বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতে করোনার সর্বব্যাপী প্রভাব পড়েছে, যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকারসহ দেশের সকল জনগোষ্ঠী। যতই দিন যাচ্ছে, ততই নতুন নতুন দৃশ্যপট উন্মোচিত হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জীবন-জীবিকা এবং শিক্ষা খাত শীর্ষে অবস্থান করছে।
অর্থনীতি, স্বাস্থ্য, জীবন-জীবিকার ক্ষয়ক্ষতির বেশির ভাগ দিক ইতোমধ্যে উন্মোচিত হওয়ার ফলে সেগুলো অনুকূলে আনতে সরকারি-বেসরকারি নানা পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু করোনাকালে শিক্ষায় যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তা এখন পর্যন্ত তেমনভাবে দৃশ্যমান হয়নি। সম্ভবত আমরা অনুধাবনও করতে পারছি না।
অর্থনীতির ওপর সৃষ্ট ক্ষতির প্রভাব টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা যায়; যথাযথ পরিকল্পনা ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে তা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে যে ক্ষতি ক্রমাগত বাড়ছে, তা কীভাবে পূরণ সম্ভব হবে সেটি বিশাল উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। এ ক্ষতির পুরো প্রভাব টের পেতে দীর্ঘদিন লেগে যেতে পারে।
করোনাভাইরাসের কারণে শিক্ষার ওপর প্রভাব নিয়ে আগস্টে প্রকাশিত জাতিসংঘ মহাসচিবের পলিসি ব্রিফের তথ্য দিয়ে ইউনেসকো জানিয়েছে, করোনার কারণে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৯৯ লাখ ৩৬ হাজার ৮৪৩ শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত। এর মধ্যে মেয়ে ২ কোটি ২১ লাখ ৫ হাজার ৫৮৯ এবং ছেলে ১ কোটি ৯৭ লাখ ২১ হাজার ২৫৪ জন। যার মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৫ হাজার ৮২৫ জন, প্রাথমিকে ৮৭ লাখ ৯৯ হাজার ৩৩ জন, মাধ্যমিকে ৮৩ লাখ ৫৩ হাজার ৮৪৬ জন এবং ১২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮৫ জন উচ্চশিক্ষায়। [সূত্র : প্রথম আলো, ১১ আগস্ট, ২০২০]

১৬ মাস ধরে বন্ধ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
করোনার ছোবলে লণ্ড-ভণ্ড হয়ে গেছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। টানা ১৬ মাস ধরে বন্ধ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চরম ক্ষতির শিকার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের প্রায় সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থী ও ৫০ লাখ শিক্ষক। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিও কম নয়।
গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সরকার সংসদ টেলিভিশন, বেতার ও অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তবে সব শিক্ষার্থী এ সুবিধা পাচ্ছেন না। করোনায় শিক্ষা খাতের ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন জরিপেও। গণসাক্ষরতা অভিযানের সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ও দূরশিক্ষণ বা বেতার, টেলিভিশন, অনলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেওয়া পাঠদানের আওতায় এসেছে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি ৯২ শতাংশ আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী টেলিভিশনের পাঠদানের আওতায় এসেছে।

মাধ্যমিক শিক্ষায় ক্ষতি
করোনায় দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষতি ভয়াবহ। গত বছর কোনো বার্ষিক পরীক্ষা ছাড়াই উপরের শ্রেণিতে উঠেছে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা। ফলে গত বছরের ক্লাসের দক্ষতা ঘাটতি তাদের রয়েই গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন বছরে নতুন ক্লাসের পড়াশোনা। অথচ স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ নেই। সামর্থ্যবান অভিভাবকরা গৃহশিক্ষক দিয়ে পড়াচ্ছেন। তবে শিক্ষকের কাছে দিনে এক ঘণ্টা পড়ে বিদ্যালয়ের ৬-৭ ঘণ্টা ঘাটতি পূরণ হওয়ার নয়। অন্যদিকে করোনায় নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র অসংখ্য অভিভাবকের আয়ে ধস নেমেছে। তাই তারা সন্তানের জন্য গৃহশিক্ষক রাখতে পারছেন না।
গত বছর এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও এক দিনও ক্লাসে বসতে পারেনি। করোনায় গত বছরের এইচএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। ২০২১ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা কবে নেওয়া সম্ভব হবে কেউ জানে না। এদের মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা নবম শ্রেণিতে সরাসরি ক্লাস করেছে, দশম শ্রেণিতে ক্লাস পেয়েছে মাত্র আড়াই মাস। তাদের প্রিটেস্ট ও টেস্ট কোনো পরীক্ষাই হয়নি। এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের দ্বিতীয় বর্ষে দেওয়া হয়েছিল অটোপাস।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রথম বর্ষে কোনো শিক্ষার্থী নেই
দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন প্রথম বর্ষে (নিউ ফার্স্ট ইয়ার) কোনো শিক্ষার্থী নেই। কারণ, ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারেনি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। গত বছর অটোপাসের মাধ্যমে যারা এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন, সেসব শিক্ষার্থীরই প্রথমবর্ষে ভর্তি হওয়ার কথা। কিন্তু করোনার কারণে এখনও ভর্তি পরীক্ষা নিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

উচ্চশিক্ষায় বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীরা
উচ্চশিক্ষা স্তরে করোনার থাবায় বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীরা। সেশনজট জেঁকে বসেছে। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, আছে চাকরির চিন্তা। করোনা সংক্রমণ কমে আসায় ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষ সেমিস্টার ও মাস্টার্সের বেশ কয়েকটি পরীক্ষা হয়। কিন্তু অন্য সেমিস্টারগুলোতে কিছু ক্লাস হলেও পরীক্ষা হয়নি। বন্ধ রয়েছে উচ্চতর গবেষণাও।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়
২৯ লাখ ছাত্রছাত্রী নিয়ে পরিচালিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরও সঙ্গীন। সারাদেশের দুই হাজার ২৬৮টি কলেজের উচ্চশিক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত এ প্রতিষ্ঠানেও লেগেছে পরীক্ষাজট। ২০২০ সালের কোনো পরীক্ষা এখনও শুরুই হয়নি। ২০১৯ সালের পরীক্ষাগুলো শেষ হলেও মৌখিক পরীক্ষা বাকি রয়েছে।

সমস্যাক্রান্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
দেশে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১০৫টি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলিয়ে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়মিত বেতন-ভাতা পরিশোধ করলেও সমস্যায় আছে ছোট ও মাঝারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।

দিশাহারা বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধে সরকারি ও এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের তেমন কোনো সমস্যায় পড়তে না হলেও দিশাহারা হয়ে পড়েছে ১০ লাখ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী। বেতনের সঙ্গে প্রাইভেট টিউশনিও বন্ধ হওয়ায় সঙ্কট আরও বেড়েছে।

বিপদে নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা
সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছে নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা। দেশে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার নন-এমপিও স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় ১ লাখ ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছে। যাদের মধ্যে সম্প্রতি ২ হাজার ৬১৫ প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হওয়ায় ৩০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর বেতনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে ৮০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী।

মহাবিপদে কিন্ডারগার্টেন স্কুল
দেশে প্রায় ৫০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ৬ লাখ শিক্ষক কর্মরত। এসব প্রতিষ্ঠান ভাড়াবাড়িতে চলে। আর শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর এসব প্রতিষ্ঠান শতভাগ নির্ভরশীল। টিউশন ফির টাকায়ই বাড়ি ভাড়া, নানা ধরনের বিল ও শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের সন্তানরা পড়ালেখা করায় তারা স্কুল বন্ধের সময়ে কেউ বেতন দিতে পারছে না, আবার কেউ দিতেও চাচ্ছে না। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে এসব স্কুলের শিক্ষকরা।

সমস্যায় আছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা
আন্তর্জাতিকভাবে পরিচালিত হয় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পড়ালেখা এবং সারা বিশ্বে একই দিনে অনুষ্ঠিত হয় পরীক্ষা। করোনা প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতিতে অ্যাডেক্সেল ও ক্যামব্রিজের অধীনে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেলের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে রয়েছে জটিলতা। জুনে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর বার্ষিক পরীক্ষাও প্রয়োজনে অনলাইনেই গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে একাধিক স্কুল কর্তৃপক।
প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষকরা মাত্রারিক্ত ভাবে বেতন নির্ভর। তার কারণ বেশিরভাগ স্কুল থেকে তারা বেতন ছাড়া প্রভিডেন্ট ফান্ড বা অন্যকোনো ভাতা পায় না। সে কারণে অনেক শিক্ষক প্রাইভেট পড়িয়ে ঘাটতি পুষিয়ে নিতেন। এখন শিক্ষকদের বেতন আর প্রাইভেট টিউশন থেকে আসা আয় দু’টোই একসাথে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা বেশ বিপদের মধ্যে পড়েছেন।

আলিয়া মাদরাসা
করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে বাংলাদেশের মাদরাসা শিক্ষাকার্যক্রম চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আলিয়া মাদরাসা রয়েছে ১৯ হাজার ৯৮৫টি, এর মধ্যে তিনটি সরকারি এবং বাকিগুলো বেসরকারি। ২০১৫ সালের বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, এসব মাদরাসায় দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল পর্যায়ে মোট ২৪ লাখ ৯ হাজার ৩৭৩ জন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করে। ডয়চে ভেলের তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে ইবতেদায়ি মাদরাসার সংখ্যা ৬,৮৮২টি, দাখিল মাদরাসা ৯,২২১টি, আলিম মাদরাসা ২,৬৮৮টি, ফাজিল মাদরাসা ১,৩০০টি ও কামিল মাদরাসা ১৯৪টি। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করেই আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে।
স্কুলের ন্যায় আলিয়া মাদরাসায় অনলাইনে ও দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে বিকল্প পাঠদান শুরু করা হলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব শিক্ষার্থীর কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না। মাদরাসা শিক্ষকদের মাধ্যমে অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে সারাদেশের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার মধ্যে নিয়ে আসার নানা রকম উদ্যোগ থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের বাইরে থেকে যাচ্ছে। করোনার মধ্যে করুণ অবস্থায় জীবনযাপন করছে ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকরা। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, মাত্র ১ হাজার ৫১৯টি মাদরাসার প্রধান শিক্ষকদের ২৫০০ টাকা ও সহকারী শিক্ষকদের ২৩০০ টাকা ভাতা দেয় সরকার। যা দিয়ে জীবন নির্বাহ করা তাদের জন্য কষ্টকর।

কওমি মাদরাসা
১৮৬৬ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশে দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই উপমহাদেশে কওমি মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা। ২০১৫ সালের ব্যানবেইস তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদরাসা রয়েছে। এসব মাদরাসায় ছাত্রসংখ্যা ১৪ লাখ। কিন্তু বাস্তবে এটা আরো বেশি। নূরানি মাদরাসার সংখ্যা এই হিসাবের বাইরে। ছয়টি শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে এসব মাদরাসা পরিচালিত হয়ে আসছে। ছয়টি বোর্ডকে সমন্বিত করে উচ্চতর একটি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ রয়েছে, যা ‘হাইয়াতুল উলিয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়াহ’ নামে পরিচিত।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি সঙ্কটে কওমি মাদরাসাগুলো। কওমি মাদরাসাগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা হয়নি। সাধারণত শাবান মাসে পরীক্ষা পরিচালিত হয়। হিফজ বিভাগের লাখো শিক্ষার্থী মুখস্থ করা অংশ ভুলে যাচ্ছে। ৪-৫ বছরের অর্জন খোয়াতে বসেছে এসব শিক্ষার্থীরা। সরকারি/এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ সরকারি বেতন পাচ্ছেন কিন্তু কওমি মাদরাসার লাখ লাখ শিক্ষক কোনোরকম বেতন-ভাতা না পেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় আর্থিক সঙ্কটে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে কওমি মাদরাসা।

প্রাইভেট মাদরাসা
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরে আরেক ধরনের প্রাইভেট মাদরাসা আছে যেগুলো প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের। এসব মাদরাসার সংখ্যাও কম নয়। মাদানি বা অন্য বিশেষ নেসাবের অধীনে এগুলো পরিচালিত হয়ে থাকে। কওমি ও আলিয়া পাঠ্যক্রমের সমন্বয়ে অনেকে নিজস্ব সিলেবাস তৈরি করে পাঠদান করে থাকেন। এ রকম বেশির ভাগ মাদরাসা ভাড়া করা ভবনে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। যেসব প্রাইভেট বা বেসরকারি মাদরাসা, এতিমখানা ও হেফজখানা ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হয়ে আসছে তাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়।

কারিগরি প্রতিষ্ঠান
বর্তমানে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড অনুমোদিত ৩৩টি শিক্ষাক্রম দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ৮,৭৪৩টি এবং শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ১০,৪৫২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত হচ্ছে। এর মধ্যেবেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই ৯,৭৫৯টি, যেখানে সরকারি সংখ্যা মাত্র ৬৯৩। এসব শিক্ষাক্রমে ২০১৮-১৯ সেশন রেজিস্ট্রেশনকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭ লক্ষ ২১ হাজার ৭৯ জন। বেসরকারি কারিগরি প্রতিষ্ঠানসমূহ বেতন-ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি কোন অনুদান বা আর্থিক সহযোগিতা পায় না এবং কখনো পাওয়ার জন্য আবেদনও করেনি। কিন্তু বর্তমানে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করার পর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত ও অনুমোদনপ্রাপ্ত বেসরকারি কারিগরি সব প্রতিষ্ঠানই অর্থনৈতিকভাবে বড় সংকটের পড়ে।

শিক্ষায় বৈষম্য প্রকট
করোনাকালে শহরের স্কুলগুলোতে অনলাইনে ক্লাস হচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে গ্রামের স্কুল। আবার শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারযোগ্য মুঠোফোন বা অন্য ডিভাইস এবং ইন্টারনেট নেওয়ার সামর্থ্য নেই, তারা ক্লাস করতে পারছে না। গত মার্চে মোবাইল অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএম এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেট সেবার আওতায় থাকা দুই তৃতীয়াংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন না।
বেসরকারি-সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও ব্যবধান আরও বেড়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে পরীক্ষা-ক্লাস হচ্ছে। প্রতি সেমিস্টারে শিক্ষার্থীও ভর্তি করা হচ্ছে। কিন্তু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৃত অর্থে শিক্ষা কার্যক্রম অনেকটা স্থবির হয়ে আছে।

বিক্রি ও বন্ধ হতে যাচ্ছে অনেক স্কুল
রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন স্থানের অনেক স্কুল মহামারির কারণে কঠিন সময় পার করছে। এসব স্কুলের বেশিরভাগ শিক্ষক তাদের গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছে এবং আর্থিক সমস্যায় দিন পার করছে। এ খাতে জড়িতরা বলছে, গত কয়েক মাসে শতাধিক স্কুল বিক্রি করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

করোনার প্রভাবে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার শঙ্কা
শিক্ষার্থী ঝরেপড়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি দৈন্যতা। প্রতি বছরই আমাদের দেশে বিভিন্ন স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। গবেষণা রিপোর্ট বলছে, প্রতি বছর বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন স্তরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ভাগ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্সের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে ১৯ ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার বাইরে চলে গেছে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত এই জরিপ পরিচালিত হয়।
গবেষণায় শহরের শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষণ ঘাটতির ঝুঁকি বেশি বলে পরিলক্ষিত হয়েছে। মেয়েদের ২৬ ও ছেলে শিক্ষার্থীদের ৩০ শতাংশ এ ঝুঁকিতে রয়েছে। দরিদ্র শ্রেণির মানুষের মধ্যে যারা অতিদরিদ্র, সেসব পরিবারের মাধ্যমিক স্কুলগামী ৩৩ শতাংশ ছেলে শিক্ষার্থীর করোনাসৃষ্ট অর্থনৈতিক ধাক্কায় স্কুল ছেড়ে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ছুটি বাড়ছেই, নেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা
করোনা মহামারির শুরুর দিকে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে মন্ত্রণালয় নিয়মিত বিরতিতে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের মেয়াদ বাড়ানোর খবর জানাচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বিকল্প কী, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাঁরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার অপেক্ষায়, তাঁরা আশাহত হচ্ছেন। জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানায়, বিশ্বে বেশি দিন স্কুল বন্ধ থাকা ১৪টি দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ।

চাপ বাড়ছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার
দীর্ঘ ১৬ মাস নভেল করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারির কবলে দেশ। এ মহামারিরোধে দেশের সব পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে গত বছরের মার্চ মাস থেকে। চলতি বছরের প্রথমদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তা থাকলেও কোভিডের দ্বিতীয় ডেউয়ে সেই প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে সরকার।
বর্তমানে কোভিড সংক্রমণ কিছুটা কমলেও ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের (ধরন) ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে একে একে চালু করে দেওয়া হয়েছে বাস, ট্রেন ও লঞ্চ। এরই আগেই খুলে দেওয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে অভিভাবক, ছাত্র-শিক্ষকসহ সব মহল থেকে চাপ বাড়ছে।

করণীয়
করোনায় বা করোনাপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মানসম্পন্ন করতে হলে নতুন পরিকল্পনা করে একে ঢেলে সাজাতে হবে। অন্য দেশের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নিজস্ব প্রয়োজন ও বাস্তবতার নিরিখে উপযুক্ত পরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করাই উত্তম বলে মনে করছেন অনেকে। যদি একসঙ্গে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা না যায়, তাহলে যেখানে যখন পরিস্থিতি উন্নতি হবে, সেখানে আগে খুলে দেওয়া যেতে পারে। করোনা দীর্ঘ হলে স্কুল-কলেজ ও মাদরাসায় সরকার চাইলে এমন নিয়ম করতে পারে, প্রতি ক্লাসে প্রতিদিন অর্ধেক শিক্ষার্থী ক্লাস করবে। জোড় রোল একদিন বিজোড় রোল একদিন ক্লাস করবে। নিয়ম মানার ব্যাপারে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে। পিছিয়ে পড়াদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা দরকার। প্রয়োজনে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে দ্রুত ১৮ বছরের বেশি সবার টিকাকরণ নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। শিক্ষাঙ্গনের দুর্নীতিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে মেধার মূল্যায়ন না করে আর্থিক লেনদেন ধরা পড়লে কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা দুর্নীতি করলে তাদেরকে কেবল পদ থেকে সরিয়ে না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ছাত্র ও শিক্ষকদের মধ্যে রাজনৈতিক নয় একাডেমিক চর্চার গতি বেগবান করতে হবে। যোগ্যতাসম্পন্ন মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ করে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে এবং কমিশনে রাজনৈতিক নিয়োগ বন্ধ করে শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব নিয়োগ দিতে হবে। এভাবে সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, শিক্ষক, ছাত্র এবং অভিভাবক- সবাই সতর্ক হয়ে নিজ নিজ অবস্থানে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করলে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও মানসম্পন্ন হয়ে উঠবে। বর্তমানের বিপর্যস্ত করোনাকবলিত শিক্ষা ব্যবস্থা এ ভাইরাসের তিরোধানের পর আবারও ঘুরে দাঁড়াবে ইনশাআল্লাহ।