ঠিক তিন বছর পর ফিরে এসেছিল স্বপন। মিথিলা অবাক হয়ে দেখেছিল, স্বপনের চেহারা যেন খোলতাই হয়েছে আরও। গৌরবর্ণ যেন আরও গৌর হয়ে উঠেছে। মিথিলার চোখে আরও সুন্দর, আরও দেবোপম হয়ে উঠল তখন স্বপন। মিথিলা কলেজে যাওয়ার নাম করে স্বপনের সাথে শহরে গেল। অনেক ঘুরল সারাদিন, বলল কত না বলা কথা। কত ভবিষ্যৎ স্বপ্ন তারা বুনল সারাদিন! স্বপনের চোখের দিকে তাকিয়ে মিথিলার মনে হল, সে হাজার বছর কাটিয়ে দিতে পারবে এভাবেই! স্বপন যেন একটু বদলেও গিয়েছে, মনে হল মিথিলার। আগের মত শান্ত, চুপচাপ নেই আর সে। কথা বলছে অনর্গল, সুযোগ পেলেই আলতো ছুঁয়ে দিচ্ছে মিথিলাকে। না, মিথিলার খুব খারাপ লাগেনি। ততদিনে সে-ও, মনে মনে বড় হয়ে উঠেছে অনেকটাই। মন থেকে ঝরে পড়েছে অনেক অহেতুক সংস্কার। সে নিঃসঙ্কোচেই ধরেছে স্বপনের হাত। তারা একে অন্যের হাত ধরে হাঁটল, সারাদিন ঘুরল। তারপর বিকেলে, ফিরে গেল যে যার বাড়ি।

মিথিলাদের বাড়িতে স্বপন আর মিথিলার সম্পকের্র খবর পৌঁছেছিল বহু আগেই। মিথিলার ভাই-বোন, বাবা, এমনকি সৎ মা রেহানাও এক কথায় নাকচ করে দিয়েছিলেন সে সম্পর্ক। স্বপনের মত অপদার্থের জন্য দ্বিতীয় বাক্যব্যয় নিতান্তই অপচয় মনে হয়েছিল তাদের। মিথিলাকে নিয়ে তার পরিবারে এক ধরনের স্বপ্ন তৈরি হচ্ছিল, টের পাচ্ছিল মিথিলা, হয়ত সে সবার ছোট ছিল বলেই একটু বেশিই ছিল সেটা।

স্বপন মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরতেই, যেহেতু কিছু টাকা-পয়সা নিয়ে ফিরেছিল সে, তার পরিবার চাইছিল তাকে বিয়ে করিয়ে দিতে। বিয়ে করে, তিনমাস পর, বউ রেখে আবার সে চলে যাবে প্রবাসে। স্বপনের সাহস ছিল না মিথিলার পরিবারে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাওয়ার। কিংবা তার নিজের পরিবারকে জানানোর যে, মিথিলাকে বিয়ে করতে চায়। মিথিলার নিজের কল্পনায়ও আর যাই থাক বিয়ের চিন্তা ছিল না তখন।

স্বপন একে তো ছিল পাত্র হিসেবে মিথিলার অযোগ্য, সে নিজে বুঝত সেটা, বলতও মাঝে মাঝেই, তায় পড়াশোনায় খারাপ বলে ধানী জমি বিক্রি করে তার বিদেশ যাওয়ার খরচ যুগিয়েছিল পরিবার। যে কারণে সে জোর গলায় নিজের বা মিথিলার পরিবারে নিজের ইচ্ছে প্রকাশ করার সাহস পেল না। এই সংকটকালে মিথিলাকে অদ্ভুত এক প্রস্তাব দিল স্বপন। চমকে গেল মিথিলা। খুব হতাশায় ভুগল কদিন। নিজেকে খুব ছোট আর অপরাধী মনে হল তার। কিন্তু শেষপর্যন্ত উপায়ন্তর কিছু খুঁজে না পেয়ে রাজি হয়ে গেল স্বপনের প্রস্তাবে। সে রাতেই পালাল তারা। রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করল। অতঃপর ফিরে এল গ্রামে। বউ নিয়ে নিজের বাড়িতেই উঠল স্বপন। অভ্যর্থনাটা সুখের ছিল না তাদের।

স্বপনের মা মিথিলাকে, মিথিলার পরিবারকে অপছন্দ করতেন। একই পাড়ায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে এ পরিবারের হাঁড়ির খবর ও পরিবারের অজানা ছিল না। মিথিলাদের পরিবারের নাকউঁচু ভাব গ্রামের অনেকেই বাঁকা চোখে দেখত। সমালোচনাও করত আড়ালে। মিথিলার ভাই-বোন সবাই, এমনকি মিথিলাও পড়াশোনায় ভালো ছিল। তাদের পরিবার, গ্রামের অন্য পরিবারগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। রুচি ও আভিজাত্যে, সংস্কৃতি ও সংস্কারে তারা অন্যদের থেকে পৃথক ছিল, শ্রেষ্ঠও হয়ত। মিথিলার মাতুল বংশ ছিল অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও সুসংস্কৃত। খুব স্বাভাবিকভাবেই মিথিলার মা, যিনি মারা গিয়েছিলেন মিথিলার তিন কি চার বছর বয়সে, তিনি বয়ে এনেছিলেন তাঁর রক্তে, আচার-ব্যবহাওে, সেই আভিজাত্য ও পারিপাট্য, রুচি ও সংস্কৃতি। যা মিথিলাদের পরিবারকে বদলে দিয়েছিল। এক অন্য মাত্রা দিয়েছিল। কিন্ত গ্রামের মূর্খ, অশিক্ষিত আর পরশ্রীকাতর মানুষগুলোর ভালো লাগেনি তা। তাদের চোখে মিথিলাদের পরিবার ছিল অমিশুক আর অহংকারী। ফলে তারা একটু ভয়ের চোখে দেখত মিথিলাদের। মনে মনে একটু সমীহও ছিল। আর ছিল ঈর্ষা। নির্ভেজাল, খাঁটি ঈর্ষা।

মিথিলার পরিবারের মানুষগুলো ছিল খুবই ভদ্র ও বিনয়ী। গ্রামের মানুষ যখন দেখল তারা উন্নত হচ্ছে, ভালো চাকরি করছে, এগিয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন ও সমৃদ্ধির দিকে, সুখ ও সম্ভাবনার দিকে, তখন এইসব পরশ্রীকাতর মানুষগুলো ঈর্ষায় পুড়ত। মুখে প্রশংসা করত, আপদে বিপদে সাহায্যের জন্য তাদের কাছে নির্দ্বিধায় সাহায্যের হাতও পাততো, কিন্ত তারা কেউই আদতে খুশি ছিল না মিথিলাদের এই উত্থানে। স্বপনের পরিবারও এর বাইরে ছিল না।

মিথিলাকে স্বপনের মা ভালোভাবে নিলেন না। মিথিলা অহংকারী, মিথিলা অমিশুক, অন্তর্মুখী, তার ছেলের চেয়েও বেশি বিদ্যে ধরে—এতসব ত্রুটি এক লহমায় ক্ষমা করতে একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। বস্তুত আর সব সেকেলে শাশুড়ির মতই তিনিও চেয়েছিলেন এমন একটা বউ, যে তার সংসারের সব কাজ বুঝে নেবে। ঠিক যেমন তিনি নিয়েছিলেন তার শিশুবয়সেই। তার সে চাওয়ায় তেমন অন্যায় কিছুও ছিল না আসলে, জানে মিথিলা। তিনি চেয়েছিলেন তার ছেলের বউ শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করবে। সংসার গুছিয়ে রাখবে। সাতচড়ে রা করবে না এবং অতি অবশ্যই মিথিলার মত বইয়ে মুখ গুঁজে থাকবে না সারাদিন।

মিথিলা বড় একটা রা করেও নি। ছোট বেলায় মা মরা মিথিলা কষ্ট সয়ে অভ্যস্ত ছিল খুবই। সে কোনো অশান্তি চায়নি, ইচ্ছে করে বাড়াতে চায়নি বিপর্যয়। সে মানিয়ে নিতে চেয়েছিল। পরিবারের সকলের ছোট ছিল বলে কাজে ভীষণ অপটু আর অনিচ্ছুক ছিল সে। যা তাকে লজ্জা দিত, বিব্রত করত স্বপনদের পরিবারে। সে প্রাণপণ চেষ্টা করত তাদের সাথে তাল মেলাতে। কিন্তু স্বপনের মা খুশি হতেন না তাতেও।

অন্যদিকে, মিথিলাদের মত পরিবারের মেয়ের এমন অধঃগতিতে খুবই খুশি ছিল গ্রামের অধিকাংশ মানুষ। ভারি একটা বিনোদনের বিষয় হয়ে উঠল তাদের কাছে মিথিলার এই স্বয়ম্বর হওয়ার ঘটনা। মিথিলার পরিবার লজ্জায়, অপমানে, আরও সেঁধিয়ে গেলো নিজেদের মধ্যে। তার মা-বাবা, ভাই-বোন, বিনা বাক্যব্যয়ে, কোনো অহেতুক ঝামেলায় না জড়িয়ে, ত্যাগ করল তাকে।