ফেলেছে। স্বপ্নও বেকারত্ব নিয়ে বাড়ি থেকে চলে গেছে। কেউ তার খোঁজ দিতে পারে না। শত চেষ্টা করেও স্বপ্ন’র মোবাইল নম্বরটা যোগাড় করতে পারিনি। ইতিমধ্যে আমার বিএ পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়ে গেছে। পাশও করেছি।অবশ্য তখন সার্টিফিকেট আমার কাছে মুল্যহীন হয়ে উঠেছে। একটি চাকুরী যে আমার প্রয়োজন, সে কথা কাকে বলবো, কিভাবে ভাই-ভাবীকে বোঝাবো? আমার মাথায় কোনো কাজই করে না।তাদের আচার-আচরণে আমি হতাশ হয়ে যেতে থাকি, ভেঙে পড়ে আমার বেঁচে থাকার প্রত্যাশা।
বাবা-মায়ের বাড়ি যে, আমার নিজের বাড়ি নয়, সে কথা ভাবী ও ভাই ইশারা-ইঙ্গিতে অথবা মানুসিক নির্যাতনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত জানিয়ে দিতে থাকে।কোথায় যাবো, কী করবো, ভেবে পাচ্ছিলাম না। একবার তো বাড়ি ছেড়ে গিয়ে বুঝতে পেরেছি, সমাজের যত দোষ, সব মেয়েরাই করে। আর পুরুষগুলো হা করে তাকিয়ে থাকে, সুযোগ পেলেই গিলে খেতে চায়।পুলিশের সে আচরণের কথা মনে হলে, আমার বমি লাগে,মাথা ঘোরে। বাড়ি থেকে বের হতে আর সাহস পাইনি। এদিকে বাবা বৃদ্ধ জনিত কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। বাবা এবং ভাই-ভাবীর সেবা করতেই মায়ের সময় কেটে যায়। আমাকে সময় দেওয়ার সুযোগ কারোরই নেই। একটু-আধটু মা’র সামনাসামনি হলে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায়, বার বার আঁচলে চোখ মোছে।আমিও আর মা’র সামনে যেতে চাইনি। সকলের খাওয়া হলে, শুধু মা আমাকে ডেকে একটু খাবার দেয়। কত যে করুণা করে খাবারটা দেয়, তা না দেখলে কেউ বুঝবে না। ভাবীর চোখের দিকে তাকালে, বুঝতে পারি আমি তাদের চোখে, কতটা অপছন্দের। এরপরও যাবো কোথায়? একবার পথ হারিয়ে ফেললে পথ পাওয়া বড় কঠিন হয়ে যায়। বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে।এ দেশে এখনো মেয়েদের স্বাধীনভাবে, স্ব-পরিচয়ে চলার পথ হয়নি। অথচ একটি ছেলে স্বগর্ভে, স্বপরিচয়ে চলতে পারে। এরপরও বাঁচতে হবে, এরকম মানুসিক বল নিয়ে টিকে আছি।উচ্ছিষ্ট প্রাণি হয়ে চলতে থাকি। মনে মনে শক্তি সঞ্চয় করি, বেঁচে তো থাকতেই হবে, যে কোন উপায়ে।
পাড়া-প্রতিবেশিদের কাছে মা, প্রায় আমার জন্য একটা ছেলে দেখতে বলে। কিন্তু বিয়ের প্রসঙ্গ এলেই, আমার আগের ইতিহাস উঠে আসে। এক সময় মনে হয়, বেশি লেখাপড়া জানা ছেলেরা যদি, কম লেখাপড়া জানা মেয়েদের বিয়ে করতে পারে, তবে আমি কেন কম লেখাপড়া জানা ছেলেকে বিয়ে করতে পারবো না। মনে মনে একটা ভালো নীরিহ ও বিশ্বাসযোগ্য ছেলে খুঁজতে শুরু করি, বিয়ে করতে হবে, ভাসমান হয়ে তো এ সমাজে টিকে থাকা যাবে না, মেয়ে হয়ে জন্মিয়েছি, তাই একটা অভিভাবক দরকার।
মনে পড়ে, শামীমের কর্মচারি শাহ্ আলমের কথা। শাহ্ আলম শামীমের ব্যবসা দেখাশুনা করতো। সেই সুত্র ধরে আমার কাছে আসতো। ওর চোখের দিকে তাকালে চোখটা নামিয়ে নিতো। আমার মনে হতো, আমার প্রতি তার দূর্বলতা ছিল। আমাকে বেশ পছন্দ করতো।আমার কাছে কোনো কাজে এলেই গোপনে চেয়ে চেয়ে দেখতো। তখন কর্মচারি হিসেবে, ওকে আমি গুরুত্ব দিতে চাইনি। ছেলেটি লাজুক স্বভাবের।এখনো প্রায় দেখা হয়, কিছু বলে না, শুধু চেয়ে থাকে, মনে হয় কিছু বলবে। অপেক্ষা করতে করতে কী মনে হলো, একদিন ছেলেটিকে চিঠি লিখি। অবাক হলাম, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অনেক পথ রয়েছে, ওর আগ্রহ আমাকে নতুন পথ দেখাই। ছেলেটিও আমাকে একটি চিঠি দিয়েছে। শুধু লিখেছে, এ মন একটি চিঠির জন্য হাজার বছর ধরে অপেক্ষা করছিলাম।