আবার চলে গেল স্বপন। যাওয়ার আগে সে মিথিলাকে একটা মোবাইল ফোন কিনে দিয়ে গেল এবার। এবং মিথিলা তার শরীরের নিভৃততম কোণে অন্য এক শরীরের অস্তিত্ব টের পেল। স্বপনও জেনে গেল সে খবর। খুব খুশি হল সে-ও। খুশি হল মিথিলাও। স্বপনের পরিবারের সবাইকেই খুশি দেখাল। মিথিলা নিজের মনে থাকে। কলেজে তখন খুব প্রয়োজন ছাড়া যায় না সে। স্বপনের সাথে প্রতিদিনই কথা হয়, স্বপনের মা-ও মিথিলার শরীরের যতœ নেন বেশ। এর মধ্যেই ভীষণ আনন্দময় একটা ঘটনা ঘটে গেল। দারুণ খুশিতে ভরে উঠল তার মন।

সৎ মা রেহানা এসে ও বাড়িতে নিয়ে গেলেন তাকে। মিথিলার মনে হল অনেক বছর, অনেক যুগ পর সে নিজের বাড়িতে ফিরল যেন বা। নিজের বাড়ি! মিথিলার নিজের বাড়ি! নিজেরই কি বাড়ি? ভাবল মিথিলা। স্বপনদের বাড়িটা তার নয়। ওটা তার শ্বশুরবাড়ি। এই বাড়িটাও তার নয়। এটা তার বাপের বাড়ি। তাহলে তার নিজের বাড়ি কোনটা? কবর? মিথিলা ভাবে, বিড়বিড় করে নিজের মনেই, উদ্বাস্তু! তারা, মেয়েরা, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত উদ্বাস্তু। তার নিজের কি একটা বাড়ি হতে পারে না, এই ধরাধামেই? সাতপাঁচ ভাবে মিথিলা। ভাবনায় পায় তাকে।

মৃত্তিকা এল। খুব চুপিসারেই এল। ফোনে মেয়ের কান্না শুনে কী যে খুশি হল স্বপন! আনন্দে, উত্তেজনায় চোখে জল এল মিথিলার। মৃত্তিকার নরম, টুলটুলে মুখের দিকে তাকিয়ে কী অপার্থিব মায়া জাগল মিথিলার বুকে! আহা! এত সুখ, এত আনন্দও তার জন্য জমিয়ে রেখেছিলেন ঈশ্বর! এই ছোট্ট, সুন্দর, জ্যান্ত পুতুলটা তার! মৃত্তিকাকে নিয়ে দারুণ ব্যস্ততায় কাটে তখন মিথিলার সময়। দারুণ উদ্বিগ্ন সে মেয়েকে নিয়ে। কলেজে যাওয়া প্রায় ছেড়েই দিল সে। কোথায় হারাল তার সেই সব আকাশ ছোঁয়ার ইচ্ছেগুলো!

মৃত্তিকা একটু একটু করে বড় হয়, আধো আধো কথা বলে। কী এক অদ্ভুত সুখে, তৃপ্তিতে বুক ভরে যায় মিথিলার, মায়ায় ভরে ওঠে মন। তার ইচ্ছে করে সারা পৃথিবী এনে ছড়িয়ে দেয় মেয়ের সামনে। কিন্তু তখনও তাকে স্বপনের মায়ের কাছে হাত পাততে হয় টাকার জন্য, নিজের বাবার কাছেও চাইতে পারে না। বড় লজ্জা, বড় সঙ্কোচ হয় তার। স্বপন মেয়ের জন্য এটা সেটা পাঠায়। মিথিলার ইচ্ছে করে সে নিজে কিছু কিনে দেয় মৃত্তিকাকে। কিন্তু নাচার সে। আহা, কত কিছু জানার, কত কিছু বোঝার যে বাকি ছিল তার! বস্তুত, জীবনের চেয়ে বড় শিক্ষক বা পাঠশালা আর কিছু নেই, জীবন থেকেই সেটা শিখল মিথিলা।

শুরু হল অশান্তি। স্বপন নয়, স্বপনের মা টাকা দেন তাকে। যা দেন, কথা শোনান তারচে ঢের বেশি। স্বপনের কাছে অনেক কথা লাগান, অনেক অভিযোগ করেন, সব অভিযোগ মিথ্যেও নয় আদতে। ফলে শুরু হল সন্দেহ, অবিশ্বাস। মিথিলাকে ফোন দিয়ে ফোন ব্যস্ত পেলেই হাজারো প্রশ্ন তার, হাজারো জেরা। বিরক্ত, ক্লান্ত, অতিষ্ঠ হয়ে উঠল মিথিলা। এরই মধ্যে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে আবার দেশে ফিরল স্বপন। মেয়েকে দেখে খুশিতে ভরে উঠল তার মুখ। স্নেহে, আদরে ভরে উঠল মৃত্তিকা।

দেশে এসে, মৃত্তিকাকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হল স্বপন। সিদ্ধান্ত নিল আর প্রবাসে যাবে না। দেশেই, এতদিনের জমানো টাকায় কিছু একটা করবে। বেশ কিছুদিন খুব খুশিতে, খুব আনন্দে কাটল তাদের। তারপরই শুরু হল কলহ, বাঁধল বিবাদ, নিত্য-নিয়মিত। স্বপনের সবকিছুই বড় স্থূল, বড় রুচিহীন হয়ে উঠল মিথিলার কাছে, অসহ্যও। অন্যদিকে, মিথিলাকেও খুব বেশি অহংকারী মনে হল যেন স্বপনের। বস্তুত, মিথিলা কোনো বিষয়ে অসম্মতি জানালেই স্বপন ভেবে নেয়, মিথিলা তাকে অপমান করছে, অবজ্ঞা করছে। বিরোধিতা করলেই ধরে নেয় তাকে ছোট করছে মিথিলা। মিথিলার মনে হল হীনম্মন্যতায় ভুগছে স্বপন। এসএসসি পাসটাও করেনি সে। মধ্যপ্রাচ্যে যে কাজ সে করত, খুব সম্মানের, খুব গর্বের কিছু যে ছিল না সেটা—তা-ও জানত মিথিলা। এটুকু বুঝতে খুব বেশি অসুবিধে তো তার হবার কথা নয় তার যে, ঐ বিদ্যের জোরে খুব ভালো কিছু, বেশি কিছু করা যায় না আদতে। এখানেই স্বপনের যত রাগ, যত ক্ষোভ! কেন এত বুঝবে তার বউ! একটু কম বুঝলে ক্ষতি কী! ক্ষতি যে কী সেটা মিথিলারও জানা ছিল না আদতে, একটু বেশিই বুঝে ফেলত সে, তারই বা কী করার ছিল তাতে!

মিথিলা চাইল, যেহেতু মৃত্তিকা একটু বড় হয়েছে তখন, আর স্বপনও ফিরে এসেছে, কাজেই পড়াশোনাটা আবার শুরু করে সে। কিন্তু স্বপনের প্রবল আপত্তি তাতে। এমনকি, মিথিলার বই পড়াতেও তার মত নেই আর। মিথিলা বারণ শুনল না। আবার কলেজে যাওয়া শুরু করল সে। চিরদিনই একরোখা সে; এবার যেন ধনুকভাঙ্গা পণ করল, যেভাবেই হোক অন্তত পড়াশোনাটা শেষ করবে। চরমে উঠল অশান্তি। সন্দেহ আর অবিশ্বাসের বিষবাষ্পে বিষিয়ে উঠল জীবনটা তার।

স্বপনের দৃঢ় বিশ্বাস, নিশ্চয়ই এমন কোনো ব্যাপার আছে মিথিলার যে কারণে স্বপনকে অগ্রাহ্য করেও কলেজে যেতে মরিয়া সে!

ব্যাপার ছিল বৈকি। তবে সেটা পড়াশোনা শেষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার। কিন্তু স্বপন ভুল বুঝল তাকে। সে সুযোগ পেলেই মিথিলার ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে। সেভ করা নম্বরগুলো খুঁটিয়ে দেখে, এমনকি কোনো নম্বর নিয়ে খটকা লাগলে সেখানে ফোন দিয়ে নিঃসন্দেহ হতে চায়। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যেতে চায় মিথিলার। স্বপ্ন, যা সে দেখত, দেখেছিল, সেসব ভেঙেছিল সেই কবেই, কল্পনাও ত্যাগ করেছিল তাকে—তবু, বাস্তবের কদর্যতা আর কর্কশতা আরও বিপর্যস্ত করে দিতে চাইল তাকে। তবু, যেহেতু মৃত্তিকা চলে এসেছে, সে আর একা নয়, মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে, তার টুলটুলে, কচি মুখের দিকে চেয়ে, দাঁত চেপে সহ্য করতে চাইল সে। যেন বা বলি হতে চাইল সংসার নামক যজ্ঞে।

কিন্তু, বাস্তবে মিথিলা দেখল, জীবন অতটাও সহজ নয়। আর সেও সর্বংসহা ধরণী নয়! কোনো স্বাধীনতা নেই তার, নেই কোনো সম্মান। শুধুই সন্দেহ আর অবিশ্বাস, অপমান আর অবজ্ঞা। এই সেই স্বপন যার জন্য সে ত্যাগ করে এসেছিল সর্বস্ব! যার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল সে!

হিসাব মেলাতে চেয়েছিল মিথিলা, মেলেনি। মূলত, কোনো হিসাবই শেষ পর্যন্ত মেলেনি তার।

এরকম সময়েই, একদিন, স্বপনের বাবা-মা, বোন, সবাই বেড়াতে গেছিল কোথাও। বেলা বারো কি সাড়ে বারোটা হবে তখন। কী মনে হল মিথিলার, সে মৃত্তিকাকে কোলে নিয়ে, স্বপনকে বলে, বাবার বাড়িতে গেল। স্বপন তখন ঘরে শুয়ে। কাজের মেয়ে জোহরা কাজ করছে রান্না ঘরে।

বাড়িতে গিয়ে মিথিলা দেখল, রেহানা অনেক আয়োজন করেছেন সেদিন। রান্না করেছেন অনেক পদ। ততদিনে, মিথিলার সাথে সাথে স্বপনকেও ও-বাড়িতে মেনে নিয়েছিল সবাই। মিথিলাকে দেখে রেহানা খুশিই হয়ে উঠলেন যেন। বললেন স্বপনকেও ডেকে আনতে।

বাইরে তখন খটখটে রোদ্দুর। আবার যাবে সে? কী দরকার? ফোনটা তো আছে! সে ফোন দিল স্বপনকে। ফোন বাজছে। বেজেই যাচ্ছে! ধরে না স্বপন। কেন? কী করছে সে? মিথিলা একের পর এক ফোন দিতে থাকে, অনেকক্ষণ পর, যখন মিথিলা নিজেই যাবে বলে পা বাড়িয়েছে, তখন ফোন ধরল স্বপন।

হ্যালো!

হ্যালো। খুব শান্ত, নীরিহ একটি শব্দ। তবু কী প্রচ- শক্তি ধরে! কী ছিল ঐ ছোট্ট শব্দটিতে ? কী ছিল স্বপনের কণ্ঠে সেদিন? জানে না মিথিলা। পরে এ নিয়ে অনেক ভেবেছে সে। উত্তর পায়নি কোনো। কিন্তু কিছু একটা ছিল! তার অবচেতন মন, তার ষষ্ঠেন্দ্রিয়, তাকে সংকেত পাঠিয়েছিল সেদিন মুহূর্তেই! ঐ হ্যালো বলাটা খুব সহজ, খুব স্বচ্ছন্দ, খুব স্বাভাবিক লাগেনি তার কানে। নিষিদ্ধ গন্দম খাওয়ার হর্ষ, উল্লাস, অপরাধবোধ, সব একাকার হয়ে যেন মিশে ছিল ঐ শব্দে! খট করে বেজেছিল তার কানে! আর তাই স্বপনের কণ্ঠে ঐ হ্যালো শুনেই কেঁপে উঠেছিল তার বুক, মাথাটা ফাঁকা হয়ে উঠেছিল মুহূর্তেই!

সে আর এক মুহূর্তও দেরি করেনি। মৃত্তিকাকে রেখেই, প্রায় উদ্ভ্রান্তের মত ছুটতে ছুটতে সে স্বপনদের বাড়ি চলে এসেছিল। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে, পাগলের প্রলাপ বকার মত চিৎকার করে প্রশ্ন করেছিল, ফোন ধরতে এত দেরি করলে কেন? কেন?

কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি স্বপন। একবার বলল, সে নাকি কাপড় ধুচ্ছিল! কোথায় সে ধোয়া কাপড়? জানতে চাইল মিথিলা। চুপসে গেল স্বপন! বসে রইল অপরাধীর মত। জোহরাকে খুঁজল মিথিলা। জোহরা কলপাড়ে বসা। তার মুখে, গলায়, হা ঈশ্বর, কিসের দাগ ওগুলো! মিথিলার দম বন্ধ হয়ে আসতে চাইল। মনে হল, মাথা ঘুরে সে পড়ে যাবে এক্ষুনি! সেই অবস্থায়, সে প্রায় ফিসফিস করে জোহরাকে জিজ্ঞেস করল, তোর মুখে, গলায়, কিসের দাগ?

জোহরা উত্তর দিল না, সে চোখ নামিয়ে নিল। তেমনই অধোমুখে বসে রইল নিরুত্তর, নির্বাক!

স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ মিথিলা সেখানেই বসে পড়ল। ঠিক কতক্ষণ সে বসে ছিল মনে নেই তার। তারপর, একসময় উঠল সে। দুর্বল পায়ে, টলতে টলতে সে চলে এল আবার, বাবার বাড়িতে।

স্বপনকে সে আর দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করেনি, চায়নি কোনো জবাবদিহিও। সে, তারপর আর ফিরে যায়নি ও বাড়িতে। ভাই-বোনদের অনেক অনুরোধ করে, হাতে পায়ে ধরে তৈরি করিয়েছিল ডিভোর্স লেটার। পাঠিয়ে দিয়েছিল স্বপনদের বাড়িতে।