শ্রাবণের বিকেল। প্রবল বৃষ্টির ধারা ঝরছে। বিজয় নগর গ্রাম খানি যেন পড়েছে নির্জনতার হাতছানি। বৃক্ষরাজ নিরোব ঠাঁই দাড়িয়ে। বৃষ্টির ধারা মাটিকে গড়িয়ে গড়িয়ে খাল বিলে উচ্ছ্বাস বাড়াচ্ছে। এ যেন প্রকৃতির খেলা।
বিজয়নগর গ্রামটি ব্রহ্মপুত্র নদের শাখা ঝিন্ইা নদীর তীরে মনরোম পরিবেশে অবস্থিত। নদীটি এক সময় খুবই খরস্রোতা ছিল। কালের পরিক্রমায় নদীটি এখন কংকালসার। নদীতে ন্ইে কোন জল। স্রোত সে তো আতুড় ঘরে হাড়িয়ে গেছে।বর্ষা মৌসুমে নদী ছাপিয়ে পানিতে গ্রাম খানি টইটুম্বুর হয়ে যায়। নৌকা ছাড়া চলাচল দুর্ষ্ক । উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগের রাস্তাটি মোটামুটি ভাল। ইদানিং জেলা শহরের সাথে যোগাযোগ রাস্তা হয়েছে।
কৃষক ছাদেক আলী এ গাঁয়েরই বাসিন্দা। লম্বা সিপসিপে চেহারা । গাল ভার্তি লম্বা দাড়ি। তারা দুই ভাই দুই বোন। বোনদের বিয়ে হয়েছে। ছাদেক আলীর এক ছেলে চার মেয়ে । ছাদেক আলীর ছোট ভাই রাজু খেত কাম করে । এখনও বিয়ে করেনি। বৃদ্ধা মা চানঁ বানু এখনও বেঁচে আছেন। তাদের সংসার ভালই চলছিল।
বৃষ্টির দিন কাজ নেই। অলস সময় গল্প গুজবে দিন কাটে। সিকদার,আকবর মুন্সি,একাব্বর আলী ও ছাদেক আলী তারা বসে ছাদেক আলীর ঘরে গল্প করছিল । পিয়াজকুচি কাচা মরিচ ও সরিষার তেল দিয়ে ঝাল মুড়ি বানিয়ে দিলেন চাদেক আলীর স্ত্রী । ঝাল মুড়ি খাচ্ছে আর গল্পে ডুবে আছে। মুড়ি খাওয়া শেষ হলে ছাদেক আলীর স্ত্রী জয়নব বানু পানের বাটায় পান সুপারি দিয়ে ছাতা হাতে রান্নাঘরে চলে যান। পান চিবাইতে চিবাইতে সিকদার ছাদেক আলীকে বললেন আপনাকে একটা কথা বলতে চাই । কথাটি কিভাবে নেবেন জানিনা। যদি অভয় দেন তাহলে বলি।
ছাদেক আলী জানতে চাইলেন বনিতা না করে বলে ফেলো,শুনে বিবেচনা করার চেষ্টা করবো। সুযোগটা সিকদার কাজে লাগালেন। বললেন আপনার ছোট ভাই ,রাজুর তো বিয়ের বয়স হলো । ভাল দেখে বিয়ে করিয়ে দেই। ভাল একটি মেয়ে আছে। আমাদের গ্রামেরই মেয়ে। আজহার মৃধার বড় মেয়ে। দেখতে শুনতে খুবই ভাল্ । কথাগুলো গড়গড় করে বলে ফেললো।
ছাদেক আলী সিকদারের কথায় অভাগ হলেন। তিনি ভাবতে পারেননি এ ধরনের প্রস্তাব দিতে পারেন। তাই তিনি নিজেকে সামলিয়ে কৌশলে হেসে হেসে জবাব দিলেন -রাজুর তো এখনও বিয়ের বয়সই হয়নি । হিসাব নিকাশ ঠিকমত বুঝে না বললেই চলে। সংসারের ভার বহন করবে কেমনে? সংসার কি তা বুঝে সুজে উঠুক।তারপর না হয় কথাটি ভেবে দেখবো। এভাবে বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন ছাদেক আলী। ইহা একটি ঝড়ের পূর্বাভাস তা ছাদেক আলী অনুমান করতে পারলেন। আকবর মুন্সি ও একাবর আলী এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করলেন না।
সিকদার বুঝতে পারলেন ছাদেক ্আলী বিষয়টি এড়িয়ে গেলেন। তাই তার মনে কেমন যেন জেদের পোকা ভর করলো। সিকদার মনে মনে ভাবলেন আমার নামও সিকদার, এ বিয়ে দিয়েই ছাড়বো। সিকান্দার এবার টোপ ফেললেন ভিন্ন পথে। রাজুর ভগ্নিপতি আকবর মুন্সির সাথে ভাব জমিয়ে ফেললো। সে সুযোগে তাকে কবজা করার প্রযাস চালান এবং সফলও হলেন ।
আকবর মুন্সিকে সিকদার বললেন- ভগ্নিপতি হিসেবে আপনার তো একটা দায়িত্ব আছে। কি বলেন ?
তাতো আছেই । কেন?
সিকদার বললো-আপনার ভুমিকা ছাড়া মনে হয় সম্ভব হবে না। তাই বলছিলাম কি ,রাজুর বিয়ের বিষয়ে ছাদেক আলী কোন দিনই রাজি হবে না। আপনি ভরসা। আপনি মত দিলে এগুতে পারি।
রাজি না হওয়ার কারণ ? আকবর মুন্সি জানতে চাইলেন।
তার কারণ আছে আকবর ভাই। কি কারণ ? যে জন্য তিনি রাজি হবেন না তাহলো- তার পাচ জন ছেলে মেয়ে স্কুলে পড়ালেখা করে। তাদের অনেক খরচ আছে । বাড়তি কোন আয় নেই। যে পাচ ছয় বিঘা জমি আছে তার উপর নির্ভর করে সংসার চলে ।তাও আবার নদী ভাঙ্গাজমি ঠিকমত ফসল হয়না। এর মধ্যে রাজুকে বিয়ে করালে নতুন আরেকটি সংসার হবে । খরচ বাড়বে ।সংসার চলবে না । এমনিতেই সারা বছর টানাপোড়ন থেকেই যায়।
এ ছাড়া আরো একটি কারণ আছে । সেটা আবার কি? আকবর জানতে চায়। সেটা হলো রাজু যদি সংসার থেকে পৃথক হয়ে যায়।
যতদিন তাকে ধরে রাখা যায় । ততদিন তার লাভ। এটা তার একটা কৌশল্।
-ঠিক বলেছ সিকদার । এভাবে কখনও ভাবিনি তো!
সিকদার এবার জোড় গলায় বললো-তার স্বার্থের জন্য তো আর রাজু সারা জীবন চিরকুমার হয়ে থাকবে না । কি বলো আকবর ভাই। তা কি করে হয় আকবর মুন্সি বললেন। এর একটি ব্যবস্থা করা দরকার।
-তাহলে দেরি কেন ? রাজুর যদি মঙ্গল চান তাহলে ;রাজুর একটা ব্যবস্থা করুন-সিকদার বললেন। তাছাড়া ছাদেক আলী সংসারে কোন কাজও করে না । ভবগুরের মত দেওয়ানী করাই তার কাজ । এটা তো ভাল করেই জানেন। জমিতে হাল চাষ থেকে শুরু করে কামলা কিষাণ ,সংসারের যাবতীয় কাজ তো রাজুই করে । তিনি বসে বসে আরাম কেদারায় ফায়দা নিচ্ছেন। বিশ্লেষণী ব্যাখ্যা শুনে আকবর মুন্সি বললেন –ঠিকই বলেছ । কোনদিন এভাবে ভাবিনি। তাই মাথায় আসেনি । তিনিও তার সাথে সুর মিলিয়ে বলল -একজনের জন্য তো আর আরেক জন এভাবে ঠকতে পারে ন্ া। সিকদার তুমি ঠিকই ধরেছ। এভাবে রাজুর ভবিষৎ নষ্ট হতে দেয়া উচিত নয়। একটা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সিকদার মনে মনে খুশি হলেন । তিনি এটাই চেয়েছিলেন। সিকদার বলল রাজুর মঙ্গলের জন্যই বলছি । রাজুর কে বিয়ে করিয়ে পৃথক করে দিন । দেখবেন দুদিনেই তাদের সংসারে উন্নতি আসবে। একটু তাচ্ছিল্যের সুরে বললো- দেখবেন ছাদেক আলী কেমন বেহাল দশা হয়।
আকবর মুন্সি ও সিকদার রাজুকে বুঝাতে থাকে। রাজু ছিল একজন সহজ সরল ছেলে। কোন প্রকার ছল চাতুরি জানতো না। সেই রাজু যুক্তিবাক্য শুনতে শুনতে সেও বেগে বসলো। কেননা পাথর জড় পদার্থ তাকেও একটি অন্যটির সাথে ঘন ঘন ঘর্ষণে করলে আগুন জ¦লে। রাজু তো রক্ত মাংসের মানুষ । বিয়ের কথা শুনতে শুনতে বিয়ে পাগলা হয়ে গেলো। কুটিল মনের মানুষ যে কাজ করে সে কাজ মঙ্গল জনক হয় না। তারা কুটিল কাজ করতেই ভালবাসে। আকবর মুন্সিও তার ব্যতিক্রম নয়।
ছাদেক আলী কিন্তু এই গোপন ষড়যন্ত্রের কথা কিছুই জানতে পেলো না।
১৯৮১ সাল ২৩ শে জানুয়ারি ।
সকাল বেলা ছাদেক আলী রাজুকে বললো- জমি চাষের জন্য লাঙল জোয়াল নিয়ে মাঠে যাও। -যেতে পারবো না । রাজু রাগের বসে গড় গড় করে কথাটি বলে ফেললো। কেন যেতে পারবে না ? তোর কি শরীর খারাপ ?
না । শরীর খারাপ নয়। তাহলে যাবে না কেন?
রাজু এবার চোখ বন্ধ করে বলে ফেললো -আমি আর এ সংসারে কুলুর বলদের মত খাটতে পারবো না। সংসারে আমি একা খাই না। আমি বুঝে গেছি ,আমার ভাবনা তোমার মাথায় নেই। আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে কোন দিন চিন্তা করেছ ? করনি। সারা জীবন শুধু খেটেই যাব? আমার কোন ভবিষৎ নাই? আমার ভাবনা আমাকেই ভাবতে হবে।
তোর আবার কিসের ভাবনা ?বুঝলাম না।
উত্তর না দিয়ে হনহন করে মাঠে চলে গেল।
ছাদেক আলী আর কথা বাড়ালো না। বুঝতে পারলো নিশ্চয়ই একটা গোলমাল হয়ে গেছে।
বড় ভায়ের উপর বিরাগভাজন হয়ে রাজু কঠোর কথা বলে গেল। যে ইঙ্গিত দিয়েছে । তাতে মান সম্মান হারানোর ভয় রয়েছে। কথাগুলো শুনে মনে কষ্ট পেলো। ছাদেক আলী ভাবছে -যে ব্যক্তি কোন দিন চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনি । সে আজ বুক ফুলিয়ে কথাগুলি অনায়েসে বলে গেলো।
সত্য একদিন প্রকাশ পায় । এটাই সত্য। কোন গোপনই গোপন থাকে না। রাজুর বিষয়টি প্রকাশ পেলো। সিকদার ,আকবর মুন্সি তাদের সাথে যোগ হয়েছে একাব্বর আলী । তারা ফুসলিয়ে ফুসলিয়ে রাজুর মাথা খারাপ করে দিয়েছে। তাই রাজু বিদ্রোহের সুরে উলটাপালটা কথা বলছে। বিয়ে না করালে সংসারে কোন কাজই করবে না ।
ছাদেক আলী যা জেনেছে তাতে বুঝলেন-এ বিয়ে সংসারে কোন মঙ্গল বয়ে আনবে না। তবুও তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর দাড়ালো না । সোজা বাড়ি ফিরলো। চিন্তা ভাবনায় ও ক্লান্তিতে বিছানায় গা এলিয়ে দিলেন।
অসময়ে ছাদেক আলীকে বিছানায় দেখে তার স্ত্রী জয়নব বানু জিজ্ঞাসা করলো-অসময়ে বিছানায়!ব্যাপার কি? শরীর খারাপ ?
-না । তাহলে অসময়ে শুয়ে আছ কেন? দীর্ঘ নি:শ্বাস ছাড়লেন । মনটা খারাপ । ভাল লাগছে না । একটু বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
কি হয়েছে ? আমাকে বলা যায় না?বলা যাবে না কেন? হ্যাঁ তোমাকে অবশ্যই বলবো ।
-রাজু কে বিয়ে না করালে সংসারে কাজ করবে না । আমার সাথে যে আচরণ করলো তাতে আমি হতাশ হলাম।
কথাগুলি শুনে জয়নব বানু বিচলিত হলো কি হলো না; বুঝা গেল না তাকে সাহস যোগালেন এবং বললো—আল্লাহ আছেন । আল্লাহ যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন কারো অমঙ্গল করেন না। যারা ক্ষতি করার জন্য যড়যন্ত্র করে, তারাই একদিন ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
স্বগোক্তি করে ছাদেক আলী বললো -তোমার কথাই যেন সত্য হয়।
ছাদেক আলী আকবর মুন্সি কে ডেকে পাঠালো । আকবর মুন্সি ছাদেক আলীর ছোট বোন রেজিয়া বেগমের স্বামী।শত্রুতা করলেও তাকে ডাকতেই হয়।আকবর মুন্সি বিকালে এলো । ছাদেক আলী ঘরেই ছিলেন ।বাড়ির আঙিনায় কাঁঠাল গাছের ছায়ায় বসলো দু’জন। আকবর মুন্সি বললো-ভাই ,ডেকেছেন আমাকে? হ্যাঁ ডেকেছি।
কি ব্যাপারে বলুন তো। বিষয়টি তুমিও জানো। তবুও বলছি। রাজু কে বিয়ে না করালে কোন কাজ করবে না। এইটা কি বললেন –আমি কি করে জানবো। থাক সে সব কথা । এখন কি করা যায় তাই বলো। আকবর মুন্সি রহস্য করে বললো-এখন বিয়ে না করালেই নয়? না করিয়ে তো উপায় দেখছি না। তোমার কি মত?
কোন উপায় যেহেতু নেই। তাহলে তো বিয়ে করানোই উচিত। -ঠিক আছে । তোমরা ব্যবস্থা করো। আচ্ছা আমি দেখছি। আকবর মুন্সি আগবাড়িয়ে বললো-রাজুর মেয়ে পছন্দ করা আছে শুনলাম ্ । তবে আর দেরি কেন? দিনক্ষণ দেখে বিয়ের দিন ধার্য্য করে ফেলুন। ছাদেক আলী বললো- মেয়ে দেখতে হবে না? না দেখে বিয়ের দিন ধার্য্য এ কেমন ব্যাপার ,আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা। সে যাই হোক। ছাদেক আলীর আর মেয়ে দেখা হলো না। শুভ বিবাহ সম্পন্ন হয়ে গেল।
বিয়ের পর নববধু ছাদেক আলীর বাড়ী এক বার এসেছিল । তারপরেই রাজুর শশুড় আজহার আলী মৃধা মেয়ে আটকে দিলেন। বলে পাঠালেন যে- রাজু একান্ন সংসার থেকে পৃথক না হলে মেয়ে পাঠাবেন না। তার কথা হলো – ছাদেক আলীর সংসারে থাকলে রাজুর উন্নতি হবে ন্ া। আমাদের মেয়ে জামাই এর উন্নতির বিষয়টি আমাদেরই ভাবতে হবে।
১৯৮১ সাল । ১৫ ই মার্চ। সকাল ৯.০০টা। ছাদেক আলীর বাড়ির আঙিনায় কিছু লোক জমায়েত হয়েছে। ছাদেক আলীও বসে আছেন। সিকদার ,আকবর মুন্সি,ও একাব্বর আলীও আছে। ছাদেক আলীকে না জানিয়ে রাজু লোক জমায়েত করেছে। সিকদার আগ বাড়িয়ে রাজুকে জিজ্ঞাসা করলেন – রাজু লোক ডেকেছ কেন?
রাজু বললো-আমি আপনাদেরকে ডেকেছি একটা কারণে । তাহলো -আমি আর এক সংসারে থাকতে চাই না। আজ থেকে পৃথক সংসারে থাকতে চাই। আমাকে পৃথক করে দিন। প্রতিবেশি অনেকে বললো এ কেমন কথা। বিয়ে করতে না করতেই পৃথক সংসার ।
জমির দেওয়ানি বললেন ঠিক আছে তুমি যদি এক সংসারে থাকতে না চাও। আমরা বিষয়টি পরে বিবেচনা করে দেখবো। এখন নয় । কিছুদিন যাক । আমরা আবার পরে বসবো। এতে রাজু মানতে রাজি নয়। ছাদেক আলীর কাছে জানতে চান আকবর মুন্সি ভাই আপনি কি বলেন? তোমাদেও কথাই মানছে না । আমি আর কি বলব্। রাজু যখন থাকতে চাইছে না । আমাদের বোঝা মনে করছে । আমি কি জোর করে ধরে রাখতে পারবো? তোমরা যা ভাল মনে করো সেটাই করো। তখন আকবর মুন্সি সিকদারকে বললো- কি আর করা যাবে । এক সঙ্গে যখন থাকতে চায়না , পৃথক করেই দেওয়া হোক।
ঘরে যা আছে ভাগ বন্টন করে দেওয়ার তোরজোর শুরু হয়েগেল। ছাদেক আলী কোন কথাই বলছে না।
এ পিছনে বড় ভুমিকা ছিল সিকদারের।
ভাগ বাটোয়ার জন্য ঘর থেকে যখন ধান বের করা হচ্ছিল তখন ছাদেক আলীর ছেলে তারেক বাড়ির আঙিনায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অবাক হবার কথাই কেননা তার চাচীকে দেখতে না দেখতেই পৃথক হয়ে গেল।সংসারে নুতন বউ এলো আর সুন্দর সংসার টা ত্রাসের ঘরের মত ভেঙ্গে গেল। তারেক এসব ভাবতে ভাবতে আবেগে দুঃখে দু চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। চোখ মুছতে মুছতে ঘরের ভিতরে ডুকলো , বই খাতা নিয়ে দ্রুত স্কুলের দিকে পা বাড়াল।
তারেক তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ছাত্র হিসাবে মোটা মুটি ভালই । দরিদ্র পরিবারে যা হয়। পোষাক পরিচ্ছেদে নেই কোন জৌলুস। গায়ে কোন রকমে একটি রেড়িমেট শাট।র্ পরনে কমদামের লুঙ্গি,পায়ে রুপসা চপ্পল । ইহা তারেকের ছাত্র জীবনে পোশাক । স্কুলের বই খাতা ঠিকমত কিনে দিতে পারতো না ছাদেক আলী। এতসব অপ্রতুলতা সানন্দে গ্রহণ করে নিতো। এছাড়া উপায়ও ছিল না। সে দিন স্কুলে গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু স্কুলে তার মন বসেনি। ছুটি হলে সোজা বাড়ি ফিরে আসে । বাড়িতে প্রবেশ করে দেখলো তার মা জয়নব বানু আঙিনায় ঘরের কোল ঘেসে বিমর্ষ ভারাক্রান্ত মনে বসে আছে। দুপুরের রান্না হয়নি। ছোট বোন বেনু, খালেদা ও মুক্তা মায়ের কাছেই কাঁদছে। ছাদেক আলী বাড়ি নেই। এ থমথমে অবস্থা দেখে মায়ের কাছে ভাতের জন্য বিরক্ত করলো না। ঘরে বই গুলো রেখে বাহিরে চলে যায়।
রাতেও চুলা জ¦লেনি।
পাশের বাড়ির তারেকের মাজেদা খালা ঘরে এসে দাঁড়ালো । তার হাতে এক গামলা ভাত আর তরকারি নিয়ে এসেছে। ডাক দিয়ে বললো-তারেক,বেনু খালেদা,মুক্তা তোরা বসে পড় । ক্ষুধা লেগেছে খেয়ে নে। আমি বেড়ে দিচ্ছি।সকলে বসে পড়লো । ক্ষুধাও লেগেছে। চুপচাপ খেয়ে নিলো।
রাজুর স্ত্রী সেদিনই এসেছে। নুতন সংসার শুরু। এখন তার আনন্দের দিন। রাজুর ভাবনা ছাদেক আলীর পরিবারের ব্যয় ভার বহন করতে হব্নো । দুজন আর দুজন । তাদের সংসার সুখেই চলবে। নিজকে তৃপ্তমনে স্বচ্ছন্দ বোধ করছে।
রাজু যতটুকু খুশি না হয়েছে তার চেয়ে বেশি খুশি হলো সিকদার আকবর ও একাব্বর । জমি জমা বন্টন হয়ে গেলে রাজু মহা আনন্দে তার নতুন সংসারে আত্মনিয়োগ করলো।
এদিকে ছাদেক আলীর মাথায় বাজ পড়ল। এক ছেলে চার মেয়ে ,সকলে স্কুলে লেখাপড়া করে। তাদের খরচ বহন করা কঠিন হয়ে দাড়ালো। তাছাড়া জমিতে কৃষাণ নিতে পারছে না নিজে জমিতে খাটতে হচ্ছে । এ অবস্থা দেখে
কুটিল সম্রাটগন উপহাস করতে ছাড়লো না। তাদের ধারনা – ছাদেক আলী ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া তো দূরের কথা সংসারই চলবে না।
ছাদেক আলী তাদের উপহাস নিরবে হজম করে যান। এ ছাড়া উপায়ই বা কি? তারেক বয়সে ছোট হলেও বুঝতে পারে। নিজের মনোবল কে শক্ত করার চেষ্ঠা করে।
পাঁচ বছর পরের ঘটনা। ছাদেক আলীর অবস্থা আরও শোচনীয় । পৈত্রিক তিন বিঘা জমি পেয়েছিল । তা থেকে দুই বিঘা ইতিমধ্যে বিক্রি করতে হয়েছে। আবাদি জমি না থাকায় জমি থেকে কোন ফসল আসেন্ া। সে বছর তারেক এসএসসি পরিক্ষার্থী। তারেক ছাদেক আলীকে জানালো –ফরম ফিলাপের টাকা লাগবে তিন শত পঞ্চাশ টাকা। ভাবনায় পড়লো ছাদেক আলী। অর্থের অভাবে ফরম ফিলাপ অনিশ্চিত হয়ে পড়্ । এমন সময প্রতিবেশি কয়েকজন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাদের সহযোগিতায় ফরম ফিলাপ হয়ে গেল। এস্এসসি পাশ করলো।
এবার কলেজে ভর্তির পালা । ভর্তি হতেও টাকা লাগবে। নতুন বই কিনতে হবে। এক বিঘা জমি ছিল সেটাও বন্দক দিলো। কলেজে ভর্তি হয়। ছাদেক আলী বললো-তুমি মনযোগ দিয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকে।তুমি কোন চিন্তা করো না । আমার যত কষ্টই হোক । ছাদেক আলীর স্বপ্ন তার শত কষ্ট হলেও ছেলেকে শিক্ষিত করে তুলবেন। প্রয়োজনে বাড়িভিটামাটি বিক্রি করবে তবুও ছেলেকে লেখাপড়া থেকে বিরত রাখবেন না। এগিয়ে যাচ্ছে দিন। তারেক এইচএসসি পাশ করে বিএসসি তে ভর্তি হয় এবং পাশ করে। ছাদেক আলীর তখন এমন অবস্থা দাড়ায় যে, দিন মজুরি কাজ ব্যতিত তার কোন রাস্তা খোলা ছিল না। কিন্তু বংশ মর্যাদা ও আত্ম মর্যাদা রক্ষায় তাহাও করতে পারছে না । এমতাবস্থায় দিন যেন আর কাটতে চাইছে না। এক বেলা জুটে তো দু বেলাই উপোষ থাকতে হয়।
একদিনের কথাই বলা যাক । সে দিন ছাদেক আলী কোন ব্যবস্থা করতে পারলেন না। শুন্য হাতে বাড়ি ফিরে এলো। কেউ ধার কর্জও দেয় না। পরিশোধ করতে পারবে না বলে কেউ দিতে চায় না। সকাল পেরিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো । তখনও চুলা জ¦লেনি। ছেলে মেয়ে গুলো ক্ষুধায় কাতর। অনাহারে আর কত সহ্য করবে। মাকে ভাতের জন্য বিরক্ত করছে। ইহা যে তাদের ব্যর্থ চেষ্টা তা শিশুরা বুঝবে কি করে। রাত গভীর হতে চললো। কতক্ষণ আর জেগে থাকে শিশু । কাঁদতে কাঁদতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে।
তারেক বিএসসি পরীক্ষা দিয়েছে প্রায় একমাস হলো। ফলাফল বের হতে আর প্রায় দুই মাস বাকী। চৈত্রের খর রৌদ্রে জল না চাইতেই যেন হাতের নাগালে জল পেল। বিকালে ডাক পিয়ন এসে একটা রেজিষ্ট্রি লম্বা রঙিন খাম দিয়ে গেল। বাবা মা কাছে এলো। ছাদেক আলী বললো- কিসের খাম তারেক ? কি আছে এতে? তারেক বললো- জানি না। খুলে দেখি কিসের চিঠি। খাম খুলে পড়লো । পড়ে খুশির খবর টি মা বাবাকে বললো –বাবা আমার চাকুরি হয়ে গেছে । দশ দিন পর কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে। বিএসসি পরীক্ষার আগে একটি প্রতিষ্ঠানে দরখাস্ত করেছিল তারেক মৌখিক পরীক্ষাও দিয়েছিল।
ছেলের চাকরি হওয়ায় ছাদেক আলী খুব খুশি হলেন। আনন্দে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলো । আনন্দে তার দুচোখ অশ্রুতে ছলছল করছে। ধরে রাখতে পারলো না। কয়েক ফোটা তপ্ত অশ্রু টপটপ করে ধরার ধূলিতে গড়িয়ে পড়ল। শুষ্ক মাটি তা শুষে নিল।
তারেকের পোষ্টিং হয়েছে উত্তর বঙ্গে । রেল ও ষ্টিমার যোগে যেতে হবে। কর্মস্থলে যোগদানের জন্য প্রস্তুতি নিল। মুরুব্বীদের দোয়া নিলেন । সোনালি স্বপ্নের প্রত্যয় নিয়ে তারেক চাকুরিতে যোগদানের উদ্দেশে নিজ বাড়ি থেকে অচেনা পথে পা বাড়ালো। ছাদেক আলী আর জয়নব বানু আদরের ধন তারেকের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইলো, যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে রইলো। এক সময় তারেক গাঁয়ের বাঁকা পথে অদৃশ্য হয়ে গেল।