বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিপ্রতিভার মধ্যগগনে বাংলা-কবিতার জগতে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের আত্মপ্রকাশ- সবিতা কাব্য দিয়ে ১৯০০ খ্রীস্টাব্দে । যদিও- বেণু ও বীণা’র কয়েকটিকবিতা এর আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। কবি সত্যেন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৮২ খ্রীস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারী, মাতুলালয়ে। তাঁর পিতা রজনীনাথ দত্ত ও মাতা মহামায়া দেবী। পিতামহ প্রখ্যাত গদ্যলেখক অক্ষয় কুমার দত্ত এবং মাতামহ রামদাস মিত্র। কবি সত্যেন্দ্রনাথ কলকাতার সেন্ট্রাল কলেজিয়েট স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে। পরবর্তী কালে বি. এ পড়ার সময় কনকলতা দেবীর সঙ্গে তিনি বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। তবে তিনি বিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি! মামা কালীচরণ মিত্রের ব্যবসায়ে কিছু দিনের জন্য যোগ দেন, তবে সেখান থেকে বেড়িয়ে নিজের জায়গায় তথা সাহিত্যের পথে প্রবেশ করেন ও সেই রাস্তায় চলতে থাকেন। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বেশিদিন পৃথিবীতে থাকতে পারেননি! ১৯২২ সালে মাত্র ৪০ বছর বয়সে তাঁর অকাল মৃত্যু ঘটে! তবে সল্পকালের কবিজীবন ও সাহিত্য সৃষ্টি যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের রচনার মধ্যে রয়েছে বহু কাব্য, নাটক, ছড়া, উপন্যাস ও নিবন্ধ। কাব্যগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সবিতা ১৯০০, সন্ধিক্ষণ ১৯০৫, বেণু ও বীণা ১৯০৬, তীর্থরেণু ১৯১০ এবং তাঁর ফুলের ফসল ১৯১১ ও তুলির লিখন ১৯১৪ প্রভৃতি। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত স্বভাবকবি হলেও যাঁদের সাহচর্য সহযোগিতা তাঁকে কবি করে তুলেছিল তাঁরা হলেন, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, রবীন্দ্রনাথ এবং অমিতকুমার চক্রবর্তী, সতীশচন্দ্র রায়, সৌরীন্দ্র মোহন মুখার্জী, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিপ্রতিভা আলোচনা করলে অতি অবশ্যই ফুলের ফসল কাব্যগ্রন্থটির প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হয়। তাঁর সেই কাব্যগ্রন্থ ফুলের ফসল একটি বিশেষ কবিতা চম্পা। এই কবিতাটি পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের বাংলা সহায়ক পাঠগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাংলা সহায়ক পাঠ বইয়ের ভূমিকায় পর্ষদ সভাপতি লিখেছেন, বাংলা সহায়ক পাঠ এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টিমূলক ধারার সঙ্গে ছাত্রদের ও ছাত্রীদের পরিচয় করিয়ে তাদের মধ্যে আধুনিক সমাজচেতনা সঞ্চার এবং সৃষ্টিশীল রসবোধ ও কল্পনাশক্তির উজ্জীবন! মান্য বর সভাপতির বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলা যায়, চম্পা কবিতার অন্তর্ভুক্তির কারণ বর্তমান আর্থ সামাজিক পটভূমিকা। ফুলকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, দেবেন্দ্রনাথ সেন সহ বহু কবি প্রচুর কবিতা লিখেছেন। তাঁরা ফুলের সুন্দর, কোমল, মোহময় দিকটি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তবে সত্যেন্দ্রনাথের চম্পা-ই প্রথম বাংলা ভাষায় লেখা পুষ্পকেন্দ্রিক কবিতার মধ্যে প্রথম বিদ্রোহী কবিতা।

কবি সত্যেন্দ্রনাথের ফুলের ফসল কাব্যটি প্রকাশিত হয় ১৯১৯ খ্রীস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে। এ কাব্যের চম্পা একটি বিশেষ ও বহুল প্রচলিত কবিতা। কবির প্রকৃচেতনার একটি বিশেষ দিক ফুটে উঠেছে এই কবিতায়। প্রকৃতিকে এখানে নিছক সুকোমল দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করেননি এবং তার রুদ্ররূপকে আলোচ্য কবিতায় শিল্পরূপ দান করেছেন। বাংলা প্রকৃতিতে যে ছয় ঋতুর সমাগম, তারমধ্যে গ্রীষ্ম ঋতু নিষ্ঠুর, উত্তপ্ত ও নির্মম। গ্রীষ্ম ঋতু তার নিজ ক্ষমতার বলে সমগ্র জগৎকে দগ্ধ করে। গ্রীষ্ম ঋতুর এই নিষ্ঠুর ক্ষমতার কাছে বর্ষা, শরৎ ও বসন্তের ফুলেরা ফুটে ওঠার ক্ষমতা পায় না অথচ গ্রীষ্মের এই নির্মম দাহের মধ্যে চম্পা এক বিশেষ বিদ্রোহী পুষ্প, যা বর্তমানকালে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বিভিন্ন কুসংস্কার ও নির্যাতনের বিদ্রোহিনী নারীর প্রতিভূ। চম্পা নামটীর আপাত কোমলতা থাকলেও তার তেজস্বিতা, সৎ বুদ্ধিমতি নারীদের স্মরণ করে দেয়। সত্যেন্দ্রনাথের চম্পার মধ্যে আমরা এক আত্মসচেতন প্রতিবাদী বিদ্রোহিনী নারীকে দেখতে পাই। বসন্তের কোমলতা যখন পৃথিবী থেকে অন্তর্হিত হচ্ছে, গ্রীষ্ম এর পদাঘাতে পৃথিবী জর্জরিত, ঠিক সেই সময়ে স্বমহিমায় তার আবির্ভাব, অর্থাৎ চম্পার! চারপাশের অনুকূল আবহাওয়া ও সরসতা, বৃষ্টির স্নিগ্ধতা সে পায় না, তথাপি অফুরন্ত প্রাণশক্তি ও প্রশ্বাস নিয়ে গ্রীষ্মের কঠোর উত্তাপ, নিষ্ঠুরতাকে আপন অঙ্গে সৌরভে রূপান্তরিত করে। গ্রীষ্মের নিরস প্রভা নিজের মধ্যে নিয়ে চারিদিককে রঙিন করে তোলে। কবিতার প্রথম স্তবকে কবি চম্পাকে সাহসিকা অপ্সরার সঙ্গে তুলনা করেছেন। চম্পা যেন মর্তালোকের এক সাধারণ নারী, সে হয়ে ওঠে অসাধারণ বিদ্রোহিনী। এই তুলনা সর্বকালের সব সমাজের নির্যাতিতা এবং বিদ্রোহিনী নারীদের স্মরণ করে দেয়।
আমারে ফুটিতে হল বসন্তের অন্তিম নিশ্বাসে
বিষণ্ণ যখন বিশ্ব
নির্মম গ্রীষ্মের পদানত
রুদ্র তপস্যার বনে, আধ ত্রাসে আধেক
উল্লাসে,
একাকী আসিতে হল সাহসিকা অপ্সরার মতো !
চম্পা যখন পৃথিবীতে আবির্ভূত হয় গ্রীষ্মের খরতাপে তখন সমস্ত কিছুর প্রাণ ওষ্ঠাগত! বিমর্ষ পুস্পকুঞ্জে কালেভদ্রে শোনা যায় ক্লান্ত কোকিলের কণ্ঠস্বর। জন্ম লাভ করে চম্পার অনুভব পৃথিবী যেন তার সামনে শুধু কঠিনের বাতাবরণ তৈরী করে রেখেছে, যা বর্তমানে এবং প্রাচীন যুগেও নারীদের অবস্থা ছিল। তথাপি এই প্রকৃতির প্রতিকূলতা জয় করে (প্রত্যাশী) আশাবাদী নারীর মত, সংগ্রামী যোদ্ধার মত সম্মুখ সমরে চলে আসে। কবি লিখেছেন, তবু এনু বাহিরিয়া, বিশ্বাসের বৃন্তে বেপমান! চম্পার এই বিশ্বাস কবি সত্যেন্দ্রনাথের বিশ্বাস, চম্পার এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যেন সাধারণ সমাজে অত্যাচারিত নিপীড়িত নির্যাতিত প্রতিবাদী প্রতীক। অনুকূল পরিবেশ, সুস্থ স্বাভাবিক আর্থসামাজিক পরিবেশ প্রত্যেক নারী সুন্দর ভাবে জীবন যাপন করতে পারে। চম্পা কবিতায় নারীরূপী চম্পা ফুল প্রতিকূল পরিবেশে সুকঠিন এবং সংগ্রামের মধ্যেদিয়ে নিজের বেঁচে থাকার সংগ্রামে জয়ী হয়েছে। সমাজের যেমন সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে নারীরা এগিয়ে যায় বা যাচ্ছে, তেমনি ভাবে নারীরূপী চম্পা সূর্যের প্রদীপ্ত বিভূতিকে সে নিজের শরীরের লাবণ্যে রূপান্তরিত করেছেন। সহজ সরল আত্মবিশ্বাসের উপর সে বলতে পারেছে আমি চম্পা, সূর্যের সৌরভ। যেমন নারীরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সমাজের সুন্দরের জন্য নিজেকে তৈরী করে, নিজেকে উৎসর্গ করে। সারা বিশ্বে নারীরা যে ভাবে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত নিপীড়িত হচ্ছে প্রতি পদে পদে, তা ভাবতে বিস্ময় হতে হয়। জীবন যন্ত্রণা ও জীবিকা যন্ত্রণা নারীদেরকে এক কঠিন ও কঠোর জায়গায় দাঁড় করিয়ে চলেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা! বাংলার ছয় ঋতুর মধ্যে যেমন বর্ষা, শরৎ, বসন্ত ফুলের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ আমরা কি সেই পরিবেশ পৃথিবীতে তৈরী করতে পেরেছি নারীদের জন্য ]? সত্যেন্দ্রনাথ – চম্পা কবিতার মাধ্যমে সমগ্র পুরুষ সমাজকে জাগ্রত করতে চেয়েছেন যে, নারীরাও এই সমাজের মানুষ, তাঁদের স্বাধীনভাবে বাঁচাতে, স্বাধীনভাবে ভাবতে, স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া উচিত। পৃথিবীর সুন্দর সৃষ্টির মূলে রয়েছে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রয়াস। সত্যেন্দ্রনাথ এই কঠিন সত্য জানতেন বলেই চম্পা কবিতায় চম্পার জবানিতে সমাজকে সচেতন করে দিয়েছিলেন। সুন্দরের সৃষ্টির মূলে অর্ধেক নারী এবং অর্ধেক পুরুষ। তা না মানলে প্রতিদিন খবরের কাগজে যে সব নারী নির্যাতনের খবর দেখা যায়, তা আরও বৃদ্ধি পাবে! নারীরা যেমন নিজেকে উৎসর্গ করে বেশির ক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তথা মানব সমাজকে সুন্দর করে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তা চম্পা কবিতায় চম্পার মধ্যেদিয়ে তুলে ধরেছেন। এখানেই কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ও চম্পা কবিতা চিরস্মরণীয়!