খুব অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে ছিল না লিপা। বরং বেশ গরিবই ছিল তারা। তার বাবা কৃষি কাজ করত। নিজেদের সামান্য জমি ছিল আর অন্যের জমিতে বর্গা চাষ করে সংসার চলত তাদের। তার বড় ভাইটা কয়েক ক্লাস পর্যন্ত পড়েছিল গ্রামের স্কুলে। তারপর, পড়াশোনায় ইস্তফা দিয়ে ক্ষেতের কাজে হাত লাগিয়েছিল সে-ও। দু ভাই-বোনের মধ্যে লিপা ছোট ছিল। বেশ আদরেই বড় হচ্ছিল সে। ক্লাস এইটে পড়ার সময়ে তার বিয়ের সম্বন্ধ আসতে থাকল। একটি প্রস্তাব বেশ মনে ধরল তার বাবা রজব আলীর। এমন আহামরি কোনো প্রস্তাব নয়, তবু তাদের পরিবারের তুলনায় নেহাৎ ফেলনাও নয়। ছেলে ইন্টারমিডিয়েট পাস, ঢাকায় থাকে, গার্মেন্টসে চাকরি করে। দেখতে শুনতে ভালো, ছোট পরিবারের একমাত্র ছেলে। রজব আলী খোঁজ খবর নিয়ে অমত করার কোনো কারণ খুঁজে পেল না। এককথায় রাজি হয়ে গেল সে। তাছাড়া ছেলের তেমন কোনো চাহিদা নেই। শুধু মেয়েকে তার সাধ্যমত সাজিয়ে দিলেই হবে। লিপা গরিবের মেয়ে বলে, দেখতে বেশ ভালো ছিল বলে, তাকে নিয়ে বেশ বিপদেই ছিল তার বাবা রজব আলী। মেয়েকে পাত্রস্থ করার এই সুযোগ হেলায় হারানো নিতান্তই বোকামি বলে মনে হল তার। দিনক্ষণ ঠিক করা হল অতি তড়িঘড়ি। বিয়ে হয়ে গেল লিপার।

হারুনকে খুব যে অপছন্দ হয়েছিল লিপার তা নয়, বরং সে খুশিই ছিল। তার বয়সী মেয়েদের বিয়ে হয়ে সুখে সংসার করা উচিৎ, এমনটাই জানত সে। স্বপ্নও দেখত তেমনই। তাই বিয়েতে সে অখুশি ছিল না মোটেই। হারুন চাকরি করে, ঢাকায় থাকে, সেও ঢাকায় থাকবে; নির্ঝঞ্ঝাট সংসার পাতবে হারুনের সাথে—এমন কল্পনায় বরং সে বিভোর হল। অধীর হল, কবে সে শুরু করবে সংসার। হারুনও ভালোবাসল তাকে। ভালোবাসায়, আদরে স্বপ্নময় করল লিপার মন। কত স্বপ্ন দেখল, কত পরিকল্পনা করল তারা! কিভাবে তারা সংসার সাজাবে, কিভাবে তারা একে অন্যকে সুখে ভরিয়ে দেবে তা নিয়ে আলোচনাও হল বিস্তর।

বিয়ের জন্য এক সপ্তাহ ছুটি পেয়েছিল হারুন। দেখতে না দেখতেই ছুটি ফুরোল তার। ঢাকায় ফিরে গেল সে। লিপা তার মা-বাবার কাছেই থাকল। মাঝে কয়েকবার শ্বশুর বাড়ি থেকেও ঘুরে এল। লিপার মোবাইল ছিল না তখন। ভাইয়ের ফোনে সে হারুনের সাথে কথা বলত। হারুন বলেছিল, হাতে কিছু টাকা জমলেই সে লিপাকে একটা মোবাইল সেট কিনে দেবে। তার আগে, মেস ছেড়ে একরুমের ছোট্ট একটা বাসা নেবে। তারপর খুব তাড়াতাড়িই লিপাকে নিয়ে যাবে নিজের সংসারে। তারপর? শুধু সুখ আর সুখ! আনন্দ আর আনন্দ! সুখ, আনন্দ! ভাবতেই খুশিতে, উত্তেজনায়, ছটফটিয়ে উঠত লিপা। অপেক্ষা যেন ফুরোতেই চাইত না আর। তারপর, সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে, সত্যি সত্যিই একদিন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ এসে উপস্থিত হল তার জীবনে।

হারুন ফোন করে জানাল, বাসা নিয়েছে সে, লিপা যেন চলে আসে ঢাকায়। সে অফিস থেকে কোনোভাবেই ছুটি নিতে পারবে না তখন। কিন্তু লিপা কার সাথে যাবে? তখন ধান কাটার মৌসুম। তার বাবা এবং ভাই দুজনই ভীষণ ব্যস্ত। অন্যের জমি চাষ করে তারা, নিজের স্বাধীনতা নেই সেখানে। তাই ইচ্ছে থাকলেও সেই মুহূর্তে তাদের পক্ষে লিপাকে নিয়ে ঢাকা যাওয়া সম্ভব ছিল না। ওদিকে হারুন বারবার তাগাদা দিচ্ছিল তাড়াতাড়ি যেতে। লিপাও পারলে তখনই ছোটে। শেষমেষ হারুন লিপাকে একাই চলে যেতে বলল। সব শুনে লিপারও মনে হল একা যাওয়াটা সত্যিই কোনো সমস্যা না। সরাসরি ঢাকায় যায় এমন গাড়িতে উঠে লিপা বাসের কোনো যাত্রীর ফোন থেকে হারুনকে একটা মিসকল দিলেই হারুন যোগাযোগ রেখে সময়মত লিপাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে নেবে। কোনো ঝামেলা নেই, কোনো অসুবিধা নেই।

লিপাও ভেবে দেখল শুধু শুধু তার বাবা বা ভাইকে অসুবিধায় ফেলার চেয়ে বরং একা চলে যাওয়াটাই ভালো। সে সব কিছু গুছিয়ে, তার মা নতুন সংসারের জন্য সাধ্যমত যা কিছু দিল সেগুলো বেঁধেছেঁদে, ভাইয়ের সাথে রওনা হল অবশেষে। তার আগে মা-বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ভাসাল। এতদিনের চেনা, পরিচিত জায়গা ছেড়ে, বাবা-মাকে ছেড়ে, যেতে খুব কষ্ট হল তার। উথালপাথাল দুঃখ জমল বুকে।

বাসস্টেশনে এসে, ভাইয়ের ফোন থেকে বাসের নাম এবং বাস ছাড়ার সময় হারুনকে জানাল লিপা। ঠিক সাড়ে আটটায় ছেড়ে দেবে বাস। বাসে ওঠার সময় একমাত্র ভাইটাকে জড়িয়ে ধরে আরও একবার কাঁদল। ছোট বেলা থেকে একসাথে বেড়ে ওঠা ভাইটার সাথে কত টুকরো স্মৃতি ভেসে উঠল তার চোখে। কেঁদে আকুল হল লিপা। কাঁদল তার ভাইটাও। সান্ত¡Íনা দিল তাকে। বলল, একটু কাজের চাপ কমলেই সে ঢাকায় যাবে। দেখবে কেমন সাজিয়েছে লিপা তার ছোট্ট সংসার। লিপা মা-বাবা, ভাই, আবাল্য পরিচিত নিজের সেই চেনা পরিবেশ, সবকিছু ছেড়ে যাওয়ার কষ্টকে পাশ কাটিয়ে, স্বামীর সাথে সংসারের সুখময় ভবিষ্যতের ছবি মনের মধ্যে আঁকতে আঁকতে, দুরুদুরু বুকে উঠে বসল বাসে। ছেড়ে দিল বাস। লিপা জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, তার প্রিয় ভাই, তার চেনা পরিবেশ একটু একটু করে দূরে সরে গেল। মিলিয়ে গেল সামনে থেকে, ভোজবাজির মত।

কোনোদিন শহরে যায়নি লিপা। সে শহরে স্বামীর কাছে যাবে। ফলে সবচেয়ে ভালো শাড়িটা সে পড়েছিল সেদিন, সেজেছিল খুব সুন্দর করে। শ্বশুরবাড়ি আর বাপের বাড়ি থেকে যে দু-চারখানা গহনা সে পেয়েছিল, গায়ে জড়িয়েছিল সেগুলো। তাকে দেখে কতটা খুশি হয়ে উঠবে হারুন, সেই বা কী বলবে হারুনকে দেখে, সেসব ভেবে ভারি লজ্জা হচ্ছিল তার, রোমাঞ্চিত হয়ে উঠছিল মন।

লিপার সিট ছিল পেছনের দিকে, জানালার পাশে। তার পাশের সিটটায় একটা ছেলে বসেছিল। বিশ-একুশ বছর বয়স। গাড়িটা সরাসরি ঢাকায় যাবে, সবাই ঢাকায় নামবে, জানা কথা। তবু লিপা ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবে সে। মূলত, তার উদ্দেশ্য ছিল, ছেলেটার সাথে খাতির জমিয়ে তার ফোন থেকে হারুনকে মিসকল দেওয়া। ছেলেটার কাছে ফোন আছে, আড়চোখে দেখেছিল সে। ছেলেটা জানাল, সে ঢাকায় যাবে। মিথিলা হড়বড় করে তার আদ্যোপান্ত জানাল তাকে। সে কেন, কার কাছে ঢাকায় যাচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং তারপর সে লাজুক চোখে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল, সে ছেলেটার ফোন থেকে তার স্বামীকে একটা মিসকল দিতে চায়। এক কথায় রাজি হয়ে গেল ছেলেটা। মিসকল নয় বরং কলই দিতে বলল তাকে। লিপা অতঃপর, খুশিতে গদগদ হয়ে ফোন দিল হারুনকে। হারুন লিপার সাথে কথা বলে নিশ্চিন্ত হয়ে, ছেলেটার সাথেও কথা বলল। তাকে অনুরোধ করল, সে যেন দেখে রাখে লিপাকে, যেন সাহায্য করে, কারণ লিপা আগে কখনোই শহরে আসেনি। ছেলেটা, হারুনকে আশ্বস্ত করল। অভয় দিল। চিন্তা করতে নিষেধ করল। সে নিজেও টঙ্গীতেই নামবে, বলল সে। যখন শুনল, টঙ্গী থেকে লিপাকে নামিয়ে নেবে হারুন।

নিশ্চিন্ত হয়ে, ফোন রেখে দিল হারুন। লিপাও গুছিয়ে বসল এবার। সব শঙ্কা, সব উদ্বেগ দূর হল নিমেষেই। বাসে সারাপথ অনেক গল্প করল তারা। ততক্ষণে, ছেলেটার নামও জেনে নিয়েছে মিথিলা। রাসেল। কোনো এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, জানাল নিজেই। লিপাকে আমড়া আর ঝালমুড়ি কিনে খাওয়াল। লিপাও তাকে বাদাম কিনে খাইয়েছিল। এর মধ্যে বেশ ক’বার হারুনের সাথে কথা হয়েছে তার, কথা হয়েছে তার ভাইয়ের সাথেও।

ছেলেটার কথায়, ব্যবহারে, রীতিমত মুগ্ধ হয়ে গেল লিপা।

বাস থামল এক জায়গায়। গাজীপুরের চৌরঙ্গী নাম জায়গাটার। লিপাকে তেমনই বলল রাসেল। সেখানে, লিপাকে নিয়ে নামল রাসেল। লিপা বলল, তার স্বামী তো তাকে টঙ্গী নামতে বলেছে, তাহলে এখানে কেন নামবে তারা? উত্তরে রাসেল বলল, এখান থেকে সিএনজি করে টঙ্গী যেতে হয়। লিপার একটু খটকা লাগল। সে কথা বলতে চাইল হারুনের সাথে। শুনে হাসল রাসেল। বলল, আপনি আমাকে এখনও ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না, না ? ঠিক আছে, আপনার স্বামীর সাথে কথা বলেন।

বলে, সে ফোনটা বাড়িয়ে দিল লিপার দিকে। লিপা লজ্জা পেল, তার মন থেকে মেঘ সরে গেল। সে অপ্রস্তুত গলায় বলল, না, থাক। কথা বলতে হবে না।

রাসেল বাস থেকে নেমে, তাকে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে সিএনজি নিয়ে এল। ফোনে কথা বলতে বলতে এল সে। লিপার কাছে এসে তাকে উঠতে বলল সিএনজিতে। উঠল লিপা। রাসেল তার ব্যাগগুলো টেনে তুলে, নিজেও উঠে বসল। লিপাকে বলল, এইমাত্র ফোনে কথা বললাম আপনার স্বামীর সাথে। উনি কাছাকাছি চলে এসেছেন। আপনি গিয়েই উনাকে দেখতে পাবেন, কোনো চিন্তা নেই।

বলে হাসল রাসেল। নির্দোষ, নিষ্কলুষ হাসি। লিপা চুপ করে রইল। কিন্ত কেন কে জানে, সিএনজিতে ওঠার পর থেকেই আর ভালো লাগছিল না তার। কেমন ভয় ভয় লাগছিল, অস্থির লাগছিল। সে এক সময় অধৈর্য হয়ে প্রশ্ন করল, আর কত দূর?

রাসেল আবার হাসল। অভয় দিল, বলল, এই তো, চলে এসেছি প্রায়।

ঠিক কতক্ষণ পরে জানে না লিপা, হয়ত আধাঘণ্টা, কিংবা বেশি অথবা কম, একটি জীর্র্ণ, পুরাতন, পলেস্তারা খসা, ইট বের হওয়া বাড়ির সামনে এসে থামল তাদের সিএনজি। ছেলেটা নামল। লিপাকেও নামতে বলে, টেনে ব্যাগগুলো নামাল গাড়ি থেকে।

লিপা নামল। এদিক ওদিক তাকাল। না, হারুন কোথাও নেই। সে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ও, ও কোথায়?

রাসেল হাসল আবারও। শান্ত, সুন্দর হাসি। বলল, কে? আপনার স্বামী? আছে, ঐ যে বাড়িটা দেখছেন, ঐ বাড়িতে। আপনি এসে পড়েছেন টের পায়নি বোধহয়। চলুন আমরাই যাই।

লিপা বলল, একটা মিসকল দেন, চলে আসবে।

আর বলবেন না আপা, ফোনের চার্জ শেষ, বন্ধ হয়ে গেছে। ফোন দেওয়া যাবে না আর।

ততক্ষণে সিএনজিঅলা ভাড়া নিয়ে বিদেয় হয়েছে। সেই নির্জন রাস্তায়, প্রায় ভূতুড়ে একটি বাড়ির সামনে দাঁড়িযে গা ছমছম করে উঠল লিপার। গায়ে কাঁটা দিল। রাসেল তার ব্যাগগুলো দুহাতে নিয়ে তাড়া দিল তাকে, আসুন, তাড়াতাড়ি আসুন!

লিপা তবু ঘাড় গোঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল, বলল, আপনি গিয়ে ওকে পাঠিয়ে দিন!

দূর! আপনি এখনও আমাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না! মেয়েমানুষকে নিয়ে এই এক জ্বালা! ঠিক আছে, আপনি এখানেই দাঁড়ান। আমি উনাকে পাঠাচ্ছি।

বিরক্তভাবে কথাগুলো বলে, হনহন হাঁটতে শুরু করল রাসেল। অগত্যা, লিপাও অনুসরণ করল তাকে। বাড়িটাতে ঢুকে, রাসেল হাত দিয়ে তাকে একটা রুমের দিকে ঈঙ্গিত করে বলল, ঐ যে, ঐ রুমে আপনার স্বামী থাকে, যান।

লিপার মনে একবারও এ প্রশ্ন আসেনি তখন যে, হারুন ঐ রুমে থাকে সেটা রাসেল কীভাবে জানল! সে তো আগে থেকে চেনে না হারুনকে! লিপা মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে গেলো সেদিকে, পেছনে রাসেল। দরজা ভেজানো ছিল। সে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। কিন্তু, কোথায় হারুন! সাথে সাথেই ঘুরে দাঁড়াল লিপা। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে তখন। রাসেল তাকে ধাক্কা দিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বন্ধ করে দিল দরজা।

তারপরের ইতিহাস খুবই সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত। ঘরের মধ্যে আরও চারজন ছিল, তাস পেটাচ্ছিল। সম্ভবত, কোনো নেশাও করেছিল বা করছিল তারা। সেদিন, সেই পাঁচজন, পরপর, কয়েকবার, ধর্ষণ করল তাকে। একসময় জ্ঞান হারাল সে।

ঠিক কতক্ষণ, ক’ঘণ্টা বা ক’দিন পর, জানে না লিপা, জ্ঞান ফিরল তার। সারা শরীরে তীব্র ব্যথা, যন্ত্রণা আর ক্ষত নিয়ে জেগে উঠল সে। জেগে উঠেই, অনুশোচনা ও আফসোসে ভরে গেল তার মন। মনে হল, কেন সে জেগে উঠল আবার! কেন সে মরে গেল না তক্ষুনি! কিন্তু তখনও, আরও কিছু বিস্ময়, আরও কিছু আশ্চর্য অপেক্ষা করছিল তার জন্য। সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক বেশ্যালয়ে, যেখানে বেশ্যা হিসেবে বিক্রি হয়ে গেছিল সে।

শুরু হল তার নতুন জীবন। বেশ্যা হিসেবে নাম লেখা হয়ে গেছে তার, এ থেকে আর মুক্তি নেই—বারবার, নানা ভাবে একথা বোঝানো হল তাকে। সে বাধা দিতে চাইল, প্রতিবাদ করতে চাইল, কাঁদল, চিৎকার করল। বিনিময়ে, অত্যাচার করা হল তাকে, বাধ্য করা হল। তারপর শ্রান্ত হয়ে, ক্লান্ত হয়ে, অন্য সবারই মত সে-ও মেনে নিল ভারবাহী সেই পশুজীবন। বুঝল এ থেকে আর মুক্তি নেই তার, পরিত্রাণ নেই এই নরক থেকে।

প্রতিদিন নতুন খদ্দের আসত তার ঘরে। খরিদ করত তার শরীর। সুখ নিত, আনন্দ নিত। শুধু সে-ই নিরানন্দে, অসুখে, ডুবে যেতে থাকল ক্রমশ। বেশ্যা হিসেবে বিকোতে সায় দিত না তার শরীর, মন। খদ্দেরদের একজনকে সে হাতে-পায়ে ধরে যোগাযোগ করল তার ভাই আর হারুনের সাথে। হারুন আসেনি। তালাকনামা পাঠিয়েছিল সে। তার ভাই এসেছিল। তাকে বেরও করেছিল সেই নরক থেকে। কিন্তু তাদের গ্রামে, ততদিনে লিপার কাহিনি অজ্ঞাত ছিল না কারোই। ফলে তার ভাই, তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে, চোখের জল মুছে বিদায় নিয়েছিল অতঃপর। জানিয়ে গেছিল বাবা-মায়েরও এই-ই মত। এক নরক থেকে বের করে বৃহৎ আর এক নরকে লিপাকে ফেলে রেখে চলে গেছিল সেদিন তার অতি প্রিয় ভাইটি।

না, আর কাঁদেনি লিপা। চোখের জলও ফেলেনি আর। অনেক ঘাটের জল খেল সে এরপর। ঝুলিতে ভরল অনেক যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতা। তারপর একসময় বিয়ে করল সে তার বর্তমান স্বামী শিপলুকে। শিপলু আলাভোলো ধরণের মানুষ। সব জেনেই বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল লিপাকে। কেন, জানে না লিপা। তবে অশিক্ষিত, আলাভোলো শিপলুর সাথে খুব মন্দ কাটছে না তার দিন। অন্তত শরীর বিকোতে হচ্ছে না আর। তার বাবা-মা, ভাই, আর খোঁজ নেয়নি তার, তাকে ত্যাগ করে বেঁচেছে তারা ততদিনে।