কলেজে ভর্তি হওয়ায় মিথিলার জীবন এক নতুন মাত্রা পেল। নতুন বন্ধুবান্ধব, অনেক নতুন মুখ। বাড়িতেও নেই আগের সেই দম বন্ধ করা শাসন। বড় বোনেরা বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি। ভাইয়েরাও চাকরি, সংসার নিয়ে বাইরে। তবু, মিথিলার ভালো লাগল না কিছুই। সে ছোটবেলা থেকেই অভ্যস্ত হয়েছিল আশপাশের লোকজন, পাড়াপ্রতিবেশীদের সাথে না মেশায়। সত্যি বলতে সেখানে মেশার মত তেমন কেউ ছিলও না তার। স্বপনের সাথে প্রেম হবার পর থেকে তার জগৎটা হয়ে গেছিল আরও ছোট আর সংকীর্ণ। কিন্তু তার কল্পজগতের বিস্তার ছিল বিশাল ও বিরাট। উন্মুক্ত ও উদার। স্বপন মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমানোয় প্রবল কষ্ট তাকে অভিভূত করেছিল। দুঃসহ একাকিত্ব তাকে আঁকড়ে ধরেছিল। এই কষ্ট থেকে পালাতে আরও বেশি ঝুঁকে পড়েছিল সে বইয়ের দিকে। এবং অবশ্যই পাঠ্যবই ছিল না সেসব।

মিথিলা দেখতে মন্দ ছিল না খুব। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর, তার নিজের ক্লাসের এবং ওপরের ক্লাসের অনেক ছেলেই ভাব জমাতে চেষ্টা করত তার সাথে, সুযোগ বুঝে প্রেমের প্রস্তাবও দিয়ে বসতো কেউ কেউ। মিথিলা এড়িয়ে যেত, নাকচ করে দিতো। বোকা ছিল না সে। নারীর অতিরিক্ত যে একটি ইন্দ্রিয় থাকে, যাকে ষষ্ঠেন্দ্রিয় বলে লোকে, তারই কল্যাণে, পুরুষের কামনার দৃষ্টি চিনতে ভুল হতো না তার। ফলে সে নিঃসঙ্কোচে স্বপনের কথা জানাত সকলকে। বলত, স্বপনকে ভালোবাসে সে। একসময় বিয়ে করবে তারা। কোনো এক পবিত্র তিথিতে হারাবে তারা এক অন্যেয়।

স্বপনের প্রেমে এতটাই বুঁদ ছিল মিথিলা যে তারা বিয়ে করবে, সংসার করবে, এটাই তার কাছে সহজ ও স্বাভাবিক, পবিত্র ও সুন্দর মনে হত। যদিও সংসার সম্পর্কে বস্তুত কোনো ধারণাই ছিল না তার। ফলে যথেষ্ট সুন্দর আর আকর্ষণীয় হওয়া সত্ত্বেও, মুখচোরা স্বভাব আর অহংকারী—হ্যাঁ, ছেলেরা শেষপর্যন্ত এমনটাই ভাবত তাকে—ভাবের কারণে সে ধীরে ধীরে আরও একা ও নিঃসঙ্গ হয়ে গেল। সমবয়সী মেয়েদের সাথে কথা বলতেও তেমন ভালো লাগত না তার। তাদের গল্পের বিষয়বস্তু ছিল খুবই সংকীর্ণ ও সাধারণ, যা টানত না তাকে। হাতে গোনা কজন বন্ধু ছিল তার, যাদের সাথে সে মিশত, কথা বলত। তার একটি দোষ বা গুণ ছিল এই যে, যা সে করত, যা সে বলত, মন থেকেই করত, মন থেকেই বলত। কোনো ভান, কোনো ভনিতা ছিল না তাতে। এই সব বন্ধুদের কাছে সে অকপটে, নিঃসঙ্কোচে স্বপনের কথা বলত।

রাত জেগে সে চিঠি লিখত স্বপনকে। তার চিঠি পড়ে মুগ্ধ হত, প্রেমে গদগদ হত স্বপন। তাদের সম্পর্কের উষ্ণতায় ও অকৃত্রিমতায়, পবিত্রতায় ও গভীরতায় সে গর্ববোধ করত। অহংকার করত। কেননা, সে টের পেত, তার চারপাশে, তার সমবয়সী, বড় বা ছোটরাও অনেক সময়ই প্রেমের নামে, ভালোবাসার নামে, সম্পর্কের নামে, কত নোংরামী আর ভ-ামি, পাপ আর অনাচারে ভাসিয়ে দিচ্ছে, ডুবিয়ে দিচ্ছে নিজেদের। সে মনে মনে ভীষণ ঘৃণা করত তাদের, আর আরও বেশি করে, আরও গভীর করে ভালোবাসত স্বপনকে, যেহেতু সে কখনো, কোনোদিনও, সামান্যতম নোংরামির ইঙ্গিতমাত্রও দেয়নি মিথিলাকে। করেনি কোনো অশ্লীল আচরণ। বরং তার লেখা চিঠিগুলো এক অন্যরকম স্বপ্নে বিভোর করে তুলত মিথিলাকে। হাতছানি দিত ভীষণ রোমাঞ্চকর এক জীবনের। তাই, মিথিলার মনে হতো, তার সকল দুঃখ ও যন্ত্রণা, বিষণœতা ও কষ্ট দূর করে দেবে স্বপন তার ভালোবাসার যাদুস্পর্শে।

শরীরীবোধ বা শরীর, অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, তখন পর্যন্ত মিথিলার কাছে ছিল সম্পূর্ণ অচেনা। নারী পুরুষের সম্পর্ক সম্পর্কে সে অজ্ঞাত ছিল না। তার বই পড়া বিদ্যে দিয়ে সে অস্পষ্ট অনুধাবন করত সেটা। কিন্তু তার স্বরূপ সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না তার। তার একটা কারণ হয়ত এই ছিল যে, তখন অব্দি তার তেমন কোনো বিবাহিত নারী, যাদের কাছ থেকে মেয়েরা সাধারণত এসব জ্ঞান লাভ করে থাকে, তাদের সাথে মেশার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তার নিজেরও কোনো আগ্রহ জাগেনি তেমন। বরং সে অস্বস্তি নিয়ে এড়িয়ে যেত, যদি এমন প্রসঙ্গ উঠত কখনো। তবে খুব ছোট বেলায়, মিথিলার বয়স তখন পাঁচ কি ছয়, ভীষণ অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল তার। এবং অন্যরকম বলেই তার অবচেতন মন সংগোপনে জমা রেখেছিল সেটা। আর অনেক বছর পর, মিথিলার ভীষণ মন কেমন করা, শরীর কেমন করা এক ক্ষণে উগরে দিয়েছিল তাকে। ফিরিয়ে দিয়েছিল মিথিলার স্মৃতিতে। মিথিলার তখন বমি পেয়েছিল, গা গুলিয়ে উঠেছিল ভীষণ। একছুটে কলপাড়ে গিয়ে, সেই কতবছর আগের ভুলে যাওয়া স্মৃতি আর সদ্য তার ঝুলিতে যোগ হওয়া কষ্টাভারে হড়হড় করে বমি করেছিল সে, যেন উগড়ে দিতে চেয়েছিল তার নতুন, পুরাতন সকল স্মৃতির বোঝা-ই। সেই ছিল সত্যিকার জীবন যন্ত্রণার শুরু মিথিলার। ছিল এক ক্লান্তিকর যুদ্ধারম্ভ।