শাদাদাড়িওয়ালা

আমাদের বংশের শাদাদাড়িওয়ালারা
নপুংসক সময়ের অস্তিত্বে বিলীন হয়েছেন

দাদাজী বলতেন, আমিও বিলীন হবো
শতাব্দীর আশ্চর্য পরিব্রাজক
রূহের পর রূহ পরিভ্রমণ করা এক মহীরুহ সংগ্রামী
কালের ইথারে ইথারে জমা করেছি মাটির প্রাসাদ
কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মত বিক্রি করেছি
পাঁজরের একেকটি স্মৃতি যেনো রুটির টুকরো

বংশানুক্রমে আবাদ করেছি বুকের জমিন
সেঁতসেঁতে মাটির বাসনে রোপন করেছি আগরের চারা
হয়েছে বৃক্ষ ছায়াদার মায়ামাখা ভালোবাসাময়
সবই আছে চৌচালা টিনের ঘরে
সুখ স্বাদ স্বপ্ন ও একটি সুখের পানসি
আর কি চাই বলো
যদি বিরহে পোড়েনা মন
যদি জগদ্দল পাথর চেপে বসে না বুকের উপর
যদি ঘুম ভাঙ্গে খাইরুম মিনান নৌম শোনে
যদি বিনয়াবনত হয় পাষাণ হৃদয়
শাদাদাড়িওয়ালাদের মতো
তাহলে রহমতের বারিশ বয়ে যাবে মৃত্তিকা ঘরে

মা’বুদ মেহেরবান
তাদের প্রতি করুণা দেখাও
তাদের খান্দান সফেদ রাখো শাদাদাড়ির মতো
কিংবা আবছা আলোময় ঘরে
জায়নামাজের হৃদয়ে ছড়ানো শাদা তসবিহদানার মতো
তাদের মুখমণ্ডল সৌম্যশান্ত করে রাখো।
…………………………………………..

ঝরাপাতা

অবরুদ্ধ সময়ের ভাজে
নকল মানুষের নির্মম যাতাকলে পিষ্ট হয়েছি বহুকাল
একবারও খবর নাও নি তুমি—

দুঃসময়ের প্রতিকুল স্রোতে
হিংসুক সমাজের তীর্যক বাক্যবাণে
বারবার ক্ষত হয়েছে হৃদয়
একবারও বলো নি আসছি তোমার পাশে—

ভুল মহাজনের কাছে আত্মসম্মান রেখেছি বন্ধক
জীবনের তেজারতে গুনেছি লোকসান
আসো নি তো সমব্যথি হয়ে—

আজও তবে বেদনার দেয়াল ভেঙ্গো না
আমি আজন্ম পিষ্ট হবো স্বৈরাচারীর অসভ্য বুলডোজারে
তবুও যাবো না তোমার দুয়ারে—
প্রেমের তৃষ্ণা নিয়ে, হাহুতাশ করে।

ভালো থেকো ঝরাপাতা হে!
…………………………………………..

কুল্লু নাফসিন যা–ইকাতুল মাউত

মানবিক সভ্যতা আজ বিধ্বস্ত প্রায়—
প্রতিটি ব্যস্ত শহর জুড়ে সুনশান নিরবতার প্রচ্ছন্ন ধ্বংসলীলা
অবিশ্বাস্য রকমের হতাশা নেমেছে লন্ডন ব্রিজে
আইফেল টাওয়ারেও অবশিষ্ট নেই প্রাণের সজীবতা
টাইম স্কয়ারের দেশ আজ অচল, অনর্থক
মারণাস্ত্রের চুল্লিগুলোও ভয়াবহ রূপধারণ করেছে
থরথর করে কাঁপছে আজ চীনের মহাপ্রাচীর
ইরান থমকে গেছে, থমকে গেছে স্পেনের নগর
বেলজিয়ামের সৌন্দর্য আজ কলঙ্কিত
জার্মানযন্ত্রও কাজ করছে না ঠিকঠাক
ইটালির ভেনিসে নেই কাব্যময়তা
নাইরোবিতে চলছে না কফির আড্ডাগুলো
মস্কোতেও ছেয়ে গেছে বিষন্নতা।

আরবমরুতে নিথর দাড়িয়ে আছে নাগরিকতা
নেই উট–দুম্বার নিরন্তর ছুটে চলা
চারিদিকে নিঃসীম স্তব্ধতায় ডুকরে কাঁদছে বিশ্বমানবতার ঘর
উল্লাসের সংস্কৃতির পিরামিডগুলো আজ দুর্গন্ধের আস্তাকুঁড়।

অদৃশ্য বিপদ আছড়ে পড়েছে প্রতিটি দুয়ারে
ঘর ছেড়েছে পবিত্র ভালোবাসার সমীরণ
পারমানবিক বিশ্বের দম্ভের গোডাউন বাসা বেঁধেছে ভয়
চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে আজ পরাশক্তির অহঙ্কারের পাহাড়।

ঝকঝকে ইউরোপের মসৃণ পথগুলো বহন করছে লাশের গাড়ি
তাদের আকাশ কাঁদছে, বাতাস ভারি, মৃত্যু উপত্যকায়
ঠাই নেই আর একটি কফিনেরও।

সারাক্ষণ কোলাহলে ভরপুর পার্কগুলোর অবস্থা কী?
কেন আড্ডাবাজ মানুষ নেই তাদের বিরাণ বুকে?
মার্কেটগুলোয় নেই শপিং, নেই ডলারের খসখস আওয়াজ
মদ, গাজা, ক্যাসিনোর গেট লক, ভেতরে ভুতুড়ে দুর্গন্ধ
বড়বেশি বেসুরো আজ গিটারের গীতালি
গিটারিস্টের লাশও পড়ে আছে অট্টালিকার ক্যাসিগেটে
কেউ স্পর্শ করছে না তাদের পাপিষ্ট দেহ।

তাজমহলের উঠোন শূণ্য। দেয়ালের মার্বেলপাথরও নিথর
লঙ্গেস্ট সী বীচেও আজ মানুষ নামের কোনো প্রাণী নেই
কবির কবিতায় নেই ছন্দ, প্রাণের স্পন্দন নেই
কারো বিশ্বাসে নেই বাঁচার প্রত্যাশা
শিল্পীর সুর যেন হারিয়েছে আমাজন বনে
মৃত্যুময় এই গ্রহে আর আসছে না দূরের অতিথি পাখি।

সীমাহীন যন্ত্রণার কোনো মেডিসিন নেই ভালোবাসা ছাড়া
নির্জীব দেহাবয়বে মিশে গেছে সর্পিল বেদনা
বেদনা এনেছে সারাদেহে জ্বর
এ জ্বর মাপার থার্মাল স্কেনার নেই এ রাষ্ট্রে।

শিশুদের বুকশেলফে এসেছে কিছু নতুন শব্দাবলি
করোনা, লক ডাউন, কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশন, ভেন্টিলেটর, পিপিই, আইইডিসিআর
এসব অর্থহীন শব্দের মীনিং নিয়ে গবেষণা করার কেউ কি থাকবে আর?

এদিকে আমার এই বঙ্গজনপদে চলছে
প্রাণের আর্তনাদেও ত্রাণের নাটিকার থিয়েটারায়ন
গরীবের ডাল চাল আলু কেড়ে নিচ্ছে একদল সুঁকর বা নেড়িকুত্তার রক্তখেকু হায়েনার বাচ্চারা!
কেউ কি আছেন তাদেরকে খবর দিতে যে
আমি তাদের ধিক্কার দেওয়ার আর কোনো ভাষা পাইনি বলে দুঃখ প্রকাশ করেছি!

হে মানুষরূপী নব্য দাজ্জালেরা শোনো
জেনেছি ইয়াজুজ–মাজুজের বীর্যবহণ করছো তোমরা
সাবধান হয়ে যাও—কারণ এই দোযখের আগুন পেটে ঢুকানোর সময় তুমি পাবে বলে মনে হচ্ছে না।

কুল্লু নাফসিন যা–ইকাতুল মাউত…
…………………………………………..

ধুসর জীবন

একজীবনে একটি ধূসর রঙের পাখি—
অনেকগুলো পোকার জীবন নিয়ে
নির্মম খেলা করে যায়।

একসময় পাখিটির ছোট্ট শরীরে
সোয়াইন ফ্লো বা করোনার জীবানু বাসা বাধে
আইসিইউ পায়নি বলে পাখিটি মারা যায়
কোনো এক নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়—
অতপর অনেকগুলো পোকা মিলে
পাখিটির শেষকৃত্যানুষ্ঠান করে বিদায় জানায়।

এই হলো একটি জীবনের উত্তান—পতনের গল্প
যা পাখিটির প্রজন্মরা পড়ে কিন্তু শিক্ষাগ্রহণ করে না
এই হলো একটি স্বৈরাচারের ক্ষমতা দখলের কসরত
যা নির্বাক চেয়ে দেখে তার বাচ্চা স্বৈরাচাররা
ফলে—আবার পাখিরা পোকা খায়
আবার স্বৈরাচার মানুষের পিঠে ছুরি বসিয়ে
ক্ষমতার চেয়ার দখল করে।
…………………………………………..

নূরের উৎসমুখ

মহাপ্লাবনের পর
তামাম জাহানে উত্তাল হলো মুক্তপ্রাণের স্বর
সেই স্বরে উঠে প্রমূর্ত হয়ে কবিতার মহাঝড়।

আরেকটা প্লাবন চাই
যে প্লাবন এসে ধুয়ে মুছে নেবে জীর্ণ জীবনটাই
আবার আসবে প্রাণের মিছিল শহরে সহসাই।

যদি চাও হে উত্তরণ
মিথ্যা স্বরাজ জ্বলে পুড়ে যাক নির্মম প্রহসন
সত্য সাহস সওগাত চাই মহাপ্রাণ প্রয়োজন।

আজ সৃষ্টি–সুখের নির্মাণে চাই নূরের উৎসমুখ
চাই সত্যান্বেষী মহাপুরুষ এক ইস্পাতচেরা বুক।
…………………………………………..

সফেদ মখমল

আগরের গন্ধ শুঁকেছি আনমনে সেদিন
আদমের চোখের জল পান করেছে সে
মাটির দেহ ছুঁয়ে করেছি কসম
হাওয়ার গন্ধমে মিশে আছো তুমি হে নারী
আমি তো অমরই আছি জনম জনম।

একদিন কন্যাসমর্পণ করতে গিয়ে দেখি
অতিমানবের অস্তিত্বের গান শোনা যায়
মাটির পিয়াস আছে আর আছে জলের
শুণ্যালোকের সফেদ শব্দ শোনে যে প্রাণ
জানে সে গভীর জ্ঞান মোহিত মখমলের!
…………………………………………..

সমুদ্রের মাপজোখ

সময়ের আস্তিনে কবিতা লিখে চলেছি
মেঘের পালকিতে বসে পড়ছি সমুদ্রের পাঠ
স্বপ্নের বীজগুলো বপন করে রেখেছি ফুরাতের তীরে
তবুও যদি উড়ে আসে শাদা গাঙচিল
হৃদয়ের জলরং নীড়ে।

মাপজোখ করে রাখা কিছু স্বপ্ন ছিলো
আজন্ম বুকের ভেতর লালন করা পোষা পাখি যেন
প্রতিদিন একটি দুটি করে পালক ছিড়ে যায়
আর আমি অসহায় হতে থাকি ঝড়ে কাঁপা বকের মতো
অতঃপর যখন একটু কিরণ দেখা যায় তিমিরের পর
আমি আবারও জীবনের স্বাদ খোঁজে পাই আবহায়াতের পেয়ালার ঠোঁটে!
…………………………………………..

এসো, শাশ্বত বিশ্বাসে

জলের অতলে আছে প্রাণ।
মাটির রূহের সাথে সখ্যতা কার?
প্রাণের সখ্যতা;
বাতাসের দেহে থাকে শতায়ুর প্রেম
নিরুপমা, জেনে রেখো,
নদীর জলেও ভাসে অপার মুগ্ধতা।

ঝরাপাতা ঠিকই বুঝে শূণ্যতা কী
কাঁঙ্খের কলসি গায় বিরহের গান
কষ্টের পাথর নুড়ি কবিতা লিখে
নারীর আঁচল বেয়ে নেমে আসে প্রজন্মের বাঁচার আকুতি।

নিয়ম মেনে- পাঁজরের ফুলে রাখো পরম নিঃশ্বাস
বাতাসের সোহাগে হয় তন্দ্রিত তনু।
তাই এসো; শাশ্বত বিশ্বাসে রাখি হাত
প্রেমের মেদিনী হোক গোলাপসঙ্কাশ।
…………………………………………..

আমি রাজনীতি করি

আমি দুখি মানুষের কষ্টে কাঁদি মানুষের সুখে হাসি
আমি মানুষের সাথে মিশে গিয়ে মানুষকে ভালোবাসি।

আমি শ্রমিকের গায়ে ঘাম মুছে দেই আমার আস্তিন দিয়ে
আমি অসহায় মানুষের পাশে দাড়াই অসীম মমতা নিয়ে।

আমি নির্বাক হই বাকহারা সব মানুষের ব্যথা দেখে
আমি অপলক চাই গুম হয়ে যাওয়া মানুষের কথা লেখে।

আমি অবাক নয়নে তাকাই সকল পিতৃহারার দিকে
আমি সহসা তাদের পাশে দাড়াই কবিতা-ছন্দ লিখে।

আজ থেকে আমি মজলুম সব মানুষের পাশে আছি
আমি জেল-যুলুম আর পাশবিকতার যাব না কাছাকাছি।

আমি বিক্ষোভ আর হুলিয়ার ভয়ে ছাড়ব না অধিকার
আমি নতুন সূর্যোদয়ের আশায় সইব অত্যাচার।

যদি তুমি বলো কেন আমি ভাই রাজনীতির কথা কই
এই রক্তে ভেজা দেশের মানুষ আমি বাহিরের কেউ নই!
…………………………………………..

কষ্টের নুড়িপাথর

প্রতিটি রাত আসে সীমাহীন নিস্তব্ধতা নিয়ে
প্রতিটি কবিতা আসে ছাপ্পান্ন ইউনিট বেদনার সমান
আসমুদ্র যন্ত্রণা শেষে।

কষ্টের নুড়িপাথরগুলো
তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের করিডোরে আছড়ে পড়ে
আমি শুধু গহীন অন্ধকারের ভেতর দুঃস্বপ্নে কেঁপে উঠি।

এ জীবনযন্ত্রণা আর কত হে নাবিক?
নাকি তোমার এই প্রহেলিকা প্রেম অনন্ত জ্বালাবে
নরকের ইন্ধন হয়ে?
আর কত বিক্ষুব্ধ হবো তোমার প্রহসনে?
আমি কি পাবো না সুখ জীবনের বাতায়নে?
আর কত ক্লিষ্ট হবো তোমার যাতাকলে?
আমি যান্ত্রিকতা চেয়েছি?

দোহাই! দোহাই!
এবার একটু শান্তি চাই
এবার একটু মুক্তি চাই।