মৃত্তিকার সাথে কথা বলে অনেকটা হালকাবোধ করল মিথিলা। বাইরে থেকে হেঁটে এসে, বাসায় ফিরেই রেহানাকে আবার ফোন দিল মিথিলা। মৃত্তিকাই ধরল এবার। কথা বলল অনেকক্ষণ। ভালো আছে। মৃত্তিকা ভালো আছে। স্কুলের কথা, বন্ধুদের কথা, কত যে কথা মেয়েটার! শুধু ভুলেও, একটিবারের জন্যও তার বাবার কথা বলল না। না, স্বপনের প্রসঙ্গ মিথিলার কাছে তোলে না মেয়েটা। মেয়েটাও তারই মতো শান্ত আর একরোখা, বড় অভিমানী। মেয়েটা কি মিথিলার মতোই হবে শেষে? ভাবতেই, বুকের মধ্যে কেঁপে ওঠে তার! মনে মনে বলে, ঈশ্বর! মেয়েটাকে ভালো রেখ, সুখে রেখ! পরক্ষণেই চমকায়। সে তো ঈশ্বরে বিশ্বাসই করে না! তবে? সংস্কার, যা মিশে আছে তার রক্তে, মজ্জায় তা ত্যাগ করা এত সহজ নয়!

খুব বেশি রাত করে না তারা—যেহেতু উঠতে হয় খুব ভোরে, তাই রাতের খাবারটা শেষ করে তাড়াতাড়ি। তারপর বিছানায়।

খেতে বসে জাহিদ মৃত্তিকার প্রসঙ্গ তুলতেই বিরক্ত হয় মিথিলা মনে মনে। জাহিদ বলে, মৃত্তিকার সাথে কথা হল?

হুম।—আনমনে উত্তর করে সে।

কেমন আছে?

ভালো।—সংক্ষিপ্ত, নিরুত্তাপ উত্তর দেয় মিথিলা।

কতবার বললাম, মেয়েটাকে নিয়ে এসো, নিজের কাছে রাখ, কথা শুনলে না। কেন শুধু শুধু মেয়েটাকে কষ্ট দিচ্ছ? নিজেও কষ্ট পাচ্ছ!

মৃত্তিকা ভালো আছে জাহিদ, ওকে নিয়ে ভেব না। আমরা দুজনই ভালো আছি, বেশ আছি।

মিথিলার কথায় চুপ করে যায় জাহিদ। মিথিলার এই বিষয়টা বোঝে না সে। কেন নিজের সন্তানকে কাছে রাখতে আপত্তি মিথিলার? যখন জাহিদ এক কথায় মৃত্তিকাকে মেনে নিতে রাজি! মিথিলাও কোনো কথা বলে না আর। ঘর পোড়া গরু সে, সিঁদুরে মেঘেও তাই ভয়। নইলে তার কি মন পোড়ে না নিজের একমাত্র সন্তানকে বুকে আগলে রাখতে! যন্ত্রণা কি পোড়ায় না তার মাতৃহৃদয়! তবু এ এক অদ্ভুত কষ্ট, অন্যরকম যন্ত্রণা! যা কখনো কাউকে বলতেও পারবে না সে, বোঝাতেও পারবে না। তার ছোট্ট, একরত্তি মেয়েটা, সে কি বোঝে তার মায়ের কষ্ট? বুঝবে একদিন, যখন সে বড় হবে, তখন নিশ্চই সে বুঝবে তার মায়ের যন্ত্রণা। কেন তাকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল তার মা, কেন তাকে বঞ্চিত করেছিল মাতৃস্নেহ থেকে—নিশ্চয়ই কোনো একদিন বুঝবে সে!

স্বপনের এস.এস.সি.র ফলাফল মিথিলার ঘোর কাটাল। যেন সে কোনো স্বপ্ন থেকে জেগে উঠল হঠাৎ। নিজের পড়াশোনার প্রতি এবার মনোযোগী হল সে। পাঠ্যবই, যার সাথে এতদিন সম্পর্ক চুকেই গেছিল প্রায়, সেগুলো আবার হাতে উঠল তার। তাছাড়া, ততদিনে তার বাড়িতেও খবর পৌঁছেছিল যে মিথিলার পড়াশোনায় আর মন নেই মোটেই। ফলে, পড়াশোনায় নতুন করে মনোযোগী হল সে, যুদ্ধে নামল যেন। এবং বেশ ভালোভাবেই পাশ করল সে এসএসসি, ভর্তি হল কলেজে।

স্বপন পরপর তিনবার ফেল করে, কিছুদিন ভ্যাগাব-র মত এদিক ওদিক ঘুরে ততদিনে পাড়ি জমিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু প্রেম কমেনি তাতে। ফোনের যুগ নয় তখন, কথা বলা যায় না মন চাইলেই। মিথিলাদের গ্রামে বিদ্যুৎই আসেনি তখন!

ঠিক পনেরো দিন পর পর চিঠি আসত স্বপনের। তীর্থের কাকের মত মিথিলা চিঠির আশায় দিন গুনত। দিনগুলো যেন আর কাটতেই চাইত না তার! গুনে গুনে, ঠিক পনেরো দিন পরে, মিথিলা হানা দিত পোস্টাফিসে। মনে হতো, ডাকপিয়নটা যেন ইচ্ছে করেই দেরি করত সেদিন। ভীষণ রাগ হতো তার, উচাটন লাগত খুব। তারপর, পিয়ন যখন সত্যি সত্যিই তার হাতে বুঝিয়ে দিত চিঠি—পরম প্রার্থিত, নীল খামে মোড়া, ভারি আর মোটা— তখন ভীষণ গর্বে আর খুশিতে ঝলমল করে উঠত তার মুখ। বুকের মধ্যে যেন ড্রাম পেটাত কেউ। গলা শুকিয়ে আসত তার। হাত পা কাঁপত আর মাথাটা যেন ফাঁকা মাঠ হয়ে যেত তখন। প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে, পিয়নের হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিয়ে, ঝড়ের গতিতে বাড়ির পথে এগোত সে। বাড়ি গিয়ে, দরজায় সাবধানে খিল এঁটে, কতবার যে চুমু খেত সে চিঠিতে! কতবার বুকের সাথে জড়াত! কতবার পড়ত, পড়তে পড়তে মুখস্ত হয়ে যেত। মনে মনে চিঠির প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি কথা কতবার আওড়াত সে, নিজেও জানত না তা। কারও কাছে এতটা মূল্য ধরে সে, ভাবতেই দারুণ এক ভালোলাগায় শিরশির করে উঠত তার বুক, কাঁপিয়ে দিত তাকে।

কোনো কোনোবার দেরি হতো চিঠি আসতে। নির্ধারিত দিনের চেয়ে এক দু দিন বা তারও বেশি দেরি হতো। তখন শুধু দীর্ঘশ্বাস আর ছটফটানি! নির্ঘুম রাত আর চোখের জল। যন্ত্রণা, কী যে যন্ত্রণাময় হতো সে ক’টা দিন! আহ! ভাবতে এখনও চোখে জল আসতে চায় মিথিলার!

সেই কোন ছোট্টবেলায় মা মারা গেছিল তার। বড় ভাই-বোনেরা সবাই নিজেদের নিয়ে ছিল ভীষণ ব্যস্ত। প্রায় অনাদরে, অবহেলায় বেড়ে ওঠা মিথিলাকে কেউ বুঝিয়ে দেয়নি তার জীবনটাও মূল্যহীন নয়! সে-ও মানুষ! সম্পূর্র্ণ, পরিপূর্র্ণ একজন মানুষ! সৎ মা রেহানা তাকে খুব যে অনাদর করতেন এমন নয়। তবে, খুব যে আদরে ভরিয়ে দিতেন মনে পড়ে না তেমনটাও। নিজের সেই অনাদর, অবহেলা আর একাকিত্বময় জীবনটাতে স্বপন তাই অধিকার করে নিয়েছিল তার মনোরাজ্যের পুরোটাই। মিথিলার স্নেহবুভুক্ষু, দুর্বল মনে স্বপন ছিল পরম নির্ভরতার কেন্দ্রবিন্দু।

স্বপনের কাছে সে যাচ্ঞা করত প্রেমিকের প্রেম ও একাগ্রতা। কামনা করত দ্বিধাহীন সমর্পণ। সেই সাথে, তার অবচেতন মনে ছিল স্নেহ-ভালোবাসার জন্য উদগ্র কাঙালপনা। যা দয়িতের কাছে দয়িতার চাওয়া নয়! যেন, তা ছিল মায়ের কাছে, বাবার কাছে ছোট্ট অবুঝ শিশুটির আবদার! স্বপন বোঝেনি তা, বুঝতে চায়ওনি। হয়ত, শেষ পর্যন্ত কেউই বোঝে না তা। তবু, স্বপন ভালোবাসত তাকে। তখন অন্তত তেমনটিই মনে হতো মিথিলার। ভালো কি বাসত সত্যিই! এখন, এই বত্রিশে দাঁড়িয়ে, পাশে অন্য পুরুষ, যে এখন তার স্বামী, তার পাশে শুয়ে, ভাবে মিথিলা। ভালোবাসা! তা কি সত্যিই এত পলকা আর ঠুনকো হয়? এত অল্পেই তা গুঁড়িয়ে যায়? কই, স্বপন তার বুকটা চিরে দিল, ঝাঁঝরা করে দিল, তবু তো সে…! তবে কি মিথ্যে বলত স্বপন? কখনোই কি সে ভালোবাসেনি মিথিলাকে? সবই ছিল কথার কথা, মিথ্যের বেসাতি ? ভাবে আর অবাক হয় মিথিলা, অবাক হয় আর ভাবে। ভাবনা যেন ফুরোয় না তার! ভাবনাগুলোই পাগল করে দেবে তাকে, দগ্ধে মারবে নিয়ত। যন্ত্রণায় ছটফট করে সে।