কলেজ জীবনের প্রথম দিনের ক্লাশ করে বাড়ি এসেই কেমন যেন একটা আলাদা অনুভূতি মিশুর মনে। ঠিক বলে বোঝাতে পারবে না সে। স্কুল জীবন থেকেই কলেজ জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছে সে। কিন্তু অন্যের মুখে শোনা আর বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্যে এক বিরাট তফাত। যদিও এর আগেও সে কলেজে দু’দিন গিয়েছে। প্রথমদিন এক বড় বোনের সঙ্গে ভর্তি হতে । আর দ্বিতীয় দিন উদ্বোধনী ক্লাশে। কিন্তু ক্লাশ করার অভিজ্ঞতা আজই প্রথম। এর আগেও সে কিন্ডার গার্টেন এবং হাই স্কুলে অনেক ক্লাশ করেছে। সঙ্গত কারণ ছাড়া কোন দিন ক্লাশ ফাঁকি দিয়েছে বলে মনে হয় না। কিন্তু কলেজ মানে কলেজ-ই।যার কোন তুলনা হয় না। সবই নতুন অভিজ্ঞা। প্রতিটি বিষয়ে আলাদা আলাদা স্যার-ম্যাডাম, একেক ক্লাশ একেক রুমে,বড় মাঠে বান্ধবীদের সাথে ঘুরে বেড়ানো । আবার ক্লাশের ফাঁকে অফ টাইম। তখন হয় কমনরুমে গিয়ে খেলা করা , না হয় লাইব্রেরীতে গিয়ে নানা রকম বই-পত্রিকা পড়া। আবার ইচ্ছে করলে ফুল বাগানের মাঝখানে গাছের নীচে বসে গল্পও করা যায়। আসলে কলেজে না পরলে মনে হয় ছাত্রজীবন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কেন যে কোন কোন মা-বাবা এসএসসি পাশ করার আগেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়- ভেবে পায় না মিশু। হয়তো মেয়েদের জীবনটাই এমন। মেয়েদের চিন্তার কোন স্বাধীনতা নেই। বিয়ের আগে মা-বাবা, বিয়ের পর স্বামী-শ^শুড় আর শেষজীবনে ছেলের সিদ্ধান্তই ফাইনাল।

ক্লাশ করে বাড়ি ফিরে আসার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাবার আগ পর্যন্ত ছোট বোন আর মায়ের সাথে সারাক্ষণ ঐ একই কথা। কোন স্যার-ম্যাডাম কেমন, কে কী বললো, নতুন কয়জন বান্ধবী হলো, কী ধরণের কলেজ ইউনিফর্ম বানাতে হবে, প্রতিদিন কয়টা করে ক্লাশ, দুপুরে কলেজ ক্যান্টিনে কি কি খাবার পাওয়া যায় ইত্যদি। মিশুর কথা শুনে মনে হয় সুপ্ত আগ্নেয়গিরী থেকে যেন অগ্নুৎপাত শুরু হয়েছে। অন্য কাউকে কথা বলার কোন সুযোগই দেয় না সে। অনেক কষ্টে তার মা তাকে রাতে বিছানায় পাঠায়। কিন্তু সে রাতে ঘুম যেন মিশুর সঙ্গে আঁড়ি দিয়ে বসে। ছোট বোন ঘুমিয়ে গেলেও সে কলেজের প্রথম দিনের স্মৃতির সাগরে ভাসতে থাকে। সব গ্রুপের ছাত্রীদের নিয়ে প্রথম ক্লাশটি ছিল কম্বাইন্ড ক্লাশ। ক্লাশে ঢুকেই ইংরেজী স্যার নিজের পরিচয়টা তুলে ধরলেন। যদিও এই স্যারের কথা কলেজে ভর্তি হওয়ার আগেই শুনেছে সে। কলেজে ভর্তি হতে এসেও একবার খোঁজ করেছিল। কিন্তু ঐদিন স্যার ছুটিতে থাকায় তার সঙ্গে আর দেখা হয়নি। উদ্বোধনী ক্লাশের দিনও অধ্যক্ষ স্যার অন্যান্য স্যারদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তখন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে একটু হাত নেড়েছিলেন তিনি। কিন্তু আজ ক্লাশের চল্লিশ মিনিট সময়েই জাত চেনালেন তিনি। শুধু নিজের পরিচয়ই না, কলেজ ও ক্লাশের নিয়ম- কানুন, পড়ানোর পদ্ধতি, রাস্তায় যাতায়াত থেকে শুরু করে যাবতীয় আদব কায়দা সম্পর্কে সচেতন করা কোন কিছুই বাদ যায়নি তার প্রথমদিনের আলোচনায়। কি সুন্দর তার বাচনভঙ্গি আর দায়িত্বশীলতা! গায়ে কলেজ-বিশ^দ্যিালয়ের গন্ধ লেগে আছে। কিন্তু কথা শুনে মনে হয় জাত শিক্ষক একজন। প্রথম দিনের ক্লাশে ছাত্রীদের সাধারণ জ্ঞানের উপর দু’চারটা প্রশ্নও করেছেন। টাঙ্গাইল জেলা কত তারিখ হানাদার মুক্ত হয়? কালিহাতী উপজেলায় একজন রাষ্ট্রপতি ছিলেন তার নাম কী? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষের কবিতা গল্পের নায়িকার নাম কী? বেগম রোকেয়ার নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় আছে, সেটি কোথায় অবস্থিত? কলেজের স্লোগান ‘জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা’ কোন কবির কোন কবিতার লাইন? এসব আর কী। মিশু একটি প্রশ্নের সঠিক উত্তরও দিতে পেরেছে। তাই তার আনন্দটা একটু বেশীই। স্যারের কথাগুলি যেন সবারই আরও শুনতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু তার আগেই ঘন্টা বেজে গেল। কেন যে ক্লাশটা মাত্র চল্লিশ মিনিটের ছিল? -ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পরে সে।

পরের দিন যথারীতি সকাল দশটায় ক্লাশ। তাই বাড়ি থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে বের হয়ে যায় সে। যদিও বাড়ি থেকে কলেজে পৌছাতে একঘন্টার বেশী সময় লাগে না। তারপরও প্রথম প্রথম কলেজ বলে কথা। গতকালের ঘোর তখনো কাটেনি। তাই একটু আগেই বাড়ি থেকে বের হয় মিশু। রাস্তায় বান্ধবীদের সাথে দেখা। সবাই একসঙ্গেই আসে কলেজে। কিন্তু গাড়ির মধ্যে তাদের আলাপে বিরক্ত হয়ে যায় অন্য যাত্রীরা। কিন্তু কেউ কিছু বলে না। না বলার কারণও আছে। এমনিতেই মেয়ে মানুষ। তারউপর আবার নতুন নতুন কলেজে ভর্তি হয়েছে। গল্পতো ওরাই করবে। এসব ভেবে গাড়ির যাত্রীরাও চুপ থাকে। কলেজ আঙ্গিণায় প্রবেশ করার পর থেকেই মিশু শিক্ষক-কর্মচারীদের দেখলেই সালাম দিয়ে তার নাম, বিষয়,পদবী এসব মনে করার চেষ্টা করে। অন্য ছাত্রীরাও তাই। কোন কোন বান্ধবী আবার গায়ে পরে স্যার- ম্যাডামদের সঙ্গে কথা বলতে চায়, টেলিফোন নম্বর নেয়। একটু এক্সটা খাতির জমানো আর কি। কিন্তু মিশু তাদের দলে নয়। কারণ আকাশের ধ্রুব তারার আলাদা করে পরিচয় দেবার প্রয়োজন নেই। ক্লাশ শুরু হবার প্রথম সপ্তাহ থেকেই মিশু আকাশের ধ্রুব তারার মত জ্যোতি বিলাতে থাকে। তাই স্যার-ম্যাডামরাই তাকে আবিস্কার করে ফেলে। একজন ভাল ছাত্রীর সব গুণই আছে মিশু’র মধ্যে। বরং দু’একটি ক্ষেত্রে একটু বেশীই আছে। যেসব গুণের জন্য স্যার-ম্যাডাম-বান্ধবী- অশিক্ষক কর্মচারীদের কাছে অল্প কয়দিনের মধ্যেই প্রিয় ছাত্রী হয়ে উঠে মিশু। আর ক্লাশের প্রথম দিনই মিশুর প্রিয় স্যারের খাতায় নাম উঠে ইংরেজী স্যারের। শুধু ক্লাশ না, ইংরেজী স্যারের চাল চলন, কথা বলার ধরণ, বাচনভঙ্গি, সামাজিকতা, দায়িত্ব ও ব্যক্তিত্ববোধ সবকিছু অনুকরণ করার চেস্টা করতে থাকে মিশু। তার শুধু খারাপ লাগে যখন অন্য দু’একজন স্যার বা ম্যাডাম ক্লাশে গিয়ে আকার ইঙ্গিতে ইংরেজী স্যারের নামে দুর্নাম করে তখন। আবার কোন কোন স্যারতো সরাসরি দুর্নাম করে। তারা কেন যে বুঝে না কলেজ পড়া ছাত্রীরাও অনেক কিছু বুঝে। তাছাড়া সব স্যার-ম্যাডামেরই তো ক্লাশে দু’একজন করে ভক্তছাত্রী থাকে। তারা কি এটাও জানে না? মিশুর মনে চাপা একটা ক্ষোপও কাজ করে। সেই ক্ষোপ থেকেই একদিন কয়েকজন বান্ধবীকে মিলে ক্লাশরুম থেকে বের হবার সময় স্যারকে বলেও দিয়েছে। কিন্তু স্যার সে কথা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেছে- এসব তোমাদের ভাবনার বিষয় না। এটাকে ইংরেজীতে ‘প্রফেশনাল জেলাস’ বলে। বড় হলে সব বুঝবে। কিন্তু স্যারের উত্তর মিশুর পছন্দ হয় না। তাই সে আরও কিছু বলতে চাইলেও স্যারই তাকে থামিয়ে দেয়। মিশু মনে মনে ভাবতে থাকে ‘ প্রফেশনাল জেলাস’ না বুঝলেও আমরা অনেক কিছু বুঝি। মিশুর এক বান্ধবীতো স্যার একটু আঁড়াল হতে বলেই ফেলে -‘ স্যার সাহিত্য সংস্কৃতিমনা মানুষ। তাই হয়তো একটু বেশী উদার।’

না, মিশুর প্রতিভা খুব বেশী দিন চাপা থাকে না। মাটি ভেদ করে যেমন বীজের অঙ্কুরোদ্গম হয় ঠিক সেই ভাবেই যেন মিশুর সব প্রতিভা লাউয়ের ডোগার মত বিকাশ ঘটতে থাকে। আসলে প্রতিভা জিনিসটাই এমন। ছাই চাপা আগুনের মত। একসময় বের হয়ে এসে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়। শুধু লেখাপড়া না, ক্যুইজ- বিতর্ক থেকে শুরু করে নাচ- গান। সব কিছুতেই মিশু অনন্যা। ইংরেজী স্যারতো তাকে দিয়ে কলেজের একটি অনুষ্ঠানও উপস্থাপনা করিয়েছে। নিজের হাতে উপস্থাপনার স্কিপ্ট লিখে দিয়ে উচ্চারনসহ শিখিয়েছে তাকে। মিশুর কেন যেন মনে হয়েছে ইংরেজী স্যার বাংলা নিয়ে পড়লে হয়তো আরও অনেক বেশী ভাল করতেন। তখনো মিশু লক্ষ্য করেছে। কী পরিমান দায়িত্ব নিয়ে স্যার সব কিছু সামলান। একেবারে রিহার্সেল থেকে শুরু করে অনুষ্ঠান শেষে মাইক বিদায় পর্যন্ত। কে কী বললো স্যার কখনো সেটাকে পাত্তা দেয় না। একদিন কথা প্রসঙ্গে স্যার বলেছিলেন- ‘কাজের মানুষের কাজই হচ্ছে কাজ করা। আর যারা কাজ করে না, তাদের কাজ হলো বসে বসে সমালোচনা করা। সমালোচনা ব্যর্থ মানুষদের খুব ভাল একটা অস্ত্র। আর সমালোচকদের সামনে খুশী করার জন্য কিছু মানুষ হ্যাঁ, হ্যাঁ করলেও আসলে তাদের কেউ পছন্দ করে না। তাছাড়া সমালোচকরা খুব বেশী দূর এগুতেও পারে না। তাই বিচার বুদ্ধি বিবেক দিয়ে কাজ করে যাবে। কাজের মূল্যায়ন করবে সময়। সময় কখনো কারও সাথে বেঈমানি করে না।’ সত্যিই স্যারের পরামর্শগুলি জীবন চলার পথে অনেক মূল্যবান। স্যার ক্লাশের ফাঁকে ফাঁকে এ জাতীয় কথা প্রায়ই বলেন। এই যে সেদিনও বললেন- ‘ পরীক্ষায় দু’চার নম্বর বেশী পাওয়ার চেয়ে নৈতিক শিক্ষাটা অনেক বড়। মানুষকে মূল্যায়ন করবে। সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে শিখবে। মানুষ সাময়িকভাবে তোমাকে নিয়ে বিদ্রুপ করতে পারে, কিন্তু মনে মনে সে তোমার নীতি আর আদর্শের কাছে পরাজয় বরণ করবে। হয়তো সে কোনদিনও সেটাকে স্বীকার করবে না।’ ক্লাশের এই কথাগুলি শুধু মিশু না, মিশুর মত বেশীরভাগ ছাত্রীর মনেই অমোচনীয় কালির মত দাগ লেগে আছে। তাইতো স্যারের প্রতি সব ছাত্রীদের এত বেশি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা। ইংরেজী স্যার ক্লাশে ঢুকার সাথে সাথে ছাত্রীরা একেবারে নিরব হয়ে যায়। তবে ভয়ও পায় অনেকে। কারণ স্যারতো শুধু ভালোইবাসেন না, শাসনও করেন। প্রথম দিকের ক্লাশেই একদিন পপি নামের এক ছাত্রীকে ক্লাশ থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তারপর থেকেই তো-

কলেজের অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় মিশু সকল বিষয়েই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে তিন গ্রুপের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করলো। কলেজের পাশাপাশি উৎসাহ দেবার জন্য ইংরেজী স্যারও আলাদা করে মিশুকে নিজের লেখা দুইটি বই উপহার দিয়েছেন। শুধু তাকে না, তিনটি বিভাগে যারা প্লেস করেছে সবাইকে দিয়েছেন। বইয়ের প্রথম পাতায় স্যার নিজের হাতে লিখে দিয়েছেন- ‘প্রত্যাশা আর প্রাপ্তিতে পূর্ণ হোক তোমার অনাগত ভবিষ্যত। শুভেচ্ছাসহ—’ স্যারের নাম,স্বাক্ষর আর তারিখ। স্যারের দেয়া বইগুলি মিশু শুধু নিজেই পড়েনি, বান্ধবীদেরও পড়তে দিয়েছে। আবার ফেরত নিয়ে নিজের কাছে যত্ন করে রেখে দিয়েছে। মিশু জানে, কখনো কখনো ছোট ছোট দু’একটি উপহার মানুষের জীবনে অনেক মূল্যবান হয়ে উঠে। বহন করে অনেক স্মৃতি, অনেক ভালোবাসা। কখনো কখনো জীবনে এনে দেয় অনেক বড় পরিবর্তন। তাই স্যারের দেয়া এই আশীর্বাদ মিশু কিছুতেই হাতছাড়া করতে চায় না।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা আর গ্রীস্মের ছুটি মিলিয়ে প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর কলেজে ক্লাশ শুরু হয়। সামনেই বার্ষিক পরীক্ষা। যদিও ছাত্রীরা এটাকে ‘ইয়ার চেঞ্জ’ পরীক্ষা বলতেই বেশী পছন্দ করে। অধিকাংশ ছাত্রী এবং স্যাররাতো বটেই ক্লাশে মিশুর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাথীও মেনে নিয়েছে তার লড়াইটা দ্বিতীয় স্থান ধরে রাখার। কিন্তু না। বন্ধের পরে কলেজ খোলার পর থেকে মিশু ক্লাশ করছে না। দু’একদিন যেতেই বিষয়টি চোখে পরলো সবার। সাথীই একদিন স্যারদের জানালো মিশু আর পড়বে না। সে তার বড় বোনের বাড়ি গাজীপুর চলে গেছে। প্রথম প্রথম দু’চারদিন মিশুর এই চলে যাওয়ার বিষয়টি স্যার-ম্যাডামদের মধ্যে আলোচনা হলেও সেটা খুব বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। বর্তমান সমাজে এমন ঘটনাতো কতই ঘটছে। হবে হয়তো কোন ব্যক্তিগত অথবা পারিবারিক সমস্যা। যে কারণে মিশুর পরিবার তাকে আর গ্রামে রাখতে সাহস পাননি। আজকালতো ভাল অনেক মেয়েই গ্রামে নিরাপদ না। তাই হয়তো কিছুদিন বড় বোনের বাড়িতে রেখে একটা ছেলে-টেলে দেখে বিয়ে দেবে তাকে। এমন ঘটনা এই কলেজেতো আগেও ঘটেছে। তাই একমাত্র ইংরেজী স্যার ছাড়া এই বিষযটি নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যাথা নেই। ইংরেজী স্যার একদিন সাথীকে ডেকে জানতেও চেয়েছিল। কিন্তু সাথী কিছু একটা লুকিয়ে যাচ্ছে বুঝতে পেরে স্যার আর কথা বাড়ায়নি। এই বয়সে মেয়েদের কত সমস্যাইতো হয়। হয়তো কাউকে ভালোবাসতো। মা-বাবা বুঝতে পেরে এলাকা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। অথবা হতে পারে কোন ছেলের হাত ধরে পালিয়ে গেছে। ঘটনা চাপা দেবার জন্য পরিবার থেকে বোনের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবার কথা বলছে। সাথী হয়তো সবই জানে। তাই স্যারের কাছে লুকাতে চায়। এরকম ঘটনাতো সমাজে প্রতিনিয়তই ঘটছে। তাই স্যারও আর বিষয়টা নিয়ে বেশি ঘাটতে চায় না। তবে তার মিশুর জন্য মায়া হয়। এত ভাল একটা মেয়ে শেষে যদি-

একদিন বিকেলে কলেজ ছুটির পর ইংরেজী স্যার প্রাইভেট পড়াচ্ছিল। তখন সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস থেকে ফোনে জানালো যে তার চিঠি এসেছে। কলেজ থেকে ফেরার পথে নিয়ে যাবে বললেও স্যারের আর মনে নেই সে কথা। কত চিঠিইতো আসে। হবে হয়তো পত্রিকা অফিস অথবা কোন সংগঠনের চিঠি। জরুরি কিছু হলে অবশ্যই ফোন করতো। তাই তেমন একটা গুরুত্বও দেননি স্যার। কিন্তু কোন কোন চিঠি যে ফোনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে,দিতে পারে নাজানা অনেক প্রশ্নের উত্তর সেটা স্যার বুঝতে পেরেছিলেন পরের দিন দুপুরে চিঠিটা পড়ার পর। তৃতীয় ঘন্টার কাশ শেষ করে শিক্ষক মিলনায়তনে বসেই চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করেন স্যার। সাদা কাগজে পরিচ্ছন ও পরিচিত হাতের লেখা-
শ্রদ্ধেয় স্যার,
সালাম নেবেন। প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, কিছু না বলে এভাবে চলে আসার জন্য। দীর্ঘদিনের ছুটির মধ্যে আমি কলেজ থেকে টি সি নিয়ে চলে এসেছি। এখানে একটি কলেজে ভর্তি হয়েছি। কারণটা অন্য কাউকে বুঝতে দেইনি। শুধু বলেছি কলেজ আমার ভাল লাগে না। আসল কারণটা হচ্ছে,আমি নিজের অজান্তেই আপনার প্রতি অনেক বেশী দুর্বল হয়ে পরেছিলাম। দু’ একদিন আপনাকে বলার চেষ্টাও করেছি। যখনই বলতে গিয়েছি আপনার প্রথম ক্লাশের কথাগুলি মনে পরেছে- ‘ আমি তোমাদের শিক্ষক, তোমাদের বড় ভাইয়ের মত , তোমাদের অভিবাবক। আমি তোমাদের বন্ধু হতে চাই। শিক্ষক হিসেবে যতটা ভালোবাসা যায় আমি তোমাদেরকে ততটাই ভালবাসবো। তোমরাও আমাকে শ্রদ্ধা করবে আসা রাখি। বয়স আমাদের যাই হোক, সম্পর্কটা যেন ছাত্রী-শিক্ষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। মনে রাখবে এই সম্পর্কটি অত্যন্ত পবিত্র।’ তাই বলতে পারিনি। আমার এই দুর্বলতার কথা একমাত্র সাথী জানতো। মেয়েরা এই জাতীয় কথা বেশী দিন চেপে রাখতে পারে না। জানাজানি হয়ে গেলে আপনাকে অনেক বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হতে হতো। আমি যেটা চাইনি। তাছাড়া আমি ঠিক মত পড়া-লেখায় মন বসাতে পারছিলাম না। সব সময়ই শুধু আপনার কথা ভাবতাম। আমার পড়া-লেখায়ও অনেক ক্ষতি হচ্ছিল। এটা আপনারা কোন স্যার ম্যাডামই মেনে নিতেন না। স্যার, আপনি আমার কাছে দেবতাতুল্য মানুষ। আমি চাই আজীবন আপনি দেবতার আসনেই থাকুন। তাই আমি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। আমাকে দোয়া করবেন স্যার। আমি যেন আপনার আদর্শে বড় হয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে পারি। আমি যেন আপনার প্রদর্শিত পথে হাঁটতে পারি।কলেজের সব স্যার-ম্যাডমকে আমার সালাম জানাবেন। পারলে আমাকে আপনি ক্ষমা করে দেবেন। ভালো থাকবেন।
ইতি
আপনাদের স্নেহের-
মিশু।
চিঠিটা পড়া শেষ না হতেই স্যারের চোখের কোণে জল চলে আসে। এ জল আনন্দের না ভালোবাসার, প্রাপ্তির না গর্বের -সেটা বুঝে উঠার আগেই স্যার উঠে গিয়ে ওয়াশ রুম থেকে মুখ ধুয়ে আসে। ওয়াস রুম থেকে বের হবার সময় মিশুর চিঠির শেষ অংশে বিশেষ দ্রষ্টব্যের জায়গায় লেখা শেষ অনুরোধের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে চিঠিটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে জানালা দিয়ে ফেলে দিয়ে এসে দাঁড়ায় দোতলার বাড়ান্দায়। টিফিন পিরিওডে ছাত্রীরা তখন মাঠের মধ্যে ছোটাছুটি করছে। স্যার অপলোক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে প্রিয় ছাত্রীদের দিকে। কী চপলতা! কী দূরন্তপনা! আর স্যার সেই প্রাণোচ্ছল মুখগুলির মাঝে খুঁজে পায় মিশুর প্রতিচ্ছবি।