বাস থেকে নেমে খুব ক্লান্ত, অবসন্ন লাগল মিথিলার। জাহিদ তিনদিন হলো বাসায় নেই। শুধু একার জন্য রান্না করতে ইচ্ছে করে না তার। রাস্তার পাশের অখ্যাত এক দোকান থেকে এক প্যাকেট ভুনা খিচুড়ি নিয়ে বাসায় ফিরল সে। নিশ্চিন্ত। রাতে আর রান্না করতে হবে না তার। লিপা এ-কদিন তার সাথেই থাকছে রাতে। সকালে উঠে, মিথিলার নাস্তা আর দুপুরের খাবার তৈরি করে দিয়ে বের হয়ে যায় কাজে। মিথিলার বারণ শোনে না। তাই সকালের নাস্তা নিয়ে আপাতত চিন্তা না করলেও চলছে তার।

বাসায় ফিরে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে গোসল করল মিথিলা। সারাদিনের ক্লান্তি, অস্বস্তি, ঘামের গন্ধ, বাসের গাদাগাদি ভীড়, মানুষগুলোর গায়ের ঘামের বিদঘুটে সব গন্ধ দূর করে স্নিগ্ধ, সতেজ হয়ে বের হল বাথরুম থেকে। আয়নার সামনে দাঁড়াল, নিজেকে দেখল নিজেই। বয়স হচ্ছে কি? হুম! আয়নাও বলছে সে কথা! জাহিদ বাচ্চা চায়। অনেক দিন থেকেই আকার ইঙ্গিতে বলছে। কিন্তু অত তাড়া নেই মিথিলার! না, আর কোনো ভুল সে করবে না! মৃত্তিকাকে এনে যে অন্যায়, যে অবিচার সে করছে মেয়েটার সাথে, তার পুনরাবৃত্তি সে চায় না আর। বরং আরো সময় যাক, আরো কিছুটা সহজ হোক তারা। তারপর, যদি সত্যিই শেষ পর্যন্ত একসাথে থাকা হয়ে ওঠে তাদের, তখন না হয় ভেবে দেখবে সে! অনেক পোড় খেয়েছে, পাড়ি দিয়েছে অনেক বন্ধুর পথ। গ্রামের সেই শান্ত, সুবোধ মেয়েটি তো আর নয় সে এখন! জীবন অনেক ঠকিয়েছে তাকে, অনেক শিখিয়েছে। ধীরে ধীরে সে আস্থা হারিয়েছে মানুষে, আস্থা হারিয়েছে ঈশ্বরেও!

ঈশ্বর? কোথায় থাকেন তিনি? না, সে মিথিলা জোয়াদ্দার, কীটাণুকীট সে। তবু, ডাকবে না আর, স্মরণ করবে না আর তাঁকে! ভেবে নিজেই চমকে ওঠে মিথিলা। হেসে ওঠে শব্দ করে। স্মরণ করবে না? ডাকবে না? তাহলে কদিন থেকে সে কেন নামাজ পড়ছে পাঁচবেলা? ভেবেই হতবুদ্ধি হয় সে। নিজের স্ববিরোধিতা ও ভ-ামিতে বিরক্ত হয়ে ওঠে নিজেই। না, এমন ছিল না সে। তবে কি নষ্ট হতে শুরু করেছে সে? পচন ধরেছে বোধে? সে হয় হবে আস্তিক, নয়ত নাস্তিক। মাঝামাঝি কিছু নেই, থাকা অনুচিত। নিজেকে নিজেই মনে মনে প্রশ্ন করে সে কী আসলে—আস্তিক নাকি নাস্তিক? মন বড় দুর্বল! বিপদে, বিপন্ন, অসহায় অবস্থায়, তাই আশ্রয় খোঁজে সে, খোঁজে অবলম্বন! আর তাই মুখে যাই বলুক, অন্তরে সে জানে, তার ঈশ্বর বিশ্বাসে খাদ নেই এতটুকুও! কদিন নামাজ পড়ে অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ছেয়ে গেছে তার মন। কেবলই মনে হয়েছে, না, কেউ একজন কান পেতে শুনছে তার কথা। কেউ একজন রক্ষা করবে তাকে সকল অমঙ্গল ও অন্ধকার থেকে! পরক্ষণেই আবার মিথিলা ভাবে, কিন্তু সত্যিই কি রক্ষা করবে? করে?

লিপা একটু রাত করে আসে। তার স্বামী রিক্সা চালায়, ফিরতে রাত হয়। লিপা তার স্বামীকে খাইয়ে, নিজে খেয়ে, তবে আসে। ফলে আসতে দেরি হয় তার। মিথিলা বলে না কিছু। আহা, সে তো না-ও আসতে পারত! নিজের সংসার ছেড়ে, স্বামী ছেড়ে, সে যে আসছে মিথিলাকে সঙ্গ দিতে, এতেই কৃতজ্ঞ বোধ করে মিথিলা। লিপা দেরি করে আসুক, দেরি হোক তার, ক্ষতি নেই।

লিপা এল সাড়ে দশটার দিকে। কাল শুক্রবার, অফিস ছুটি মিথিলার। দেরিতে ঘুমোলে ক্ষতি নেই কিছু। সে একটা বই টেনে নিয়ে আধশোয়া হল বিছানায়। এই এক বদভ্যাস তার! বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়া। পড়ার অভ্যাসটা ছাড়তে পারেনি আজও। কত ঘটনা, কত দুর্ঘটনা ছোট্ট এই জীবনে! বয়ে গেল কতটা দীর্ঘ সময়, সে পাড়ি দিলো কত বন্ধুর পথ, তবু পড়ার অভ্যাসটা ত্যাগ করতে পারল না কিছুতেই। আর দম বন্ধ করা যে কোনো ক্ষণে বই-ই তাকে মুক্তি দেয়, দেয় স্বস্তির সুবাতাস। এমন বন্ধুকে সে ত্যাগই বা করবে কী দুঃখে!

লিপা রোজকার মতো এসেই ঘুমের তোড়জোড় করল না। বরং সে আঁচলে বাঁধা সুগন্ধি পান বের করে মুখে পুরে মিথিলাকে জিজ্ঞেস করল, খাইবেন আফামনি?

মিথিলা চমকে তাকিয়ে দেখল একবার। লিপা নিজের মুখে একটি পান পুরে পরম তৃপ্তিতে চিবুচ্ছে, অন্যটি হাতে ধরে রেখেছে। তার মানে, সে হিসেব করে দুটি পান এনেছে, একটি তার, অন্যটি মিথিলার জন্য। না বলতে খারাপ লাগল মিথিলার। সে পান খায় না, ভালোও লাগে না তার। পাছে লিপা কষ্ট পায়, ভাবে সে গরিব বলে তার দেয়া পান খেল না মিথিলা, তাই হাত বাড়িয়ে পানটা নিয়ে মুখে পুরলো। পান চিবুতে চিবুতে উঠে গিয়ে, বেসিনে পানের পিক ফেলে এসে জাঁকিয়ে বসল বিছানায়। তারপর, মুখে পান রেখেই, মুখ সরু করে বলল, খামোখা পান খাও কেন? পান খাওয়া ভালো নয়।

লিপা পান খাওয়া রাঙা ঠোঁটে আধফোটা হাসল। খুব মিষ্টি, মধুর দেখাল তাকে। মিথিলা সেদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল বড় করে, কেন নিজেও জানে না। লিপা হেসে, পানের পিক ফেলে এসে পান মুখে রেখেই, ঠোঁটে অদ্ভুত ভঙ্গি করে বলল, সবসুময় খাই না গো আফামনি, মাজে মুইদ্যে সখ কইরা খাই।

ও আচ্ছা। —বলল মিথিলা। আর কী বলবে খুঁজে পেল না। খুব গল্পবাজ নয় সে। কথাবার্তা চালানোয় ভীষণ অপটু, অদক্ষ সে। গল্প জমাতে পারে না সহজে। কিন্ত লিপা মনে হয় আজ গল্পের মেজাজে আছে। হড়বড় কথা বলছে। শেষে, মিথিলাকে প্রায় চমকে দিয়ে সে বলল, আফামনি না আমার গফ্ হুনবার চাইছুইন?

অ্যাঁ? —লিপার কথা বুঝতে পারল না মিথিলা।

আফনে না আমার গফ্ হুনবার চাইছুইন একদিন?

এবার বুঝল মিথিলা। মনে পড়ল, হ্যাঁ, সে একদিন লিপার সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল বটে। লিপার কথায় নড়ে চড়ে বসল সে। মন্দ হয় না। এত তাড়াতাড়ি ঘুমও আসবে না তার। তাই সোৎসাহে বলল, বলবে এখন? বেশ তো! বলো না!

লিপা পান চিবুনো বন্ধ করল এবার। পানের ছোবা ফেলে ধুয়ে এল মুখ। নিজের বিছানায় বসল আসন গেড়ে। মনে মনে যেন গুছিয়ে নিল কী বলবে, কীভাবে বলবে। তারপর আচমকা বলে বসল, আফামনি, সব হুইন্যা আমারে কামের থনে ছাড়াইয়া দিয়েন না যে!

তার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল, যার তীব্রতায় ভূত দেখার মত চমকে গেল মিথিলা। অস্ফুটে বলল, একথা বলছ কেন?

আমার গফ হুনলেই বুইজবাইন গো আফামনি!

আচ্ছা, তাড়াবো না। তুমি বলো।

লিপা বলে যায়। যেন অনেক দূর থেকে কথা বলে কেউ। সামনে বসা ঐ মেয়েটা নয়। সে কথা বলে, দুচোখ বেয়ে অবিরল জল গড়ায়। লিপা চোখ মোছে না, মোছার চেষ্টাও করে না। তার কণ্ঠের ওঠা-নামাটা শুধু টের পাওয়া যায়। মিথিলা স্তব্ধ হয়ে শুনতে থাকে। একটিও কথা না বলে, একটিও প্রশ্ন না করে শুনে যায় সে। বলা শেষ হলে মাথা নিচু করে বসে থাকে লিপা। সামনে বসে থাকা ঐ দুঃখী, সব হারানো মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ব্যথায় মুচড়ে ওঠে মিথিলার বুক। তার ইচ্ছে করে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে মেয়েটাকে। তাকে সান্ত¡না দেয়, তার সাথে একাত্ম হয়ে কাঁদে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই করে না সে। ঠায় বসে থাকে। মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পর্যন্ত পারে না। শুধু লক্ষ্য করে, তার দুচোখ দিয়েও জলের উষ্ণ স্নারাতে নেমেছে।

মিথিলার কেবলই মনে হয় সে বা লিপা, তারা আলাদা কেউ নয় আদতে! তাদের কষ্ট ভিন্ন, গল্প ভিন্ন, চেহারা ভিন্ন। তবু কোথায় যেন অনেক বড় একটা সামঞ্জস্য আছে তাদের মধ্যে। সেটা ঠিক কোথায়? মিথিলা হাতড়ে মরে, মিথিলা হয়রান হয়ে খোঁজে। কিন্তু পায় না খুঁজে। আর পায় না বলেই আরও বেশি অস্থির লাগে তার। ছটফট করে। কিন্তু তার মন বলে, সে বা লিপা মূলত আলাদা কেউ নয়। সমাজে তাদের অবস্থান ভিন্ন, কিন্তু সমাজের চোখে তারা দুজনই সামান্য ‘শরীর’ বৈ নয়। যা সামান্যতেই অশুচি হয়ে যায়, অচ্ছুত হয়ে যায়। সেখানে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা, তাদের কোনো অপরাধ থাকুক বা না থাকুক!