বিয়ের পর আরও প্রায় আড়াই মাস দেশে থাকল স্বপন। এই সময়টা, প্রায় ঘোরের মধ্যে কাটল মিথিলার। প্রথম রাত্রির আড়ষ্টতা, অপমানের যন্ত্রণা, অস্বস্তি, কেটে গেল তার। যেহেতু স্বপনের প্রতি ছিল তার সত্যিকারের প্রেম, নির্ভেজাল ভালোবাসা। সে কারণেই হয়ত, স্বপনকে সে মন থেকেই ক্ষমা করতে পারল। স্বপনের অজ্ঞতা, রুচির স্থূলতা, ভালোবাসার সংকীর্ণতা সবকিছুই সে মেনে নিল। নির্দ্বিধায় নয় অবশ্যই। মনের মধ্যে যে দ্বিধা, যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল সেটা দূর হতে চায়নি সহজে। স্বপন ‘বহুগামী’—তার মন এটা মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না একবারেই। কিন্তু স্বপনের দ্বিধাহীন সমর্পণ ও স্বীকারোক্তি, আর কোনো ‘ভুল’ না করার প্রতিশ্রুতি, শুধু মিথিলাকেই ভালোবাসার অঙ্গীকার, সর্বোপরি মিথিলার নিজের নড়বড়ে অবস্থান—সব মিলিয়ে, স্বপনকে শেষ পর্যন্ত মেনে নিল সে! মন থেকে সরিয়ে দিল সকল দ্বিধা ও সংশয়, সন্দেহ ও অবিশ্বাস। সে, ক্ষমা করল স্বপনকে। স্বপ্ন দেখল সুন্দর আগামীর।

ধীরে ধীরে, মিথিলা মেনে নিল যে, শেষ পর্যন্ত জীবনটা বইয়ে লেখা কাহিনির মত নয়। নয় কোনো সরল গদ্যও। কল্পনা আর বাস্তব যে গাঁটছড়া বাঁধে না বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই—একথা বুঝল সে। আর তাই মিথিলা খুব করে চেষ্টা করল সব কল্পনা দূরে সরিয়ে রেখে, যা আছে, যা পেয়েছে, তাই নিয়ে সুখি হতে। স্বপনের মা-ও একটু একটু করে সহজ হলেন, মেনে নিলেন মিথিলাকে, বাধ্য হয়েই।

মিথিলা স্বপনের সাথে আনন্দেই কাটাল সেদিনগুলো। মান-অভিমান হল মাঝে মধ্যেই, আবার তা মিটেও গেল। প্রথম রাতের যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতা মুছে গেল। শরীর জাগল, শরীরের আনন্দে মেতে রইল তারা। কিন্ত সময় দ্রুত ফুরিয়ে গেল। স্বপনের চলে যাওয়ার ক্ষণ এসে গেল। চলে গেল সে। কাঁদতে কাঁদতে, চোখের জল মুছতে মুছতে স্বপনকে বিদায় দিল মিথিলা। তারপর সিনেমায় দেখা সস্তা দৃশ্যগুলোর মতোই বিছানায় উপুড় হয়ে, ফুলে ফুলে, ফুঁপিয়ে কাঁদল সে। নিখাদ, নির্ভেজাল কান্না। প্রগাঢ় বিষাদ ছেয়ে ফেলল তাকে। ঘিরে ধরল দুঃসহ একাকিত্ব। স্বপন স্বীকার করেছিল, সে বিদেশে গিয়ে প্রায়ই ছুটির দিনে পতিতালয়ে যেত! আর যাবে না, কথাও দিয়ে গেল সে!

মনের মধ্যে বিঁধে যাওয়া চোর কাঁটাটা তবু সরলো না তার। হৃদয়ের কোনো এক কোণে জেগে রইল সেটা। জেগে রইল বিষাদ ও বিষণœতা। যে স্বপ্ন সে দেখেছিল, যে জীবন সে চেয়েছিল, এ যেন তা নয়। ফলে অতৃপ্তি জন্ম নিল মনে। আগের মতই চিঠি আসে, সে-ও পাঠায়, তবু সেই আগ্রহ আর খুঁজে পায় না সে, সেই ভালোলাগাটা যেন নেই আর! উচ্ছ্বাস! সেই বা হারাল কোথায়? তবু, মিথিলা মনে মনে দিন গুনতে থাকে, কবে আসবে স্বপন। স্বপনদের সংসারে তার অবস্থানটাও খুব পোক্ত নয়। স্বপনের মা সুযোগ পেলেই খিটিমিটি করেন, বোনটা শুধুই কথার হুল ফোটায়। কিছুই বলে না মিথিলা। অশান্তি চায় না সে, অস্বস্তি বরং ভালো।

ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে স্বপনের আপত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাটাই মিথিলা দিল না শেষপর্যন্ত। ভর্তি হল স্থানীয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত অখ্যাত এক কলেজে। স্বপ্নগুলোও, আস্তে আস্তে ছেড়ে গেল তাকে। কলেজে সে যায় আসে, কিন্তু আগের সেই উৎসাহটা খুঁজে পায় না আর। নিজেদের বাড়ির পাশ দিয়েই কলেজে যাওয়া-আসা করে সে। কিন্তু ও বাড়িতে আর ঠাঁই নাই তার, অবাঞ্ছিত সে ওখানে। নিজের কৃত অপরাধটায় সে নিজেই কাঁটা হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে, পথের মধ্যে দেখা হয়ে যায় তার বাবার সাথে। দেখেও না দেখার ভান করে মুখ ঘুরিয়ে নেন তিনি। চোখের জল মুছে মিথিলা নিজের পথে চলে যায়। জানে, যা সে করেছে, যে অন্যায় সে করেছে—এই-ই তার যোগ্য শাস্তি।

স্বপন টাকা পাঠাল তার নামে, বিশ হাজার। ভীষণ রেগে গেলেন স্বপনের মা। কড়া ভাষায় চিঠি লিখলেন ছেলেকে, যেন আর কখনই সে মিথিলার নামে টাকা না পাঠায়। মিথিলার প্রয়োজনমত টাকা তিনিই মিথিলাকে দেবেন। স্বপন যেন তার বাবা বা মায়ের নামে টাকা পাঠায়। স্বপন আর মিথিলার নামে টাকা পাঠাল না। কলেজে যাওয়ার সময় স্বপনের মায়ের কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিতে হয়। অস্বস্তি, লজ্জা! তবু কোনো অভিযোগ করল না মিথিলা। বরং স্বপনের টাকায় তার পড়ার খরচ চালাতে হয় বলে নিজেকেই তুচ্ছ, ছোট মনে হল তার। সময় গড়াল। দুই বছর আট মাস পর আবার ফিরে এল স্বপন। মিথিলার তখন বিশ চলছে।

এবারও তিন মাস থাকল স্বপন। এই তিনমাসের মধ্যেই একদিনের ঘটনায় স্বপনের প্রতি প্রবল ঘৃণায় ভরে গেল মিথিলার মন। আবার তার মধ্যে জাগল তীব্র হাহাকার। অনুশোচনায় তিক্ত হল মন। এবং তার মনে হল, স্বপনকে বিয়ে করে চরম ভুল করেছে সে। যে ভুলের কোনো শোধন সেই মুহূর্তে জানা ছিল না তার। বাড়ি থেকেই কলেজ করত মিথিলা। বাসে যাওয়া-আসা করত। সেদিনও রুটিনমত কলেজের উদ্দেশ্যে বের হল সে। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পরেই ফিরে এসে স্বপন আর তার জন্য বরাদ্দকৃত ঘরটাতে ঢুকে দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁদতে থাকল। স্বপন বারবার জানতে চাইল কী হয়েছে মিথিলার। কেন সে কাঁদছে, মিথিলা বলল না কিছুই। বরং কান্নার বেগ আরও তীব্র হল তার। ভীষণ বিরক্ত স্বপন, চোখ মুখ কুঁচকে, ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করল। মিথিলার কান্নার বেগ একটু কমে এলে আবার জানতে চাইল কী হয়েছে তার, কেন কাঁদছে। মুখ খুলল মিথিলা, অবশেষে।

প্রচণ্ড ভিড় ছিল বাসে। মিথিলার সেদিন টিউটরিয়াল পরীক্ষা ছিল, যেতেই হতো কলেজে। সে তাই ভিড় ঠেলে বাসে উঠে কোনোমতে দরজার পাশে একটু জায়গা করে নিল। দরজার হাতল ধরে দাঁড়িয়ে রইল। পরবর্তী স্টপেজ আসার ঠিক আগে, বাস থামার আগমুহূর্তে মিথিলা বুঝতেও পারল না কার হাত, কোন দিক থেকে এল; অদৃশ্য একটা হাত ধেয়ে এল তার বুক লক্ষ্য করে। পিষ্ট করেই ভোজবাজির মত শূন্যে মিলাল। কেউ দেখল না, কেউ খেয়াল করল না। লজ্জায়, অপমানে, ক্ষোভে, যন্ত্রণায় মিথিলার দুচোখ উপচে জল গড়াল। ঠোঁট কামড়ে সে কান্না সামলাল। তার আর পরীক্ষা দেয়া হল না। সেখানেই নেমে পড়ল সে। ফিরতি বাসে উঠে চলে এল বাড়ি। নিজেকে একটা নোংরা পশু, অশুচি কোনো জীব মনে হল তার।

স্বপন সব শুনল চুপচাপ। তারপর, কিছুক্ষণ চুপ থেকে, যে প্রশ্নটা সে করল মিথিলাকে, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না মিথিলা। সে তাই চমকে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে, যন্ত্রণায় কাতর হয়ে জলভরা চোখে তাকিয়ে রইল স্বপনের দিকে। তার মনে হল, স্বপন! এই সেই স্বপন!

হিংস্র ভঙ্গিতে স্বপন প্রশ্ন করল, বাসে তো আরও ‘মেয়েমানুষ’ ছিল, তাদের ছেড়ে তোমার গায়েই হাত দিল কেন?

কেন? হা ঈশ্বর! এই কেন’র কী জবাব দেবে মিথিলা! মিথিলা মূক, নির্বাক।